একটু ভাবুন তো, আজকাল প্রেমের সংজ্ঞাটা কি ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে? যেখানে একসময় ভালোবাসা মানে ছিল অপেক্ষা, বিশ্বাস, সম্মান আর একসঙ্গে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন সেখানে আজ অনেক সম্পর্কের শুরুতেই যেন এক অদৃশ্য চুক্তি তুমি আমাকে ভালোবাসলে তোমাকে আমার সব চাহিদা পূরণ করতে হবে।
প্রেমের প্রমাণ দিতে হবে শরীর দিয়ে, ভালোবাসার সত্যতা প্রমাণ করতে হবে ব্যক্তিগত ছবি পাঠিয়ে, আর সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার শর্ত হয়ে দাঁড়ায় শারীরিক ঘনিষ্ঠতা। প্রশ্ন হলো, যে সম্পর্কে শরীরের অধিকার চাওয়াটাই প্রধান, সেখানে মনের অধিকার প্রায় নাই বললেই চলে। ভালোবাসা, এখন শুধু শরীর পাওয়ার কৌশল।
কিছু সম্পর্ক শুরু হয় মিষ্টি কথায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে কথা, রাত জেগে মেসেজ, ভবিষ্যতের হাজারো প্রতিশ্রুতি তুমি আমার পৃথিবী, তোমাকে ছাড়া বাঁচব না, তোমাকেই বিয়ে করব।
তারপর ধীরে ধীরে শুরু হয় আবদার।
‘আমাকে সত্যিই ভালোবাসলে এটা করতে পারবে না?’
আমাকে বিশ্বাস করো না?’
সবাই তো করে, তুমি এত সেকেলে কেন?
আমার চাহিদা বুঝতে পারো না, আবার বলো ভালোবাসো।
এভাবেই ভালোবাসার জায়গায় ঢুকে পড়ে মানসিক চাপ, আবেগের ব্ল্যাকমেইল আর অপর পক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা। কেউ হারানোর ভয়ে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে রাজি হয়। কেউ সম্পর্ক বাঁচাতে নিজের সীমারেখা ভেঙে ফেলে। কেউ আবার বিশ্বাস করে, শারীরিকভাবে ঘনিষ্ঠ হলেই মানুষটি তাকে আরও বেশি ভালোবাসবে। কিন্তু সত্যিটা হলো কাউকে ভালোবাসা আর কাউকে নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করার অধিকার পাওয়া এক বিষয় নয়।
প্রেমের সম্পর্কেও প্রত্যেক মানুষের নিজের শরীর, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সিদ্ধান্তের ওপর অধিকার রয়েছে। ভালোবাসার নামে চাপ সৃষ্টি করা, ভয় দেখানো কিংবা ব্যক্তিগত ছবি আদায় করা ভালোবাসা নয় এগুলো নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ।
চাহিদা পূরণ হলে নেক্সট?
সবাই এমন নয়। আজও অসংখ্য তরুণ-তরুণী আন্তরিকভাবে ভালোবাসে, দায়িত্ব নেয়, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। কিন্তু কিছু সম্পর্কের মধ্যে এমন এক ভোগবাদী মানসিকতা দেখা যায়, যা উদ্বেগ তৈরি করার মতো।যতক্ষণ নতুনত্ব আছে, ততক্ষণ আগ্রহ। যতক্ষণ চাহিদা পূরণ হচ্ছে, ততক্ষণ যত্ন। আর যখন আগ্রহ কমে যায়, তখন শুরু হয় অজুহাত আমাদের আর মিলছে না, ‘আমি এখন কমিটমেন্ট চাই না, কিংবা কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া।
কখনো একজনের বিশ্বাস, আবেগ ও ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলোকে ব্যবহার করে অন্যজন চলে যায় নতুন কারও সন্ধানে। একজন তখনও পুরোনো প্রতিশ্রুতির অর্থ খুঁজতে থাকে, আর অন্যজন হয়তো ইতিমধ্যে নতুন সম্পর্কের গল্প শুরু করে দিয়েছে।
এখানে, বিচ্ছেদ নিজে অপরাধ নয়। সব সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাও সম্ভব নয়, সব সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাও উচিত নয়। কিন্তু কাউকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ব্যবহার করা, প্রতারণা করা কিংবা তার দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া এগুলো কোনো আধুনিকতার পরিচয় নয়। ব্রেকআপের ট্রেন্ড নয়, বরং সম্পর্কের প্রতি দায়িত্বহীনতা আর মানুষকে সহজে বদলে ফেলার মানসিকতাই আমাদের ভাবিয়ে তোলা উচিত।
ভালোবাসা মানেই কি অপর পক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করা?
কিছু মানুষ প্রেমে পড়ার পর ভালোবাসার মানুষটির ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কার সঙ্গে কথা বলবে, কী পোশাক পরবে, কোথায় যাবে, কার সঙ্গে ছবি তুলবে সবকিছুর অনুমতি যেন একজনকেই দিতে হবে।
ফোনের পাসওয়ার্ড চাওয়া, নিয়মিত অবস্থান জানতে চাওয়া, বন্ধুদের থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া, সন্দেহের নামে জেরা করা এসবকেও কখনো কখনো ভালোবাসার অধিকার বলে চালিয়ে দেওয়া হয়।
অথচ ভালোবাসা কাউকে বন্দি করে না।
ভালোবাসা নিরাপত্তা দেয়, স্বাধীনতা কেড়ে নেয় না।
মনে রাখবেন, যে মানুষ আপনাকে ভালোবাসার কথা বলে আপনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেড়ে নেয়, সে হয়তো ভালোবাসার চেয়ে আপনার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতেই বেশি আগ্রহী।
পাশ্চাত্য সংস্কৃতি, নাকি অন্ধ অনুকরণের সমস্যা?
আজকের তরুণ প্রজন্মের পোশাক, ভাষা, বিনোদন কিংবা জীবনযাপনে বিশ্বসংস্কৃতির প্রভাব থাকবেই। সমস্যা সংস্কৃতির আদান-প্রদানে নয় সমস্যা হলো, কোনো কিছুর বাহ্যিক রূপ দেখে তার পরিণতি না বুঝে অন্ধভাবে অনুকরণ করায়।
সিনেমার প্রেম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সম্পর্ক, সেলিব্রিটিদের বিচ্ছেদ কিংবা ক্ষণস্থায়ী আকর্ষণকে বাস্তব জীবনের আদর্শ মনে করলে বিপদ তৈরি হতে পারে। কারণ বাস্তব জীবন কোনো রিলস নয়। এখানে একটি সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে আত্মসম্মানে, মানসিক স্বাস্থ্যে, পড়াশোনায়, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এবং কখনো কখনো একটি পরিবারের জীবনেও।
আমাদের তরুণ প্রজন্মের স্বাধীনতা প্রয়োজন, কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধও প্রয়োজন। আধুনিক হওয়া মানে নিজের ইচ্ছাকে সবার ওপরে বসানো নয় আধুনিক হওয়া মানে নিজের অধিকার বোঝার পাশাপাশি অন্যের অধিকারকেও সম্মান করতে শেখা।
এই প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কোথায় যাচ্ছে?
একটি প্রজন্মকে শুধু প্রেম করে, সম্পর্কে জড়িয়ে কিংবা বিচ্ছেদ ঘটিয়ে বিচার করা যায় না। তাদের সামনে আছে কর্মসংস্থানের চাপ, সামাজিক তুলনা, অনলাইন আসক্তি, একাকিত্ব এবং আবেগগত সম্পর্ক গড়ে তোলার নানা চ্যালেঞ্জ।
তবু, প্রশ্ন থেকে যায় আমরা কি আমাদের সন্তানদের শুধু ভালো রেজাল্ট আর ভালো চাকরির শিক্ষা দিচ্ছি, নাকি একজন মানুষকে সম্মান করতে, প্রত্যাখ্যান মেনে নিতে এবং নিজের আবেগের দায়িত্ব নিতে শেখাচ্ছি?
আমাদের ছেলেদের শেখানো উচিত কোনো মেয়ের ভালোবাসা মানেই তার শরীরের ওপর অধিকার নয়। আমাদের মেয়েদের শেখানো উচিৎ , কাউকে হারানোর ভয়ে নিজের ইচ্ছা, নিরাপত্তা ও আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে নেই।
দুজনকেই শেখানো উচিত না মানে না, নীরবতা সম্মতি নয়, আর সম্পর্কের মধ্যে সম্মতি যেকোনো সময় প্রত্যাহার করা যায়। যে শিক্ষা মানুষকে নিজের আবেগ সামলাতে শেখায় না, অন্যের সীমারেখা মানতে শেখায় না, সেই শিক্ষার ঘাটতি শুধু প্রেমের সম্পর্কে নয়, ভবিষ্যতের দাম্পত্য জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রেম হোক, কিন্তু আত্মসম্মান বিকিয়ে নয়।প্রেম করা অপরাধ নয়। আকর্ষণ অনুভব করাও অপরাধ নয়। শারীরিক ঘনিষ্ঠতা নিয়ে প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব মূল্যবোধ ও সিদ্ধান্ত থাকতে পারে। কিন্তু কোনো সম্পর্কেই কাউকে চাপ দিয়ে, ভয় দেখিয়ে, প্রতারণা করে কিংবা ভালোবাসার প্রমাণ দাবি করে শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করা গ্রহণযোগ্য নয়।
যে মানুষ আপনার সীমারেখাকে সম্মান করে না, আপনার ‘না’ মেনে নিতে পারে না, আপনার দুর্বলতাকে অস্ত্র বানায় তার মুখের ভালোবাসার কথা নয়, তার আচরণ দেখুন। সম্পর্কে যাওয়ার আগে নিজেই আগে উপলব্ধি করুন আমি এই মানুষটির সঙ্গে নিরাপদ বোধ করি কিনা। সে আমার সিদ্ধান্তকে সম্মান করে কি না।
সে শুধু আমার কাছ থেকে কিছু পেতে চায় কিনা, নাকি আমার সুখ, দুঃখ, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবে। কারণ দিন শেষে শরীরের আকর্ষণ কমে যেতে পারে, নতুনত্ব ফুরিয়ে যেতে পারে, সম্পর্কও শেষ হতে পারে। কিন্তু কাউকে বিশ্বাস করে নিজের জীবনের একটি অধ্যায় ভাগ করে নেওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে যায়।
ভালোবাসা মানে কাউকে পাওয়ার অধিকার নয় ভালোবাসা মানে এমন একজন মানুষ হওয়া, যার কাছে অন্যজন নিজেকে নিরাপদ, সম্মানিত ও স্বাধীন মনে করে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে শুধু প্রেম করতে শেখাবেন না ভালোবাসতে শেখান। শুধু কাউকে কাছে টানতে নয়, তার সীমারেখাকে সম্মান করতেও শেখান। শুধু সম্পর্ক শুরু করতে নয়, দায়িত্ব নিয়ে সম্পর্ক পরিচালনা করতে শেখান।
কারণ একটি সুস্থ প্রজন্ম গড়ে ওঠে শুধু ভালোবাসার গল্প দিয়ে নয়, ভালোবাসার সঠিক শিক্ষা দিয়ে।
পাঠকের কাছে প্রশ্ন, আপনার কাছে প্রেমের প্রমাণ কী শারীরিক ঘনিষ্ঠতা, নাকি বিশ্বাস, সম্মান ও দায়িত্ববোধ? আর আপনার সন্তান যদি একদিন ভালোবাসার নামে এমন কোনো চাপে পড়ে, যেখানে সম্পর্ক বাঁচাতে তাকে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করতে বলা হয়, আপনি কি তাকে শুধু সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে বলবেন, নাকি নিজের আত্মসম্মান ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে শেখাবেন?
ভেবে দেখুন আমরা কি সত্যিই ভালোবাসতে শিখছি, নাকি ভালোবাসার নাম ব্যবহার করে একে অপরকে ভোগ করতে শিখছি?
লেখা
ইশরাত জাহান ইনা