হাঁটি হাঁটি পা পা করে পূজা প্রায় চলেই এসেছে। ঢাক-ঢোলের তালে উৎসবমুখর পরিবেশে আনন্দময়ীকে বরণ করে নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। ক্যালেন্ডারের পাতায় তারিখটা দেখেই ঈশিতার বুকের ভেতরটা কেমন যেন আনন্দে ভরে উঠল। কত দিন পর আবার নতুন শাড়ি পরবে। বন্ধুদের সঙ্গে বের হওয়া, মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে দর্শন, অঞ্জলি দেওয়া, সঙ্গে জম্পেশ খাওয়াদাওয়া তো আছেই!
কিন্তু আনন্দের সেই মুহূর্তটা হঠাৎ একটু থেমে গেল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে।
‘এ কী! মুখটা এমন নিষ্প্রাণ দেখাচ্ছে কেন?’
কপালে দু-একটা ছোট ব্রণ, কিছুটা সানট্যান; ত্বকটাও যেন আগের মতো উজ্জ্বল নয়। ব্যস! মাথায় শুরু হয়ে গেল রাজ্যের চিন্তা।
পূজার আর তো হাতে গোনা কয়েকটা দিন। এই কদিন ত্বক ভালো রাখতে একটা ভালো সিরাম কিনতে হবে। সঙ্গে এক্সফোলিয়েটিং মাস্ক। একটা ফেসিয়ালও কি করা যায়? বন্ধুর পরামর্শে নতুন একটা রেটিনলও শুরু করা যায় কি না ভাবতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা নতুন ফেসমাস্কটা, সেটাও তো একবার ট্রাই করে দেখাই যায়!
একসঙ্গে এত কিছু ভেবে ঈশিতা শেষ পর্যন্ত ফোন হাতে নিল।
এই পর্যায়ে একটু থামুন!
এই যে ঈশিতা পূজার আগে ত্বককে ভালো দেখানোর তাড়ায় নতুন নতুন স্কিনকেয়ার পণ্যের এক্সপেরিমেন্ট একসঙ্গে শুরু করতে চাইছে, তা কি সত্যিই ভালো আইডিয়া? এতে আদৌ কি উপকার হবে, নাকি সব প্রচেষ্টাই বিফলে যাবে?
পূজার আগে ‘নতুন কিছু’ করার আগে একটু ভাবুন
নতুন স্কিনকেয়ার পণ্য মানেই খারাপ, এমন নয়। কিন্তু নতুন কোনো কিছু আপনার ত্বকে কেমন প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে, তা আগে থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্বকের যত্নে ‘লেস ইজ মোর’—অর্থাৎ অতিরিক্ত পণ্য ব্যবহারের চেয়ে একটি সহজ ও নিয়মিত রুটিন মেনে চলা অনেক বেশি কার্যকর। এ ছাড়া নতুন পণ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্যাচ টেস্ট করা ত্বকের বড় ধরনের ক্ষতি বা অ্যালার্জি থেকে বাঁচতে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে রেটিনল বা গ্লাইকোলিক অ্যাসিডের মতো অ্যাক্টিভ উপাদান ব্যবহারের সময় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
পূজার ঠিক আগে নতুন সিরাম, রেটিনল কিংবা নতুন কোনো ট্রিটমেন্ট ব্যবহার করে ‘গ্লাস স্কিন’ পাওয়ার চেষ্টা বরং উল্টো ফল দিতে পারে।
ত্বকের যত্ন শুরু হোক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা দিয়ে
পূজায় সারা দিন বাইরে ঘোরাঘুরি, ঘাম, ধুলাবালি, মেকআপ—সবকিছুর ধকল এই ত্বকের ওপর দিয়েই যায়। তাই ত্বকের যত্নের প্রথম শর্তই হলো ত্বক পরিষ্কার রাখা। তবে পরিষ্কার করার অর্থ এই নয় যে মুখ বারবার ঘষে বা স্ক্রাব করে ধুয়ে ফেলতে হবে। আমেরিকান একাডেমি অব ডার্মাটোলজি (এএডি) মৃদু ও নন-অ্যালকালাইন ক্লিনজার ব্যবহারের পরামর্শ দেয় এবং অতিরিক্ত ঘর্ষণ এড়িয়ে চলতে বলে। কারণ, এতে জ্বালাপোড়া বাড়তে পারে।
একটি ভালো স্কিনকেয়ার রুটিনের মূল ভিত্তি হতে পারে জেন্টল ক্লিনজার, প্রয়োজন হলে সিরাম, ময়েশ্চারাইজার এবং সানস্ক্রিন। টোনার ব্যবহার করতে ভালো লাগলে রুটিনে রাখা যেতে পারে, কিন্তু এটি ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক বা সবার জন্য অপরিহার্য কোনো ধাপ নয়।
আর বাইরে বের হওয়ার আগে ব্রড-স্পেকট্রাম এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি সানস্ক্রিন ব্যবহার করা জরুরি। পূজার কয়েক দিন তো রোদে অনেকটা সময় কাটবেই। তাই এটি যেন শুধু একটি প্রসাধনী না হয়ে রুটিনের নিয়মিত অংশ হয়।
পূজার আগে ফেসিয়াল করবেন?
ঈশিতারও ইচ্ছে হচ্ছিল পার্লারে গিয়ে একটা ফেসিয়াল করিয়ে আসবে। শুধু ঈশিতারই নয়, এমন কোনো বিশেষ মুহূর্তের আগে আমাদেরও এমন ভাবনা আসে।
কিন্তু এখানে একটা কথা মনে রাখা ভালো—যে ট্রিটমেন্ট আপনি আগে কখনো করেননি, সেটি ঠিক আগমুহূর্তে পরীক্ষা না করাই ভালো। সবার ত্বকের সহ্যক্ষমতা এক নয়। কারও ত্বকে ফেসিয়ালের নতুন কোনো পণ্য বা উপাদানের কারণে অ্যালার্জি, লালচে ভাব বা আকস্মিক ব্রণ দেখা দিতে পারে। তবে এমন কোনো ফেসিয়াল হলে, যা আপনি আগেও বহুবার করেছেন এবং ত্বকে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়নি, তাহলে হাতে সময় রেখে তা করতে পারেন।
ঘরোয়া ফেসপ্যাক? একটু সাবধানে
ত্বকে ঘরোয়া ফেসপ্যাক ব্যবহারের চল বহুদিনের। দই, মধু, অ্যালোভেরা বা বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে নানা ধরনের মাস্ক ব্যবহারের কথা আমরা শুনি।
কিন্তু প্রাকৃতিক মানেই যে সবার ত্বকের জন্য নিরাপদ—এমন নয়।
বিশেষ করে লেবুর রস সরাসরি বা অতিরিক্ত পরিমাণে মুখে লাগাবেন না। এটি অত্যন্ত অ্যাসিডিক, যা ত্বকে জ্বালাপোড়া তৈরি করতে পারে এবং ত্বককে রোদের প্রতি সংবেদনশীল করে তুলতে পারে।
চালের গুঁড়া, চিনি বা কফি স্ক্রাবার হিসেবে পরিচিত। এগুলো দিয়ে স্ক্রাব করার সময় খুব জোরে ঘষবেন না। এতে ত্বকে মাইক্রো-টিয়ার বা সূক্ষ্ম ক্ষত তৈরি হতে পারে।
তাই পূজার আগে ‘ইনস্ট্যান্ট গ্লো’ পাওয়ার আশায় রান্নাঘরের সব উপাদান মুখে লাগানোর চেয়ে নিজের পরিচিত ও সহনীয় পণ্য ব্যবহার করাই ভালো।
ত্বকের মতো চুলেরও দরকার যত্ন
শুধু মুখের জেল্লা থাকলেই তো সাজ সম্পূর্ণ হয় না। পূজার শাড়ি, খোলা চুল কিংবা সুন্দর হেয়ারস্টাইল—সবকিছুর জন্য চুলও চাই সুস্থ ও গোছানো।
ত্বকের যত্নের ক্ষেত্রে যেমন ত্বক পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন, তেমনি চুলের ক্ষেত্রেও স্ক্যাল্প পরিষ্কার রাখতে হবে। তাহলেই চুল ভালো থাকবে। তবে প্রতিদিন শ্যাম্পু করতেই হবে, এমন কোনো সার্বজনীন নিয়ম নেই। কারও স্ক্যাল্প খুব তৈলাক্ত হলে ঘন ঘন শ্যাম্পুর প্রয়োজন হতে পারে। আবার শুষ্ক, কোঁকড়ানো বা ঘন চুল হলে তুলনামূলক কম ঘন ঘন শ্যাম্পু করাই যথেষ্ট হতে পারে। মোটকথা, চুলের ধরন ও স্ক্যাল্প কতটা তৈলাক্ত বা ময়লা হচ্ছে, তার ওপর শ্যাম্পু করার বিষয়টি নির্ভর করে।
মোটা দাঁতের চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ানোর ক্ষেত্রেও একটু সতর্ক হতে হবে। ভেজা অবস্থায় চুলের গোড়া নরম থাকে এবং চুলে ইলাস্টিসিটি বা স্থিতিস্থাপকতা বেশি থাকে। ফলে সাধারণ চিরুনি ব্যবহার করলে চুল সহজেই ছিঁড়ে বা ভেঙে যেতে পারে। চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ার সময় আঁচড়াবেন না। তোয়ালে বা সুতি কাপড় দিয়ে চেপে অতিরিক্ত পানি শুকিয়ে নেওয়ার পর, যখন চুল হালকা স্যাঁতসেঁতে থাকবে, তখন আলতোভাবে মোটা দাঁতের চিরুনি বা ওয়াইড-টুথ কম্ব ব্যবহার করা যেতে পারে।
তেল ব্যবহার করতে চাইলে নিজের চুল ও স্ক্যাল্পের ধরন বুঝে ব্যবহার করুন। তেল চুলকে নরম ও সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করতে পারে। তবে শুধু চুলে তেল দিলেই চুলের গোড়া শক্ত হবে কিংবা চুল পড়া জাদুর মতো বন্ধ হয়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
হাত-পায়ের যত্নও বাদ নয়
পূজার সাজে হাত-পা সহজেই নজরে আসে। তাই নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন। বিশেষ করে গোড়ালি, হাঁটু, কনুইয়ের মতো জায়গায় শুষ্কতা থাকলে সেখানে ময়েশ্চারাইজার একটু বেশি করে ব্যবহার করা যেতে পারে। শক্ত স্ক্রাব বা লেবু-হলুদ দিয়ে ঘষাঘষি এড়িয়ে চলুন।
বাইরে থেকে ফিরে পা পরিষ্কার করে শুকিয়ে নিন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—নতুন জুতা পূজার প্রথম দিনেই পরে বের হবেন না। ঈশিতা এবার এই ভুলটা করবে না। নতুন জুতাটা পূজার আগে কয়েক দিন পরে দেখে নেবে পায়ে ঘষা লাগছে কি না, হাঁটতে অস্বস্তি হচ্ছে কি না। কারণ পূজার দিনে সুন্দর দেখানোর পাশাপাশি স্বস্তিতে হাঁটতে পারাটাও কিন্তু নিজের যত্নের অংশ।
পূজার আগে ঈশিতার ছোট্ট চেকলিস্ট
ত্বক
পরিচিত মৃদু ক্লিনজার
ময়েশ্চারাইজার
এসপিএফ ৩০+ সানস্ক্রিন
নতুন পণ্য হলে আগে প্যাচ টেস্ট
অতিরিক্ত স্ক্রাব বা এক্সফোলিয়েশন নয়
শেষ মুহূর্তে নতুন কোনো ট্রিটমেন্টের এক্সপেরিমেন্ট নয়
চুল
স্ক্যাল্প পরিষ্কার রাখা
চুলের ধরন অনুযায়ী শ্যাম্পু
শ্যাম্পুর পর কন্ডিশনার
ভেজা চুলে আলতোভাবে মোটা দাঁতের চিরুনি ব্যবহার
চুলে অতিরিক্ত হিট এড়িয়ে চলা
হাত-পা
নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার
আরামদায়ক ফুটওয়্যার
নতুন জুতা আগে পরে দেখা
বাইরে থেকে ফিরে পা পরিষ্কার ও শুকনো রাখা
ঈশিতার স্কিনকেয়ার চেকলিস্ট তো শেষ হলো। কিন্তু পূজার প্রস্তুতি তো শুধু ত্বকের যত্নেই থেমে থাকে না। নতুন শাড়ি, কুর্তি, গয়না, জুতা, ব্যাগ—পূজার শপিং লিস্টও ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে।
কিন্তু সবকিছুই কি কিনতে হবে? কোনটা আগে, কোনটা পরে?
সেই গল্প নিয়েই থাকবে ঈশিতার পূজার প্রস্তুতির পরের পর্ব।
কারণ পূজার সাজ শুরু হয় আয়নার সামনে নয়, শপিং ব্যাগ হাতে সঠিক জিনিস বেছে নেওয়া থেকেই।
ঢাকা/টিএ