প্রাক্তন, কিন্তু বন্ধু—কেন ছিঁড়ে যায় না পুরোনো সম্পর্কের সুতো?

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

প্রেমের সম্পর্কটা ভেঙে গেছে। আগের সেই গভীর ভালোবাসা, অধিকারবোধ কিংবা একসঙ্গে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন—সবই হয়তো শেষ। তবু দিনশেষে একে অপরের খোঁজ নেওয়া থামেনি। কথা হয়, প্রয়োজন হলে পাশে দাঁড়ান, কখনো হয়তো পুরোনো স্মৃতি নিয়েও হাসাহাসি করেন। সম্পর্কের নাম বদলে গেছে, কিন্তু যোগাযোগের সুতোটা পুরোপুরি ছিঁড়ে যায়নি।


এমন সম্পর্ককে অনেকেই বলেন—‘প্রাক্তন, কিন্তু বন্ধু’। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিচ্ছেদের পরও কেন অনেকে সাবেক প্রেমিক বা প্রেমিকার সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখেন? এর পেছনে কি শুধু পুরোনো ভালোবাসা কাজ করে, নাকি এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অভ্যাস, মানসিক নিরাপত্তা, প্রয়োজন কিংবা সম্পর্ক হারানোর ভয়ও?


মনোবিষয়ক সাময়িকী Psychology Today-এর একটি প্রতিবেদনে, কানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাসহ বিভিন্ন গবেষণার আলোকে সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখার কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে।


পুরোনো ভরসার জায়গাটা সহজে হারায় না


একটি প্রেমের সম্পর্কে শুধু ভালোবাসা তৈরি হয় না; তৈরি হয় গভীর বিশ্বাস ও মানসিক নির্ভরতা। কে কী নিয়ে চিন্তিত, কোন কথায় মন ভালো হয়, কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে পাশে দাঁড়াতে হয়—এসব দুজনেরই জানা হয়ে যায়।


বিচ্ছেদ হয়ে গেলেও এই পরিচিতি একদিনে মুছে যায় না। তাই মন খারাপ হলে সাবেক মানুষটির কথাই মনে পড়তে পারে। বিপদে পড়লে তাকেই ফোন করতে ইচ্ছে হতে পারে। কারণ, নতুন কারও কাছে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করার চেয়ে পরিচিত একজনের কাছে নিজেকে মেলে ধরা অনেক সহজ মনে হয়।


এ ক্ষেত্রে বন্ধুত্বটি সত্যিই স্বস্তিদায়ক হতে পারে—যদি দুজনই সম্পর্কের পরিবর্তিত অবস্থাটিকে মেনে নেন এবং একে অপরের সীমারেখাকে সম্মান করেন।


কখনো বন্ধুত্বের পেছনে থাকে প্রয়োজন


সব সময় আবেগের কারণেই সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় থাকে না। কখনো বাস্তব প্রয়োজনও দুজনকে যোগাযোগে রাখে। একই বন্ধুমহল, একই কর্মক্ষেত্র বা সামাজিক পরিসর, যৌথ সম্পদ, পোষা প্রাণী কিংবা সন্তানের দায়িত্ব—এ ধরনের বিষয় বিচ্ছেদের পরও দুজনকে যোগাযোগ রাখতে বাধ্য করতে পারে।


কখনো আবার অর্থনৈতিক বা অন্য কোনো পারস্পরিক সুবিধার কারণেও যোগাযোগ অব্যাহত থাকতে পারে।


এ ধরনের সম্পর্ককে সব সময় ‘বন্ধুত্ব’ বলা না গেলেও, তাতে সৌহার্দ্য বজায় থাকতে পারে। তবে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া যায়, কেবল প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব অনেক সময় দীর্ঘস্থায়ী হয় না।


ঝামেলা এড়াতেও বন্ধুত্ব বজায় রাখেন অনেকে


বিচ্ছেদ মানেই যে সব সময় তিক্ততা, অভিযোগ আর শত্রুতা—তা নয়। কেউ কেউ সম্পর্ক শেষ করার পরও চান না, বিষয়টি নতুন কোনো সংঘাত তৈরি করুক। তাই সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে ভদ্রভাবে কথা বলেন, খোঁজখবর রাখেন কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে স্বাভাবিক আচরণ করেন।


বিশেষ করে যখন দুজনের বন্ধু একই, তখন সম্পূর্ণ যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া অনেক সময় অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে। কেউ আবার ভাবেন, হঠাৎ করে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলে সাবেক সঙ্গী আরও বেশি কষ্ট পেতে পারেন।


ফলে বন্ধুত্বের একটি আবরণে সম্পর্কের দূরত্বটা সামলে নেওয়ার চেষ্টা করেন তারা। তবে শুধু ঝামেলা এড়ানোর জন্য বজায় রাখা এই ধরনের সম্পর্ক সব সময় গভীর বন্ধুত্বে পরিণত হয় না। হয়তো ভালোবাসাটা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। এটাই সম্ভবত সবচেয়ে জটিল কারণ।


বিচ্ছেদ হয়ে গেলেই যে দুজনের অনুভূতি একই মুহূর্তে শেষ হয়ে যাবে, এমন নয়। একজন হয়তো সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসেছেন, কিন্তু অন্যজন এখনো পুরোনো জায়গাতেই আটকে আছেন।


তখন ‘বন্ধুত্ব’ হয়ে উঠতে পারে সম্পর্কটিকে ধরে রাখার একটি উপায়। মনে হতে পারে—‘এখন বন্ধুত্ব থাক, হয়তো কোনো একদিন আবার সব ঠিক হয়ে যাবে।’


সাবেক সঙ্গীর জীবনে নতুন কেউ আসুক—এটাও অনেকের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন হয়। ফলে বন্ধুত্বের আড়ালে থেকে তার জীবনের সঙ্গে যুক্ত থাকার চেষ্টা চলতে থাকে।


কিন্তু এখানেই তৈরি হতে পারে সবচেয়ে বড় সমস্যা। একজন যদি সত্যিই শুধু বন্ধুত্ব চান, আর অন্যজন যদি মনে মনে সম্পর্ক পুনরায় শুরু হওয়ার অপেক্ষায় থাকেন, তাহলে এই অসম প্রত্যাশা নতুন করে কষ্ট, হতাশা ও মানসিক টানাপোড়েন তৈরি করতে পারে।


প্রাক্তনের সঙ্গে বন্ধুত্ব কি তাহলে খারাপ?


একেবারেই নয়। সাবেক প্রেমিক বা প্রেমিকার সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখা মানেই যে পুরোনো প্রেম ফিরে আসবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। অনেক সম্পর্ক তিক্ততা ছাড়াই শেষ হয়। সময়ের সঙ্গে প্রেমের অনুভূতি কমে গিয়ে দুজনের মধ্যে একটি পরিণত বন্ধুত্ব তৈরি হতে পারে।


আবার কেউ কেউ বুঝতে পারেন, প্রেমিক-প্রেমিকা হিসেবে তারা ভালো ছিলেন না, কিন্তু মানুষ হিসেবে একে অপরকে সম্মান করেন। সেই জায়গা থেকেই বন্ধুত্ব তৈরি হতে পারে।


Psychology Today-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষের অন্তত একজন সাবেক প্রেমিক বা প্রেমিকার সঙ্গে বন্ধুত্ব রয়েছে। প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের একাধিক সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিষমকামী ব্যক্তিদের তুলনায় LGBTQ ব্যক্তিদের মধ্যে বিচ্ছেদের পর বন্ধুত্ব বজায় রাখার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।


আসল বিষয়—দুজনের চাওয়া কি একই?


প্রাক্তনের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে কি না, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই বন্ধুত্ব দুজনের জন্য কী অর্থ বহন করছে। একজন যদি অতীতকে মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চান, আর অন্যজন যদি প্রতিটি কথোপকথনে পুরোনো সম্পর্ক ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা খুঁজতে থাকেন, তাহলে বন্ধুত্বটি ধীরে ধীরে মানসিক বোঝা হয়ে উঠতে পারে।


কখনো কখনো যোগাযোগ ধরে রাখার অর্থ ভালোবাসা নয়; বরং পুরোনো অভ্যাসকে বিদায় জানাতে না পারা। কারও ক্ষেত্রে প্রাক্তন মানুষটি হয়ে ওঠেন পরিচিত নিরাপত্তার জায়গা। কারও ক্ষেত্রে তিনি শুধুই একজন পুরোনো বন্ধু। আবার কারও জন্য সেই সম্পর্কের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।


তাই ‘প্রাক্তনের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখা উচিত কি না’—এর কোনো একক উত্তর নেই। বরং নিজেকে প্রশ্ন করা জরুরি—আমি কি সত্যিই বন্ধুত্ব চাই, নাকি বন্ধুত্বের নামে এখনো সেই মানুষটিকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় আছি?


কারণ সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়ার পরও যোগাযোগ থাকতে পারে, বন্ধুত্বও থাকতে পারে। কিন্তু সেই বন্ধুত্ব যদি কাউকে অতীতের মধ্যে আটকে রাখে, তাহলে দূরত্ব তৈরি করাও কখনো কখনো নিজের প্রতি যত্নেরই একটি অংশ।

sidebar ad