নারী জীবন, বহুমুখী চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নারী জীবন, বহুমুখী চ্যালেঞ্জ
“একজন নারী শুধু চাকরি করে না সে প্রতিদিন যুদ্ধ লড়ে”


কর্মক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ দুজনেই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। কিন্তু চ্যালেঞ্জের প্রকৃতি কি একই? না। পরিসংখ্যান বলবে সুযোগের কথা, পদোন্নতির হার বলবে কাঠামোর কথা, কিন্তু বাস্তবতা বলবে দায়িত্বের অদৃশ্য বিভাজনের কথা। একজন পুরুষ অফিসে কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরলে তার দিন শেষ হতে পারে। একজন নারীর ক্ষেত্রে দিনটি তখনই দ্বিতীয় শিফটে ঢুকে যায়।

এই লেখাটি কোনো অভিযোগপত্র নয়। এটি একটি বাস্তব চিত্র যেখানে কর্মক্ষেত্রে নারীর সংগ্রাম দৃশ্যমান চ্যালেঞ্জের চেয়েও বেশি অদৃশ্য চাপের গল্প। 

দ্বৈত দায়িত্ব: অফিস ও ঘর দুই জায়গাতেই পূর্ণকালীন কর্মী। একজন কর্মজীবী নারী সকাল শুরু করেন সময়ের বিরুদ্ধে দৌড়ে। সন্তানের স্কুল, পরিবারের সকালের খাবার, গৃহকর্মীর অনুপস্থিতি সব সামলে যখন তিনি অফিসে পৌঁছান, তখন তার দিনের প্রথম লড়াই শেষ। অফিসে ঢুকেই তাকে পেশাদার হতে হয়, ফোকাসড, স্ট্র্যাটেজিক, আত্মবিশ্বাসী।

কিন্তু অফিস শেষে?
তার সামনে থাকে দ্বিতীয় দায়িত্ব। রান্না, সন্তানের পড়াশোনা, বয়স্ক অভিভাবকের ওষুধ, সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা। একজন পুরুষ কর্মী যদি অতিরিক্ত সময় অফিসে দেন, সেটি ক্যারিয়ার কমিটমেন্ট হিসেবে দেখা হয়। একজন নারী দিলে প্রশ্ন ওঠে “বাড়ির দিকে খেয়াল রাখছেন তো?” এই দ্বৈত মানদণ্ড নারীর কর্মজীবনকে শুরু থেকেই কঠিন করে তোলে।

প্রমাণের চাপ: যোগ্যতা নয়, বারবার সক্ষমতা প্রমাণ 
কর্মক্ষেত্রে অনেক নারীই অনুভব করেন তাদের দক্ষতা একবার প্রমাণ করলেই হয় না, বারবার প্রমাণ করতে হয়। একটি মিটিংয়ে একই প্রস্তাব যদি একজন পুরুষ দেন, সেটি “কনফিডেন্ট” হিসেবে দেখা হয়। একই প্রস্তাব একজন নারী দিলে বলা হয় “খুব অ্যাগ্রেসিভ হয়ে যাচ্ছেন না তো?” নারীর দৃঢ়তা অনেক সময় ভুল ব্যাখ্যা পায়। নেতৃত্ব দেখালে বলা হয় কঠিন। আবেগ দেখালে বলা হয় দুর্বল। এই দুই প্রান্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তাকে এমন এক ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়, যা পুরুষ সহকর্মীর ক্ষেত্রে সচরাচর প্রশ্নবিদ্ধ হয় না।

মাতৃত্বের মূল্য: ক্যারিয়ারের বিরতি, সুযোগের ফাঁক
মাতৃত্ব নারীর জীবনের এক গভীর ও আনন্দের অধ্যায়। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে এটি অনেক সময় অদৃশ্য শাস্তি হয়ে দাঁড়ায়। ম্যাটারনিটি লিভ নেওয়া মানেই পদোন্নতির দৌড়ে পিছিয়ে পড়া। এমন ধারণা এখনো অস্বীকার করা যায় না। অনেকে প্রকাশ্যে কিছু বলেন না, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে নাম থাকে না। মাতৃত্ব-পরবর্তী সময়ে একজন নারী যখন কাজে ফেরেন, তখন তাকে প্রমাণ করতে হয় তিনি এখনো সমান দক্ষ, সমান মনোযোগী। পুরুষের পিতৃত্বকে সাধারণত “অতিরিক্ত দায়িত্ব” হিসেবে দেখা হয় না। বরং অনেকে বলেন “ফ্যামিলি ম্যান হয়েছেন।” কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে মাতৃত্বকে অনেক সময় ক্যারিয়ারের প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখা হয়।

নিরাপত্তা ও মানসিক চাপ
নারীদের কর্মক্ষেত্রে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপত্তা শারীরিক এবং মানসিক দুই দিকেই। অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্য, সূক্ষ্ম ইঙ্গিত, অনাকাঙ্ক্ষিত মেসেজ সবসময় প্রকাশ্যে হয় না, কিন্তু প্রভাব ফেলে গভীরে। একজন নারীকে অনেক সময় সিদ্ধান্ত নিতে হয় প্রতিবাদ করবেন, নাকি চুপ থাকবেন? প্রতিবাদ করলে কি ক্যারিয়ারের ক্ষতি হবে? এই মানসিক দ্বিধা প্রতিদিনের চাপ তৈরি করে। অফিসের কাজের চাপের পাশাপাশি তাকে মানসিক নিরাপত্তার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হয়।


বেতন বৈষম্য ও নেতৃত্বের সীমা
বিশ্বজুড়ে লিঙ্গভিত্তিক বেতন বৈষম্যের কথা নতুন নয়। একই কাজের জন্য নারীরা অনেক ক্ষেত্রেই কম বেতন পান। আবার নেতৃত্বের জায়গায় নারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। এটি শুধু যোগ্যতার প্রশ্ন নয়, এটি সুযোগের প্রশ্ন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে নারীর উপস্থিতি কম হলে, নীতিনির্ধারণে তার অভিজ্ঞতার প্রতিফলনও কম হয়। তাই অনেক নারীকে শুধু নিজের উন্নতির জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও লড়তে হয়, যাতে পরের প্রজন্ম একই বাধার মুখোমুখি না হয়।

সামাজিক বিচার: সফল হলে প্রশ্ন, ব্যর্থ হলে দায়
একজন নারী যখন দ্রুত সফল হন, তখন অনেক সময় তার দক্ষতার চেয়ে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। “কীভাবে এত দ্রুত উঠলেন?” “কার সাপোর্ট ছিল?”
কিন্তু ব্যর্থ হলে দায়টি পুরোপুরি ব্যক্তিগত। বলা হয় “এটাই তো হওয়ার ছিল।” পুরুষের ক্ষেত্রে সাফল্যকে ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে উদযাপন করা হয়, ব্যর্থতাকে বলা হয় অভিজ্ঞতা। নারীর ক্ষেত্রে সাফল্যকে সন্দেহ করা হয়, ব্যর্থতাকে বলা হয় সীমাবদ্ধতা।

আত্ম-সন্দেহ: ভেতরের অদৃশ্য লড়াই
সবচেয়ে বড় যুদ্ধটি বাইরে নয়, ভেতরে। সমাজের দীর্ঘদিনের বার্তা, “তুমি পারবে তো?” একসময় আত্ম-সন্দেহে রূপ নেয়।
অনেক যোগ্য নারী বড় পদে আবেদন করেন না, কারণ তারা ভাবেন, “আমি কি যথেষ্ট প্রস্তুত?” অন্যদিকে, অনেক পুরুষ আংশিক যোগ্য হয়েও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আবেদন করেন। এই মানসিক পার্থক্য গড়ে ওঠে সামাজিক শর্তায়নের মাধ্যমে। ছোটবেলা থেকে মেয়েদের বলা হয় সাবধান হতে, ছেলেদের বলা হয় সাহসী হতে। ফলে কর্মক্ষেত্রে নারীকে শুধু কাজ নয়, নিজের ভেতরের ভয়ও জয় করতে হয়।

তবু কেন এগিয়ে যাচ্ছে নারী?
এত চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। কেন? কারণ তারা জানে, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা শুধু আয় নয়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। কর্মজীবন শুধু পদ নয়, পরিচয়। নেতৃত্ব শুধু চেয়ার নয়, প্রভাব। আজকের নারী জানে, সে শুধু নিজের জন্য কাজ করছে না। তার পথচলা পরবর্তী প্রজন্মের মেয়েদের জন্য মানচিত্র তৈরি করছে।

পুরুষের চ্যালেঞ্জও বাস্তব—কিন্তু আলাদা
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য আছে; পুরুষদেরও চাপ আছে। পরিবার চালানোর সামাজিক প্রত্যাশা, আর্থিক স্থিতি বজায় রাখার দায়িত্ব, আবেগ প্রকাশে বাধা, এসবও বাস্তব। কিন্তু পার্থক্য হলো, পুরুষের চাপ প্রধানত একমুখী। অর্থনৈতিক ও পেশাগত। নারীর চাপ বহুমুখী। অর্থনৈতিক, পেশাগত, পারিবারিক, সামাজিক, মানসিক। এই বহুমাত্রিক চাপই নারীর কর্মজীবনকে আলাদা করে তোলে।

পরিবর্তনের পথ কোথায়?
পরিবর্তন শুধু নারীর দায়িত্ব নয়। প্রতিষ্ঠানকে নীতি বদলাতে হবে— সমান বেতন মাতৃত্ব ও পিতৃত্ব ছুটি। নিরাপদ কর্মপরিবেশ নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পরিবারকেও বদলাতে হবে। গৃহকর্মকে যৌথ দায়িত্ব হিসেবে দেখা, ক্যারিয়ারকে লিঙ্গ দিয়ে বিচার না করা এবং সমাজকে বদলাতে হবে; সফল নারীকে সন্দেহ নয়, সম্মান করা।

শেষ কথা
একজন নারী শুধু অফিসে কাজ করেন না। তিনি একসঙ্গে ম্যানেজার, মা, কন্যা, সঙ্গী, সহকর্মী, নেতা—সব ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। প্রতিদিন তিনি সময়, প্রত্যাশা, আবেগ, দায়িত্ব সবকিছুর সঙ্গে সমঝোতা করেন। তাই কর্মক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের চ্যালেঞ্জ আলাদা। এটি বিভাজনের কথা নয়, বাস্তবতার স্বীকৃতি।
যেদিন আমরা এই বাস্তবতাকে বুঝতে পারব, সেদিন সমতা কেবল স্লোগান থাকবে না, তা হবে নীতি, সংস্কৃতি এবং অভ্যাস। কারণ একজন নারী যখন এগিয়ে যায়, সে একা এগোয় না, সে একটি সমাজকে সামনে টেনে নেয়।


সাবিনা ইয়াসমীন, সম্পাদক-রোদসী
sidebar ad