শিক্ষক দিবস: যাঁরা মানুষ গড়ার কারিগর

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬

ছবি: এআই/রোদসী
ছবি: এআই/রোদসী

একজন মানুষকে পৃথিবীতে নিয়ে আসেন তার বাবা-মা। কিন্তু কেমন মানুষ হয়ে সে পৃথিবীতে দাড়াবে, তার ভিত গড়ে দেওয়ার মানুষগুলোর একজন শিক্ষক। জীবনের পথে কত মানুষ আসে, কত মুখ সময়ের ভিড়ে হারিয়ে যায়। অথচ শৈশবের কোনো এক বিকেলে শ্রেণিকক্ষের সামনে দাড়িয়ে একজন শিক্ষকের বলা একটি কথা, একটি শাসন, একটি উৎসাহ কিংবা নিঃশব্দ স্নেহ বহু বছর পরও মনের ভেতর ঠিক আগের মতোই বেঁচে থাকে।


একজন শিক্ষক শুধু বইয়ের অক্ষর পড়ান না। তিনি শেখান কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে ভুল থেকে শিখতে হয়, কীভাবে ব্যর্থতার পর আবার উঠে দাড়াতে হয়। কখনো তার কঠোরতা শাসন মনে হয়, পরে বুঝি সেই শাসনের ভেতরেও ছিল আমাদের ভালো করার গভীর আকাঙ্ক্ষা।


একটি ভালো ফলাফল হয়তো একজন শিক্ষার্থীর একটি বছর বদলে দিতে পারে, কিন্তু একজন ভালো শিক্ষক বদলে দিতে পারেন একজন শিক্ষার্থীর পুরো জীবন দেখার দৃষ্টিভঙ্গি।



আজ প্রযুক্তির যুগ। শিশুর হাতের মুঠোয় পৃথিবীর অগণিত তথ্য। মুহূর্তেই কোনো প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়। কিন্তু তথ্য জানা আর মানুষ হয়ে ওঠা এক বিষয় নয়।


একজন শিক্ষকই শেখান,  কোন তথ্য সত্য, কোনটি গুরুত্বপূর্ণ, কীভাবে চিন্তা করতে হয় এবং জ্ঞানকে কীভাবে মানবিকতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হয়। তাই শিক্ষকতা নিছক একটি পেশা নয়। এটি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে আলো পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব।



প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস আমাদের সেই মানুষগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়, যারা নিজেদের সময়, শ্রম, জ্ঞান ও মমতা দিয়ে অন্যের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন। তবে আমার কাছে শিক্ষক দিবস কেবল একটি আন্তর্জাতিক দিবস নয়।


এই দিনটি ফিরে আসে কিছু বিশেষ মুখ, কিছু বিশেষ কণ্ঠস্বর আর কিছু অমলিন স্মৃতি নিয়ে।



আমার শিক্ষক,

আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি

এই লেখাটি আমার প্রিয় শিক্ষক মরহুম জনাব আবুল কাশেম স্যারকে উৎসর্গ করছি।



আজও যেন শুনতে পাই সেই পরিচিত সাইকেলের টুং টাং শব্দ। সেই শব্দে আমার সন্ধ্যা শুরু হতো।


পড়ার টেবিলে বসে অপেক্ষা করতাম স্যার আসবেন। তার সাইকেলের সেই ছোট্ট ঘণ্টাধ্বনি আমার শৈশবের সন্ধ্যাগুলোর সঙ্গে এমনভাবে মিশে আছে যে, এত বছর পরও মনে হয়, কোনো এক সন্ধ্যায় হয়তো আবার সেই শব্দটি শুনব।


স্যার হয়তো জানতেন না, তার প্রতিদিনের সেই আসা, তার পড়ানো, তার শাসন, তার স্নেহ একটি শিশুর মনে কত গভীর ছাপ রেখে যাচ্ছিল।


"ফেলি রে ফেলি

আজ বুঝলি না বুঝবি 

দিন গেলি"

আঞ্চলিক এই প্রবাদটিকে কতবার স্যারের মুখে যে শুনেছি পড়া না করে দিলে,দুস্টুমি করলে,কথা না শুনলে।

আজ ঠিকি বুঝি,সব কিছু বুঝি।


সময়ের সঙ্গে আমি বড় হয়েছি। জীবনের ব্যস্ততা বেড়েছে। সেই পড়ার টেবিল নেই, সেই সন্ধ্যাগুলো নেই, স্যারের সেই সাইকেলও নেই। স্যারের সেই মাসে একবার কল করে ইনা মা কেমন আছো ডাক টাও আর শুনি না। কিন্তু শিক্ষকের দেওয়া শিক্ষা টা হারিয়ে যায়নি। স্নেহটুকুও হারিয়ে যায়নি।


কিছু মানুষ আমাদের জীবনে থাকেন না, কিন্তু তাদের শেখানো কথা আমাদের জীবনযাপনের অংশ হয়ে যায়। তারা চোখের সামনে থাকেন না, অথচ সিদ্ধান্তের মুহূর্তে তাদের কোনো একটি কথা মনে পড়ে যায়। তারা হাত ধরে পথ দেখান না, কিন্তু তাদের শিক্ষা আমাদের পথ চিনতে সাহায্য করে।


আবুল কাশেম স্যারও আমার জীবনে তেমনই একজন মানুষ। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার শিক্ষা ও স্নেহ আমার জীবনে অমর হয়ে আছে। তার স্মৃতির প্রতি রইল আমার গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা।



হয়তো একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি এটাই। তিনি চলে যাওয়ার পরও তার কোনো এক শিক্ষার্থী তার কথা মনে করে বলে, “স্যার, আপনি আমার জীবনে ছিলেন এটাই আমার সৌভাগ্য।”


বিশ্ব শিক্ষক দিবসে পৃথিবীর সকল শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা। আর আমার প্রিয় শিক্ষক মরহুম জনাব আবুল কাশেম স্যারের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা।



স্যার, আপনার সাইকেলের সেই টুং টাং শব্দ আজও আমার স্মৃতির ভেতর বাজে। আপনি নেই, কিন্তু আপনার শেখানো আলো এখনো আমার পথের সঙ্গী।


শ্রদ্ধাঞ্জলি, স্যার।

sidebar ad