শায়লা জাহান
সূর্যের তিরিক্ষি মেজাজ এর কাছে নাজেহাল হয়ে পড়ছে সবাই। পারদের পাল্লা যেন বেড়েই চলছে। প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত, তখনই নিয়ে নাও এমন কিছু খাবার যা নিমিষেই শরীরে আনবে শীতল স্বস্তি।
গ্রীষ্মের তাপদাহে অতিষ্ঠ জনজীবন। দিনের প্রথম প্রহরে তাপমাত্রা কিছুটা সহ্যের মাঝে থাকলেও, বেলা বাড়ার সাথে সাথেই তা অসহনীয় পর্যায়ে চলে আসে। সূর্যের উত্তাপ দেখে মনে হয়,সবাই আস্ত একটা ফ্রাইপ্যানে বসে অমলেট হচ্ছি। শুধু কি তাই? তার সাথে চলমান থাকা বিদ্যুৎ বিভ্রাট তো রয়েছেই!
গরমের দিনে তীব্র তাপে শরীর দ্রুত পানিশূন্য ও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে অতিরিক্ত ঘাম, মাথা ঘোরা, দূর্বলতা এবং বমি ভাবের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এছাড়াও দীর্ঘ সময় ধরে রোদে থাকলে হিটস্ট্রোক, চর্মরোগের ঝুঁকি বাড়ে। এই প্রচন্ড গরমে নিজেকে সতেজ রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই সময় সঠিক খাবার নির্বাচনই হতে পারে তোমার সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। আমাদের রসুই ঘরে এমন কিছু খাবার আছে যেগুলো প্রাকৃতিকভাবেই শরীরকে ঠান্ডা রাখে, সাথে পানি ও মিনারেল ব্যালান্স বজায় রাখে এবং এনার্জি ধরে রাখতেও সাহায্য করে। বাজারে চলতি কোমল পানীয় ভুলে নিজেকে সতেজ রাখো এই ১০টি খাবারের ছোঁয়ায়-
তরমুজ-
তীব্র গরমে শরীর ঠান্ডা ও আর্দ্র রাখতে তরমুজ হতে পারে আদর্শ। এতে ৯২% পানি থাকে, যা শরীরকে হাইড্রেট রাখে। তরমুজে ভিটামিন এ, সি, বি৬, পটাশিয়াম ও লাইকোপিন থাকে যা শরীরের তাপমাত্রা কমিয়ে ঠান্ডা ও সতেজ রাখে। শুধু তাই নয়, এটি মস্তিষ্ক ও শরীর ঠান্ডা রেখে তীব্র গরমে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়।
শসা-
শসা শরীর ঠান্ডা রাখার জন্য দারুণ। এতে ৯৫-৯৬% পানি ও প্রচুর ফাইবার থাকে, যা হজম ক্ষমতা বাড়ায় এবং কোষ্ঠ্যকাঠিন্য দূর করে। শসার মধ্যে থাকা এই বেশি মাত্রা পানি এবং পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম উপাদান শরীরকে সতেজ রাখে এবং হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়। শসার অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণাগুণ রোদে পোড়া ভাব এবং চোখের ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে। সালাদ, জুস বা কাঁচা চিবিয়ে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শাসা রাখতে পারো।
ডাবের পানি-
ইলেকট্রোলাইটের খনি হলো ডাবের পানি। এটি পটাশিয়াম, সোডিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের মতো খনিজ উপাদানে ভরপুর, যা শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে বেরিয়ে যাওয়া ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখে এবং ক্লান্তি দূর করে। ডাবের পানি সহজে হজম হয় এবং এটি পান করলে তাৎক্ষণিক শক্তি পাওয়া যায়। তবে যাদের কিডনি বা হৃদরোগের সমস্যা আছে, তাদের ডাবের পানি খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিৎ।
দই বা টক দই-
শরীর ঠাণ্ডা রাখতে এবং হজম ভালো করতে দই এর জুড়ি মেলা ভার। প্রোবায়টিক থাকায় গাট হেলথ ভালো রাখে। এতে থাকা ক্যালসিয়াম, প্রোটিন এবং ফসফরাস শরীরের পুষ্টির চাহিদা মেটায়। লাচ্ছি বা ঘোল বানিয়ে খাওয়া যেতে পারে কিংবা দইয়ের সাথে জিরার গুঁড়া, পুদিনা পাতা ও সামান্য লবন মিশিয়ে রায়তা তৈরি করে এর স্বাদ আস্বাদন করা যেতে পারে।
লেবু-
প্রচন্ড গরমে শরীর ঠান্ডা ও হাইড্রেটেড রাখতে লেবুপানি বা লেবুর শরবত অন্যতম সেরা প্রাকৃতিক উপায়। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ লেবু আমাদের রোগ প্রতিরধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং শরীরকে বিষমুক্ত করে। লেবুতে থাকা পটাশিয়াম ও খনিজ শরীরের সোডিয়াম-পটাশিয়ামের ভারসাম্য ঠিক রাখে। এছাড়া, নিয়মিত লেবুপানি পানে ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। শুধু তাই নয়, লেবুর অ্যান্টি- অক্সিডেন্ট গরমে ত্বকের কোষের ক্ষতি রোধ করে এবং ত্বক হাইড্রেটেড রাখে।
পুদিনা পাতা-
প্রাকৃতিকভাবে শরীর শীতল করতে পারে পুদিনা পাতা। এই সময় খাবারে যোগ করতে পারো এই ভেষজটি। এর ভেতর থাকা মেন্থল শরীরে এক ধরনের শীতল অনুভূতি দেয় এবং শরিরের অভ্যন্তরীণ তাপ কমাতে সাহায্য করে। ক্লান্তিভাব দূর করতে চাইলে, লেবুর শরবত বা সালাদে কয়েকটা পুদিনা পাতা মিশিয়ে দাও আর ম্যাজিক দেখো। নিমিষেই সবকিছু উধাও হয়ে যাবে। শরবত, সালাদ কিংবা রায়তা; সবকিছুতেই পুদিনা পাতা যোগ করতে পারো। যারা উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় আছো, তারা এই গরমে খাবারের তালিকায় পুদিনা পাতা রাখতে কারন এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে ভূমিকা রাখে।
লাউ-
লাউ গরমের জন্য আর্শীবাদ স্বরুপ। গরমে আরাম থাকতে লাউ একটি অত্যন্ত কার্যকরী ও আরামদায়ক সবজি। এতে প্রায় ৯৬ শতাংশ পানি থাকে, যা তীব্র গরমে শরীরে পানির ঘাটতি পুরণ করতে দারুণ ভূমিকা পালন করে। লাউয়ে ক্যালোরি খুবই কম এবং ফাইবার বেশি যা পেট ভরা রাখতে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। গরমে লাউয়ের হালকা ঝোল, লাউয়ের সূপ বা লাউ-টকদইয়ের তরকারি শরীর ঠান্ডা রাখতে খুব উপকারী।
বেল-
পেটের যেকোন সমস্যা সমাধানে বেল এক অব্যর্থ ওষুধ। শরীরের রক্ত পরিষ্কার করে এবং গরমে শীতল রাখে। প্রতিদিন দুপুর বা বিকালের নাস্তায় এক গ্লাস বেলের শরবত সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে দিবে।
সবুজ শাকসবজি-
খাদ্যতালিকায় বেশি বেশি পানিসমৃদ্ধ শাকসবজি যুক্ত করো। লাল শাক, পালং শাক বা কলমি, ঝিঙে, পটল- এসবে প্রচুর পানি ও ফাইবার থাকে। হজম করা সহজ এবং শরীরকে ভেতর থেকে আর্দ্র রাখতে সাহায্য করে। তবে মনে রাখতে হবে, অতিরিক্ত তেল বা মশলা দিয়ে রান্না করা শাক কিন্তু হিতে বিপরীত হবে।
আম-
কাঁচা আম পান্না করে খাওয়া যেতে পারে। এছাড়াও পাকা আম শক্তি দেয়। তবে তা খেতে হবে অবশ্যই পরিমিত। কারন অতিরিক্ত খেলে উল্টো গরম লাগতে পারে।
অতিরিক্ত টিপস-
* বেশি মশলাদার খাবার থেকে দূরে থাকা। এসব খাবার শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়
*অতিরিক্ত ক্যাফেইন না নেয়াই ভালো। এগুলো শরীরকে পানিশূন্য করে দেয়
*পর্যাপ্ত পানি পান করা। দিনে অন্তত ৩-৪ লিটার পানি নিশ্চিত করতে হবে
নিজের যত্ন নিতে হবে, সুস্থ থাকতে হবে এবং এই তাপদাহেও নিজেকে সতেজ রাখতে হবে