বিনোদন শুধু অবসর কাটানোর উপায় নয়; পরিবার, বন্ধু কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে কিছুটা সময় আনন্দে কাটানোও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশে পরিকল্পিত বিনোদন ও অ্যামিউজমেন্ট পার্কের ধারণাকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে ফ্যান্টাসি কিংডম একটি পরিচিত নাম। ঢাকার আশুলিয়ার জামগড়ায় অবস্থিত এই বিনোদনকেন্দ্র এবার পেল বড় স্বীকৃতি—বাংলাদেশ পর্যটন পুরস্কার ২০২৬-এর ‘বর্ষসেরা অ্যামিউজমেন্ট পার্ক’ সম্মাননা। বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের পুরস্কারের তালিকাতেও ফ্যান্টাসি কিংডম কমপ্লেক্সের নাম রয়েছে।
ফ্যান্টাসি কিংডম মূলত একটি থিম পার্ক ও বিনোদনকেন্দ্র। কনকর্ড গ্রুপের উদ্যোগে ২০০২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি এর যাত্রা শুরু হয়। কনকর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এটি বাংলাদেশের প্রথম থিম পার্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০০২ সালে বাংলাদেশ সরকার এটিকে ‘ট্যুরিস্ট স্পট’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
তবে ফ্যান্টাসি কিংডমকে শুধু কয়েকটি রাইডের পার্ক হিসেবে দেখলে এর পরিসরটা ছোট করে দেখা হবে। সময়ের সঙ্গে এটি একটি বড় এন্টারটেইনমেন্ট অ্যান্ড হসপিটালিটি কমপ্লেক্সে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে ওয়াটার কিংডম, হেরিটেজ পার্ক, এক্সট্রিম রেসিং এবং রিসোর্টসহ নানা বিনোদন ও অবকাশের আয়োজন।
শিশু থেকে বড়—সবার জন্য
ফ্যান্টাসি কিংডমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বয়সভেদে বিনোদনের সুযোগ রাখা। শিশুদের জন্য রয়েছে তুলনামূলকভাবে কোমল ও আনন্দদায়ক রাইড এবং প্লে এরিয়া। অন্যদিকে অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়দের জন্য রয়েছে বিভিন্ন থ্রিল রাইড। ওয়াটার কিংডমে পানির স্লাইড, ওয়েভ পুল ও অন্যান্য জলভিত্তিক বিনোদনের ব্যবস্থাও রয়েছে।
অর্থাৎ, একটি পরিবারে শিশুর যে ধরনের আনন্দ দরকার, কিশোর-কিশোরীর যে ধরনের উত্তেজনা ভালো লাগে কিংবা বড়দের যে ধরনের অবসর ও বিনোদন প্রয়োজন—সবগুলোকে একই জায়গায় আনার চেষ্টা রয়েছে এখানে।
শুধু পরিবারের জন্য নয়
ফ্যান্টাসি কিংডমের আরেকটি বড় দিক হলো এর গ্রুপ ও করপোরেট আউটিং। অফিসের বার্ষিক আয়োজন, কর্মীদের ডে-আউট, পিকনিক কিংবা বিভিন্ন করপোরেট অনুষ্ঠানের জন্যও এখানে আয়োজন করা যায়। জন্মদিন, পারিবারিক অনুষ্ঠান, পার্টি, ফটোশুট ও ভিডিও শুটিংয়ের মতো আয়োজনের সুবিধার কথাও প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখ করেছে।
এ কারণে ফ্যান্টাসি কিংডমের মূল দর্শক শুধু পর্যটক পরিবার নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে—
শিশু ও তাদের পরিবার
কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণী
বন্ধুদের দল
দম্পতি
স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও তাদের কর্মীরা
জন্মদিন বা পারিবারিক অনুষ্ঠান আয়োজনকারীরা
পিকনিক ও গ্রুপ আউটিংয়ে আগ্রহীরা
দেশি-বিদেশি পর্যটক
আনন্দের পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান
একটি বড় বিনোদন পার্ক পরিচালনা করতে শুধু রাইড থাকলেই হয় না। এর পেছনে প্রয়োজন প্রকৌশলী, রাইড অপারেটর, নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, খাবার ও রেস্টুরেন্টের কর্মী, কাস্টমার সার্ভিস, টিকিটিং, মার্কেটিং, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টসহ নানা ধরনের জনবল।
ফলে একটি অ্যামিউজমেন্ট পার্কের কার্যক্রম সরাসরি বিনোদন দেওয়ার পাশাপাশি পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতের বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাজের ক্ষেত্রও তৈরি করে। কনকর্ড গ্রুপ জানিয়েছে, তাদের বিনোদন ও আতিথেয়তা উদ্যোগগুলো বছরে ২০ লাখের বেশি দর্শনার্থীকে স্বাগত জানায়।
২০২৬ সালের বাংলাদেশ পর্যটন পুরস্কারে মোট ১৬ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সম্মানিত করা হয়েছে। পুরস্কারগুলোতে পর্যটন খাতের সেবা, উদ্ভাবন, ডিজিটাল প্রচার, উদ্যোক্তা কার্যক্রম, কমিউনিটি অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন অবদানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই তালিকায় ‘Best Amusement Park of the Year’ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে ফ্যান্টাসি কিংডম কমপ্লেক্স।
এ স্বীকৃতি তাই শুধু একটি বিনোদন পার্কের পুরস্কার নয়; বাংলাদেশের পর্যটন ও অবকাশ বিনোদন খাতে অ্যামিউজমেন্ট পার্কের ভূমিকারও স্বীকৃতি।
কেন এখনো জনপ্রিয়?
দুই দশকের বেশি সময় ধরে টিকে থাকার পেছনে বড় কারণ হতে পারে এর বৈচিত্র্য। একটি জায়গায় শুধু রাইড নয়—পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, খাবার, পানি ও অ্যাডভেঞ্চারভিত্তিক বিনোদন, গ্রুপ আউটিং এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ভাষ্যেও পরিবারের জন্য নিরাপদ ও আনন্দময় পরিবেশ তৈরিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ফ্যান্টাসি কিংডমের গল্প মূলত সেই চাহিদার গল্প—শহরের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে একদিনের জন্য আনন্দ, রোমাঞ্চ ও একসঙ্গে সময় কাটানোর জায়গা খোঁজা। আর সেই জায়গাটিই যখন দেশের পর্যটন কর্তৃপক্ষের ‘বর্ষসেরা অ্যামিউজমেন্ট পার্ক’ স্বীকৃতি পায়, তখন বাংলাদেশের বিনোদন পর্যটনের মানচিত্রে ফ্যান্টাসি কিংডমের অবস্থানটিও নতুন করে আলোচনায় আসে।