তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ২০ লাখ টাকা অর্থায়ন, আবেদন চলবে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত


ছবি: রোদসী/এআই
ছবি: রোদসী/এআই

ব্যবসা শুরু কিংবা সম্প্রসারণের স্বপ্ন দেখছেন? পুঁজি সংকটে আটকে আছে উদ্যোগ? তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা অর্থায়নের সুযোগ নিয়ে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘উদ্যোগ’ নামের এই কর্মসূচিতে ঋণের পাশাপাশি সমপরিমাণ অনুদান পাওয়ারও সুযোগ রয়েছে। দেশের ৫৬ জেলার তরুণ উদ্যোক্তারা ১ নভেম্বর থেকে আবেদন করতে পারছেন। তবে কারা পাবেন এই অর্থায়ন, কীভাবে করবেন আবেদন এবং কোন ধরনের উদ্যোগ রয়েছে অগ্রাধিকারে?


দেশে শিক্ষিত বেকার তরুণের সংখ্যা কম নয়। অনেকেরই রয়েছে নতুন কিছু করার পরিকল্পনা, ব্যবসার ধারণা কিংবা উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু অর্থের অভাবে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পায় না। বিশেষ করে গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ের তরুণদের জন্য ব্যবসা শুরু করার প্রাথমিক পুঁজি সংগ্রহ বড় চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতা বিবেচনায় তরুণ উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করা, তাদের উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়া এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচি চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।


ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা


বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘উদ্যোগ: উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’র আওতায় একজন নির্বাচিত উদ্যোক্তা সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন পেতে পারেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ঋণ এবং সমপরিমাণ অর্থ অনুদান হিসেবে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।


অর্থাৎ, একজন উদ্যোক্তা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ঋণ এবং ১০ লাখ টাকা অনুদান পেতে পারেন। ঋণ ও অনুদানের অর্থ এককালীন একসঙ্গে দেওয়া হবে। অনুদানের অর্থ আসবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে।


এই উদ্যোগের বিশেষত্ব হলো, উদ্যোক্তাকে শুধু ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না; বরং ব্যবসার প্রাথমিক মূলধন গঠনে অনুদানের সুবিধাও যুক্ত করা হয়েছে। ফলে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা শুরু করা কিংবা বিদ্যমান উদ্যোগকে আরও বড় করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।


কারা আবেদন করতে পারবেন?


কর্মসূচিটির মূল লক্ষ্য প্রান্তিক এলাকার শিক্ষিত বেকার ও সম্ভাবনাময় তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ের তরুণদের ব্যবসায় সম্পৃক্ত করতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।


প্রকাশিত কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, ২৫ থেকে ২৮ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধা, গ্রামের শিক্ষিত বেকার যুবক এবং নতুন উদ্যোক্তাদের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে।


নতুন ব্যবসা শুরু করতে আগ্রহীদের পাশাপাশি অন্তত এক বছর ধরে পরিচালিত হচ্ছে—এমন উদ্যোগের উদ্যোক্তারাও অর্থায়নের জন্য বিবেচিত হতে পারেন।


কী ধরনের ব্যবসায় পাওয়া যাবে অর্থায়ন?


এই কর্মসূচিতে নির্দিষ্ট কয়েকটি ব্যবসার মধ্যে সুযোগ সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। উৎপাদনশীল ও আয় সৃষ্টিকারী বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ অর্থায়নের আওতায় আসতে পারে। যেমন—


উৎপাদনমুখী উদ্যোগ: ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, পণ্য উৎপাদন এবং কারখানাভিত্তিক ব্যবসা।


কৃষি ও মৎস্য: মাছ চাষ, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ।


খাদ্য ও ক্যাটারিং: ঘরে তৈরি খাবার উৎপাদন, সরবরাহ ও খাদ্য ব্যবসা।


ফ্যাশন ও হস্তশিল্প: বুটিক, পোশাক তৈরি, হস্তশিল্প ও দেশীয় পণ্যের ব্যবসা।


অন্যান্য উদ্যোগ: স্থানীয় চাহিদাভিত্তিক উৎপাদনশীল ও আয় সৃষ্টিকারী ব্যবসা।


অর্থাৎ, শুধু বড় বিনিয়োগের ব্যবসা নয়, স্থানীয় সম্পদ ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে ওঠা ছোট উদ্যোগও সম্ভাবনার জায়গা তৈরি করতে পারে।


কীভাবে হবে উদ্যোক্তা নির্বাচন?


অর্থায়নের অর্থ যেন প্রকৃত সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছায়, সে জন্য উপজেলা পর্যায়ে আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার তফসিলি ব্যাংকের শাখাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।


বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এর আগে জানিয়েছিলেন, উদ্যোক্তারা যেকোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি কমিটি থাকবে। এতে ব্যাংকারদের পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞরাও যুক্ত থাকবেন। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নির্বাচিত উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন করা হবে।

উপজেলাভিত্তিক উদ্যোক্তা অনুসন্ধান ও নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন ব্যবসা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

৫৬ জেলায় শুরু হয়েছে আবেদন-

কর্মসূচিটির প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের আট জেলার ৬৪টি উপজেলা থেকে আবেদন নেওয়া হয়েছিল। ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত এসব এলাকার উদ্যোক্তারা আবেদন জমা দেন। প্রাথমিক পর্যায়ে মোট ১৮ হাজার ৪৪৪টি আবেদন জমা পড়েছে।

প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জেলাভিত্তিক আবেদনের সংখ্যা হলো- মানিকগঞ্জে ১,৩৪৩টি, ফেনীতে ১,২৬১টি, নওগাঁয় ২,৪৫৬টি, ঝিনাইদহে ২,১৯১টি, ভোলায় ১,৫৪৫টি, হবিগঞ্জে ১,৫৫২টি, রংপুরে ২,৭৪৫টি এবং নেত্রকোনায় ৫,৩৫১টি।

প্রাথমিক পর্যায়ের ধারাবাহিকতায় এবার অবশিষ্ট ৫৬ জেলার সব উপজেলার আগ্রহী তরুণ উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে আবেদন নেওয়া হচ্ছে।

আবেদনের সময় ও পদ্ধতি: 

১ নভেম্বর ২০২৬ থেকে শুরু হওয়া এই আবেদন গ্রহণ চলবে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। আগ্রহী উদ্যোক্তারা নির্ধারিত আবেদন ফরম পূরণ করে সংশ্লিষ্ট উপজেলার যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখায় জমা দিতে পারবেন।

আবেদন ফরম সংগ্রহ করা যাবে—

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট: www.bb.org.bd

বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই পোর্টাল: www.bb.org.bd/smespd_portal

তফসিলি ব্যাংকগুলোর নিজস্ব ওয়েবসাইট।

কর্মসূচির নীতিমালা ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এসএমইএসপিডি সার্কুলার নং-০৫-এর মাধ্যমে জারি করা হয়েছে। আবেদন করার আগে আগ্রহীদের নীতিমালা ও শর্তাবলি ভালোভাবে দেখে নেওয়া প্রয়োজন।

তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার নতুন সম্ভাবনা

একটি ব্যবসার শুরুতে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো পুঁজি। বিশেষ করে যাদের ব্যবসার ধারণা ও কাজের দক্ষতা আছে, কিন্তু বিনিয়োগের সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ উপজেলা পর্যায়ে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনতে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে শুধু অর্থায়নই যথেষ্ট নয়। নতুন উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনা, বাজারজাতকরণ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পণ্যের মান নিশ্চিত করার বিষয়েও প্রয়োজন প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ। অর্থায়নের পাশাপাশি এসব সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে উদ্যোগটি আরও কার্যকর হতে পারে।


যারা দীর্ঘদিন ধরে নিজের ব্যবসা শুরু করার স্বপ্ন দেখছেন, তাদের জন্য এই কর্মসূচি হতে পারে একটি সম্ভাবনাময় সুযোগ। তবে আবেদন করার আগে বয়স, যোগ্যতা, নির্বাচনের শর্ত এবং ঋণ-অনুদানের বিস্তারিত নিয়মাবলি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত নীতিমালা থেকে যাচাই করে নেওয়া জরুরি।


ঢাকা/টিএ

sidebar ad