২০৩৬ সালে টাকার গুরুত্ব পুরোপুরি হারিয়ে যাবে ?

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬

২০৩৬ সালে টাকার গুরুত্ব পুরোপুরি হারিয়ে যাবে ?

কল্পনা করুন, সকালে ঘুম থেকে উঠে কাজে যাওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আপনার প্রয়োজনীয় খাবার, পোশাক, চিকিৎসা, এমনকি দৈনন্দিন সেবার বড় অংশই তৈরি করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও রোবট। বাজারে প্রায় সব পণ্যই সহজলভ্য। এমন সময় যদি সত্যিই আসে তখন কি সত্যিই টাকার প্রয়োজন থাকবে?


সম্প্রতি দ্য ইকোনমিস্ট-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনই এক ভবিষ্যতের কথা বলেছেন টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক। তাঁর দাবি, ২০৩৬ সালের মধ্যে অর্থ বা টাকার গুরুত্ব অনেকটাই হারিয়ে যেতে পারে। কারণ, এআই ও রোবট মানুষের চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি পণ্য ও সেবা উৎপাদন করতে সক্ষম হবে। তখন কাজ করাও মানুষের জন্য প্রয়োজন নয়, বরং শখের বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে।


এই বক্তব্য প্রযুক্তিপ্রেমীদের মধ্যে যেমন কৌতূহল তৈরি করেছে, তেমনি অর্থনীতিবিদদের একাংশের মধ্যে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।


অর্থহীন সমাজের ধারণা কী?

ইলন মাস্কের বক্তব্যের মূল ভিত্তি হলো ‘পোস্ট-স্কার্সিটি ইকোনমি’ বা অভাব-পরবর্তী অর্থনীতি।


অর্থনীতির মৌলিক ধারণা হলো—সম্পদ সীমিত, কিন্তু মানুষের চাহিদা অসীম। এই সীমাবদ্ধতার কারণেই অর্থ, মূল্য এবং বাজারের প্রয়োজন হয়।


মাস্ক মনে করেন, উন্নত এআই, রোবট ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাবে, যেখানে উৎপাদন এত বেশি হবে যে অধিকাংশ পণ্যের আর কোনো প্রকৃত অভাব থাকবে না। যখন প্রয়োজনীয় জিনিস সহজলভ্য হবে, তখন সেগুলোর জন্য অর্থ ব্যয় করার প্রয়োজনও কমে যাবে।


কাজ কি সত্যিই ঐচ্ছিক হয়ে যাবে?

ইলন মাস্কের মতে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনেক ক্ষেত্রে মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যাবে। উৎপাদন, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, এমনকি সৃজনশীল কাজের বড় অংশও এআই পরিচালনা করতে পারবে।


এমন পরিস্থিতিতে মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য নয়, বরং নিজের আগ্রহ বা সৃজনশীলতার জায়গা থেকে কাজ করবে। অর্থাৎ, কাজ হবে পেশার চেয়ে বেশি ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়।


অর্থনীতিবিদরা কেন একমত নন?

প্রযুক্তির অগ্রগতি নিয়ে আশাবাদী হলেও অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, টাকার প্রয়োজন কখনোই পুরোপুরি শেষ হবে না।

তাঁদের যুক্তি, পৃথিবীর সব সম্পদ অসীম নয়। যেমন—


জমি সীমিত।


জ্বালানি ও শক্তির উৎস সীমিত।


বিশুদ্ধ পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত।


মানুষের সময় ও মনোযোগও সীমিত সম্পদ।


রোবট হয়তো উৎপাদন খরচ কমাতে পারবে, কিন্তু এসব সীমিত সম্পদের বণ্টনের জন্য কোনো না কোনো মূল্যব্যবস্থা প্রয়োজন হবে। আর সেই মূল্যব্যবস্থার অন্যতম মাধ্যমই হলো অর্থ।


এআই কি বৈষম্য কমাবে, নাকি বাড়াবে?


আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই প্রযুক্তির মালিক কে হবে?


যদি অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি উন্নত এআই ও রোবট প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে সম্পদের বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। তখন উৎপাদন বাড়লেও সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাবে না।


অন্যদিকে, প্রযুক্তির সুফল যদি সবার জন্য উন্মুক্ত করা যায়, তাহলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রয়োজনীয় অনেক পণ্য আরও সহজলভ্য হতে পারে।


বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী?

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই আলোচনা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে দেশের অর্থনীতির বড় অংশ নির্ভর করে শ্রমনির্ভর শিল্পের ওপর। যদি বিশ্বজুড়ে স্বয়ংক্রিয়তা দ্রুত বাড়ে, তাহলে কর্মসংস্থানের ধরনেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে।


বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে টিকে থাকতে প্রযুক্তি ব্যবহার, তথ্য বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব, সমস্যা সমাধান এবং আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার মতো দক্ষতার গুরুত্ব আরও বাড়বে।


ভবিষ্যৎ কি সত্যিই অর্থহীন?

ইতিহাস বলছে, প্রতিটি প্রযুক্তিগত বিপ্লব মানুষের জীবনযাত্রা বদলে দিয়েছে। শিল্পবিপ্লব যেমন নতুন পেশার জন্ম দিয়েছিল, তেমনি এআই বিপ্লবও বহু নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।


তবে অধিকাংশ অর্থনীতিবিদের মতে, অর্থ পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। বরং অর্থের ব্যবহার, কাজের ধরন এবং অর্থনীতির কাঠামো বদলে যেতে পারে।


ইলন মাস্কের বক্তব্য নিঃসন্দেহে সাহসী এবং চিন্তার খোরাক জোগায়। তবে এটি এখনো একটি ভবিষ্যৎ-দৃষ্টিভিত্তিক পূর্বাভাস, প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক সত্য নয়।


প্রযুক্তি হয়তো আমাদের কাজের ধরন বদলে দেবে, অনেক পণ্যকে সস্তা ও সহজলভ্য করবে। কিন্তু যতদিন পৃথিবীতে সীমিত সম্পদ থাকবে, ততদিন কোনো না কোনো ধরনের মূল্যব্যবস্থা বা বিনিময় ব্যবস্থা থাকার সম্ভাবনাই বেশি।


অতএব, ২০৩৬ সালে টাকার গুরুত্ব পুরোপুরি হারিয়ে যাবে কি না, তার উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রাকে এমনভাবে বদলে দিতে চলেছে, যা আজকের পৃথিবী থেকে অনেকটাই ভিন্ন হবে।


*রোদসী ডেস্ক


ঢাকা/আরএস

sidebar ad