দাম্পত্যে সময় না দেওয়ার অভ্যাসও একসময় দূরত্ব তৈরি করে


ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

সারাদিনের শেষে অনেক দম্পতির কাছেই নিজেদের জন্য সময়টুকু যেন বিলাসিতা হয়ে দাঁড়ায়। একই ঘরে থেকেও দুজনের মধ্যে কথাবার্তা কমে আসে। পাশে বসে থাকা মানুষটির সঙ্গে কথা বলার বদলে চোখ আটকে থাকে মোবাইলের পর্দায়।


সম্পর্কের দূরত্ব অবশ্য সব সময় বড় কোনো ঝগড়া দিয়ে শুরু হয় না। অনেক সময় তা তৈরি হয় ছোট ছোট অনুপস্থিতি থেকে—কথা বলার সময় না দেওয়া, মন দিয়ে না শোনা, দিনের গল্প জানতে না চাওয়া, কিংবা সঙ্গীর কোনো ছোট্ট আবেদনে সাড়া না দেওয়া।


গবেষণায় সম্পর্কের এমন ছোট ছোট যোগাযোগের মুহূর্তকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সম্পর্কবিষয়ক গবেষণায় perceived partner responsiveness বা সঙ্গী আমার কথা শুনছেন, আমাকে বুঝতে চেষ্টা করছেন এবং আমার প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিচ্ছেন—এই অনুভূতিকে সম্পর্কের মানের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হয়। ২০২৬ সালে Family Relations জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় মালয়েশিয়ার ১,৮৫১ জন বিবাহিত ও অবিবাহিত মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সঙ্গীর সহায়ক ও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের মান, ঘনিষ্ঠতা, আস্থা ও সন্তুষ্টির সম্পর্ক রয়েছে।


একই ছাদের নিচে, তবু দূরে


সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হওয়ার জন্য আলাদা ঘরে থাকা জরুরি নয়। কখনো কখনো দুজন মানুষ পাশাপাশি বসেও মানসিকভাবে অনেক দূরে থাকতে পারেন।


ধরুন, একজন সারাদিনের ক্লান্তি শেষে বললেন, ‘আজ অফিসে খুব খারাপ একটা দিন গেছে।’ অন্যজন হয়তো মোবাইল থেকে চোখ না তুলেই বললেন, ‘হুম।’ কথোপকথন সেখানেই শেষ।


আবার অন্যভাবে বলা যেত, ‘কী হয়েছে?’—এই ছোট প্রশ্নটিই হয়তো দীর্ঘ একটি কথোপকথনের দরজা খুলে দিতে পারত।


সম্পর্কবিষয়ক গবেষক জন গটম্যানের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘bids for connection’—অর্থাৎ একজন সঙ্গীর পক্ষ থেকে অন্যজনের সঙ্গে মনোযোগ, স্নেহ, কথা বা সংযোগের ছোট ছোট চেষ্টা। এগুলো কখনো সরাসরি হতে পারে, আবার কখনো খুব সূক্ষ্ম। যেমন—‘আজ তোমার দিন কেমন গেল?’ বলা, কোনো ঘটনা শেয়ার করা, সাহায্য চাওয়া কিংবা শুধু পাশে এসে বসা।


সঙ্গী এসব ছোট আহ্বানে মনোযোগ দিয়ে সাড়া দিলে তাকে গটম্যানের ভাষায় বলা হয় ‘turning toward’—অর্থাৎ সঙ্গীর দিকে ফিরে যাওয়া।


বড় আয়োজন নয়, দরকার ছোট ছোট উপস্থিতি


সম্পর্ক ভালো রাখতে অনেকেই বিশেষ দিন, দামি উপহার কিংবা মাঝেমধ্যে রোমান্টিক ডিনারের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। এগুলো অবশ্যই সুন্দর অভিজ্ঞতা হতে পারে। কিন্তু সম্পর্কের দৈনন্দিন ভিত্তি তৈরি হয় আরও সাধারণ মুহূর্তে।


সকালে বের হওয়ার আগে দুই মিনিট কথা বলা, দিনের মাঝখানে একটি খোঁজ নেওয়া, বাসায় ফিরে সঙ্গীর দিনের গল্প শোনা, একসঙ্গে চা খাওয়া কিংবা রাতে ঘুমানোর আগে কয়েক মিনিট নিজেদের কথা বলা—এসবই সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।


আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনও (APA) সুস্থ সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিয়মিত যোগাযোগ ও একে অপরের সঙ্গে কথা বলার জন্য সময় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তাদের পরামর্শে শুধু সন্তান, বাজার বা সংসারের কাজ নিয়ে নয়, প্রতিদিন কিছুটা ব্যক্তিগত ও গভীর বিষয় নিয়েও কথা বলার কথা বলা হয়েছে।


‘সময় নেই’—নাকি অগ্রাধিকার নেই?


বাস্তবতা হলো, সবার জীবনেই ব্যস্ততা আছে। কর্মজীবী দম্পতির ক্ষেত্রে দায়িত্ব আরও বেশি হতে পারে। তাই ‘প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা একসঙ্গে থাকতে হবে’—এমন কোনো নিয়ম নেই।


বরং প্রশ্নটা হতে পারে—যে সামান্য সময়টুকু পাওয়া যাচ্ছে, সেটুকু আমরা কীভাবে ব্যবহার করছি?


একই সোফায় বসে দুজন দুই ফোনে ডুবে থাকা আর ১৫ মিনিট মুখোমুখি বসে কথা বলা এক বিষয় নয়।


সময় দেওয়ার অর্থ সব সময় বড় কোনো আয়োজন নয়। বরং সঙ্গী যখন কথা বলছেন, তখন মোবাইলটা একটু পাশে রাখা; তিনি কোনো সমস্যার কথা বললে সঙ্গে সঙ্গে সমাধান দেওয়ার বদলে আগে মন দিয়ে শোনা; তার আনন্দের খবরকে গুরুত্ব দেওয়া—এসবও সময় দেওয়ার অংশ।


সঙ্গীর আনন্দেও সাড়া দিন


সম্পর্কে শুধু বিপদের সময় পাশে থাকাই গুরুত্বপূর্ণ নয়। সঙ্গী কোনো ভালো খবর শেয়ার করলেও সেখানে মনোযোগ দেওয়া দরকার।


‘আজ আমার একটা ভালো খবর আছে’—এই কথাটিও এক ধরনের সংযোগের আহ্বান। সেখানে অনাগ্রহ দেখানোর বদলে ‘সত্যি? কী হয়েছে?’—এমন প্রতিক্রিয়া কথোপকথনকে এগিয়ে নিতে পারে।


২০২৬ সালের একটি গবেষণায় সঙ্গীর ইতিবাচক অভিজ্ঞতার প্রতি গঠনমূলক প্রতিক্রিয়াকেও সম্পর্কের মান ও সন্তুষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত পাওয়া গেছে। গবেষণাটি এশীয় প্রেক্ষাপট—মালয়েশিয়ার মানুষের ওপর পরিচালিত হওয়ায় বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।


মনোযোগের অভাব কীভাবে দূরত্ব বাড়ায়?


একটি সম্পর্কের বড় সমস্যা সব সময় বড় ঘটনা নয়। বরং বারবার উপেক্ষিত হওয়ার অনুভূতি ধীরে ধীরে একজন মানুষকে মনে করাতে পারে—‘আমার কথা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।’


গটম্যান ইনস্টিটিউটের গবেষণা-ভিত্তিক ব্যাখ্যায়, সঙ্গীর ছোট ছোট সংযোগের আহ্বানে বারবার সাড়া দেওয়া আস্থা ও আবেগীয় সংযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। তাদের গবেষণায় নবদম্পতিদের নিয়ে করা পর্যবেক্ষণে ছয় বছর পরও একসঙ্গে থাকা দম্পতিরা পরস্পরের এসব ‘বিড’-এর দিকে ৮৬ শতাংশ সময় ফিরেছিলেন; পরবর্তী সময়ে বিচ্ছিন্ন হওয়া দম্পতিদের ক্ষেত্রে হারটি ছিল ৩৩ শতাংশ। এই ফলাফলকে সম্পর্কের একমাত্র কারণ বা ভবিষ্যৎ নির্ধারক হিসেবে না দেখে একটি গবেষণালব্ধ সম্পর্ক হিসেবে দেখা উচিত।


সম্পর্ককে সময় দেওয়ার সহজ কিছু উপায়


প্রতিদিন ১০–১৫ মিনিট ‘নো ফোন টাইম’ রাখুন


এই সময়ে শুধু দুজন কথা বলবেন। সন্তান, অফিস বা সংসারের হিসাবের বাইরে নিজেদের নিয়েও কথা হতে পারে।


একটি প্রশ্ন করুন


‘আজ দিন কেমন গেল?’—খুব সাধারণ প্রশ্ন। কিন্তু উত্তর শোনার জন্য সত্যিই আগ্রহী থাকাটাই গুরুত্বপূর্ণ।


সঙ্গীর কথা শেষ হতে দিন


সব সমস্যার সমাধান দিতে হবে না। অনেক সময় মানুষ শুধু চায়, তার কথাটা কেউ মন দিয়ে শুনুক।


একসঙ্গে ছোট কাজ করুন


চা খাওয়া, বারান্দায় বসা, হাঁটতে যাওয়া কিংবা একসঙ্গে রান্না করা—সবকিছুই যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করতে পারে।


মোবাইলের সীমা ঠিক করুন


খাবার টেবিল কিংবা ঘুমের আগে নির্দিষ্ট কিছু সময় ফোন দূরে রাখার অভ্যাস করা যেতে পারে।


ছোট সাফল্য উদ্‌যাপন করুন


সঙ্গী কোনো কাজ ভালো করলে প্রশংসা করুন। তার আনন্দকে নিজের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলুন।


ব্যস্ত হলে সেটাও জানান


সঙ্গে সঙ্গে কথা বলতে না পারলে ‘এখন একটু ব্যস্ত, ২০ মিনিট পর তোমার সঙ্গে কথা বলব’—এমন একটি আশ্বাসও পার্থক্য তৈরি করতে পারে।


সংসার চালাতে অর্থ, দায়িত্ব, কাজ—সবই প্রয়োজন। কিন্তু একটি সম্পর্ক শুধু দায়িত্ব পালনের কাঠামো নয়; সেখানে প্রয়োজন মনোযোগ, আন্তরিকতা ও উপস্থিতিও। একই ঘরে থাকা আর একে অপরের জীবনে উপস্থিত থাকা—দুটি এক বিষয় নয়।


হয়তো প্রতিদিন আলাদা করে কয়েক ঘণ্টা সময় বের করা সম্ভব নয়। কিন্তু দিনের ব্যস্ততার মধ্যেও কয়েক মিনিটের মনোযোগ, একটি প্রশ্ন, একটি মন দিয়ে শোনা, কিংবা সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে বলা—‘আমি আছি’—সম্পর্কের উষ্ণতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।


কারণ দূরত্ব অনেক সময় তৈরি হয় বড় কোনো ঘটনায় নয়; বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট ‘সময় দিতে পারিনি’-এর জমে থাকা স্তরেই।

sidebar ad