সন্তান জন্মের পর দাম্পত্যে দূরত্ব কেন বাড়ে

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

সন্তান জন্মের পর স্বামী-স্ত্রী কাছাকাছি আসার পরিবর্তে কেন যেন দূরত্ব আরোও বেড়ে যায়। একই ঘরে থেকেও দূরে। এর পেছনে মূলত শারীরিক, মানসিক এবং জীবনযাত্রার বড় ধরনের পরিবর্তন কাজ করে।


একসময় যে দুজন মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলত, তারা একদিন আবিষ্কার করে একই ঘরে থেকেও তাদের কথাবার্তা যেন শেষ হয়ে গেছে।

 

কথা হয়, কিন্তু প্রয়োজনের।


বাচ্চার দুধ আছে? স্কুলের ফি দেওয়া হয়েছে? আজ কে ওকে ডাক্তার দেখাবে? বাজার থেকে ডায়াপার এনেছ? 

 




সংসার চলছে।


সন্তান বড় হচ্ছে।


দায়িত্বও ভাগাভাগি হচ্ছে।


শুধু কোথাও যেন হারিয়ে যাচ্ছে ‘আমরা’ নামের মানুষ দুটো।

 

এটাই দাম্পত্যের এক নীরব সংকট—Emotional Disconnection, অর্থাৎ আবেগগত বিচ্ছিন্নতা।


দিপ ও অনিমার গল্প


বিয়ের প্রথম দিকে দিপ আর অনিমা অনেক কথা বলত।

 

দিনের ছোট ঘটনা থেকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন সবকিছু নিয়েই তাদের আলোচনা হতো।

 

অনিমা বলত, “জানো, আজ তোমাকে খুব মনে পড়েছে।”


দিপ বলত, “আজ তোমার সঙ্গে একটা কথা বলব বলে সারাদিন অপেক্ষা করেছি।” তারপর তাদের সন্তান এলো।


সন্তান আসার পর তাদের ভালোবাসা কমেনি। বরং দুজনের ভালোবাসার কেন্দ্র যেন আরও বড় হলো।

 

কিন্তু সেই ভালোবাসার মাঝখানে ঢুকে পড়ল ঘুমহীন রাত, শিশুর কান্না, অসংখ্য দায়িত্ব, অর্থনৈতিক চাপ, কাজের ক্লান্তি আর নিজেদের জন্য সময়ের অভাব।

 

অনিমার দিন কাটে শিশুকে ঘিরে। খাওয়ানো, গোসল, ঘুম পাড়ানো, ঘর সামলানো সবকিছুর মাঝখানে নিজের জন্য সময়টুকুও থাকে না।

 

দিপ বাইরে কাজ করে ফিরে আসে ক্লান্ত হয়ে। তারও মনে হয়, সারাদিনের চাপের পর একটু শান্তি দরকার।

 

কিন্তু অনিমার প্রয়োজন তখন অন্যরকম।


সে চায় কেউ তাকে জিজ্ঞেস করুক


“তুমি কেমন আছ?”


এক রাতে অনিমা বলল, তুমি কি বুঝতে পারছ আমি কতটা ক্লান্ত?


দিপ বিরক্ত হয়ে বলল, আমি কি আরাম করছি? আমিও তো সারাদিন কাজ করি।

 

কথাটা হয়তো দিপের কাছে আত্মপক্ষসমর্থন ছিল।


কিন্তু অনিমার কাছে সেটা হয়ে গেল তোমার কষ্ট আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।


সে দিনের কথাটা আর বাড়েনি।


কিন্তু তাদের মাঝের দূরত্বটা একটু বেড়ে গেল।


এরপর এমন অনেক দিন এল, যখন তারা একই বিছানায় শুয়েছে কিন্তু কথা বলেনি।

 

একজন ফোনে, অন্যজন শিশুর দিকে তাকিয়ে।


দুজনেরই মনে হয়েছে,


“ও আমাকে বোঝে না।”


এভাবেই কখনো কখনো ভালোবাসা হারিয়ে যায় না, হারিয়ে যায় ভালোবাসা প্রকাশের অভ্যাস।

 

সন্তান জন্মের পর দূরত্ব কেন বাড়ে?


সন্তান আসার পর সম্পর্কের কাঠামোটাই বদলে যায়।


আগে একজন আরেকজনের কাছে ছিল প্রধান সঙ্গী। সন্তান আসার পর সেই সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন দায়িত্ব অভিভাবকত্ব।

 

বিশেষ করে মায়ের ক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন, ঘুমের ঘাটতি, শিশুর নির্ভরশীলতা এবং ঘরের অদৃশ্য কাজের চাপ অনেক বেড়ে যায়।

 

অন্যদিকে বাবাও অর্থনৈতিক দায়িত্ব, কাজের চাপ এবং নতুন পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতে পারেন।

 

সমস্যা তখনই বাড়ে, যখন দুজনেই নিজের ক্লান্তিকে সত্যি মনে করেন, কিন্তু অন্যজনের ক্লান্তিকে দেখতে পান না।

 

দুজনেই কষ্ট পান।


দুজনেই মনে করেন, শুধু আমিই সব করছি।

 

এখান থেকেই শুরু হয় নীরব প্রতিযোগিতা


“কে বেশি কষ্ট করছি?”

 

অথচ দাম্পত্য কোনো প্রতিযোগিতা নয়।


সন্তানকে কেন্দ্র করে ‘আমরা কোথায় হারিয়ে যায়?

 

অনেক দম্পতির জীবনে সন্তান আসার পর একটি অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটে।


স্বামী-স্ত্রী হয়ে তারা ধীরে ধীরে শুধু হয়ে যান বাবা ও মা।

 

তাদের কথার অধিকাংশই সন্তানকে ঘিরে। সন্তান কী খেল, কী পড়ল, কখন ঘুমাল, স্কুলে কী হলো সবই গুরুত্বপূর্ণ।

 

কিন্তু একদিন হয়তো কেউ আর জিজ্ঞেস করে না


“তুমি কেমন আছ?”

 

এই ছোট প্রশ্নটির অভাবই কখনো বড় শূন্যতা তৈরি করে।

 

একটি শিশুর সুস্থ পরিবার শুধু খাবার, পড়াশোনা ও নিরাপত্তা দিয়ে তৈরি হয় না। শিশুর সামনে বাবা-মায়ের পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা ও আবেগগত সংযোগও গুরুত্বপূর্ণ।

 তাই সন্তানের যত্ন নিতে গিয়ে দাম্পত্যকে পুরোপুরি ভুলে যাওয়া সন্তানের জন্যও দীর্ঘমেয়াদে ভালো কৌশল নয়।

 

সব দূরত্বের কারণ কি সন্তান?

না।


সন্তান অনেক সময় পুরোনো সমস্যাগুলোকে আরও দৃশ্যমান করে তোলে। আগে যে অভিমান চাপা ছিল, দায়িত্ব বেড়ে গেলে সেটি প্রকাশ পেতে পারে। আগে যে যোগাযোগের ঘাটতি ছিল, ঘুমহীনতা ও চাপের মধ্যে সেটি আরও প্রকট হয়।

 

তাই সন্তানকে সমস্যার কারণ না দেখে বরং বলা যায়, সন্তান আসার পর সম্পর্কের দুর্বল জায়গাগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

 

তাহলে সমাধান কী?


সমাধান মানে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোমান্টিক সময় কাটানো নয়। বরং ছোট ছোট অভ্যাস ফিরিয়ে আনা।


১. প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিট শুধু ‘আমাদের’ সময়, সন্তানের পড়াশোনা, বাজার, বিল বা সংসারের সমস্যা নয়।


শুধু দুজন মানুষ হিসেবে কথা বলা।


আজ কেমন গেল?


কী নিয়ে চিন্তা হচ্ছে?


কী ভালো লেগেছে?


কী কষ্ট দিয়েছে?


এই ১৫ মিনিট অনেক সময় বড় কোনো ডেট নাইটের চেয়েও মূল্যবান।

 

২. “তুমি কিছুই করো না”এর বদলে বলুন, “আমি খুব ক্লান্ত” অভিযোগ মানুষকে আত্মরক্ষায় নিয়ে যায়।


কিন্তু নিজের অনুভূতি প্রকাশ করলে সংযোগের সুযোগ তৈরি হয়।


“তুমি আমাকে সাহায্য করো না”এর বদলে, “আজ আমি খুব ক্লান্ত। তুমি যদি বাচ্চাটাকে একটু সামলাও, আমার অনেক উপকার হবে।”


একই প্রয়োজন, কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষা।

 

৩. ঘরের অদৃশ্য শ্রমকে স্বীকৃতি দিন শুধু টাকা উপার্জন করাই শ্রম নয়। শিশুর খাওয়ানো, স্কুলের প্রস্তুতি, কাপড়, ডাক্তার, পড়াশোনা, ঘরের পরিকল্পনা এসবও শ্রম।


আবার বাইরে কাজ করা, অর্থনৈতিক দায়িত্ব নেওয়া, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করাও শ্রম।


দুজনের শ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া দরকার।


কারণ স্বীকৃতি ক্লান্তি দূর না করলেও একাকীত্ব অনেকটা কমিয়ে দেয়।

 

৪. সপ্তাহে অন্তত একবার ‘দম্পতি’ হিসেবে সময় সন্তানকে ভালোবাসা মানে ২৪ ঘণ্টা শুধু সন্তানের মধ্যেই থাকা নয়। সম্ভব হলে সপ্তাহে একদিন একসঙ্গে চা খাওয়া, বারান্দায় বসা, হাঁটা কিংবা রাতে কিছুক্ষণ গল্প করা যেকোনো ছোট আয়োজন হতে পারে।


বাইরে যাওয়ার সামর্থ্য না থাকলেও সমস্যা নেই।


দাম্পত্যের জন্য সবসময় টাকা লাগে না।


সময় ও মনোযোগ লাগে।


৫. ঝগড়ার সময় পুরোনো হিসাব খুলবেন না, বর্তমান সমস্যার সঙ্গে দশ বছর আগের ভুল যোগ করলে কোনো সমস্যার সমাধান হয় না। একটি বিষয় নিয়ে কথা বলুন। প্রয়োজন হলে বিরতি নিন। তারপর আবার কথা বলুন।


লক্ষ্য হওয়া উচিত “কে জিতবে?” নয়, “আমরা কীভাবে সমস্যাটা পার হব?”

 

৬. শারীরিক ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি আবেগগত ঘনিষ্ঠতাও জরুরি, অনেক দম্পতি মনে করেন, একই বিছানায় ঘুমানো বা শারীরিক সম্পর্ক থাকলেই ঘনিষ্ঠতা বজায় আছে।


আসলে একজন মানুষের হাত ধরা, পাশে বসা, আলতো করে জড়িয়ে ধরা, প্রশংসা করা কিংবা ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে বলা আজ অনেক কষ্ট গেছে তোমার, তাই না?

 

এসবও ঘনিষ্ঠতার অংশ। আর যদি কথা বললেই ঝগড়া হয়?

 

তাহলে সম্পর্কের নিয়ম বদলাতে হবে।

 

একজন কথা বলবেন, অন্যজন মাঝখানে বাধা দেবেন না।

 

তারপর দ্বিতীয়জন বলবেন


তুমি যা বললে, আমি এভাবে বুঝেছি…

 

এতে ভুল বোঝাবুঝি কমে।


আর যদি দুজনের চেষ্টা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন যোগাযোগ ভেঙে থাকে, একই বিষয় নিয়ে বারবার সংঘাত হয় বা সম্পর্কের মধ্যে অবজ্ঞা, ভয়, নিয়ন্ত্রণ কিংবা মানসিক নির্যাতন থাকে, তখন বিশ্বস্ত পেশাদার দাম্পত্য কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।

 

কারণ সব সম্পর্ক শুধু ভালোবাসার অভাবে ভাঙে না।

 

কিছু সম্পর্ক ভেঙে যায় ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও একে অপরের কাছে পৌঁছানোর ভাষা হারিয়ে ফেলার কারণে।

 

শেষ পর্যন্ত ফিরে আসা, এক রাতে দিপ অনিমাকে বলল, আমরা শেষ কবে শুধু দুজন মানুষ হিসেবে কথা বলেছি?

 



অনিমা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মৃদু হেসে বলল, মনে নেই।


দিপ ফোনটা পাশে রেখে বলল, “তাহলে আজ থেকে শুরু করি?”

 

অনিমা কোনো উত্তর দিল না। শুধু পাশে এসে বসল।


হয়তো তাদের সব সমস্যা সেদিন শেষ হয়নি।

 



সন্তানের দায়িত্ব রয়ে গেছে, সংসারের চাপ রয়ে গেছে, ক্লান্তিও রয়ে গেছে। কিন্তু সেদিন একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ফিরে এসেছিল, কথা বলার ইচ্ছা।

 

দাম্পত্যে দূরত্ব তৈরি হওয়া সবসময় সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়ার প্রমাণ নয়। কখনো কখনো এটি একটি সংকেত। আমাকে আবার একটু দেখো।

আমার কথা আবার একটু শোনো।

 

সন্তানের বাবা-মা হওয়ার পাশাপাশি, আমরা যে একসময় একে অপরের মানুষ ছিলাম সেটা আবার মনে করি।” কারণ একই ঘরে থাকা মানুষকে কাছে পাওয়ার জন্য সবসময় নতুন কোনো সম্পর্কের প্রয়োজন হয় না।


কখনো প্রয়োজন শুধু পুরোনো সেই মানুষটির দিকে আবার ফিরে তাকানো। সন্তানকে ঘিরে একটি পরিবার তৈরি করা জরুরি। কিন্তু সেই পরিবারের ভেতরে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে দুজন মানুষের সম্পর্কটিকেও বাঁচিয়ে রাখা জরুরি।


কারণ সন্তান একদিন বড় হয়ে নিজের পৃথিবীতে চলে যাবে। তখন ঘরে যদি শুধু দুজন মানুষ পড়ে থাকে। তারা কি আবার একে অপরকে চিনতে পারবে?


এই প্রশ্নটির উত্তরই হয়তো আজকের দাম্পত্যের সবচেয়ে বড় ভাবনার জায়গা।


ঢাকা/টিএ 

 

 

sidebar ad