মাত্র ১৬–১৭ বছর বয়স। সামনে তখন জীবনের অসংখ্য স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নের সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে ছিল নাচ। কিন্তু ১৯৮১ সালের একটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা আচমকাই বদলে দেয় তরুণী সুধা চন্দ্রনের জীবন। তামিলনাড়ুর ত্রিচির কাছে বাস দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিনি। পরে তাঁর ডান পায়ে গ্যাংগ্রিন দেখা দিলে শেষ পর্যন্ত পা কেটে ফেলতে হয়।
একজন তরুণ নৃত্যশিল্পীর কাছে এই পরিস্থিতি ছিল অকল্পনীয়। যে পায়ের ওপর ভর করে তিনি নাচতেন, সেই পা-ই আর নেই। নাচের মঞ্চে ফিরে যাওয়া তখন যেন অসম্ভব এক স্বপ্ন। কিন্তু সুধা স্বপ্নটিকে মরতে দেননি।
‘
আমি আবার নাচব’
পা হারানোর পর সুধা চন্দ্রন কৃত্রিম পায়ের সাহায্যে আবার হাঁটতে শেখার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ‘জয়পুর ফুট’—এক ধরনের কৃত্রিম অঙ্গ, যা তাঁকে শুধু হাঁটার সুযোগই দেয়নি, ধীরে ধীরে নাচের জগতেও ফিরিয়ে নিয়ে যায়। জয়পুরে চিকিৎসক ড. পি. কে. শেঠির সহায়তায় তিনি এই কৃত্রিম পা পান।
তবে কৃত্রিম পা পেলেই তো সবকিছু আগের মতো হয়ে যায় না। নতুন পায়ের সঙ্গে শরীরের ভারসাম্য মানিয়ে নেওয়া, হাঁটা শেখা, তারপর আবার ভরতনাট্যমের জটিল মুদ্রা ও পদক্ষেপ আয়ত্ত করা—প্রতিটি ধাপেই ছিল কঠিন অনুশীলন।
সুধা থামেননি।
দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রম ও অনুশীলনের মাধ্যমে তিনি আবার নাচের মঞ্চে ফেরেন। ১৯৮৪ সালে তাঁর নৃত্যে প্রত্যাবর্তন ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। সমকালীন প্রতিবেদনে তাঁর এই প্রত্যাবর্তনকে অসাধারণ সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।
নিজের গল্পেই সিনেমার নায়িকা
সুধার জীবনের এই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। তাঁর জীবনকাহিনি অবলম্বনে নির্মিত হয় তেলুগু চলচ্চিত্র Mayuri। ১৯৮৪ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটিতে সুধা নিজেই নিজের চরিত্রে অভিনয় করেন। ছবিটি তাঁর বাস্তব জীবনের দুর্ঘটনা, পা হারানো, কৃত্রিম পায়ের সাহায্যে আবার নাচ শেখা এবং মঞ্চে ফিরে আসার গল্প তুলে ধরে।
পরে ছবিটির হিন্দি সংস্করণ Naache Mayuri-ও নির্মিত হয়। ফলে সুধার গল্প আরও বড় পরিসরে মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
তবে সুধা চন্দ্রনের পরিচয় শুধু একজন দুর্ঘটনা থেকে ফিরে আসা নৃত্যশিল্পী হিসেবে থেমে থাকেনি। পরবর্তী সময়ে তিনি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনেও পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। তাঁর অভিনয়জীবনের পাশাপাশি নৃত্যশিল্পী হিসেবে তাঁর পরিচয়ও অটুট থাকে।
প্রতিবন্ধকতা নয়, সম্ভাবনার দিকে তাকানো
সুধা চন্দ্রনের জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক সম্ভবত এখানেই—একটি দুর্ঘটনা তাঁর শরীরের একটি অংশ কেড়ে নিয়েছিল, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন কেড়ে নিতে পারেনি।
জীবনে অনেক সময় এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সবকিছু শেষ। সুধার গল্প সেই ধারণাটিকেই প্রশ্ন করে। কারণ পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে, শরীর বদলে যেতে পারে, পথ কঠিন হয়ে যেতে পারে; কিন্তু মানুষের ইচ্ছা ও স্বপ্নের পথ সেখানেই শেষ হয়ে যায় না।
আজও সুধা চন্দ্রনের জীবনকাহিনি মনে করিয়ে দেয়, ফিরে আসার জন্য সবসময় আগের অবস্থায় ফিরে যেতে হয় না। কখনও কখনও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েই তৈরি করতে হয় নতুন পথ।
তিনি একটি পা হারিয়েছিলেন। কিন্তু নাচের প্রতি ভালোবাসা হারাননি। আর সেই ভালোবাসা, অধ্যবসায় ও দীর্ঘ অনুশীলনই তাঁকে আবার মঞ্চে ফিরিয়ে এনেছিল।