ফজল হাসান
সিডনি থেকে কোয়ান্টাস বিমানে চড়ে আমরা, অর্থাৎ আমি ও আমার স্ত্রী মেহেরুন এবং নিউ ইয়র্ক থেকে আগত আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠিনী ও তার স্বামী, যখন নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণ দ্বীপের কুইন্সটাউন শহরে পৌঁছি, তখন দুপুর পেরিয়ে গেছে ১‘এবং পশ্চিম আকাশের গায়ে ঝুলে থাকা সূর্য পাহাড়ের আড়ালে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য ক্রমশ নিচে নেমে যাচ্ছিল। বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে আমরা হোটেলের নির্ধারিত গাড়িতে চড়ে হোটেলে পৌঁছে চেক ইন করি এবং অল্প সময় বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়ি শহর দর্শনে। আমাদের হোটেল থেকে শহর পাঁচ থেকে সাত মিনিটের হাঁটা পথ।
ফ্রেমে
বাঁধানো ছবির মত সুন্দর আর চোখ জুড়ানো ছোট্ট শহর কুইন্সটাউন। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের
লীলাভূমি সেই শহরের একদিকে রয়েছে সুনীল ওয়াকাটিপু হ্রদ এবং হ্রদের অন্যদিকে মাথা উঁচু
করে দাঁড়িয়ে আছে ঢেউ খেলানো সুউচ্চ ‘রিমার্কেবলস’ পর্বতমালা। আর সেই পর্বতমালার চূড়ায়
জমে আছে শুভ্র হিমবাহ, আর আছে বিস্তৃর্ণ নীল আকাশের বুকে ভেসে বেড়ানো সাদা মেঘের ভেলা।
সেই নান্দনিক দৃশ্যকে উপভোগ করার জন্য প্রতি বছর, বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে, অসংখ্য দেশি-বিদেশি
পর্যটক ভিড় জমায় কুইন্সটাউনে।
কুইনস্টাউনের
ভৌগলিক অবস্থান, মনোমুগ্ধকর হ্রদ, চারপাশের পর্বতশ্রেণী এবং অনন্য জলবায়ুর কারণে আউটডোর
খেলাধূলা বা কর্মকান্ডের জন্য, যেমন কাওয়ারাউ ব্রিজ থেকে বাঞ্জি জাম্পিং, পাহাড়ী নদীতে
জেট বোটিং কিংবা ওয়াকাটিপু হ্রদে প্যারাগ্লাইডিং, অ্যাডভেঞ্চার পর্যটকদের কাছে প্রধান
এবং আকর্ষণীয় গন্তব্যস্থল বানিয়েছে। তাই অনেকের কাছে কুইন্সটাউন ‘নিউজিল্যান্ডের অ্যাডভেঞ্চার
ক্যাপিটাল’ হিসেবে পরিচিত। মাওরি ভাষায় কুইন্সটাউনকে তাহুনা বলা হয়, যার অর্থ ‘অগভীর
উপসাগর’।
আমরা
কুইন্সটাউন থেকে পিওর মিলফোর্ড কোম্পানীর গাইডেড ট্যুর প্যাকেজে একদিনের ভ্রমণে গিয়েছিলাম
মিলফোর্ড সাউন্ডে। কোম্পানীর রয়েছে নিজস্ব বিলাসবহুল আধুনিক বাস বা কোচ ও আরামদায়ক
অত্যাধুনিক জলযান এবং অত্যন্ত দক্ষ ও বন্ধুসুলভ চালক, যারা একই সঙ্গে ট্যুর গাইডের
দায়িত্ব পালন করে।
কুইন্সটাউন
থেকে সড়ক পথে মিলফোর্ড সাউন্ডের দূরত্ব প্রায় তিন শ’ কিলোমিটার। অথচ সরল রেখার দূরত্ব
মাত্র এক শ’ কিলোমিটার এবং এই স্বল্প দূরত্বের মাঝে রয়েছে পাহাড়। পাহাড়ের ভেতর সুড়ঙ্গ
তৈরি করে রাস্তা বানানো সম্ভব নয়, কেননা অর্থনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে মোটেও কার্যকর
নয়।
আমাদের
বাস যাত্রা শুরু করেছিল ক্রাউন প্লাজা হোটেলের সামনে থেকে, যা আমাদের হোটেল থেকে মিনিট
পাঁচেকের হাঁটা পথ। আমরা নির্ধারিত সময়ের পনের মিনিট আগেই স্টপেজে উপস্থিত হই। খোলা
আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে কিছুটা শীত অনুভব করি। তবে আমাদের সঙ্গে শীতের পোশাক ছিল। সেদিন
ছিল নভেম্বরে দ্বিতীয় সপ্তাহ এবং বসন্তের প্রায় শেষের দিকে তাপমাত্রা ছিল তেরো ডিগ্রি
সেলসিয়াস এবং তার উপর খানিকটা কুয়াশাচ্ছন্ন ছিল। আটটার সামান্য আগে নির্ধারিত বাস এসে
থামে নির্ধারিত জায়গায়। প্রথম স্টপেজের সুবাদে আমরা প্রথমেই বাসে উঠে দরজার পাশে সামনের
আসনে বসি, যাতে অনায়াসে সামনের এবং ডানে-বামের দৃশ্য দেখতে পারি। সকাল আটটার বাস ছাড়ে।
সব মিলিয়ে শহরের পাঁচটা স্টপেজ থেকে যাত্রী, অর্থাৎ পর্যটক, তুলে অবশেষে গন্তব্যের
অভিমুখে বাস চলতে শুরু করে। বাসে মোট আসন সংখ্যা ছিল পঁয়ত্রিশটি এবং সব আসনে যাত্রী
ছিল। বিশেষ ভাবে নির্মিত সেই বিলাশবহুল ও অত্যাধুনিক বাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বাসের
ছাদ কাঁচের তৈরি, যাতে যাত্রীরা সহজেই রাস্তার পাশের পাহাড়ের চূড়া দেখতে পারে।
কিছুক্ষণের
মধ্যে আমরা কুইন্সটাউন শহর ছেড়ে পাহাড়ী সড়ক পথে চলতে থাকি। আমাদের বাস চালক (একই সঙ্গে
ট্যুর গাইড), যার নাম জর্জ, নিজের পরিচয় দিয়ে সংক্ষেপে সারাদিনের ভ্রমণ সূচী জানিয়ে
দেয়। জর্জের বয়স আনুমানিক মধ্য-তিরিশ এবং কথায় পূর্ব-ইউরোপীয় টান আছে (অবশ্য পরে এক
সময় জিজ্ঞেস করে জেনেছি যে, সে মূলত এস্তোনিয়ান এবং জন্মের পর থেকেই নিউজিল্যান্ডে
স্থায়ীভাবে বসবাস করছে)।
একসময়
জর্জ কুইন্সটাউনের ইতিহাস সম্পর্কে বলতে শুরু করে। কুইন্সটাউনের আশেপাশের এলাকায় সোনার
খনি আবিস্কৃত হয় ১৮৬৪ সালে এবং ১৮৬৭ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে, বিশেষ করে চীন
থেকে, খনি শ্রমিকরা এসে কুইন্সটাউনের অদূরে অ্যারোটাউনে বসতি গড়ে তোলে। তারপর ক্রমশ
ইউরোপ ও অষ্ট্রেলিয়া থেকে মানুষ সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।
আমাদের
বাম পাশে পাহাড় আর ডান পাশে রয়েছে ওয়াকাটিপু হ্রদ এবং হ্রদের অপর পাশে ‘রিমার্কেবলস’
পর্বতমালা। জর্জ ওয়াকাটিপু হ্রদ এবং পাহাড় সম্পর্কে রীতিমতো ক্লাশ করিয়ে নেয়। আমরা
সুবোধ ছাত্র-ছাত্রীর মতো তার কথা নিঃশব্দে গিলতে থাকি। জানা যায়, ভৌগলিক আয়তনের দিক
থেকে ওয়াকাটিপু হ্রদ নিউজিল্যান্ডের তৃতীয় বৃহত্তর হ্রদ।
মিলফোর্ড সাউন্ডের সুনীল জলরাশি (ছবি: লেখক)
‘রিমার্কেবলস’
পর্বতমালায় সেসিল ও ওয়াল্টার নামের দু’টি সুউচ্চ পাহাড় রয়েছে। পাহাড় দু’টির নামকরণ
সম্পর্কে জর্জ বলেছে যে, একজন অভিযাত্রী কুইন্সটাউন অভিযানে সময় তার দুই ছেলের নামানুসারে
পাহাড় দু’টির নাম রাখে। হেলিক্পটারে চড়ে এ দু’টি পর্বত শৃঙ্খের সৌন্দর্য্য উপভোগ করা
যায়। একসময় বাস ক্রমশ নিচের দিকে নামতে থাকে। তখন বাসের ভেতর সুনসান নীরবতা এবং যাত্রীরা
গভীর মনোযোগের সঙ্গে আশেপাশের নান্দনিক দৃশ্য দেখছিল। সেই নীরবতাকে ভেঙে জর্জ মাইক্রোফোনে
ঘোষণা করে যে, আমরা যে পাহাড়ী রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি, তার নাম ডেভিল’স স্টেয়ারকেইস (শয়তানের
সিঁড়ি)। রাস্তাটি আঁকাবাঁকা, ভীষণ খাড়া এবং সংকীর্ণ, যা পাহাড় থেকে হ্রদের দিকে বাঁক
নিয়ে নেমে গেছে। গাড়ি চালানোর জন্য রাস্তাটি খুবই চ্যালেঞ্জিং। ওয়াকাটিপু হ্রদের
সবচেয়ে দক্ষিণ সীমানায় পর্যটকদের রাত্রি যাপনের জন্য গড়ে উঠেছে কিংস্টন উপশহর, যা কুইন্সটাউন
থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। কিংস্টন শহরটি ওটাগো এবং সাউথল্যান্ডকে
বিভাজন করেছে।
রাস্তার
বাম পাশে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি পাহাড় আর সেসব পাহাড়ের আঁকাবাঁকা ও চড়াই-উৎড়াই পীচ
ঢালা পথ মসৃণ ধরে বাস চলতে থাকে। ডান পাশে শান্ত লেক এবং লেকের উল্টো পাশে পাহাড়ের
শিখরে জমে আছে সাদা হিমবাহ। প্রায় এক ঘন্টা এমনভাবে চলার পর গাড়ি একসময় চলতে শুরু করে
সমতল ভূমির বুক চিরে। উল্টো দিক থেকে কদাচিৎ ধেয়ে আসা দ্রুত গতির গাড়ি অতিক্রম করে
চলে যায়।
আমাদের
আসন প্রথম সারিতে থাকার সুবাদে আমরা সামনের এবং ডানে-বায়ে তাকিয়ে দু’পাশের অপরূপ দৃশ্য
দেখতে থাকি। গাড়ির ভেতর কোনো যাত্রীর মুখে কোনো শব্দ নেই। সবার দৃষ্টি ডুবে আছে প্রাকৃতিক
দৃশ্যের গভীরে। মাঝে মধ্যে জর্জের কন্ঠস্বর শোনা যায়, বিশেষ করে কোনো উল্লেখযোগ্য জায়গার
বর্ণনা করার সময় কিংবা পরবর্তী স্থানে থামার অগ্রিম বার্তা বা বিবরণ দেওয়ার সময়।
সমতল
ভূমির বুক চিরে চলে গেছে পাথর বিছানো পথ আর সেই পথের দু’পাশে সারি সারি গবাদিপশুর চারণভূমি,
যেখানে গাঢ় সবুজ ঘাসের গালিচা আর শত শত ভেড়া এবং গরু-বাছুর মনের সুখে চড়ে বেড়াচ্ছে।
অনেকের জমিনে স্বয়ংক্রিয় সেচের ব্যবস্থা দেখলাম। নিউজিল্যান্ড সম্পর্কে জানা যায়, জনসংখ্যার
চেয়ে ভেড়ার সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি (৫.৩ মিলিয়ন মানুষ ও ২৩.৬ মিলিয়ন ভেড়া)। নিউজিল্যান্ডের
ভেড়ার পশম থেকে তৈরি মেরিনো উলের খ্যাতি ছড়িয়ে রয়েছে সারা বিশ্ব জুড়ে। এছাড়া নিউজিল্যান্ডের
বিখ্যাত গরুর গুড়া দুধ ‘অ্যাঙ্কর’ বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাওয়া যায়।
এ ছাড়া
কয়েক জায়গায় দেখলাম আলপাকা, যা একধরনের উটজাতীয় স্তন্যপায়ী পশু, দল বেঁধে ঘাস খাচ্ছে।
আলপাকার পশম থেকে তৈরি উল অন্যান্য উলের চেয়ে নরম, মসৃন, হালকা, অধিক তাপ প্রতিরোধী
এবং হাইপোঅ্যালার্জেনিক, অর্থাৎ সংবেদনশীল ত্বকের জন্য বেশি নিরাপদ। যদিও আলপাকার আদি
নিবাস দক্ষিণ আমেরিকায়, বিশেষ করে পেরুর দক্ষিণাঞ্চলের আন্দিস পর্বত এলাকায়, বলিভিয়ার
পশ্চিমাঞ্চলে, ইকুয়েডর এবং চিলির উত্তরাঞ্চলে। জানা যায়, বর্তমানে নিউজিল্যান্ডে প্রায়
চার হাজার নিবন্ধিত আলপাকা আছে।
রাস্তার পাশে সবুজ ঘাসের জমিনে গরু-বাছুরের পাল (ছবি: লেখক)
এক নাগাড়ে আড়াই ঘন্টা চলার পর আধ ঘন্টার জন্য তে আনাউ শহরের এক রেষ্টুরেন্টের কাছে বাস থামে। সেখানে আমরা সকালের নাস্তা করি। শহরটি আয়তনে ছোট হলেও অ্যাডভেঞ্চার পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ। তে আনাউ হ্রদের বোটে চড়ে তারা নান্দনিক দৃশ্য উপভোগ করে, কেউ আবার কায়াকিং করে এবং অনেকেই জনপ্রিয় হাইকিং করার জায়গা কেপলার ট্র্যাকে যায়। তবে পর্যটকদের জন্য তে আনাউ শহরের অদূরে রয়েছে অন্যতম আকর্ষণ টি আনাউ গ্লোওয়ার্ম গুহা। গাইডেড ট্যুর উৎসাহী পর্যটকদের টি আনাউ হ্রদের উল্টোদিকে চুনাপাথরের পথ ধরে সেখানে নিয়ে যায়। গ্লোওয়ার্মের কারণে সেই গুহার অভ্যন্তর আলোকিত দেখায়। এখানে অনেকেই রাত্রি যাপন করে এবং তাদের থাকার জন্য ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া তে আনাউ শহরে রয়েছে একাধিক রেষ্টুরেন্ট এবং বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট।
তে আনাউ
থেকে আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য মিলফোর্ড সাউন্ডে পৌঁছার আগে স্বল্প সময়ের জন্য দু’টি
দর্শণীয় জায়গায় বাস থামে। প্রথমে থেমেছে এগলিনটন উপত্যকা এবং পরে মাঙ্কি ক্রীক।
এগলিনটন
উপত্যকায় থামার আগে জর্জ রীতিমতো আমাদের উপর সমীক্ষা চালিয়ে ছিল। আমাদের মধ্যে কয়জন
২০১৮ সালে মুক্তি পাওয়া টম ক্রুজ অভিনীত মিশন ইম্পোসিবলের ষষ্ঠ সিনেমা ‘ফলআউট’ দেখেছি।
মাত্র আঙুলে গোণা কয়েকজনের কন্ঠস্বর বাসের মধ্যে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বন্ধ হাওয়ায় অনুরণিত
হয়। জর্জের কথায় জানতে পারি যে, শত্রু পক্ষের পেছনে টম ক্রুজের হেলিকপ্টারে ধাওয়া এবং
আকাশ-যুদ্ধ এই উপত্যকায় ধারণ করা হয়েছিল। জায়গাটি শান্ত, বিস্তৃর্ণ, খোলামেলা ও তৃণভূমি,
তবে দূরে চারপাশে রয়েছে উঁচু পাহাড়, যেন তারা একজন আরেকজনের কাঁধে হাত রেখে নির্ভার
দাঁড়িয়ে আছে। পর্যটকরা অনায়াসে বিস্তৃত জায়গায় দাঁড়িয়ে চারপাশের নান্দনিক দৃশ্য দেখার
চমৎকার অভিজ্ঞতা অর্জণ করতে পারে।
বাস
থামার সঙ্গে সঙ্গে সবাই হুড়মুড় করে নেমে যায়। পর্যটকদের মধ্যে এমন ব্যস্ততা যে, মনে
হয়েছে যেন তাদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য সেখানে ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে স্বয়ং টম ক্রুজ
হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। যাহোক, সবাই সেই স্বল্প সময়কে ধারণ করার জন্য ছবি তোলে। একজন
তরুণী ঘাসের উপর চিৎ-কাত শুয়ে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে এবং সাথের তরুণটি দাঁড়িয়ে ও বসে
নানান দৃষ্টিকোণ থেকে অসংখ্য ছবি তোলে। মেহেরুন মোবাইলে ভিডিও করায় ব্যস্ত ছিল। আর
আমি টুম ক্রুজের রোমাঞ্চকর এবং দূধর্ষ হেলিকপ্টারের দৃশ্য অনুভব করেছি। হঠাৎ জর্জের
কন্ঠস্বর কানে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই আমার ভাবনায় ছেদ পড়ে। সারি বেঁধে আমরা সবাই বাসে
উঠে বসি এবং নিজেদের আসন গ্রহণ করি। সমতল ভূমির বুক চিরে কংক্রিটের রাস্তায় বাস চলতে
শুরু করে।
এগলিনটন উপত্যকা থেকে বাস সমতল ভূমির উপর চলতে থাকে। জর্জ আমাদের নিয়মিত ধারাবিবরণী দিয়ে যাচ্ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা হাতের বামে মিরর লেইক পেরিয়ে মাঙ্কি ক্রীকে পৌঁছি। সেখানে জর্জ বাস থামায় এবং চারপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য আমাদের মাত্র পাঁচ মিনিট সময় দিয়েছে, বিশেষ করে ছবি তোলার জন্য। তবে বাস থামার আগে সে জায়গা সম্পর্কে তথ্য জানিয়েছে। তে আনাউ থেকে মাঙ্কি ক্রীকের দূরত্ব প্রায় ৯৫ কিলোমিটার। সেখানে রাস্তার পাশে পর্যটক বাস থামানোর খোলা জায়গা রয়েছে, যাতে পর্যটকরা বাস থেকে নেমে পাহাড়ের চূড়া থেকে হিমবাহ গলিত স্বচ্ছ ঝরণার বিশুদ্ধ পানি সরাসরি পান করতে পারে, এমনকী বরফের মতো সতেজ স্বাদও উপভোগ করতে পারে। এ ছাড়া পর্যটকরা অনায়াসে সঙ্গে থাকা পানির বোতলও ভর্তি করতে পারবে। বাস থামার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সবাই নেমে যাই। অনেকেই পানির কাছে ছুটে যায়। কেউ হাত ভিজিয়ে পানি স্পর্শ করে, কেউ আবার আঁজলা ভরে মুখে নিয়ে স্বাদ গ্রহণ করে। আবার কয়েকজন গাড়ির কাছে কিয়া পাখির ছবি তোলে। কিয়া একধরনের তোতা পাখি, যাদের উপস্থিতি অ্যালপাইন এলাকায়। বর্তমানে এরা বিপন্ন এবং সুরক্ষিত প্রজাতির পাখি। এরা মাঝারি আকারের পাখি এবং উচ্চতায় প্রায় ৫০ সেন্টিমিটার হয়। এদের পালকের রঙ অনেকটা জলপাই সবুজ এবং পাখার নিচের দিকে উজ্জ্বল কমলা রঙের পালক আছে। এরা ভীষণ চালাক, তবে কৌতূহলী ও দুষ্টু স্বভাবের। কেননা এরা জানে যে, ভাড়া করা গাড়ির রাবারের ট্রিম এবং পাশের আয়না কামড়ে ক্ষতি করতে পারে। বাসে উঠার আগে আমার ছবি তোলার জন্য জর্জকে অনুরোধ করি। সে বেশ কয়েকটা ছবি তোলে।
যাহোক,
বাস চালানোর এক ফাঁকে জর্জ জিজ্ঞেস করে, আমরা কেউ সেখানে বানর দেখেছি কিনা। সবার চোখ
চড়কগাছ, যেন কেউ তাদের ধাক্কা দিয়ে উপর থেকে ফেলে দিয়েছে। আসলে মাঙ্কি ক্রীকে কোনো
বানর নেই, এমনকী আশেপাশে কোথাও নেই (নিউজিল্যান্ডের খোলা পরিবেশে কোথাও বানর দেখা যায়
না, একমাত্র চিড়িয়াখানায় দেখা যায়), তবুও জায়গার নাম রাখা হয়েছে মাঙ্কি ক্রীক। এ সম্পর্কে
জর্জ মজার গল্প বলেছে। স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী উইলিয়াম হেনরী হোমারের কুকুরের নামানুসারে
জায়গার নামকরণ করা হয়েছিল, যে কুকুরের নাম ছিল মাঙ্কি। হোমার ছিলেন ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী
এবং তিনি আঠারো শেষ দিকে ফিওর্ডল্যান্ড এলাকায় জরিপকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন।
মাঙ্কি
ক্রীক থেকে বাস ছাড়ার কিছুক্ষণ পরেই আমরা একটা সুড়ঙ্গের ভেতর ঢুকে পড়ি। সুড়ঙ্গের নাম
হোমার টানেল। জর্জের কথায় জানতে পেরেছি যে, সুড়ঙ্গটি ১৯৫৪ সালে উদ্বোধন করা হয়েছে,
যা সেই সময়ের জন্য ছিল প্রকৌশলের দিক থেকে যথেষ্ট বড় কৃতিত্ব। কেননা সুড়ঙ্গটি শক্ত
পাথরের মধ্য দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে, যা চার মিটার উঁচু, ১.২ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং
নির্মাণ করতে সময় লেগেছে আট বছর। সুড়ঙ্গের মধ্যে এক লেইনের পথ। তাই উল্টো দিকের গাড়ি
সিগন্যাল বাতির কাছে এসে সাধারণত পাঁচ থেকে দশ মিনিট থামে। তবে গ্রীষ্মকালে ট্রাফিক
জ্যামের জন্য কুড়ি মিনিটও অপেক্ষা করতে হয়। পাহাড়ের ভেতর নির্মিত সুড়ঙ্গটি মিলফোর্ড
সাউন্ডে যাতায়াতের অন্যতম রোমাঞ্চকর অংশ। একসময় বাস এসে পৌছে মিলফোর্ড সাউন্ডের ফেরী
ঘাটে।
সেদিন পর্যটকদের প্রচন্ড ভীড় ছিল। তাই সেখানে অসংখ্য পর্যটক বাস ও ব্যক্তিগত কিংবা ভাড়ায় চালিত গাড়ি পার্ক করা ছিল। জর্জ বাস থামানোর জন্য ফেরী ঘাটের আশেপাশে কোথাও কোনো জায়গা ফাঁকা না পেয়ে ঘুরে গিয়ে কিছুটা দূরে বাস থামায়। সেখান থেকে ছাদওয়ালা পথ দিয়ে হাঁটলে প্রায় পাঁচ মিনিটের রাস্তা। যাহোক, বাস থেকে নামার সময় জর্জ আমাদের প্রত্যেকের হাতে বোটে চড়ার এবং দুপুরের খাবারের টিকেট ধরিয়ে দেয়। সে সঙ্গে এসে আমাদের বোটে তুলে দেয়। আমরা বোটে উঠে নির্দিষ্ট জায়গা থেকে দুপুরের খাবার (প্যাকেট) সংগ্রহ করি। আমরা ভেজিটেবল পাই নিয়েছিলাম এবং তার সঙ্গে ছিল আপেল, কেক, পনির, বিস্কুট ও ফলের রস। অবশ্য পছন্দ মতো চা বা কফির ব্যবস্থা ছিল। খাওয়া শেষ করে আমি ছাদে যাই। প্রচন্ড বাতাস। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া এসে যেন চোখেমুখে আলতো পরশ বুলিয়ে দিচ্ছিল। ফেরী চালক, যিনি একই সঙ্গে ধারা ভাষ্যকার, মিলফোর্ড সাউন্ডের ইতিহাস, ভূতত্ত্ব এবং ভৌগলিক বিবরণ বলে আমাদের উৎসাহ ও আগ্রহকে আরও চাঙ্গা করেছে।
নিউজিল্যান্ডের
দক্ষিণ দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিমের ফিওর্ডল্যান্ড ন্যাশনাল পার্কে অবস্থিত মিলফোর্ড সাউন্ড,
যা খাড়া পাহাড় ঘেরা, গভীর জলরাশি এবং হিমবাহে গঠিত ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস ও ভৌগলিক দৃশ্যাবলীর
জন্য পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও চমকপ্রদ।
মিলফোর্ড সাউন্ডের দৈর্ঘ্য প্রায় পনের কিলোমিটার।
মাংকি ক্রীক (ছবি: জর্জ, বাস চালক-কাম-ট্যুর গাইড)
যদিও মিলফোর্ড সাউন্ডের নামের শেষে ‘সাউন্ড’ শব্দ রয়েছে, তবে আসলে এটি একটি ফিওর্ড, অর্থাৎ এর সৃষ্টি হয়েছে গলিত হিমবাহের কারণে। অন্যদিকে সাউন্ড সৃষ্ট হয় নদীর গতি পথের কারণে। তবে ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা ভুলবশত ‘সাউন্ড’ নাম রেখেছিল, যা এখনো বজায় রয়েছে। মিলফোর্ড সাউন্ডকে প্রায়শই পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং দক্ষিণ-পশ্চিম নিউজিল্যান্ডের বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকা হিসেবে পরিচিত।
মিলফোর্ড সাউন্ডের মাওরি নাম হলো পিয়োপিয়োতাহি, যা এক ধরনের বিলুপ্ত পাখি ‘পিয়োপিয়ো’ থেকে এসেছে—এক সময় যে পাখি তার সুরেলা কন্ঠের জন্য পরিচিত ছিল। বলা হয়, পাখিটি অর্ধ-দেবতা মাউইয়ের মৃত্যুর পরে শোক প্রকাশ করতে ফিওর্ডের দিকে উড়ে এসেছিল। মাওরি কিংবদন্তি অনুযায়ী, সেই পাখির শোক প্রকাশের জন্যই জায়গার নাম রাখা হয়েছিল পিয়োপিয়োতাহি, যা প্রিয় পাখির প্রতি মাওরিদের বিশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি। অন্যদিকে, মাওরি পুরাণে বলা হয়েছে যে, পিয়োপিয়োতাহি সৃষ্টি করেছিলেন দেবতা তু-তে-রাকি-উহানোয়া, যে কিনা পাথর থেকে ফিয়র্ডটি খোদাই করেছিলে। কিংবদন্তি অনুযায়ী, তু-তে-রাকি-উহানোয়া পারিপার্শ্বিক প্রাকৃতিক দৃশ্যের পাহাড় ও উপত্যকা এবং সেই এলাকায় প্রবাহিত সব নদী ও পানির ধারা সৃষ্টি করেছিল। জানা যায়, বৃটিশ রয়্যাল নেভির কর্মকর্তা ও অভিযাত্রী ক্যাপ্টেন জেমস কুক (যিনি ১৭৭০ সালের দিকে অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কার করেছিলেন) ফিয়র্ডল্যান্ড সমুদ্র উপকূল খোঁজার সময় দু’বার মিলফোর্ডের পাশ দিয়ে গিয়েছিলেন। তবে আনুমানিক ১৮১২ সালের দিকে ওয়েলশ ঔপনিবেশিক জন গ্রোনো মিলফোর্ড সাউন্ড এলাকা আবিষ্কার করেন। তিনি তার ব্রিটেনের বাড়ির নাম অনুসারে জায়গার নাম রাখেন মিলফোর্ড হ্যাভেন। তবে পরে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় মিলফোর্ড সাউন্ড।
মিলফোর্ড
সাউন্ডের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অফুরন্ত। চারপাশে সবুজ ঘন অরণ্য নিয়ে চারদিকে মাথা উঁচু
করে দাঁড়িয়ে আছে উঁচু পাহাড়, আর মাঝে শান্ত নীলাভ জলরাশির হ্রদ। মনে হয় পাহাড়গুলো যেন
নিচে নেমে এসে ডুবে গেছে হ্রদের স্বচ্ছ, গভীর পানির ভেতর।
মিটার পিক, যার মাওরি নাম রহোটু, মিলফোর্ড সাউন্ডের তীরে অবস্থিত পাহাড়, যার উচ্চতা পানি থেকে প্রায় সতের শ’ মিটার। খ্রিস্টান বিশপদের মাথার পোশাকের সঙ্গে মিল থাকায় ক্যাপ্টেন জন লোর্ট স্টোকেস পাহাড়ের চূড়ার নামকরণ করেছিলেন। পাহাড়টি মিলফোর্ড সাউন্ডের অন্যতম প্রতীকী এবং সবচেয়ে বেশি চিত্রায়িত ল্যান্ডমার্ক, যা তার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য অনেক পর্যটকের কাছে আকর্ষণীয় জায়গা। তবে পর্বত আরোহীদের জন্য মিটার পাহাড়ের চূড়ায় উঠা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, কেননা পাহাড়টি ভীষণ খাড়া। এছাড়া সারা বছরই পাহাড়ের গায়ে জমে থাকে হিমবাহ। অন্যদিকে কুপার পয়েন্ট হলো মিটার পিকের উত্তর দিকের লম্বা ও সরু খাড়া অংশ, যা উচ্চতায় প্রায় দু’ শ মিটার।
হ্যারিসন
কোভের কাছে পৌঁছে চালক বোটের গতি কমিয়ে দেয়। সেখানে যে নদী বয়ে গেছে, তার দৈর্ঘ্য এগারো
কিলোমিটার। সময়ের স্বল্পতার জন্য আমরা সেখানে যাইনি। তাই কোভের মুখের কাছ থেকে এক ঝলক
দেখে ফিরে এসেছি।
আমরা
বোটের ছাদে দাঁড়িয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রূপ-সুষমা আহরণ করার সময় মোহনায় পৌঁছে উপলব্ধি
করি যে, আমাদের সামনে শুধুই অথই পানি—তাসমান সাগর। জানা যায়, সাগরের সেই
মোহনা, যার নাম অ্যানিটা বে, থেকে মাওরিরা মূল্যবান সবুজ পাথর সংগ্রহ করত এবং সেগুলো
দিয়ে তারা অলঙ্কার তৈরি করত। বোট মোহনায় পৌঁছে ঘুরে আবার ফিরতি পথে চলতে থাকে।
পুরো
দু’ঘন্টা জলযানে চড়ার পর সারেং আমাদের ঘাটে নামিয়ে দেয়। আমরা নেমে টার্মিনাল বিল্ডিং
পেরিয়ে বাইরে এসে দেখি জর্জ দাঁড়িয়ে আছে। আমরা বাসে উঠে যে যার জায়গায় বসি। একসময় বাস
চলতে শুরু করে। তে আনাউ শহরের ক্যাফেতে স্বল্প সময়ের জন্য থামবে এবং তারপর কোথাও না
থেমে সোজা চলে যাবে কুইন্সটাউন।
মিলফোর্ড সাউন্ডের লেডী বোয়েন ঝরণা (ছবি: লেখক)
বাসের ভেতর যাত্রীদের মধ্যে অনেকেই ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিয়েছে। আমি বাইরে তাকিয়ে দেখছি আর ভাবছি যে, জীবনটা সত্যি খুবই ছোট। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট এই দুনিয়ার অনেক কিছুর সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যাবে না। তবে এ জীবনে যতটুকু দেখেছি এবং দেখার সুযোগ ও সৌভাগ্য হয়েছে, তা হয়তো অনেকের তুলনায় বেশি। আর এই সান্ত্বনা নিয়ে চুপচাপ বসে দেখতে থাকি বাইরের দৃশ্যাবলী।
সবশেষে
স্বীকার করতেই হয় যে, নিজের চোখে মিলফোর্ড সাউন্ডের প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য্য, যেখানে
সবুজ পাহাড় ছুঁয়েছে নীল জলরাশি, দেখার যে আনন্দ, অনুভূতি এবং মানসিক প্রশান্তি, তা
বোধহয় বলে বোঝানো সম্ভব নয়।
ঢাকা/টিএ/আরএস