টক্সিক রিলেশন বলতে এমন একটি সম্পর্ককে বোঝায় যেখানে একজন বা দুজন মানুষই একে অপরের জন্য মানসিকভাবে ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।সহজভাবে বললে,এমন সম্পর্ক যেখানে ভালোবাসার চেয়ে কষ্ট,চাপ,অসম্মান আর নেতিবাচকতা বেশি থাকে।
টক্সিক রিলেশনের লক্ষণগুলো:
*সবসময় ঝগড়া, ভুল বোঝাবুঝি।
*একজন অন্যজনকে কন্ট্রোল করতে চায়।
*অসম্মানজনক কথা বা আচরণ(গালি,অপমান)
বিশ্বাসের অভাব বা অতিরিক্ত সন্দেহ।
*একজন সবসময় কষ্ট পায়,আরেকজন গুরুত্ব দেয় না।
*নিজের মতামত বা অনুভূতি প্রকাশ করতে ভয় লাগে।
*সম্পর্কের কারণে নিজের আত্মবিশ্বাস কমে যায়।
উদাহরণ:
যদি কেউ তোমাকে সবসময় ছোট করে, তোমার স্বাধীনতা কেড়ে নেয়,বা তোমার অনুভূতির কোনো মূল্য না দেয়,তাহলে সেটা টক্সিক রিলেশন হতে পারে।
একজন টক্সিক পার্টনারের সাথে কিভাবে মানিয়ে চলা যায়?
একজন টক্সিক পার্টনারের সাথে মানিয়ে চলা খুব কঠিন,কারণ সেখানে শুধু ভালোবাসা থাকলেই সব ঠিক হয় না।নিজের মানসিক শান্তি আর আত্মসম্মানও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে কিছু বাস্তবধর্মী উপায়ে পরিস্থিতি সামলানো যায়।
কীভাবে মানিয়ে চলার চেষ্টা করা যায়,
#শান্ত থেকে সীমারেখা তৈরি করুন।
#কোন আচরণ আপনি মেনে নেবেন আর কোনটা না,এটা পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে।
#বারবার অপমান, চিৎকার,কন্ট্রোল করা এসবকে স্বাভাবিক ভাববেন না।
#তর্কে জেতার চেষ্টা না করে পরিস্থিতি বুঝুন
টক্সিক মানুষ অনেক সময় যুক্তির চেয়ে আবেগ দিয়ে আঘাত করে।
#সব কথার উত্তর দিতে গেলে মানসিকভাবে আরও ক্লান্ত হয়ে যাবেন।
#নিজের জীবনটাকে শুধু সম্পর্কের মধ্যে আটকে ফেলবেন না।
বন্ধু,পরিবার,কাজ,শখ নিজের একটা আলাদা জগৎ রাখুন।কারণ টক্সিক সম্পর্ক ধীরে ধীরে মানুষকে একা করে দেয়।
#নিজের অনুভূতিকে ছোট করবেন না।আমি হয়তো বেশি ভাবছি,এই চিন্তা অনেকেই করেন।
কিন্তু যদি সম্পর্ক আপনাকে প্রতিদিন কাঁদায়, ভয় পাইয়ে দেয় বা ভিতর থেকে ভেঙে দেয়,তাহলে সেই কষ্ট সত্যি।
#পরিবর্তনের দায়িত্ব একা নিজের কাঁধে নেবেন না
আপনি যতই ভালোবাসুন, একজন মানুষ বদলাবে কি না সেটা তার নিজের ইচ্ছার উপরও নির্ভর করে।
#প্রয়োজনে দূরত্ব নেওয়া শিখুন।
কখন ছেড়ে আসা উচিত:
কখনও কখনও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখাটা বেশি জরুরি হয়ে যায়।
সব রাগ,ঝগড়া বা ভুল বোঝাবুঝি মানেই সম্পর্ক শেষ না।কিন্তু কিছু লক্ষণ আছে,যেগুলো বারবার ঘটতে থাকলে বুঝতে হবে,এবার হয়তো ছেড়ে আসার সময় এসেছে।
যখন ছেড়ে আসা উচিত:
#বারবার অপমান,ছোট করা বা অসম্মান হলে।
#মানসিক,শারীরিক বা আর্থিক নির্যাতন থাকলে
আপনি নিজের মত প্রকাশ করতে ভয় পেলে।
#সম্পর্কের মধ্যে থেকেও সবসময় একা লাগে।
#ক্ষমা চাওয়ার পরও একই কষ্ট বারবার ফিরে আসে।
#আপনার আত্মসম্মান, আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শান্তি নষ্ট হয়ে গেলে।
#আপনি বদলানোর চেষ্টা করছেন,কিন্তু অপরপক্ষ কোনো দায়িত্ব নিচ্ছে না।
#সম্পর্ক আপনাকে সুখের চেয়ে বেশি ভেঙে দিচ্ছে।
একটা কঠিন সত্য,
অনেক সময় মানুষ সম্পর্ক ছাড়ে না ভালোবাসার কারণে না,ছাড়তে ভয় পায় বলে।যদি আর কেউ না আসে?মানুষ কি বলবে?, এতদিনের সম্পর্ক?
এসব ভাবনা মানুষকে আটকে রাখে।কিন্তু একটা সম্পর্ক যদি প্রতিদিন আপনাকে কাঁদায়,নিজেকে তুচ্ছ মনে করায়,নিজের ভেতরের আলো নিভিয়ে দেয়,তাহলে সেখানে থেকে যাওয়াটা ই ধীরে ধীরে নিজেকে হারিয়ে ফেলা।
একজন টক্সিক পার্টননার কতটা ঝুকিপূর্ণ?
*মানসিকভাবে:
সবসময় দুশ্চিন্তা,ভয় বা চাপের মধ্যে থাকতে হয়
নিজের উপর বিশ্বাস কমে যায়।আমি যথেষ্ট ভালো না, এমন অনুভূতি তৈরি হয়
ধীরে ধীরে মানুষ ইমোশনালি এবিউজ হয়ে পড়ে।
আত্মসম্মানের উপর:
টক্সিক মানুষ অনেক সময় এমনভাবে কথা বলে বা আচরণ করে যে,আপনি নিজের মূল্য নিয়েই সন্দেহ করতে শুরু করেন।
সামাজিকভাবে:
বন্ধু বা পরিবারের থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে
আপনার স্বাধীনতা কমিয়ে দিতে পারে।সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতে পারে।
ভবিষ্যতের উপর:
দীর্ঘদিন টক্সিক সম্পর্কে থাকলে অনেকেই পরে নতুন সম্পর্কে বিশ্বাস করতে ভয় পায়।কিছু মানুষ আবার নিজের স্বাভাবিক হাসিখুশি ব্যক্তিত্বটাই হারিয়ে ফেলে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি:
যদি সম্পর্কের মধ্যে ভয় দেখানো,হুমকি,শারীরিক আঘাত,অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ,
বা মানসিক নির্যাতন থাকে,
তাহলে সেটা খুব সিরিয়াস বিষয়।তখন নিরাপত্তাকে সবার আগে গুরুত্ব দিতে হয়।
সন্তানের উপর কেমন প্রভাব পরে এমন টক্সিক বাবা মা থাকলে?
টক্সিক বাবা মায়ের মধ্যে বড় হওয়া একটা সন্তানের মনে অনেক গভীর প্রভাব ফেলে।সব ক্ষত চোখে দেখা যায় না,কিছু ক্ষত ভিতরে ভিতরে তৈরি হয়, যা বড় হওয়ার পরও মানুষ বয়ে বেড়ায়।
সন্তানের উপর কী ধরনের প্রভাব পড়ে:
#সবসময় ভয় বা অস্থিরতায় থাকা।
#যদি বাসায় সবসময় ঝগড়া,চিৎকার,অপমান বা টেনশন থাকে,তাহলে শিশু কখনও পুরোপুরি নিরাপদ অনুভব করতে পারে না।
#আত্মবিশ্বাস কমে যায়
বারবার তুলনা,বকা, অপমান বা অবহেলা পেলে শিশুর মনে হয়,আমি হয়তো যথেষ্ট ভালো না।
#ভালোবাসা সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হয়।
#যে শিশু ছোটবেলা থেকে কষ্ট, নিয়ন্ত্রণ বা অসম্মানকে স্বাভাবিক সম্পর্কে হিসেবে দেখে,সে বড় হয়ে একই ধরনের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে পারে।
#নিজের অনুভূতি চেপে রাখা শেখে।
অনেক শিশু কাঁদতে, কথা বলতে বা নিজের কষ্ট প্রকাশ করতে ভয় পায়।
কারণ তারা ভাবে,আমার কথা কেউ বুঝবে না।”
# রাগ বা আচরণগত সমস্যা কিছু শিশু খুব চুপচাপ হয়ে যায়,আবার কেউ অতিরিক্ত রাগী বা জেদি হয়ে পড়ে।এটা অনেক সময় ভিতরের কষ্টের প্রকাশ।
#সম্পর্কের ভয় তৈরি হয়
বড় হওয়ার পর তারা কাউকে সহজে বিশ্বাস করতে পারে না।
মনে ভয় থাকে সব সম্পর্কই কি শেষ পর্যন্ত কষ্ট দেয়?
#কিন্তু একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা সব টক্সিক পরিবেশে বড় হওয়া সন্তান ভেঙে পড়ে না।যদি একজন মানুষও তাকে সত্যিকারের ভালোবাসা,নিরাপত্তা আর সম্মান দেয়,তাহলে সে ধীরে ধীরে সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে পারে।
#একজন সন্তানের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন দামি জিনিস না একটা শান্ত, নিরাপদ,সম্মানপূর্ণ পরিবেশ।কারণ শিশুরা শুধু কথা শোনে না,তারা বাবা মায়ের সম্পর্ক দেখেই ভালোবাসার সংজ্ঞা শিখে।
শেষ কথা
ভালোবাসা মানে শুধু কাউকে ধরে রাখা না।
কখনও কখনও ভালোবাসা মানে নিজের ভাঙা মনটাকেও বাঁচানো।
কারণ,যে সম্পর্ক আপনার শান্তি কেড়ে নেয়,সেখানে থেকে যাওয়ার চেয়ে নিজেকে বেছে নেওয়া অনেক বেশি সাহসের।
থেকে যাওয়া উচিত কি না,এর উত্তর একটাই মাপকাঠিতে ঠিক হয়,
এই সম্পর্ক আমাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছে,নাকি ভেঙে দিচ্ছে?যদি ভেঙে দেয়,তাহলে না থাকা অনেক সময় সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর সিদ্ধান্ত।
লেখাঃ ইশরাত জাহান ইনা