ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত রাষ্ট্রনায়ক আব্রাহাম লিংকন-এর জীবন যেন প্রমাণ করে মানুষের ভাগ্য তার বর্তমান অবস্থায় লেখা থাকে না। দারিদ্র্য, শোক, ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক পরাজয় সবকিছুকে পেছনে ফেলে তিনি একদিন হয়ে উঠেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট।
দারিদ্র্যের মধ্যেই শৈশব:
১৮০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকিতে জন্মগ্রহণ করেন লিংকন। তাঁর পরিবার
ছিল অত্যন্ত দরিদ্র। ছোটবেলায় তাকে বিলাসিতা তো দূরের কথা, মৌলিক সুযোগ-সুবিধার জন্যও
সংগ্রাম করতে হয়েছে।
পরিবারের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করতে হয়েছে এবং ছোট বয়স থেকেই শারীরিক
পরিশ্রমের কাজে যুক্ত হতে হয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগও তার জীবনে খুব সীমিত ছিল। কিন্তু শেখার প্রতি
তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। সুযোগ পেলেই বই পড়তেন। অন্যের কাছ থেকে বই ধার করে পড়তেন এবং
নিজের জ্ঞান নিজেই বাড়াতেন।
একটার পর একটা ব্যর্থতা: প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে প্রবেশের পরও লিংকনের পথ সহজ হয়নি। ব্যবসা শুরু করে ব্যর্থ হন এবং আর্থিক সমস্যায় পড়েন। এরপর রাজনীতিতে প্রবেশের
চেষ্টা করেন। কিন্তু নির্বাচনে পরাজিত হন।
ব্যক্তিগত জীবনেও আসে গভীর আঘাত। তার ঘনিষ্ঠ একজন বন্ধুর মৃত্যু তাঁকে
ভীষণভাবে নাড়া দেয়। পরবর্তীতে প্রিয়জন হারানোর মতো আরও বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে
যেতে হয় তাকে। তবুও তিনি থামেননি।
ব্যর্থতার পর আবার চেষ্টা করেছেন, পরাজয়ের পর আবার দাড়িয়েছেন। আইন পড়েছেন,
নিজের যোগ্যতায় আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন এবং ধীরে ধীরে রাজনীতিতে নিজের অবস্থান
তৈরি করেছেন।
সবচেয়ে বড় সংগ্রাম দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখা: লিংকনের জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসে তিনি যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট
হন। তখন দেশ ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের মধ্যে প্রবেশ করে।
একদিকে ছিল দাসপ্রথা বিলুপ্তির প্রশ্ন, অন্যদিকে দেশ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা। হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু, রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং প্রচণ্ড চাপের মধ্যেও
লিংকন তাঁর অবস্থান থেকে সরে যাননি। তার নেতৃত্বে দাসপ্রথা বিলুপ্তির পথে ঐতিহাসিক
পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধ রাখার সংগ্রাম চালিয়ে যান তিনি।
জীবন থেকে যে শিক্ষা: আব্রাহাম লিংকনের জীবন আমাদের শেখায়, শুরুটা কঠিন হওয়া মানেই শেষটাও কঠিন
হবে এমন নয়।
দারিদ্র্য তাকে থামাতে পারেনি, শিক্ষার সীমাবদ্ধতা তাকে থামাতে পারেনি,
নির্বাচনে পরাজয় তাকে থামাতে পারেনি, ব্যক্তিগত শোক তাকে থামাতে পারেনি।
তার গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো জীবনে কতবার পড়ে গেলাম, সেটা নয় প্রতিবার
পড়ে যাওয়ার পর কতবার উঠে দাড়ালাম, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের জীবনে আমরা যখন একটি ব্যর্থতা, আর্থিক সংকট, সম্পর্কের কষ্ট কিংবা
কোনো সুযোগ হারিয়ে ভেঙে পড়ি, তখন লিংকনের জীবন মনে করিয়ে দিতে পারে একটি ব্যর্থ অধ্যায়
কখনোই পুরো জীবনের গল্প নয়।
ঢাকা/টিএ