এক কাপ কফি: ইতিহাসের পথ পেরিয়ে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের ট্রেন্ড

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

সকালটা শুরু হয় এক কাপ কফিতে।

কাজের ফাঁকে আরেক কাপ।

বন্ধুর সঙ্গে আড্ডায় এক কাপ।

কখনো মন খারাপেও শুধু নিজের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে এক কাপ কফি।



কফি কি শুধু একটি পানীয়?- সম্ভবত না। কারণ আজকের শহুরে জীবনে এক কাপ কফি অনেক সময় হয়ে উঠেছে সময়, সম্পর্ক, কাজ এবং নিজের জন্য একটু বিরতির প্রতীক।



কফির গল্পটা শুরু কোথা থেকে?


কফির উৎপত্তি নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত গল্পটি ইথিওপিয়ার। কথিত আছে, কালদি নামের এক ছাগলপালক লক্ষ্য করেছিলেন, কিছু বিশেষ লাল ফল খাওয়ার পর তাঁর ছাগলগুলো অস্বাভাবিকভাবে চঞ্চল হয়ে উঠছে। সেই ফলই ছিল কফি-চেরি। তবে কিংবদন্তির বাইরে ইতিহাস বলছে, কফি পানীয় হিসেবে সংগঠিতভাবে ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল ইয়েমেন। ১৫শ শতাব্দীতে সেখানে কফি চাষ ও পান করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।


সুফি সম্প্রদায়ের মধ্যে রাতের ইবাদত ও জিকিরের সময় জেগে থাকতে কফি ব্যবহারের কথাও ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়।

এরপর কফি ছড়িয়ে পড়ে মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও ইউরোপে। ১৭শ শতাব্দীতে ইউরোপে কফিহাউসের বিস্তার কফির ইতিহাসে নতুন অধ্যায় তৈরি করে। এসব জায়গায় মানুষ, শুধু কফি পান করত না, চলত ব্যবসা, সাহিত্য, সংবাদ, দর্শন ও নানা সামাজিক আলোচনা।


অর্থাৎ কফির সঙ্গে ‘আড্ডা’ ও ‘আলোচনা’র সম্পর্কটিও কিন্তু বেশ পুরোনো। বাংলাদেশের কাপে কফির নতুন গল্প:

বাংলাদেশে চায়ের জনপ্রিয়তা ঐতিহ্যগতভাবে অনেক বেশি। বাড়িতে অতিথি এলে চা, অফিসে চা, আড্ডায় চা,

চা আমাদের সামাজিক জীবনেরই অংশ।


কিন্তু শহুরে জীবনযাত্রা বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে কফিও ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেছে। একসময় কফি বলতে অনেকের কাছে বোঝাত ইনস্ট্যান্ট কফির একটি কাপ।


এখন সেই ধারণা অনেকটাই বদলে গেছে। ক্যাপুচিনো, লাতে, আমেরিকানো, মোখা, এসপ্রেসো, কোল্ড কফি, ফ্র্যাপে কফির নামের তালিকাই এখন বেশ লম্বা।


আর কফিশপ?

সেটি তো এখন শুধু কফি খাওয়ার জায়গা নয়। কেন বাংলাদেশের ট্রেন্ডে কফি?


১. কফিশপ হয়ে উঠেছে নতুন আড্ডার জায়গা


ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কফিশপ সংস্কৃতি বেড়েছে। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, গল্প করা, ডেট, ছোট মিটিং কিংবা একা বসে কাজ সবকিছুর জন্যই কফিশপ ব্যবহার করছেন মানুষ।


২. সোশ্যাল মিডিয়ার বড় ভূমিকা


এক কাপ সুন্দর কফি, কাপের ওপর latte art, নান্দনিক ক্যাফের ভেতরের সাজসজ্জা—সবই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য আকর্ষণীয় কনটেন্ট। ফলে কফি শুধু পানীয় নয়, হয়ে উঠেছে একটি visual experience।


৩. তরুণদের lifestyle বদলেছে


নতুন প্রজন্মের কাছে কফি অনেক সময় একটি অভ্যাসের চেয়ে বেশি কিছু এটি তাদের lifestyle-এর অংশ।

ল্যাপটপ খুলে কফিশপে বসে কাজ করা, বই পড়া, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা একা বসে গান শোনা এসব দৃশ্য এখন শহুরে জীবনে বেশ পরিচিত।


৪. বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব


সিনেমা, সিরিজ, YouTube, Instagram, TikTok ও বিদেশ ভ্রমণের মাধ্যমে কফি-কেন্দ্রিক সংস্কৃতি বাংলাদেশেও পরিচিত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন শহরের café culture এখন আর শুধু বিদেশের দৃশ্য নয়,ঢাকার তরুণদের জীবনেও তার কিছুটা প্রতিফলন দেখা যায়।


৫. স্বাদের বিশাল বৈচিত্র্য


চায়ের তুলনায় কফিকে অনেকে হয়তো তেতো ভাবতেন। কিন্তু আধুনিক কফির জগতে স্বাদের বৈচিত্র্য অনেক বেশি।

ভ্যানিলা, ক্যারামেল, চকোলেট, দারুচিনি, দুধ, ক্রিম, বরফ নানা উপাদানে একই কফি হয়ে উঠতে পারে সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা।


কফি কী সত্যিই মন ভালো করে?


কফির প্রধান সক্রিয় উপাদান ক্যাফেইন। এটি মস্তিষ্কে ঘুমভাব কমাতে এবং সাময়িকভাবে সতর্কতা ও মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। তবে কফি সবার শরীরে একইভাবে কাজ করে না। অতিরিক্ত ক্যাফেইন অস্থিরতা, বুক ধড়ফড়, ঘুমের সমস্যা বা উদ্বেগ বাড়াতে পারে।


তাই ‘আরও বেশি কফি মানেই আরও বেশি এনার্জি’ এই ধারণাটি ঠিক নয়। বিশেষ করে যাদের ঘুমের সমস্যা বা ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীলতা আছে, তাদের সময় ও পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি।


কখনো একজন তরুণী ল্যাপটপ খুলে নিজের স্বপ্নের কাজটি করে। কখনো কেউ জানালার পাশে বসে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকে। হয়তো এ কারণেই কফি আজ বাংলাদেশের শহুরে জীবনে শুধু একটি পানীয় নয় একটি অনুভূতি ও lifestyle experience হয়ে উঠছে।



শেষ কাপের গল্প


কফির ইতিহাস কয়েক শত বছরের। ইথিওপিয়ার কিংবদন্তি থেকে ইয়েমেনের সুফি সংস্কৃতি, ইউরোপের কফিহাউস হয়ে আজকের ঢাকার আধুনিক ক্যাফে কফি পাড়ি দিয়েছে দীর্ঘ পথ। আর আমাদের হাতে থাকা সেই ছোট্ট কাপটি? তার মধ্যে হয়তো ঘুম ভাঙানোর ক্যাফেইন আছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে একটু থামার সুযোগ।

কারণ কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো বড় কোনো আয়োজন চায় না।


শুধু এক কাপ কফি, একজন প্রিয় মানুষ, আর কিছুটা সময়-এই তো যথেষ্ট।

sidebar ad