প্রাপ্তবয়স্কদের বন্ধুত্ব কেমন হওয়া উচিত?

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছবি: প্রতীকী
ছবি: প্রতীকী

শৈশব কিংবা কৈশোরের বন্ধুত্ব অনেকটাই তৈরি হয় প্রতিদিনের দেখা-সাক্ষাৎ, একই স্কুল-কলেজ, একই পাড়া কিংবা একসঙ্গে বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবন বদলে যায়। চাকরি, সংসার, সন্তান, দায়িত্ব, ব্যস্ততা, শহর বদল—সবকিছুর ভিড়ে বন্ধুত্বের জন্য আলাদা করে সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে।


তাই প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের বন্ধুত্ব অনেক সময় আগের মতো নিয়মিত না হলেও তা গভীর, অর্থপূর্ণ ও নিরাপদ হতে পারে। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্বে প্রয়োজন হয় পারস্পরিক সম্মান, বোঝাপড়া, ব্যক্তিগত সীমারেখা এবং একে অপরের জীবনের প্রতি আন্তরিক আগ্রহ।


গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্কদের বন্ধুত্বের মান ও বন্ধুদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ সুস্থতা ও মানসিক ভালো থাকার সঙ্গে ইতিবাচকভাবে সম্পর্কিত। একটি systematic review-তে ৩৮টি গবেষণা পর্যালোচনা করে বন্ধুত্বের মান, সামাজিক যোগাযোগ, বন্ধুত্ব বজায় রাখার চেষ্টা ও পারস্পরিক সহায়তার সঙ্গে ভালো থাকার বিভিন্ন সূচকের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।


তাহলে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের বন্ধুত্ব কেমন হওয়া উচিত?


১. বন্ধুত্বে ‘সমান হিসাব’ নয়, পারস্পরিকতা থাকা জরুরি


বন্ধুত্ব মানেই প্রতিবার কে আগে ফোন করল, কে কতবার বিল দিল কিংবা কে কতবার সাহায্য করল—এমন হিসাব নয়। জীবনের কোনো পর্যায়ে একজন বেশি সাহায্য চাইতেই পারেন, অন্য সময়ে অন্যজনের প্রয়োজন হতে পারে।


তবে দীর্ঘমেয়াদে বন্ধুত্বটি একতরফা হয়ে গেলে সমস্যা তৈরি হয়। দুজনেরই যেন কখনো কথা বলার, শোনার, খোঁজ নেওয়ার এবং পাশে থাকার সুযোগ থাকে।


মনোবিজ্ঞানী ও friendship expert Marisa Franco-র মতে, বন্ধুত্বের শুরুতেই পারস্পরিকতার লক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ—একজন যোগাযোগ করলে অন্যজনও যোগাযোগ করেন কি না, একে অপরের সাফল্যে সত্যিই আনন্দিত হন কি না, সেটি বন্ধুত্বের মান বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।


২. ‘না’ বলার জায়গা থাকতে হবে


ভালো বন্ধু মানেই সবসময় পাওয়া যাবে—এমন নয়। প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে প্রত্যেক মানুষেরই নিজের সময়, কাজ, পরিবার, ব্যক্তিগত জীবন ও মানসিক পরিসর থাকে।


তাই বন্ধু ফোন করলে সবসময় ফোন ধরতে না পারা, কোনো অনুষ্ঠানে যেতে না চাওয়া কিংবা কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলতে না চাওয়াকে বন্ধুত্বের অবহেলা হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই।


সুস্থ বন্ধুত্বে ‘না’ বলার অধিকার থাকে। একই সঙ্গে বন্ধুর ‘না’কেও সম্মান করার মানসিকতা থাকতে হয়।


সীমারেখা আসলে দূরত্ব তৈরির জন্য নয়; সম্পর্ককে স্বাস্থ্যকর রাখার জন্যও তা প্রয়োজন হতে পারে। Harvard Health-এ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ Dr. Robert Waldinger-ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ক্ষেত্রে কাছাকাছি থাকা ও ব্যক্তিগত পরিসরের মধ্যে ভারসাম্যের গুরুত্বের কথা বলেছেন।


৩. বন্ধুত্বে বিচার নয়, বোঝার চেষ্টা থাকা উচিত


বন্ধু ভুল করতেই পারেন। তাঁর সিদ্ধান্ত আপনার পছন্দ নাও হতে পারে। জীবনযাপন, ক্যারিয়ার, বিয়ে, সন্তান নেওয়া, অর্থব্যবস্থা কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক—অনেক বিষয়েই মতের পার্থক্য থাকতে পারে। বন্ধুত্বের অর্থ হলো সব বিষয়ে একমত হওয়া নয়। বরং মতের অমিল থাকলেও ব্যক্তিটিকে সম্মান করা।


৪. শুধু দুঃখের সময় নয়, আনন্দের সময়ও বন্ধু হতে হয়


অনেকেই মনে করেন, বিপদে যে পাশে থাকে সেই-ই ভালো বন্ধু। অবশ্যই কঠিন সময়ে পাশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বন্ধুত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বন্ধুর ভালো খবরেও আন্তরিকভাবে আনন্দিত হওয়া।


বন্ধু নতুন চাকরি পেয়েছেন, ব্যবসা শুরু করেছেন, বিয়ে করেছেন, কোনো পুরস্কার পেয়েছেন কিংবা ব্যক্তিগত কোনো স্বপ্ন পূরণ করেছেন—সেখানে ঈর্ষা বা প্রতিযোগিতার বদলে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী করে।


ফ্রানকো-র বক্তব্য অনুযায়ী, বন্ধুর সাফল্যে উৎসাহ দেখানো এবং তার ভালো চাওয়ার বিষয়টি সম্পর্কের সন্তুষ্টির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত।


৫. ব্যক্তিগত কথা নিরাপদ থাকা দরকার


বন্ধুর কাছে ব্যক্তিগত বিষয় বলা মানে বিশ্বাসের জায়গা তৈরি করা। সেই বিশ্বাসের অপব্যবহার করা উচিত নয়। কোনো বন্ধুর ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পারিবারিক সমস্যা, আর্থিক সংকট কিংবা ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা অন্যের কাছে বলে দেওয়া বন্ধুত্বে আঘাত করতে পারে।


গবেষণায় প্রাপ্তবয়স্ক বন্ধুত্বের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ঘনিষ্ঠতা, বিশ্বাস, আবেগগত সহায়তা এবং নিরাপত্তার কথা উঠে এসেছে।


৬. সব সমস্যার সমাধান দিতে হবে—এমন নয়


বন্ধু কষ্টের কথা বললে অনেক সময় আমরা সঙ্গে সঙ্গে সমাধান দিতে শুরু করি। অথচ সবসময় সমাধান নয়, কখনো শুধু মন দিয়ে শোনাটাই প্রয়োজন। ‘তোমার এটা করা উচিত ছিল’, ‘এভাবে করলে তো সমস্যা হতো না’—এ ধরনের মন্তব্যের বদলে বলা যায়, ‘তুমি চাইলে আমি শুনতে পারি।’


বন্ধুর প্রয়োজন বুঝে কখন শুনতে হবে, কখন পরামর্শ দিতে হবে আর কখন পেশাদার সহায়তার কথা বলতে হবে—এই পার্থক্যটিও গুরুত্বপূর্ণ।


৭. ব্যস্ততার মধ্যেও যোগাযোগের চেষ্টা থাকা উচিত


প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে প্রতিদিন কথা বলা সম্ভব নয়। মাসে একবার দেখা হলেও কোনো কোনো বন্ধুত্ব গভীর থাকতে পারে। আবার প্রতিদিন মেসেজ করেও কোনো বন্ধুত্বে মানসিক ঘনিষ্ঠতা নাও থাকতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ হলো যোগাযোগের মান এবং উভয়ের পক্ষ থেকে সম্পর্কটি ধরে রাখার চেষ্টা।


মনোবিজ্ঞানী Robert Waldinger পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ পুনরায় শুরু করার ক্ষেত্রেও ছোট উদ্যোগ—একটি মেসেজ, ফোন কিংবা দেখা করার প্রস্তাব—দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, এরপর অপর পক্ষও সাড়া দিচ্ছে কি না, সেটি দেখা গুরুত্বপূর্ণ।


৮. বন্ধুত্বে প্রতিযোগিতা নয়, নিরাপত্তা থাকা উচিত


‘কে বেশি সফল’, ‘কার বেতন বেশি’, ‘কার সংসার ভালো’, ‘কার সন্তান বেশি ভালো করছে’—এসব তুলনা বন্ধুত্বকে ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতায় পরিণত করতে পারে। ভালো বন্ধুর কাছে নিজের সাফল্য বলতে গিয়ে ভয় পাওয়ার কথা নয়। আবার নিজের ব্যর্থতাও লুকাতে হবে না। বন্ধুত্বের একটি বড় শক্তি হলো—এখানে মানুষ নিজের দুর্বলতা নিয়েও কিছুটা নিরাপদ বোধ করতে পারে।


৯. মতের অমিল হলে কথা বলা দরকার


মনোমালিন্য হলেই সম্পর্ক শেষ করে দেওয়া প্রাপ্তবয়স্ক বন্ধুত্বের একমাত্র সমাধান নয়। আবার সবকিছু চেপে রাখাও স্বাস্থ্যকর নয়। কোনো আচরণে কষ্ট পেলে সরাসরি কিন্তু আক্রমণ না করে বলা যেতে পারে— ‘তুমি এমন মানুষ’ না বলে ‘তোমার ওই কথাটা শুনে আমি কষ্ট পেয়েছি।’


Harvard Health-এর পরামর্শেও অভিযোগের ভাষার বদলে নিজের অনুভূতি ও সমস্যাটি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে সমাধানের দিকে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।


১০. সব বন্ধুত্ব আজীবন একই রকম থাকবে—এমন প্রত্যাশা না রাখাই ভালো


মানুষের জীবন বদলায়। একসময় যে বন্ধু প্রতিদিনের জীবনের অংশ ছিলেন, পরে হয়তো তাঁর সঙ্গে বছরে কয়েকবার কথা হয়। কেউ শহর বদলান, কেউ নতুন পরিবারে ব্যস্ত হন, কারও জীবনযাপনের অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হয়।


তাই যোগাযোগ কমে গেলেই বন্ধুত্ব ব্যর্থ—এমন নয়।


তবে যদি বারবার অসম্মান, ব্যবহার করা, বিশ্বাসভঙ্গ, নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা কিংবা মানসিকভাবে নিঃশেষ করে দেওয়ার মতো আচরণ দেখা যায়, তখন সম্পর্কটির সীমারেখা নতুন করে ভাবা প্রয়োজন। স্বাস্থ্যকর বন্ধুত্বে সীমারেখা থাকা এবং তা সম্মান করা গুরুত্বপূর্ণ।


মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, একটি স্বাস্থ্যকর প্রাপ্তবয়স্ক বন্ধুত্বে মূলত চারটি বিষয় থাকা দরকার—বিশ্বাস, পারস্পরিকতা, স্বাধীনতা ও আবেগগত নিরাপত্তা।


মনোবিজ্ঞানী মারিসা ফ্রানকো-র ভাষায়, সুস্থ সম্পর্কে একজনের প্রয়োজনই শুধু গুরুত্বপূর্ণ হবে না; দুজনের প্রয়োজনকে বিবেচনায় নিয়ে কীভাবে সম্পর্কটি পরিচালনা করা যায়, সেটি ভাবতে হবে।


sidebar ad