কাঁটার বিছানায় শুয়ে রিল্যাক্সেশন! আকুপ্রেশার ম্যাট-এর রহস্য কী?

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

একসময় বাংলা সিনেমায় ভালোবাসার প্রমাণ দিতে নায়িকাদের কম কসরত করতে হতো না! নায়ক সত্যিই ভালোবাসে কি না, কিংবা নায়িকা তাঁর ভালোবাসার যোগ্য কি না—তা প্রমাণের জন্য কখনো কাঁটার পথ পেরোতে হতো তো কখনো দিতে হতো আগুনের পরীক্ষা। নায়িকার সামনে কাঁটার পথ, আর দর্শকের মনে উৎকণ্ঠা; সে কি পারবে? 


সিনেমার সেই কাঁটার পথ অবশ্য ছিল নিছক নাটকীয়তা। কিন্তু সেগুলোও আমাদের কল্পনায় বেশ জায়গা করে নিয়েছিল। 


সেই কাঁটার দিন যেন আবার ফিরে এসেছে। নতুন রুপে, নতুন পরিচয়ে। তবে এবার আর প্রেমের পরীক্ষা দিতে নয়, বরং আরাম করতে, নিজেকে একটু ভালো ফিল করাতে।


নাম তার নাম আকুপ্রেশার ম্যাট। ছোট ছোট অসংখ্য স্পাইকস-এ ভরা ম্যাট, যার ওপর শুয়ে মানুষ খুঁজছেন স্ট্রেস রিলিফ, রিল্যাক্সেশন কিংবা ঘুমের আগে একটু শান্তি। যে কাঁটা একসময় সিনেমায় ছিল ভালোবাসার পরীক্ষার প্রতীক, সেই কাঁটাই এখন হয়ে উঠেছে সেলফ কেয়ারের উপকরণ!



আকুপ্রেশার ম্যাট আসলে কী?


আকুপ্রেশার ম্যাট হলো একটি প্যাডেড ম্যাট, যার ওপরে অসংখ্য ছোট প্রেশার পয়েন্টস বা স্পাইকস থাকে। এগুলো সাধারণত শক্ত প্লাস্টিকের তৈরি এবং ম্যাটটি ফোম বা অন্য কোনো নরম উপাদানের ওপর তৈরি করা হয়। ঐতিহ্যবাহী চীনা চিকিৎসা (টিসিএম)-এর প্রাচীন নীতি দ্বারা অনুপ্রাণিত এই ম্যাটগুলো অনেকটা আকুপাংচারের মতোই কাজ করে। তবে পার্থক্য হলো এতে কোনো সূঁচ ব্যবহার করা হয় না। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে তীব্র যন্ত্রণাদায়ক বা কোনো জাদুকরি বিদ্যা মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে মূলত জীববিজ্ঞান ও স্নায়ুতন্ত্রের সহজ কিছু বৈজ্ঞানিক কার্যপদ্ধতি।


ম্যাটের ওপর শুয়ে পড়লে শরীরের পিঠ, ঘাড় বা অন্য অংশে একই সঙ্গে অনেকগুলো ছোট প্রেশার পয়েন্ট চাপ সৃষ্টি করে। শুরুতে এই চাপ বেশ তীব্র বা অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর অনেক ব্যবহারকারী চাপটিকে উষ্ণতা, ঝিনঝিনে অনুভূতি কিংবা রিল্যাক্সেশন -এর মতো অনুভব করেন। 



কাঁটার ওপর শুয়ে আরাম আসে কীভাবে?


এটাই সম্ভবত আকুপ্রেশার ম্যাটের সবচেয়ে আকর্ষণীয় রহস্য। প্রথম যখন ম্যাটটির ওপর শোয়া হয়, তখন প্লাস্টিকের হাজার হাজার সুচালো কাঁটা ত্বকে তীব্র উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। ফলে প্রথমে এক ধরনের খোঁচা বা অস্বস্তি লাগতে পারে, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তা উষ্ণতা, প্রশান্তি এবং পেশি শিথিলতার অনুভূতিতে রূপ নেয়। 


এই যে সাময়িক অস্বস্তি, এর প্রতিক্রিয়ায় মস্তিষ্ক এন্ডোরফিন এবং অক্সিটোসিন হরমোন নিঃসরণ শুরু করে। এন্ডোরফিন হলো শরীরের প্রাকৃতিক পেইনকিলার বা ব্যথানাশক যা শরীরের স্ট্রেস রেসপন্স কমিয়ে শিথিলতা বাড়ায় এবং সুস্থতার অনুভূতি বাড়ায়।


এছাড়াও, বিজ্ঞানীদের মতে মানব মস্তিষ্ক একই সাথে অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতি প্রক্রিয়া করতে পারে না। ম্যাটের অজস্র কাঁটার মৃদু চাপ যখন মেরুদণ্ডের চারপাশের স্নায়ুগুলোকে ব্যস্ত রাখে, তখন মস্তিষ্ক শরীরের অন্যান্য অংশের দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা ক্রনিক পেইনের সংকেতগুলো গ্রহণ করা সাময়িকভাবে বন্ধ বা কমিয়ে দেয়। একে বিজ্ঞানের ভাষায় 'গেইট কন্ট্রোল থিওরি' বলা হয়। 



আকুপ্রেসার ম্যাট ব্যবহারের প্রধান উপকারিতা


এই ম্যাট ব্যবহারে বেশকিছু সম্ভাব্য উপকারিতার কথা বলা হয়েছে-


- পেশির টান ও ব্যথা উপশম। বিশেষ করে পিঠ, কোমর এবং ঘাড়ের পেশী শিথিল করতে সাহায্য করার জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর।


- এন্ডোরফিন হরমোন নিঃসরণের কারণে এটি দ্রুত স্ট্রেস ও অ্যাংজাইটি কমিয়ে মন শান্ত করে।


- এটি রক্ত ​​প্রবাহকে উদ্দীপিত করে, পেশী ও কলায় তাজা অক্সিজেন পৌঁছে দেয়, শক্তি বাড়ায় এবং ক্লান্তি কমায়।


- রাতে ঘুমানোর আগে ১৫-২০ মিনিট এই ম্যাটে সময় কাটালে স্নায়ুতন্ত্র শান্ত হয় এবং অনিদ্রার (Insomnia) সমস্যা দূর হয়ে গভীর ঘুম আসে।


- ক্রীড়াবিদ এবং ফিটনেস উৎসাহীদের জন্য আদর্শ, কারণ এটি ব্যায়ামের পরে পেশীর ব্যথা ও আড়ষ্টতা কমিয়ে পেশী পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে।



গবেষণা কী বলে


আকুপ্রেশার ম্যাটের কার্যকারিতা নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়েছে, তবে তা এখনো বেশ সীমিত। চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং মনস্তত্ত্বের গবেষকেরা এর কিছু সম্ভাব্য উপকার নিয়ে বিভিন্ন ক্লিনিকাল ট্রায়াল ও ছোট আকারের গবেষণা করেছে, কিন্তু এটিকে অলৌকিক বা নিশ্চিত চিকিৎসা হিসেবে দেখানোর মতো প্রমাণ নেই।কিছু ক্ষেত্রে এর উপকারিতা পরিলক্ষিত হয়েছে আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে একে কেবল একটি "রিলাক্সেশন টুল" হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 



রিল্যাক্সেশন-এর প্রমাণ কতটা?


এই প্রসংগে খুব সুন্দর একটি গবেষণা পাওয়া যায়। ২০২৩ সালে জার্মানিতে সুস্থ তরুণদের ওপর ৩ সপ্তাহের একটি বিশেষ গবেষণা চালানো হয়। ফলাফল দেখা গেল নিয়মিত এই ম্যাট ব্যবহারের ফলে অংশগ্রহণকারীদের মানসিক সুস্থতা (Well-being) বেড়েছে, মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা কমেছে এবং ঘুমের মান ও মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা উন্নত হয়েছে। 


কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো; হার্ট রেট, রক্তচাপ, ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতা -এর মতো বিষয়গুলোর উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ বলা যায়, ম্যাটটি ব্যবহার করে মানুষ নিজেকে বেশি রিল্যাক্স অনুভব করতে পারেন, কিন্তু শরীরে বড় ধরনের শারীরবৃত্তীয়  পরিবর্তন ঘটছে—এমন দাবি করার মতো প্রমাণ এখনো সীমিত।


ব্যথার ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর? 


আকুপ্রেশার নিয়ে ব্যাক পেইন-এর ক্ষেত্রে গবেষণার ফল তুলনামূলকভাবে আশাব্যঞ্জক। একটি সিস্টেমেটিক রিভিউ-তে ৬টি গবেষণা ও ৪৬৮ জন অংশগ্রহণকারীকে বিশ্লেষণ করে ব্যথা, অক্ষমতা এবং ঘুমের উন্নতির কথা পাওয়া যায়।


ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী কোমর ব্যথায় ভোগা রোগীদের ওপর আরো একটি ক্লিনিকাল ট্রায়াল চালানো হয়, যেখানে রোগীদের একটি দলকে সাধারণ থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ বা ব্যায়াম দেওয়া হয় এবং অন্য দলকে ব্যায়ামের পাশাপাশি প্রতিদিন ম্যাট ব্যবহার করতে দেওয়া হয়। 


দীর্ঘ ৬ মাস পর্যবেক্ষণের পর দেখা গেছে, যারা সাধারণ ব্যায়ামের সাথে আকুপ্রেশার ম্যাট সংযুক্ত করেছিলেন, তাদের ব্যথার তীব্রতা অনেক দ্রুত কমেছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, এই রোগীদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান অন্য গ্রুপের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত হয়েছে।


তবে একটা বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি, এই গবেষণাগুলোর সবগুলোই আকুপ্রেশার ম্যাট নিয়ে নয়। অনেক গবেষণায় ট্রেনড আকুপ্রেশার বা নির্দিষ্ট প্রেশার পয়েন্ট টেকনিক ব্যবহার করা হয়েছে। তাই সেগুলোর ফল সরাসরি প্রতিটি বাজারজাত আকুপ্রেশার ম্যাট- এর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা ঠিক হবে না।


ঘুমের ক্ষেত্রেও কী উপকার?


ঘুমের মান উন্নত করতে এবং অনিদ্রা (Insomnia) কমাতে আকুপ্রেসার ম্যাট বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখে এবং এর স্বপক্ষে একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও মেটা-অ্যানালিসিস রয়েছে। 


একটি ক্লিনিকাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, ঘুমানোর আগে ২০ মিনিট আকুপ্রেসার ম্যাট ব্যবহার করার ফলে মানুষের শরীর গড়ে প্রায় ৯ মিনিট দ্রুত ঘুমের রাজ্যে প্রবেশ করে। প্লাস্টিকের সুচালো কাঁটাগুলো পিঠের নার্ভকে শান্ত করে বলে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করার সময় কমে যায় অংশগ্রহণকারীদের দ্রুত ঘুম আসার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। 


২০২৫ এবং ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক কিছু মেটা-অ্যানালিসিস এবং সিস্টেম্যাটিক রিভিউতে আকুপ্রেশারের সাথে ঘুমের গভীর সম্পর্কের প্রমাণ মিলেছে।


গবেষকেরা দেখেছেন, আকুপ্রেশার স্টিমুলেশন মানুষের টোটাল স্লিপ টাইম এবং স্লিপ এফিশিয়েন্সি বা ঘুমের কার্যকারিতা) উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। রিল্যাক্সেশনের কারণে মস্তিষ্কে স্লো-ওয়েভ বা গভীর ঘুম এবং আরইএম (REM) স্লিপের সময়কাল বৃদ্ধি পায়, যা পরদিন সকালে শরীরকে সতেজ রাখতে সবচেয়ে জরুরি।


ম্যাট কেনার সময় যা দেখবেন


আকুপ্রেশার ম্যাট কেনার সময় স্পাইকের ঘনত্ব, ম্যাটের উপাদান, শরীরের প্রয়োজনীয় আকার মূল এই বিষয়গুলো দেখতে হবে। বাজারে হরেক রকমের ম্যাট পাওয়া গেলেও সবগুলোর কার্যক্ষমতা এক নয়। তাই একটি ভালো মানের ও আরামদায়ক ম্যাট বেছে নিতে নিচের বিষয়গুলো ভালোভাবে যাচাই করে নিন:


- ম্যাটে যত বেশি প্লাস্টিক স্পাইক বা কাঁটা থাকবে (সাধারণত ৬,০০০ থেকে ৮,০০০ বা তার বেশি), শরীরের ওজন তত বেশি জায়গায় ছড়িয়ে পড়বে। এতে পিঠে কম বা মৃদু চাপ লাগবে যা নতুনদের জন্য উপযোগী। শুধু পায়ের জন্য ছোট ম্যাটে কমপক্ষে ১,০০০ স্পাইক থাকা উচিত।


- ভেতরের প্যাডিং ফোম বা পলিয়েস্টারের চেয়ে নারকেলের ফাইবার বা বাকহুইট (Buckwheat) দেওয়া ম্যাটগুলো বেশি টেকসই এবং শরীর থেকে ঘাম ছাড়ে ভালো। মেঝেতে ব্যবহারের জন্য হালকা গদিযুক্ত বা প্যাডিং ওয়ালা ম্যাট নেওয়া ভালো। যেহেতু এটি খালি গায়ে বা পাতলা কাপড়ে ব্যবহার করতে হয়, তাই কাভারটি অর্গানিক কটন বা লিনেনের হওয়া উচিত। কাভারটি খুলে আলাদাভাবে ধোয়া যায় কিনা তাও পরখ করে নিন। 


- আপনার পিঠের দৈর্ঘ্যের সাথে মানানসই ম্যাট বেছে নিন। সাধারণত ২৬ থেকে ২৮ ইঞ্চি লম্বা ম্যাট পিঠের নিচের অংশ থেকে ঘাড় পর্যন্ত পুরো কভার করে, যা বেশিরভাগ মানুষের জন্য উপযুক্ত। আপনার উচ্চতা যদি বেশি হয়, তবে এক্সট্রা-লং সংস্করণটি বেছে নিন যেন পুরো পিঠ ও নিতম্ব একসাথে ম্যাটের ওপর থাকে।  


- অনেক ম্যাটের সাথে একটি স্পাইকযুক্ত ঘাড়ের বালিশ (Neck Pillow) দেওয়া থাকে। ঘাড়ের ব্যথা বা মাথা ব্যথার সমস্যায় এই বালিশটি অত্যন্ত কার্যকরী। ম্যাটটি সহজে বহন বা গুটিয়ে রাখার জন্য সাথে কোনো ট্রাভেল ব্যাগ বা স্ট্র্যাপ আছে কিনা দেখে নিন। ঘাড়ের জন্য আলাদা বালিশ এবং ক্যারি ব্যাগ থাকলে ব্যবহার সহজ হয়।


সবার জন্য কী নিরাপদ?


অ্যাকুপ্রেশার ম্যাট বেশিরভাগ মানুষের জন্য নিরাপদ হলেও কিছু ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। যেমন, গর্ভবতী মহিলাদের ব্যবহারের আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এছাড়াও মৃগীরোগ থাকলে ম্যাট ব্যবহারে সতর্ক থাকুন, কারণ চাপের উদ্দীপনা বিরল ক্ষেত্রে খিঁচুনি ট্রিগার করতে পারে।


এটি কোনো সাধারণ বিছানা নয়। এর স্পাইক ত্বকে চাপ সৃষ্টি করে। তাই ত্বকে কাটা-ছেঁড়া, ক্ষত, ত্বকের সংক্রমণ বা অতি সংবেদনশীল ত্বক হলে ব্যবহার না করাই ভালো।


রক্ত পাতলা করার ওষুধ যেমন, ওয়ারফারিন বা হেপারিন জাতীয় ওষুধ সেবন করলে ম্যাট ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যাক পেইন বা অন্য কোনো দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার কারণ না জেনে শুধু ম্যাটের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। ব্যথা দীর্ঘদিন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন। 

sidebar ad