জীবনটা যেনো এক রেসের ট্র্যাক। কর্মব্যস্তময় এই জীবনে দু দন্ড দম ফেলারও ফুরসত নেই। ছুটে চলার এই সময়ে কর্মজীবিদের কাছে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত হয় দুপুরের খাবার। অথচ সারা বিকেলের শক্তি যোগাতে এই খাবারটিই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। সময় বাঁচিয়ে এমন কিছু লাঞ্চ আইটেমের আইডিয়া যদি খুঁজে থাকো, তবে এই লেখাটি তোমারই জন্য। ব্যস্ত লাইফস্টাইলের সাথে মানানসই এমনকিছু অফিস লাঞ্চ নিয়ে আমরা জানবো, যা স্বল্প সময়ে হয়ে যাবে এবং তোমাকে রাখবে ভরপুর এনার্জিতে।
বলা হয় পেট শান্তি তো দুনিয়া শান্তি। শরীরে শক্তি যোগাতে ও নতুন উদ্যমে কাজ করতে খাবারের কোন বিকল্প নেই। আর প্রসঙ্গ যদি হয় দুপুরের খাবারের, তবে তা স্কিপ করার কোন মানেই হয় না। সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকার জন্য দিনের অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ খাবার এই মধ্যাহ্ণভোজ। মেটাবোলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া সচল রাখা, শরীরে পুষ্টির ভারসাম্য রাখা, মনোযোগ ও মানসিক চাপ কমানো, শরীরে শর্করার মাত্রা ঠিক রাখা সহ অনেক অনেক উপকার রয়েছে দুপুরের এই খাবারের মধ্যে। কিন্তু অফিসের ব্যস্ততা সামলাতে যেয়ে অনেকেই প্রোপার একটা লাঞ্চের দিকে ঠিকমতো নজর দিতে পারেনা। এই অল্প সময়ে কি খাওয়া হবে সেটা নিয়ে থাকে নানা চিন্তা। আর তার উপর আমাদের বাঙ্গালিদের মাঝে দুপুরে খাওয়ার সাথে ভাতঘুমের একটা আলস্য ভাব তো থাকেই। এসব চিন্তা থেকেই অনেকের মাঝেই দিনের এই বেলার খাবার স্কিপ করার টেন্ডেসি থাকে।
সকালের নাস্তার মতো দুপুরের খাবারও খুব গুরুত্বপূর্ণ। মোটামুটি একটা লম্বা বিরতির পর কিন্তু আমরা এই খাবার খেয়ে থাকি। এই জন্য দুপুরের খাবারে সুষম ও পুষ্টিগুণ সম্পন্ন হওয়া উচিৎ। বাহিরের অস্বাস্থ্যকর খাবার বা ক্যাফেটেরিয়ার ভাজা-পোড়া না খেয়ে বাসায় তৈরি করা লাঞ্চ বক্স এক্ষেত্রে হতে পারে আদর্শ। কারণ-
স্বাস্থ্যসম্মত ও পুষ্টিকর। বাইরের খাবারের তুলনায় ঘরের খাবারে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সহজ
অর্থ ও সময় সাশ্রয় হয়
নিরাপদ ও জীবাণুমুক্ত
পছন্দ অনুযায়ী বৈচিত্র্যময় খাবার
নির্দিষ্ট ডায়েট বা খাদ্যতালিকা মেনে চলা যায়
এখন আসো সময় বাঁচিয়ে শর্টকাট কিন্তু পুষ্টিকর কিছু লাঞ্চবক্স আইডিয়া জেনে নিই।
সালাদ বোল
কোন ধরনের রান্নার ঝামেলা ছাড়াই সালাদ বোল হতে পারে স্বাস্থ্যকর, রিফ্রেশিং এবং সহজ সমাধান। কর্মব্যস্ততায় ক্লান্তি দূর করতে এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করতে এটি হতে পারে আদর্শ এক আইটেম। ভারী খাবারের তুলনায় সালাদ হজম করা সহজ আর অল্প সময়ে অফিস ডেস্কে বসে খাওয়ার জন্য এটি একটি পরিচ্ছন্ন ও স্মার্ট ওয়ে। বিভিন্ন বৈচিত্র্যের সালাদ বোল তৈরি করতে পারো-
আগের রাতে সিদ্ধ করে রাখা কাবুলি ছোলা দিয়ে সিম্পল ভাবে ঝটপট বানানো যায়। সাথে কিছু শসা কুঁচি, টমেটো, পেঁয়াজ মেশাও। স্বাদের জন্য উপরে কিছুটা লেবুর রস, গোলমরিচ গুঁড়া আর অলিভ অয়েল দিতে পারো। এতে প্রচুর ফাইবার ও প্রোটিন আছে যা অল্পতেই পেট ভরা ভাব রাখবে।
প্রোটিনের উৎস হিসেবে গ্রিল করা মুরগি, শসা, টমেটো, লেটুস একসাথে মিশাও। অলিভ অয়েল ও লেবুর রস দিয়ে হালকা ড্রেসিং করে নিতে পারো।
এছাড়াও পাস্তা সালাদও করতে পারো। সেদ্ধ পাস্তা সাথে ক্যাপসিকাম, ব্রকোলি, কর্ণ এবং মেয়োনিজ বা দইয়ের ড্রেসিং মেশাও। ব্যস। হয়ে যাবে মজাদার পাস্তা সালাদ।
এছাড়াও, বিভিন্ন ধরনের ফ্রুটস ও নাট যেমন আপেল, আংগুর, আখরোট, কাজুবাদাম সাথে দই মিশিয়ে মজাদার ফ্রুটস সালাদ করতে পারো।
র্যাপ ও স্যান্ডউইচ
এই র্যাপ তৈরি করতে সাধারণ আটার রুটি, পরোটা বা টর্টিলা ব্যবহার করতে পারো। র্যাপ বা স্যান্ডউইচ অফিস লাঞ্চ হিসেবে হতে পারে ঝটপট তৈরিযোগ্য একটি অপশন। রাতে বানানো রুটি থাকলে তাতে সকালে শুধু সিদ্ধ ডিম বা চিকেন দিয়ে তাতে শসা, গাজর, লেটুস, সামান্য সস বা দই দিয়ে মিশিয়ে র্যাপ করে নিলেই হবে। চাইলে ডিম বা চিকেনের পরিবর্তে গ্রিল করা পনিরও ব্যবহার করতে পারো। পনির, পেঁয়াজ এবং পুদিনা চাটনি দিয়েও এই র্যাপ অনেক সুস্বাদু হয়। কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন এবং ভিটামিনের দারুন এক ব্যালেন্স থাকবে এতে। এভাবে রুটি ফোল্ড করে টিস্যু পেপার বা ফয়েল পেপারে মুড়িয়ে বক্সে নিলে অনেকক্ষণ ফ্রেশ থাকে। এই রুটি র্যাপের সাথে ফল, কিছু বাদাম অথবা চিজ কিউব করে নিতে পারো।
ওটস
ওটস কমবেশি আমরা অনেকেই ট্রাই করেছি। ফাইবার সমৃদ্ধ হওয়ায় দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে এবং এনার্জেটিক রাখে। ওটসের কয়েকটি স্বাস্থ্যকর আইডিয়া হতে পারে-
সবজি ওটস খিচুড়ি। পেঁয়াজ, টমেটো, গাজর, মটরশুঁটি, ক্যাপসিকাম সামান্য তেলে ভেজে নিয়ে তাতে ওটস যোগ করে রান্না করে নাও। স্বাদ বাড়াতে তাতে অল্প করে মশলা যেমন হলুদ, জিরা গুঁড়া, আদা ব্যবহার করতে পারো।
আরেকটা জনপ্রিয় আইডিয়া হলো ওভারনাইট ওটস। রাতে একটা জারে করে তাতে ওটস, দুধ বা টক দই, চিয়া সিডস, কিছুটা মধু মিশিয়ে ফ্রিজে রেখে দিতে হবে। সকালে ওটস ফুলে নরম হয়ে থাকবে। এরপর এতে বিভিন্ন ফল , বাদাম কিংবা ড্রাই ফ্রুটস দিয়ে লাঞ্চ বক্সে নিয়ে যেতে পারো।
ওটস আর ভেজানো ডাল একসাথে বেটে তাতে ধনেপাতা, মরিচ , লবন মিশিয়ে প্যানে অল্প তেলে প্যানকেকের মতো করে তৈরি করে নেয়া যেতে পারে।
হেলদি স্মুদি বানানো যায়। ওটসের সাথে কলা, দুধ বা দই, পিনাট বাটার একসাথে ব্লেন্ড করে বোতলে ভরে নিয়ে যেতে পারো। অফিসে ব্রেক টাইম কম থাকলে সেক্ষেত্রে এটি হবে চটজলদি হয়ে যাওয়ার মতো উপযোগী একটি আইটেম।
বেন্টো বক্স
অফিস লাঞ্চবক্স হিসেবে বেন্টো বক্স বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়। জাপানি সংস্কৃতির অনুসরণে এই বিশেষ বক্সে বিভিন্ন কম্পার্টমেন্টে খাবার সাজিয়ে নেয়া যায়। একই পাত্রে প্রোটিন হিসেবে গ্রিলড চিকেন, মাছ ফ্রাই কিংবা ডিম; কার্বোহাইড্রেট হিসেবে সামান্য ভাত, রুটি কিংবা নুডুলস; সিদ্ধ সবজি বা সালাদ ও সাইড আইটেম হিসেবে ফল রাখা সহজ হয়। এতে সুষম পুষ্টি নিশ্চিত হয়। এটি দুপুরের খাবার উপভোগ করার একটি মজাদার ও দৃষ্টিনন্দন উপায় হতে পারে।
সময় বাঁচানোর টিপস
* সারা সপ্তাহের মিল প্ল্যান করে রাখা
* লাঞ্চ তৈরিতে সময় বাঁচানোর জন্য ছুটির দিনে সবজি কেটে বক্সে রাখে দিতে পারো
* চিকেন বা মাছ ম্যারিনেট করে ফ্রিজে রাখতে পারো
* ঢাকনা যুক্ত ভালো মানের লাঞ্চ বক্স ব্যবহার করতে হবে
জীবনে ব্যস্ততা থাকবেই। তাই বলে কাজের দোহাই দিয়ে নিজের শরীরের সাথে কম্প্রোমাইজ করার কোন যুক্তিই নেই। কিছুটা পরিকল্পনা করে নিলে এমন শর্টকাটে পুষ্টিকর কিছু আইটেম সহজেই তৈরি করে নিতে পারবে। তো শুরু করে দাও এখনই।