মাসের পর মাস অবমূল্যায়ন, স্বীকৃতির অভাব ও কর্মক্ষেত্রের নীরব দূরত্ব কীভাবে একজন ভালো কর্মীকে চাকরি ছাড়ার দিকে ঠেলে দেয়
অফিসে এমন কিছু কর্মী থাকেন, যাঁদের আলাদা করে মনে করিয়ে দিতে হয় না। সময়মতো কাজ করেন, প্রয়োজনের সময় বাড়তি দায়িত্ব নেন, সহকর্মীকে সহযোগিতা করেন, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থকে নিজের কাজের অংশ হিসেবে দেখেন। কোনো কাজ অসম্পূর্ণ থাকলে তাঁরা এগিয়ে আসেন। সংকটের সময় তাঁদের ওপরই ভরসা করেন সহকর্মী ও কর্তৃপক্ষ।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো—এই মানুষটিই একদিন হঠাৎ চাকরি ছেড়ে দেন।
তখন অনেকের প্রশ্ন থাকে, ‘এত ভালো কর্মী হঠাৎ চলে গেলেন কেন?’
আসলে অনেক সময় তাঁর চলে যাওয়া হঠাৎ নয়। সিদ্ধান্তটি তৈরি হয় অনেক আগে—ছোট ছোট হতাশা, স্বীকৃতির অভাব, উন্নতির সুযোগ না পাওয়া, মতামতের মূল্য না পাওয়া কিংবা বারবার নিজেকে অদৃশ্য মনে হওয়ার মধ্য দিয়ে। বাইরে থেকে কর্মীটি হয়তো আগের মতোই কাজ করে যাচ্ছেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁর দূরত্ব তৈরি হতে থাকে।
গবেষণাও বলছে, কর্মীর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক শুধু বেতন দিয়ে তৈরি হয় না। স্বীকৃতি, মূল্যায়ন, অর্থবহ ফিডব্যাক, শেখার সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা—সবকিছুই কর্মীর প্রতিষ্ঠানে থাকার ইচ্ছার সঙ্গে সম্পর্কিত।
স্বীকৃতি না পাওয়া একটি বড় সংকেত
২০২৪ সালে Gallup ও Workhuman-এর যৌথ গবেষণায় ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৩,৪০০-এর বেশি কর্মীর কর্মজীবনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, যেসব কর্মী উচ্চমানের স্বীকৃতি পেয়েছেন, তাঁরা দুই বছর পর প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ৪৫ শতাংশ কম ঝুঁকিতে ছিলেন। একই গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র ২২ শতাংশ কর্মী মনে করেন তাঁরা তাঁদের কাজের জন্য যথেষ্ট স্বীকৃতি পান।
অর্থাৎ একজন কর্মী নিয়মিত কাজ করছেন মানেই তিনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
অনেক সময় কর্মীর প্রয়োজন হয় একটি সাধারণ বাক্যের—
‘আপনার কাজটা ভালো হয়েছে।’
অথবা—
‘এই কঠিন কাজটা সামলে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।’
স্বীকৃতি মানেই পুরস্কার বা বেতন বৃদ্ধি নয়। একজন কর্মীর অবদানকে দেখা, বোঝা এবং যথাযথভাবে স্বীকার করাও এর অংশ।
বেতনই সবকিছু নয়
কর্মক্ষেত্রে সন্তুষ্টির আলোচনায় বেতন গুরুত্বপূর্ণ—এ নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা দেখাচ্ছে, চাকরির মান নির্ধারণে শুধু বেতন ও সুবিধা যথেষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের Bureau of Labor Statistics-এর ২০২৬ সালের একটি বিশ্লেষণে ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে চাকরি পরিবর্তন করা কর্মীদের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বেতন ও সুবিধার পরিবর্তন একাই একজন কর্মী নতুন চাকরিকে আগের চেয়ে ভালো মনে করবেন কি না—তা ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে না। অর্থাৎ কাজের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যও কর্মীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
সেই ‘অন্যান্য’ বিষয়গুলোর মধ্যে থাকতে পারে কাজের পরিবেশ, ব্যবস্থাপকের আচরণ, উন্নতির সুযোগ, কাজের অর্থবোধ, সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং কর্মীর প্রতি প্রতিষ্ঠানের আস্থা।
মাসের পর মাস চুপ থাকা মানেই সন্তুষ্ট থাকা নয়
একজন কর্মী যখন প্রথমবার অবমূল্যায়িত বোধ করেন, তখন হয়তো তিনি প্রতিবাদ করেন। দ্বিতীয়বার হয়তো বিষয়টি নিয়ে বসের সঙ্গে কথা বলেন। তৃতীয়বারও যদি পরিবর্তন না আসে, তখন অনেকেই আর কথা বলেন না।
এখানেই শুরু হতে পারে একটি নীরব পরিবর্তন। তিনি কাজ করবেন, কিন্তু আগের মতো উদ্যোগ নেবেন না।
অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে চাইবেন না। নতুন ধারণা দেওয়ার আগ্রহ কমে যাবে। কর্মক্ষেত্রের সমস্যাকে নিজের সমস্যা মনে করবেন না। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় প্রতিষ্ঠানটিকে আর রাখবেন না। বাইরে থেকে মনে হবে—সবকিছু ঠিকঠাক চলছে।
কিন্তু কর্মীর ভেতরে হয়তো তখন তৈরি হয়ে গেছে অন্য একটি সিদ্ধান্ত। ‘আমি কি এখানে গুরুত্বপূর্ণ?’ কর্মক্ষেত্রে মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মীর মনে হওয়া—‘আমার কাজের গুরুত্ব আছে।’
American Psychological Association-এর একটি পুরোনো কর্মক্ষেত্র জরিপেও দেখা গিয়েছিল, যেসব কর্মী মনে করতেন তাঁদের কর্মক্ষেত্রে মূল্য দেওয়া হয় না, তাঁদের মধ্যে পরবর্তী এক বছরে নতুন চাকরি খোঁজার ইচ্ছা ছিল বেশি। একই জরিপে কর্মক্ষেত্রে মূল্যায়িত বোধ করা কর্মীদের মধ্যে প্রেরণা, সম্পৃক্ততা ও কাজের সন্তুষ্টিও বেশি পাওয়া যায়।
যদিও জরিপটি ২০১২ সালের এবং যুক্তরাষ্ট্রের কর্মীদের ওপর করা হয়েছিল, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে—কর্মীর মানসিক অভিজ্ঞতা তাঁর কর্মজীবনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ভালো কর্মীরাও ক্লান্ত হন
অনেক প্রতিষ্ঠানে ‘ভালো কর্মী’ বলতে এমন মানুষকে বোঝানো হয়, যিনি কখনো না বলেন না।
তিনি ছুটির দিনেও ফোন ধরবেন।
সহকর্মীর কাজেও সহযোগিতা করবেন।
সময়সীমার আগেই কাজ শেষ করবেন।
অতিরিক্ত দায়িত্ব নেবেন।
প্রয়োজনে নিজের ব্যক্তিগত সময়ও দেবেন।
কিন্তু এখানে একটি বিপদ আছে।
যদি একজন কর্মীর অতিরিক্ত দায়িত্ব নেওয়াকে নিয়মিত কর্তব্য হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু তাঁর অবদানকে স্বাভাবিক বা অদৃশ্য ধরে নেওয়া হয়, তাহলে একসময় সেই কর্মীর মধ্যেও ক্লান্তি তৈরি হতে পারে।
এমনকি উচ্চ বেতন পাওয়া চাকরিতেও কাজের সময়, নমনীয়তা এবং ব্যক্তিগত জীবনের ওপর চাপ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। শ্রম অর্থনীতিবিদ Claudia Goldin-এর ‘greedy jobs’ ধারণা এমন কিছু উচ্চ পারিশ্রমিকের কাজকে বোঝায়, যেখানে দীর্ঘ সময় ও প্রায় সবসময় উপলব্ধ থাকার বিনিময়ে বেশি পুরস্কার দেওয়া হয়।
অর্থাৎ বেশি পারিশ্রমিক সবসময় বেশি সন্তুষ্টির সমার্থক নয়। ফিডব্যাকের অভাবও দূরত্ব তৈরি করে। একজন কর্মী শুধু প্রশংসা চান না; তিনি জানতে চান তাঁর কাজ কেমন হচ্ছে।
Gallup-Workhuman-এর গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র ২৫ শতাংশ কর্মী দৃঢ়ভাবে মনে করেন যে তাঁরা সহকর্মীদের কাছ থেকে মূল্যবান ফিডব্যাক পান। আর যারা মূল্যবান ফিডব্যাক পাওয়ার কথা দৃঢ়ভাবে জানান, তাঁরা অন্যদের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি সম্পৃক্ত থাকার সম্ভাবনা দেখিয়েছেন।
অর্থাৎ শুধু ভুল ধরিয়ে দেওয়া নয়, একজন কর্মীর কাজকে বুঝে অর্থবহ ফিডব্যাক দেওয়াও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে পারে।
চাকরি হারানোর ভয়ও মানসিক চাপ তৈরি করে
কর্মীর মনে যখন দীর্ঘদিন ধরে চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তখন সেটি শুধু কর্মক্ষমতার বিষয় থাকে না; মানসিক সুস্থতার সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে।
২০২৬ সালে Social Science & Medicine-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২০০১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার HILDA জরিপের ১৪,১৯৫ জন ব্যক্তির তথ্য এবং ৪,২৫১টি redundancy ঘটনার বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, চাকরি হারানোর আগে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি দেখা যেতে পারে। তবে পুনরায় চাকরি পাওয়ার পর অনেকের মানসিক স্বাস্থ্যের দ্রুত পুনরুদ্ধারও লক্ষ্য করা গেছে।
তাই কর্মীর চাকরি হারানোর আগের সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একজন কর্মী যখন বারবার ভাবতে থাকেন—‘আমাকে কি রাখা হবে?’ ‘আমার ভবিষ্যৎ কী?’—তখন সেই অনিশ্চয়তা তাঁর কর্মজীবনের অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
নীরবে চলে যাওয়ার আগে কি কোনো সংকেত থাকে?
সব ক্ষেত্রে নয়, তবে কিছু পরিবর্তন প্রতিষ্ঠানের নজরে আসতে পারে—
আগের তুলনায় উদ্যোগ কমে যাওয়া
নতুন দায়িত্ব এড়িয়ে চলা
মিটিংয়ে মতামত দেওয়া বন্ধ করা
প্রশংসা বা সমালোচনা—দুটোর প্রতিই উদাসীন হয়ে যাওয়া
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আর আগ্রহ না দেখানো
সহকর্মীদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে দেওয়া
কাজের ন্যূনতম দায়িত্বটুকু করে থেমে যাওয়া
অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও নতুন সুযোগ বা প্রশিক্ষণে আগ্রহ হারানো
এসবের প্রতিটিই যে চাকরি ছাড়ার সংকেত—তা বলা যাবে না। ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, কাজের চাপ কিংবা অন্য কারণও থাকতে পারে। তবে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন হলে বিষয়টি নিয়ে কর্মীর সঙ্গে কথা বলা গুরুত্বপূর্ণ।
একজন কর্মীকে ধরে রাখার অর্থ শুধু বেতন বাড়ানো নয়
কর্মী ধরে রাখার আলোচনায় বেতন ও সুযোগ-সুবিধা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দেয়, একটি সুস্থ কর্মপরিবেশে আরও কিছু বিষয় প্রয়োজন।
স্বীকৃতি: ভালো কাজটি চোখে পড়ছে কি না।
ফিডব্যাক: কর্মী জানেন কি না তিনি কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন।
উন্নতির সুযোগ: সামনে এগোনোর পথ আছে কি না।
আস্থা: প্রতিষ্ঠান তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছে কি না।
সম্পর্ক: ব্যবস্থাপক ও সহকর্মীদের সঙ্গে সম্মানজনক সম্পর্ক আছে কি না।
উদ্দেশ্য: নিজের কাজকে অর্থবহ মনে হচ্ছে কি না।
২০২৬ সালের Conference Board জরিপেও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মীদের চাকরিসন্তুষ্টি নিয়ে দেখা যায়, সামগ্রিক সন্তুষ্টি রেকর্ড পর্যায়ে থাকলেও বেতন, পদোন্নতি, সুবিধা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্তুষ্টির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। গবেষণাটি আরও দেখিয়েছে, কাজের সন্তুষ্টি বোঝার জন্য শুধু একটি সামগ্রিক ‘সন্তুষ্ট’ বা ‘অসন্তুষ্ট’ সূচক যথেষ্ট নয়।
শেষ পর্যন্ত মানুষ শুধু চাকরি ছাড়ে না, সম্পর্কও ছাড়ে
একজন দক্ষ কর্মীর চলে যাওয়া অনেক সময় শুধু একটি পদ খালি হওয়া নয়। তাঁর সঙ্গে চলে যেতে পারে বছরের পর বছর তৈরি হওয়া অভিজ্ঞতা, কাজের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞান, সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি যে আস্থাটি তিনি তৈরি করেছিলেন।
সবচেয়ে নিবেদিত কর্মী সবসময় রাগ করে দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে যান না। অনেক সময় তিনি দীর্ঘদিন কাজ করতে করতে, বলতে বলতে, অপেক্ষা করতে করতে একসময় চুপ হয়ে যান।
আর সেই নীরবতাই হয়তো তাঁর চলে যাওয়ার আগের সবচেয়ে বড় সংকেত।