ক্যালেন্ডার বলছে, এখন সেপ্টেম্বর মাস। প্রকৃতিতে এখন একটু ঠান্ডা-একটু গরম আবহাওয়া। এই মাস আত্মহত্যা প্রতিরোধ সচেতনতা মাস। আত্মহত্যা নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করা, মানসিক সংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনের সময়ে সহায়তার পথ দেখানোই এ মাসের অন্যতম উদ্দেশ্য।
মনোবিদরা বলেন—একজন মানুষ যখন আত্মহত্যার কথা ভাবতে শুরু করেন, তখন তাঁর চিন্তা, অনুভূতি এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন হতে পারে। তাই বাইরে থেকে তাঁর আচরণকে বিচার করা বা ‘এটা শুধু attention seeking’ বলে উড়িয়ে দেওয়া বিপজ্জনক।
আত্মহত্যার চিন্তার পেছনে সবসময় মৃত্যুকে বেছে নেওয়ার সরল ইচ্ছা কাজ করে না। অনেক সময় মানুষ আসলে অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চান। দীর্ঘদিনের হতাশা, একাকিত্ব, সম্পর্কের সংকট, ব্যর্থতার অনুভূতি, শোক, সামাজিক চাপ কিংবা নিজেকে সবার কাছে বোঝা মনে হওয়ার মতো অভিজ্ঞতা একজন মানুষকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে পারে, যেখানে জীবনের অন্য সম্ভাবনাগুলো আর তাঁর কাছে দৃশ্যমান থাকে না।
তীব্র মানসিক কষ্টের সময় মস্তিষ্কের চিন্তার পরিসরও সংকুচিত হয়ে আসতে পারে। যে সমস্যার একাধিক সমাধান অন্য সময়ে সহজেই চোখে পড়ত, তখন সেটিকে মনে হতে পারে সম্পূর্ণ অচলাবস্থা। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদী হওয়ার ক্ষমতাও কমে যেতে পারে। ফলে মানুষটি হয়তো মনে করতে পারেন, তাঁর কষ্টের আর কোনো শেষ নেই। এ কারণেই আত্মহত্যার চিন্তাকে দুর্বলতা, নাটক কিংবা মনোযোগ পাওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখা উচিত নয়।
কথার পরিবর্তনেও থাকতে পারে সংকেত
মানসিক সংকটে থাকা কেউ সরাসরি নিজের অনুভূতির কথা নাও বলতে পারেন। তবে আচরণ কিংবা কথাবার্তায় কিছু পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। যেমন—হঠাৎ নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, বন্ধু-পরিবারের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া, অতিরিক্ত হতাশা প্রকাশ করা, ‘আমি আর পারছি না’, ‘আমাকে ছাড়া সবাই ভালো থাকবে’—এ ধরনের কথা বলা বা নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সম্পূর্ণ আশাহীন হয়ে পড়া। তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—কোনো একটি লক্ষণ দেখেই কারও আত্মহত্যার ঝুঁকি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। বরং আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন এবং গভীর মানসিক কষ্টের প্রকাশ দেখলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে কথা বলা প্রয়োজন।
কীভাবে পাশে দাঁড়াবেন?
মনোবিশেষজ্ঞদের মতে, সংকটে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলার সময় প্রথম কাজ হলো শোনা। তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে উপদেশ দেওয়া, বিচার করা কিংবা ‘এত ছোট ব্যাপার নিয়ে এত ভাবছ কেন’ বলা পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলতে পারে। বরং শান্তভাবে বলা যেতে পারে—‘তোমার কষ্টটা আমি বুঝতে চেষ্টা করতে চাই’, ‘তুমি চাইলে আমার সঙ্গে কথা বলতে পারো’ কিংবা ‘তুমি একা নও, আমরা তোমার পাশে আছি।’
আত্মহত্যার কথা বললে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া বা ভয় পেয়ে চুপ করে যাওয়ার বদলে সরাসরি তাঁর অনুভূতি সম্পর্কে জানতে চাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। সহমর্মিতা নিয়ে কথা বলা আত্মহত্যার চিন্তা তৈরি করে না; বরং একজন মানুষকে নিজের কষ্ট প্রকাশের সুযোগ দিতে পারে।
মনোবিশেষজ্ঞের পরামর্শ হলো, এমন পরিস্থিতিতে ব্যক্তিকে একা না রাখা, বিশ্বাসযোগ্য পরিবার বা বন্ধুকে যুক্ত করা এবং দ্রুত একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট বা উপযুক্ত মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া। যদি মনে হয় ব্যক্তি তাৎক্ষণিক বিপদের মধ্যে আছেন, তাঁকে একা না রেখে স্থানীয় জরুরি চিকিৎসাসেবা বা নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যোগাযোগ করা উচিত।
প্রতিরোধ শুরু হতে পারে একটি কথোপকথন থেকেই
আত্মহত্যা প্রতিরোধ শুধু চিকিৎসকের দায়িত্ব নয়। পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী—সবারই ভূমিকা আছে। অনেক সময় একজন মানুষের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে এমন একজন মানুষ, যিনি তাঁর পরিবর্তনটি লক্ষ্য করেছেন এবং বিচার না করে পাশে দাঁড়িয়েছেন।
তাই কারও আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখলে ‘ও এমনই’ বলে এড়িয়ে না গিয়ে একবার জিজ্ঞেস করা যেতে পারে—‘কেমন আছ? সত্যিই কেমন আছ?’
হয়তো সেই একটি প্রশ্নই কাউকে নিজের কষ্টের কথা বলার সাহস দেবে। আর সাহায্য চাওয়ার সেই সুযোগটিই হয়ে উঠতে পারে নতুন করে বেঁচে থাকার পথ খুঁজে পাওয়ার প্রথম ধাপ।