সন্তানকে সামাজিকতা ও আদব কায়দা শেখাতে হবে যেভাবে

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬

সন্তানকে সামাজিকতা ও আদব কায়দা শেখাতে হবে যেভাবে

সন্তানকে শুধু ভালো রেজাল্ট করানোই যথেষ্ট নয়।তার ভেতরে যদি সামাজিকতা ও আদব-কায়দার বীজ না বোনা হয়, তাহলে জীবনের অনেক জায়গাতেই সে পিছিয়ে পড়তে পারে। একজন শিশুর আচরণ, কথা বলার ভঙ্গি, বড়দের প্রতি সম্মান, আর ছোটদের প্রতি মমতা এই সবই ধীরে ধীরে তার চরিত্র গড়ে তোলে। তাই পরিবারই হলো প্রথম স্কুল, আর বাবা-মা হলেন প্রথম শিক্ষক। ছোটবেলা থেকেই সঠিক শিক্ষা দিলে একটি শিশু শুধু শিক্ষিত নয়, হয়ে ওঠে একজন দায়িত্বশীল, ভদ্র ও মানবিক মানুষ।যে সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।হতে সে ই একদিন হবে এই সমাজের নীতি নির্ধারক।


সন্তানকে সামাজিকতা শেখানো আসলে একদিনের কাজ না।এটা ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে, প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাস থেকে।

প্রথমেই শুরু করতে হয় ঘর থেকে। বাবা-মা যদি একে অপরের সঙ্গে সম্মান দিয়ে কথা বলেন, বড়দের সালাম দেন, ছোটদের সঙ্গে নরম ব্যবহার করেন শিশু সেটাই দেখে শেখে।শিখছো না কেন,  বলার চেয়ে দেখো তো আমি বাবা কি করছি এখানে বেশি শক্তিশালী।


এরপর আসে কথাবার্তার বিষয়। শিশুকে শেখাতে হবে কীভাবে কথা বলতে হয়। ধন্যবাদ, দয়া করে, মাফ করবেন এই শব্দগুলো শুধু ভদ্রতা না, এগুলো সম্পর্ক গড়ার ভাষা। সে যেন বুঝে, জোরে বলা বা খারাপ ব্যবহার করা কোনো সমাধান না।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শেয়ার করা। নিজের জিনিস অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া, খেলায় অন্যকে সুযোগ দেওয়া এগুলো সামাজিকতার ভিত তৈরি করে। প্রথমে না চাইতেই পারে, কিন্তু ধৈর্য ধরে বারবার চর্চা করাতে হয়।


বাইরের পরিবেশে নিয়ে যাওয়া খুব কাজে দেয়। পার্ক, আত্মীয়দের বাসা, স্কুলের বাইরে ছোট মেলামেশা এগুলোতে শিশু বাস্তব জীবন শেখে। সেখানে সে দেখে মানুষ ভিন্ন ভিন্ন হয়, আর সবার সঙ্গে মানিয়ে চলতে হয়। সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো ভুল করলে ধমক না দিয়ে বুঝিয়ে বলা। তুমি খুব খারাপ করেছো, না বলে এভাবে করলে মানুষ কষ্ট পায় বাবা, এভাবে বোঝালে সে ধীরে ধীরে নিজের আচরণ ঠিক করতে শেখে।

সবশেষে মনে রাখতে হবে, সামাজিকতা মুখস্থ করানোর বিষয় না।এটা একটি অভ্যাস, যা ভালোবাসা, ধৈর্য আর নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে গড়ে ওঠে।


আদব-কায়দা শেখানো মানে শুধু কিছু নিয়ম মুখস্থ করানো না।এটা শিশুর চরিত্র গঠনের একটা ধীর কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। শিশুরা অনুকরণ প্রিয়।ছোটবেলা থেকেই যদি সঠিকভাবে শেখানো যায়, তাহলে সে বড় হয়ে যেকোনো পরিবেশে নিজের অবস্থান সুন্দরভাবে রাখতে পারে।


প্রথমেই আসে নিজের আচরণ।শিশুরা সবচেয়ে বেশি শেখে চোখে দেখে। তাই বাবা-মা যদি বড়দের সম্মান করেন, ধৈর্য ধরে কথা বলেন, আর শালীন আচরণ বজায় রাখেন শিশু স্বাভাবিকভাবেই সেটা অনুসরণ করবে। এরপর আসে মৌলিক ভদ্রতার শিক্ষা।যেমন—ছোট বড় সবাইকে সালাম দেওয়া, ধন্যবাদ বলা, মাফ চাওয়া, অনুমতি নেয়া। কারো কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা।এই ছোট ছোট বিষয়গুলোই আদব-কায়দার ভিত্তি তৈরি করে। এগুলো বারবার চর্চা করাতে হয়, শুধু একবার বললেই শেখা যায় না।


কথা বলার ধরন শেখানোও খুব জরুরি। জোরে চিৎকার না করা, বড়দের সামনে কথা বলার আগে অনুমতি নেওয়া, কারো কথা মাঝখানে না কাটা।এগুলো তাকে ভদ্র ও পরিশীলিত করে তোলে। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো খাবার ও আচরণগত শৃঙ্খলা। যেমন খেতে বসার নিয়ম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, নিজের জিনিস গুছিয়ে রাখা।এগুলোও আদবের অংশ।


সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো প্রশংসা ও ধৈর্য। যখন শিশু ভালো আচরণ করে, তখন তাকে উৎসাহ দেওয়া উচিত। আর ভুল করলে ধমক না দিয়ে শান্তভাবে বুঝিয়ে বলা। এভাবে করলে সেটা ঠিক হয় না, বরং এভাবে করলে ভালো দেখায়।


রেস্টুরেন্টেও নির্দিষ্ট ম্যানার বা ভদ্রতা টেবিল ম্যানার থাকে।এগুলো শুধু ভালো দেখানোর জন্য না, বরং অন্যদের প্রতি সম্মান দেখানো এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য খুব জরুরি।


প্রথমেই, আসে অপেক্ষা করার আচরণ। রেস্টুরেন্টে ঢুকে অযথা চিৎকার না করা, নিজের টেবিলের জন্য শান্তভাবে অপেক্ষা করা।এটাই বেসিক ম্যানার।


খাবার অর্ডার করার সময় ভদ্রভাবে কথা বলা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ওয়েটারের সাথে দয়া করে, ধন্যবাদ এই শব্দগুলো ব্যবহার করা উচিত। রাগ করে বা খারাপ ভাষায় কথা বলা একদমই অশোভন।খাওয়ার সময়ও কিছু নিয়ম আছে। মুখ ভর্তি করে কথা না বলা, জোরে শব্দ করে না খাওয়া, আর প্লেটের খাবার চারপাশে না ছড়িয়ে খাওয়া।এগুলো টেবিল ম্যানার-এর অংশ।

আরেকটা বিষয় হলো ফোন ব্যবহার। খাওয়ার টেবিলে বেশি ফোন দেখা বা জোরে কথা বলা অন্যদের বিরক্ত করতে পারে, তাই সেটা এড়িয়ে চলা ভালো। সবশেষে বিল দেওয়া বা রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার সময়ও ভদ্র আচরণ জরুরি।স্টাফদের ধন্যবাদ দেওয়া, চেয়ার গুছিয়ে রাখা যতটা সম্ভব, এবং শান্তভাবে বের হওয়া।


স্কুলে ম্যানার বলতে বোঝায় এমন কিছু আচরণ ও শৃঙ্খলা, যা একজন ছাত্রকে ভদ্র, দায়িত্বশীল এবং শিক্ষার পরিবেশের উপযোগী করে তোলে।

প্রথমেই আসে সময়মতো স্কুলে যাওয়া। দেরি না করা, নিয়মিত উপস্থিত থাকা।এগুলো শুধু নিয়ম না, বরং নিজের প্রতি দায়িত্বশীলতার পরিচয়।

শ্রেণিকক্ষে আচরণ খুব গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক ক্লাস নিচ্ছেন,এসময় মনোযোগ দিয়ে শোনা, মাঝখানে কথা না বলা, প্রশ্ন থাকলে হাত তুলে বলা,এগুলোই ভালো ছাত্রের লক্ষণ।


বন্ধুদের সাথে আচরণও স্কুল ম্যানারের অংশ। কারো সাথে খারাপ ব্যবহার না করা, ঝগড়া না করা, শেয়ার করা এবং একে অপরকে সাহায্য করা।এগুলো বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করে। শিক্ষকের প্রতি সম্মান দেখানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। সালাম দেওয়া, কথা শোনা, নির্দেশনা মানা।এগুলো একজন ছাত্রের আদব-কায়দা প্রকাশ করে। স্কুলের সম্পদ যেমন বেঞ্চ, বই, দেয়াল এসব নষ্ট না করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এটাও দায়িত্বশীলতার অংশ।


কারো বাসায় গেলে সুন্দর আচরণ বা গেস্ট ম্যানার মানা খুব জরুরি।এটা আপনার ভদ্রতা আর ব্যক্তিত্ব দুটোই প্রকাশ করে।

প্রথমেই আসে অনুমতি নেওয়া ও সময়মতো যাওয়া। দেরি করে যাওয়া বা হঠাৎ করে না জানিয়ে চলে যাওয়া ঠিক না। আগে থেকে জানিয়ে, ঠিক সময়ে যাওয়া ভালো।


বাসায় ঢুকেই সালাম বা শুভেচ্ছা জানানো উচিত। হাসিমুখে কথা বলা, এবং হোস্টকে সম্মান দেখানো খুব গুরুত্বপূর্ণ।

ভিতরে ঢুকে অযথা এদিক-সেদিক ঘোরাফেরা না করা, অনুমতি ছাড়া কিছু স্পর্শ না করা।এগুলো খুব সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম।

কথাবার্তায় ভদ্রতা বজায় রাখা দরকার। জোরে কথা না বলা, কারো ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন না করা, এবং সবাইকে সম্মান দিয়ে কথা বলা উচিত।খাবার পরিবেশন করলে ধন্যবাদ বলা এবং যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই নেওয়া।অতিরিক্ত না নেওয়া ভালো আচরণ।

ছোট বাচ্চাদের খেলনা বা জিনিসপত্র অনুমতি ছাড়া ব্যবহার না করা, আর বাসার শৃঙ্খলা নষ্ট না করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।


সবশেষে, চলে যাওয়ার সময় ধন্যবাদ জানানো এবং বিদায় নেওয়া উচিত। সম্ভব হলে পরে মেসেজ বা কল দিয়ে কৃতজ্ঞতা জানানো আরও সুন্দর আচরণ। সহজভাবে বললে কারো বাসায় গেলে এমন আচরণ করতে হবে যাতে তারা খুশি হয় এবং আবার আপনাকে আসতে বলতে চায়।


সমবয়সীদের সঙ্গে আচরণ খুব গুরুত্বপূর্ণ।এটাই একজন মানুষের সামাজিক চরিত্রের সবচেয়ে স্পষ্ট ছবি তুলে ধরে। বন্ধুত্ব ঠিক রাখার পাশাপাশি নিজের ভদ্রতা ও মূল্যবোধও এখানে প্রকাশ পায়।


প্রথমেই আসে সম্মান। সমবয়সী হলেও কাউকে ছোট করে দেখা, অপমান করা বা উপহাস করা ঠিক না। সবাইকে সমানভাবে সম্মান দিলে সম্পর্ক ভালো থাকে।এরপর আসে কথা বলার ভঙ্গি। জোরে চিৎকার করা, খারাপ ভাষা ব্যবহার করা বা ব্যঙ্গ করে কথা বলা এড়িয়ে চলা উচিত। শান্ত ও পরিষ্কারভাবে কথা বললে ভুল বোঝাবুঝি কমে।


বন্ধুত্বে শেয়ার করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।খেলাধুলা, জিনিসপত্র বা সুযোগ ভাগ করে নেওয়া। এতে সম্পর্ক শক্ত হয় এবং হিংসা বা প্রতিযোগিতা কমে।

ঝগড়া হলে দ্রুত রাগ না দেখিয়ে শান্তভাবে কথা বলে সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করা উচিত। ছোট ভুলের জন্য সম্পর্ক নষ্ট না করাই বুদ্ধিমানের কাজ। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গোপনীয়তা সম্মান করা। বন্ধুর ব্যক্তিগত বিষয় অন্যদের কাছে বলে দেওয়া বা মজা করে প্রকাশ করা ঠিক না।


সবশেষে, একে অপরকে সাহায্য করা এবং উৎসাহ দেওয়া।এটাই ভালো সমবয়সী আচরণের সবচেয়ে সুন্দর দিক। এতে শুধু বন্ধুত্বই ভালো হয় না, নিজের ব্যক্তিত্বও উন্নত হয়।সহজভাবে বললে, সমবয়সীদের সঙ্গে এমন আচরণ করতে হবে যেন সম্পর্কটা শুধু মজার না, বরং সম্মান আর বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।


লেখা: ইশরাত জাহান ইনা 

sidebar ad