বাংলা সাহিত্যে নারী ঔপন্যাসিক: নারীচরিত্রের আত্মপ্রকাশ ও আত্মপরিচয়ের সংকট

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত
ফাল্গুনী তানিয়া

উনিশ শতকের শেষভাগে অবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশের নারীরা উপন্যাস রচনা শুরু করেন। আত্মপ্রকাশের তাগিদেই সংসার রক্ষা করে তাঁরা প্রথম কলম হাতে তুলে নিয়েছিলেন। ভার্জিনিয়া উলফ্ নারীর সাহিত্যকর্মের প্রধান অন্তরায় মনে করছিলেন আর্থিক সঙ্গতি ও নিজের ব্যক্তিগত একটি ঘরের অভাবকে। তাঁর A room of one’s own গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছিলেন ঔপন্যাসিক জেন অস্টেন কীভাবে পরিপার্শ্ব দ্বারা বাঁধাপ্রাপ্ত হয়ে তাঁর Pride and Prejudice (১৮১৩) উপন্যাসটি রচনা করেছিলেন। আমাদের নারী সাহিত্যিকগণ সাহিত্য রচনার প্রথম দিকে গৃহস্থালীর কাজকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে অবসর সময়ে সাহিত্যসৃষ্টি করেছেন। সুতরাং নারীলেখকদের দেখা সঙ্কীর্ন পৃথিবীই তাঁদের রচনাতে পরিস্ফুট হয়েছে। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সাহিত্য সমালোচনাতে সেটাকে নারীলেখকদের বৈশিষ্ট্য নয় বরং অদক্ষতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের প্রচলিত ধারায়ও নারী ঔপন্যাসিকগণ কখনো তাৎপর্যপূর্ণ অবস্থান লাভ করেনি। তাঁরা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সংযোজিত হয়েছেন স্ত্রী ঔপন্যাসিক, মহিলা ঔপন্যাসিক, অন্যান্য, অপরাপর ও কতিপয় হিসেবে।

এ বিষয়ে গবেষক সুতপা ভট্টাচার্যের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য :

উনিশ শতকে মেয়েদের লেখালেখির যে সূচনা হলো, বিশ শতকে তার ব্যাপ্তি ঘটল অনেক। যদিও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস লিখেছেন যাঁরা, তাঁরা এমন অনেকের নাম পর্যন্ত উল্লেখ করেননি, মেয়েদের আত্মপ্রকাশের ইতিহাসে যাঁরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়।

(সুতপা ভট্টাচার্য ২০০০: ১৩)

নারীলেখকদের লেখা বিবেচনার ক্ষেত্রে প্রাধান্য পেয়েছে তাঁদের পুরুষ অভিভাবকত্ব। অন্যের পরিচয়ে তাঁরা পরিচিত হয়েছেন। তাঁদের লেখাতে পুরুষ-লেখকদের ছাপ, অনুকরণ ও অনুসরণ প্রবৃত্তি খোঁজার প্রচেষ্টা হয়েছে। অথচ কোনো সাহিত্যিকই তাঁর প্রারম্ভিক রচনাতে স্বকীয়তা নিয়ে আবির্ভূত হন না। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখায় স্যার ওয়াল্টার স্কটের প্রভাব, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্রের প্রভাব কখনো নেতিবাচক দৃষ্টিতে বিশ্লেষিত হয়নি। কিš‘ নারী ঔপন্যাসিকদের লেখার ক্ষেত্রে ইতিবাচক বিশ্লেষণের অভাব অত্যন্ত প্রকট। মূলত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসবিদরা পুরুষ-পক্ষপাতিত্বের একটি ধারা তাঁদের আলোচনাতে অব্যাহত রেখেছেন। নারীর নিজস্ব অভিজ্ঞতা কিংবা অভিজ্ঞতাহীনতা, বোধ ও বোধি, পারিপার্শ্বিক সংকীর্ণ জগতবীক্ষণ কিছুই স্বতন্ত্র মাপকাঠি হিসেবে বিশ্লেষিত হয়নি। নারীলেখকগণ ঔপন্যাসিক হিসেবে পুরুষদের দলভুক্ত কখনো হতে পারেননি, এখানেও কাজ করেছে জেন্ডার বৈষম্য। 

স্বর্ণকুমারী দেবী (১৮৫৫-১৯৩২) আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিক। মাত্র আটাশ বছর বয়সে তিনি ভারতী সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেন।  বালক নামক কিশোর পত্রিকা প্রতিষ্ঠাও তাঁর উল্লেখযোগ্য কীর্তি। (সেলিনা হোসেন ও নূরুল ইসলাম ২০০৩ : ৪২৭)। বাঙালি মেয়েদের মধ্যে বিজ্ঞান আলোচনার সূত্রপাত করা, প্রথম অপেরা লেখা, বিধবা ও দরিদ্র নারীদের সাহায্যার্থে সখী সমিতি সংগঠন প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তাঁর নবকাহিনী (১৮৭৭) বাঙালি মহিলাদের লিখিত প্রথম ছোটগল্পের বই। স্বর্ণকুমারী দেবী রচিত প্রথম উপন্যাস দীপনির্বাণ (১৮৭৬)। তাঁর অন্যান্য উপন্যাস মেবার রাজ (১৮৭৭), ছিন্ন মুকুল (১৮৭৯), মালতী (১৮৮০), হুগলির ইমাম বাড়ি (১৮৮৮), বিদ্রোহ (১৮৯০), কাহাকে (১৮৯৮), বিচিত্রা (১৯২০), স্বপ্নবাণী (১৯২১) ও মিলনরাত্রি (১৯২৫)। ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণের ফলেই তাঁর এই সর্বব্যাপ্ত প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ পেয়েছিল বলে গবেষকদের ধারণা। অথচ এই নারী প্রতিভাকে ব্যক্তি পরিচয়ে পরিচিত না করে মুহম্মদ আব্দুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান রচিত বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (আধুনিক যুগ) গ্রšে’ স্বর্ণকুমারী দেবীর পরিচিতিতে তিনি যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠা ভগিনী এটিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। (মুহম্মদ আব্দুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান ১৩৮১ বঙ্গাব্দ : ৩০২)। কাজী দীন মুহম্মদ তাঁর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (৩য় খ-)-এ স্বর্ণকুমারী দেবীর আলোচনায় তাঁকে রবীন্দ্রনাথের অগ্রজা বলে পরিচয় দিয়েছেন। (কাজী দীন মুহম্মদ ১৯৬৮ : ২৪৬)।  যদিও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বেই তিনি উপন্যাস রচনা আরম্ভ করেছিলেন।

স্বর্ণকুমারী দেবী ১৩২১ বঙ্গাব্দে প্রবাসী পত্রিকার পাঠক-পাঠিকাদের বিচারে বঙ্গের শ্রেষ্ঠ লেখিকা হিসেবে কামিনী রায়ের সঙ্গে যুগ্মভাবে স্বীকৃতি লাভ করেন। (সুদক্ষিণা ঘোষ ২০০৮ : ৩৯)। তাঁর সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র। স্বর্ণকুমারী দেবীর প্রথম উপন্যাস দীপনির্বাণ প্রকাশিত হয় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬০) প্রকাশের মাত্র ১১ বছর পর। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর প্রথম উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কিংবা রমেশচন্দ্র দত্তের প্রভাব ছিল। স্বর্ণকুমারীর লেখা তাঁর অনুজের কাছে কীভাবে গৃহীত হয়েছিল সেটি কৌতূহলের বিষয়। গবেষক সুদক্ষিণা ঘোষের মতে অগ্রজার সাহিত্যসৃষ্টি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রশংসা অর্জন করতে পারেনি কখনো। ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে লেখা এই চিঠিটা ছাড়াও রোটেনস্টাইনকে এক তারিখবিহীন চিঠিতে তিনি লিখেছেন

She is one of those unfortunate beings who has more ambition than abilities. But just enough talent to keep her mediocrity alive for a short period. Her weakness has been taken advantage of buy some unscrupulous literary agents in london and she had stories translated and published. I have given her no encouragement but I have not been successful in making her see things in their proper light.  (চিত্রা দেবী ১৩৯০ বঙ্গাব্দ: ৪৮)

নারীশিক্ষার অগ্রদূত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০Ñ১৯৩২) ছিলেন স্বশিক্ষিত। কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প ও উপন্যাস সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্রেই রোকেয়ার সাবলীল পদাচারণা ঘটেছে। তিনি তাঁর রচিত সাহিত্যে নারীমুক্তির প্রতিবন্ধকতাসমূহ চিহ্নিত করেছেন এবং তা অতিক্রমের পথও তিনি সুস্পষ্টরূপে নির্দেশ করেছেন। রোকেয়া একই সাঙ্গে নারী-শিক্ষা, নারী-জাগরণ ও নারী-মুক্তির পক্ষে কাজ করেছেন। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন তাঁর উপন্যাস পদ্মরাগে (১৯২৪) স্বাধীনচেতা ব্যক্তিত্বময় সিদ্দিকা ওরফে পদ্মরাগ চরিত্রে নারীর আদর্শ রূপটিই ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘তারিণী ভবনে’ বসবাসকারী প্রতিটি নারীই ছিল পুরুষতন্ত্রের শিকার। সিদ্দিকা নিজেও নির্যাতিত নারীর প্রতীক। বিবাহ নামক পুরুষতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানটিকে সে অগ্রাহ্য করার দুঃসাহস দেখিয়েছে। নারীর সম্মানজনক অব¯’ানটি রক্ষা করা সিদ্দিকার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। তাই স্বামীর অন্যায় আচরণকে উপেক্ষা করে তার কাছে ফিরে যাওয়াকে সে তার নারীত্বের অপমান মনে করেছে। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন বিয়েকেই নারী জীবনের চরম লক্ষ্য মনে করেননি যা পুরুষতন্ত্রের মূলে কুঠারাঘাত করেছে।

অনুরূপা দেবী (১৮৮২-?) একাধারে কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সমাজসেবী ও নারী অধিকার কর্মী। তিনি ২৫টিরও বেশি উপন্যাস এবং বেশ কিছু ছোটগল্প লিখেছেন। তাঁর রচিত উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পোষ্যপুত্র (১৯১৫), জ্যোতিঃহারা (১৯১৫), মন্ত্রশক্তি (১৯১৫), মহানিশা (১৯১৯), মা (১৯২০) ইত্যাদি। উনিশ শতকে নারীকে শিক্ষিত করার জন্য নারী ঔপন্যাসিকরা উদারপন্থি’ মনোভাবের অনুসারী ছিলেন। কিš‘ নারী সম্পর্কিত একটি জনপ্রিয় ও সামাজিক পুরুষতান্ত্রিক ধারণাকে তাঁরা তাঁদের সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সেই ধারণাটি হচ্ছে নারী হবে স্বামীর প্রতি একনিষ্ঠ, সেবাময়ী, গৃহী ও সন্তান লালন-পালনকারী। অনুরূপা দেবীর সব উপন্যাসই এই পিতৃতান্ত্রিকতার ছকে বিন্যস্ত, জনপ্রিয় সামাজিক ধারার উপন্যাস। নারী আন্দোলনকারী অনুরূপা দেবী পুরুষ সাহিত্যিকদের নির্মিত ছকে আত্মপ্রতিষ্ঠা খুঁজেছিলেন। ঔপন্যাসিক নিরূপমা দেবীও (১৮৮৩-১৯৫১) এর ব্যতিক্রম নন। স্বামীর পদতলে নারীর চিরন্তন আশ্রয়- এই সনাতন ঐতিহ্যের বার্তা প্রদানকারী মন্ত্রশক্তি উপন্যাসটিতে অনুরূপা দেবী পুরুষতন্ত্রেরই জয়গান গেয়েছেন। তেমনি নিরূপমা দেবীর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলে খ্যাত দিদি উপন্যাসে সুরমাকে ঔপন্যাসিক দেবী থেকে দাসীতে পরিণত করেছেন। সমালোচক হুমায়ুন আজাদ এ উপন্যাস সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন:

নিরূপমা দেবীর ‘দিদি’ (১৯১৫) চেতনায় ও কাঠামোয় অনুরূপার মন্ত্রশক্তির সঙ্গে অভিন্ন, এতেও প্রচার করা হয়েছে পিতৃতন্ত্রের বিধান। অনুরূপা ও নিরুপমা দুইজনেই ব্যবহার করেছেন একই ছক, ‘মন্ত্রশক্তিতে’ বাণী সারা উপন্যাস জুড়ে নিজের দেহ রক্ষা করেছে স্বামীর কবল থেকে, শেষে আত্মসমর্পণ করেছে মৃত স্বামীর পায়ে; ‘দিদি’র সুরমাও স্বামীকে দেহ দেয়নি কিন্তু উপন্যাসের শেষ পাতায় আশ্রয় নিয়েছে স্বামীর পায়ে। তাদের উপন্যাসের প্রথম অধ্যায়গুলো নারীর জন্য প্রলোভন, মাঝের অধ্যায়গুলো নারীর বিরুদ্ধে চক্রান্ত, আর শেষ পৃষ্ঠাগুলো বিশ্বাসঘাতকতা। (হুমায়ুন আজাদ ১৯৯২ : ৩১১)

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রেরণাতেই সাহিত্যচর্চা করেছিল নিরূপমা দেবী। তাই শরৎচন্দ্রের প্রভাব তিনি এড়াতে পারেননি। (সুদক্ষিণা ঘোষ ২০০৮ : ৩১)। মূলত তাঁর রচিত সব উপন্যাসেই তিনি পুরুষতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছক অনুসরণ করেছেন।

শৈলবালা ঘোষজায়া একাধারে (১৮৯০-?) ঔপন্যাসিক ও গল্পকার। তাঁর রচিত প্রথম উপন্যাস শেখ আন্দু (১৩২৪ বঙ্গাব্দ)। এই উপন্যাসের বিষয়ব¯‘র অভিনবত্ব যেমন প্রশংসনীয় তেমনি আরো একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। পুরুষ-ঔপন্যাসিকরা নারীদের গৃহবন্দি জীবনকে নারীর সৃষ্টিশীল কাজের অন্তরায় মনে করেছিলেন। শেখ আন্দু উপন্যাসে লেখকের বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কিত জ্ঞান ও উপলব্ধি এবং বিভিন্ন স্থানের ভৌগোলিক বিবরণ তাঁর বিস্তৃত মেধা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিচয়বাহী। সুকুমার সেন তাঁর বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস পঞ্চম খ-ে শৈলবালা ঘোষজায়া সম্পর্কে লিখেছেন, ‘শৈলবালা তাঁহার প্রথম সম্পূর্ণ প্রকাশিত উপন্যাস শেখ আন্দুর (১৯১৭) প্লটে একটু বিশেষরকম স্বাধীনতা ও সাহসিকতা দেখাইয়াছিলেন।’ (সুকুমার সেন ১৯৯৯ : ২৩৪)। শৈলবালার বহু পূর্বেই হিন্দু- মুসলমান প্রণয় কাহিনি উপজীব্য করে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর প্রথম উপন্যাস রচনা করেছিলেন। কিন্তু শৈলবালা নারী-লেখক বলে এই রকম প্লট নির্বাচনকে সাহসিকতার দৃষ্টিতে দেখেছেন সমালোচক। শ্রী শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত বঙ্গ সাহিত্যে উপন্যাসের ধারা গ্রন্থে শৈলবালা ঘোষজায়া ও প্রভাবতী দেবী সরস্বতী সম্পর্কে তিনি বলেছেন :

প্রভাবতী দেবী সরস্বতী ও শৈলবালা ঘোষজায়া অনেকগুলি উপন্যাস রচনা করিয়াছেন। কিš‘ ইঁহাদের মধ্যে নতুন ধারা প্রবর্তনের বিশেষ কোন পরিচয় পাওয়া যায় না। মোটের উপর ইহারা সকলেই কম-বেশি পুরাতন আদর্শ ও সমাজব্যবস্থার প্রতি সহানুভূতি সম্পন্না ও এই আদর্শ সংঘর্ষের যুগে পুরাতনেরই পোষকতা করেন।

(শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৭৬ : ৪৯৩) 

অবিবেচক ও উৎপীড়ক স্বামী আর উৎপীড়িত স্ত্রী-শৈলবালা ঘোষজায়ার অধিকাংশ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট এই। তবে পিতৃতন্ত্রের দিকে সুষ্পষ্ট অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন তিনি। কন্যাদায় এড়াতে, স্বর্গপ্রাপ্তির লোভে পিতাও যে কন্যার জীবনে আদর্শের স্থানটি ধরে রাখতে অক্ষম, তিনি সেটা স্বচ্ছ যুক্তিতে দেখিয়ে দিয়েছেন। মাতৃত্বের ঐতিহ্যকে স্বীকার করেও তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন তিনি। তাই জন্ম-অভিশপ্তা উপন্যাসে নায়িকা অত্যাচারী স্বামীর সন্তান গর্ভে ধারণ করে শিউরে উঠেছে। সমসাময়িক বিবেচনা অনুযায়ী শৈলবালা ঘোষজায়ার উপন্যাস নিঃসন্দেহে অত্যন্ত আধুনিক তবে লিঙ্গীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তাকে লেখক হিসেবে সমালোচকরা স্বীকৃতি দেননি। 

শান্তা দেবী (১৮৯৪-১৯৮৪) ও সীতা দেবী (১৮৯৫-১৯৭৪) দুই বোনই জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক ছিলেন। শিক্ষিত নারীর স্বাধীন জীবনযাপনের চিত্র তাঁরা যেমনভাবে এঁকেছেন তৎকালীন সমাজ-ব্যবস্থায় নারীর প্রকৃত চিত্র তেমন ছিল না। কিন্তু ব্রাহ্মসমাজের উদার আদর্শে বেড়ে ওঠার কারণে হিন্দু সমাজের চিরন্তন আচার-রীতি-সংস্কার তাঁদের লেখার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠেনি। সীতা দেবী ও শান্তা দেবী তাঁদের উপন্যাসে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর মেয়েদের কথা বলেছেন। এই নারীদের চেতনার জগৎ স্বাভাবিকভাবেই স্বতন্ত্র। আকাক্সিক্ষত পুরুষের অনুসন্ধানে তারা উদ্যোগী হয়, তাকে না পেলে তারা জীবনকে অর্থহীন মনে করে না বরং নতুন কাউকে জীবনে জড়িয়ে সুখী হয়। নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত তারা নিজেরাই নেয়। প্রবঞ্চিত হলে সমাজের ভয়ে মুখ লুকিয়ে বসে থাকে না তারা বরং প্রতিবাদ করে।

গিরিবালা দেবী (১৮৯১-১৯৮৩) অনুরূপা দেবী কিংবা নিরূপমা দেবীর মতই ছকবাঁধা ঔপন্যাসিক। সব মিলিয়ে তিনি কুড়িটি উপন্যাস ও দুই হাজারের বেশি ছোট গল্প লিখেছেন। (সৈয়দা নাজনীন আখতার ২০০৮ : ৪৬৬)। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস রূপহীনা (১৯৪৫), রায়বাড়ি (১৯৭৪) ইত্যাদি। সামাজিক সংস্কার ও ঐতিহ্যের কাছে তাঁর নায়িকারা সবসময় পরাস্ত হয়েছে। স্বামী তাদের কাছে জীবন্ত দেবতা তাই তাদের পায়ে লুটিয়ে তাদের কাছে মাথা নত করে তাদেরকে পূজনীয় করে তুলেছে। হিন্দুর মেয়ে উপন্যাসে হিন্দুধর্মের সংস্কারকে সর্বস্ব করা হয়েছে। স্ত্রী বর্তমান থাকা সত্ত্বেও কলেজের প্রতিষ্ঠাতার সুন্দরী কন্যা মুকুলের প্রতি অসীমের মনে ভালোবাসার জন্ম হয়। নায়িকা সুব্রতার কাছে স্বামীর এই স্খলন বা পতন বিশেষ কোনো ঘটনা নয়। সতী নারীর কাছে স্বামীর অন্য নারীতে আসক্তি তাদের সম্পর্কে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় না। স্বামী যাই করুক তা অধর্ম নয়- হিন্দুনারীর এই সংস্কারের জয়জয়কার ঘোষিত হয়েছে মুকুল চরিত্রটির মধ্যে। পাঁচ বছর বয়সে মুকুলের বিবাহ হয় এবং বৈধব্য ঘটে। গুরুতর অসুখে সে স্মৃতি ভ্রষ্ট হয়েছিল। ফলে কুমারীর মত বেড়ে ওঠে সে। সে বিবাহিত এই তথ্য জানার পর তার হিন্দুত্বের সংস্কার এত প্রবল হয়ে ওঠে যে সে পুনঃবিবাহের প্রসঙ্গ উঠলে নিজেকে অপবিত্র মনে করেছে। অসীমের প্রতি প্রেম দৃষ্টির বদলে ভ্রাতৃভাব ফুটে ওঠে। যে বিবাহ সম্পর্কে তার কোনো স্মৃতি নেই, সেই বিবাহের তথ্যটুকু আঁকড়ে ধরে সারাজীবন বৈধব্য ব্রত পালন করার দৃঢ়তা দেখিয়েছে মুকুল। লেখক ঐ উপন্যাসে সতী নারীর পতিব্রতার চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন। মুকুটমনি উপন্যাসে লেখক বহু বিবাহ, কৌলিন্যপ্রথা সবকিছুর স্বীকৃতি দিয়েছেন। স্বামী তাদের কাছে জীবন্ত দেবতা তাই তাদের পায়ে লুটিয়ে তাদের কাছে মাথা নত করে তাদেরকে পূজনীয় করে তুলেছে। হিন্দুর মেয়ে উপন্যাসে হিন্দুধর্মের সংস্কারকে সর্বস্ব করা হয়েছে। মূলত, গিরিবালা দেবী পিতৃতন্ত্রের বিধানকে সর্বস্ব দিয়ে আঁকড়ে ধরেছেন তাঁর উপন্যাসে। তাঁর সৃষ্ট নারীচরিত্রের কাছে স্বামী চির আরাধ্য, নিষ্কলঙ্ক ও সর্বদা পূজনীয়। বিবাহও তাঁর নায়িকাদের কাছে জন্ম-জন্মান্তরের বন্ধন হিসেবে পরিগণিত হয়েছে, তাকে অস্বীকার করা তাই তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।

১৩৩৮ বঙ্গাব্দে বিচিত্রা পত্রিকায় আমোদিনী ঘোষের ফস্কা গেরো উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়। এ উপন্যাসে অসম বয়সের বিয়ে প্রসঙ্গে নারী ঔপন্যাসিকের কলমে রচিত হয়েছে ভিন্ন বাস্তবতা। ফস্কা গেরো উপন্যাসে বৃদ্ধ মুরারীবাবু তার নাতনীর সমান বয়সী চন্দ্রলেখাকে বিয়ে করে আনে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রজনী উপন্যাসে লবঙ্গলতা এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেবদাসে পার্বতী দেবদাসের প্রণয়ী ছিল। কিš‘ উভয়েই বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা, হিসেবে নিজেদের অব¯’ানে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছিল। চন্দ্রলেখার কোনো প্রণয়ী নেই, স্বামীর ভ্রাতুষ্পুত্র অনিলকে দেখে তার মনে কামনার বহ্নিশিখা জ্বলেছে। বাবার বয়সী এক জনকে স্বামী হিসেবে মেনে নিয়ে অনিলকে সে সন্তানবৎ মনে করতে পারেনি। পার্বতীর মতো স্বপত্নী পুত্র ও কন্যাদের ‘ছোট মা’ সে হতে পারেনি। 

পুরুষ ঔপন্যাসিকরা নারীচরিত্রের মনে স্বামীত্বের সংস্কার এমন প্রবলভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন যে তাদের ব্যক্তিগত আকাক্সক্ষা কখনোই মুখ খোলেনি। কিš‘ আমোদিনী ঘোষের ফস্কা গেরো উপন্যাসে অব¯’ার পরিপ্রেক্ষিতে যে কিশোরী মেয়েটি বৃদ্ধ স্বামীর ঘর করতে আসে তার শরীর ও মনে প্রতিবাদ জমা হয়েছে। সুখহীন, বিস্বাদ জীবনকে বয়ে নিয়ে চলতে ই”ছুক ছিল না চন্দ্রলেখা। স্বামীর ও সমাজের বজ্র আঁটুনির প্রতিবাদে বৈধব্যের বেশ পরে সে আত্মহত্যা করেছে। সাদা শাড়ি ও সিঁথি দিয়ে সে ব্যঙ্গ করেছে আচার সর্ব¯’ বিবাহ-প্রথাকে। বিবাহের রঙ তার জীবনকে রঙিন করে তুলতে পারেনি তাই বিধবার সঙ্গে সে তার প্রভেদ খুঁজে পায়নি।

বিবাহ প্রথাটাকে ব্যঙ্গ করেছেন আমোদিনী ঘোষ তাঁর দীপের দাহ (১৯০৪) উপন্যাসেও। অনুরূপা দেবী তাঁর মন্ত্রশক্তি উপন্যাসে দেখিয়েছিলেন বেদমন্ত্রের প্রভাবে কীভাবে বাণী মৃত্যুশয্যায় তার স্বামীকে মৃত্যুমুখ থেকে ফিরিয়ে আনতে ব্রতী হয়েছিল। অথচ সে স্বামীর সঙ্গে কোনো দাম্পত্য সম্পর্ক তার ছিল না। কিন্তু আমোদিনীর নায়িকা বিবাহ অনুষ্ঠান, মন্ত্র-চিহ্নিত স্বামী সবকিছুকে অস্বীকার করেছে। সুপ্রিয়ার প্রেমিক কঙ্কের অভিন্ন হৃদয় বন্ধু মতিলালের সঙ্গে সুপ্রিয়ার বিবাহ হয়। বিবাহ-বিদ্বেষী মতিলাল সুপ্রিয়াকে কঙ্কের ঘরে দিয়ে আসে। সুপ্রিয়া বিবাহমন্ত্র নয়, বিবেচনা করেছে হৃদয়ের একনিষ্ঠতাকে। এই বিবেচনা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের চন্দ্রশেখর উপন্যাসে শৈবালিনী চরিত্রটির মনে কার্যকরী থাকলে প্রতাপের প্রতি প্রণয়ভাবের জন্য শৈবালিনীর  ভিতর পাপবোধ থাকার কথা নয়। চন্দ্রশেখর তার স্বামী, তবু প্রতাপকে সে ভুলতে পারে না এজন্য শৈবালিনী মানসিকভাবে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে। আমোদিনী ঘোষের মতে, প্রকৃত পাপতো এটাই যাকে হৃদয়ে ধারণ করা হয়নি তাকে শরীরের অধিকার সমর্পন করা। তাই সুপ্রিয়া দ্বিধাহীন চিত্তে কঙ্ককে স্বামীত্বে বরণ করে স্বামীত্বের এক নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছে। কঙ্ক ও সুপ্রিয়ার মাতাল প্রেম মতিলালকেও উন্মাদ করলে সুপ্রিয়ার উপর অধিকার প্রয়োগ করতে চায় সে। কিš‘ সুপ্রিয়া অমিত তেজে তাকে প্রতিহত করেছে। দুঃসাহসী এই নারী তার আর কঙ্কের ভালোবাসার সন্তান গর্ভে ধারণ করেছে। সুপ্রিয়া সমাজের কাছে নতি স্বীকার করেনি। সমাজের চোখে সুপ্রিয়া যত অন্যায়ই করুক বিবাহের মন্ত্র সুপ্রিয়ার কাছে হৃদয়ের একনিষ্ঠতা এবং এটাই তার কাছে প্রকৃত সতীত্ব।

আশালতা সিংহের গল্প ও উপন্যাস উনিশ শতকের ত্রিশের দশকে সকলকে বিস্মিত করেছিল। সাহিত্য জীবনে খ্যাতি ও অখ্যাতি দুটোই পেয়েছিলেন আধুনিক ও অ-নারীসুলভ মনোভঙ্গির জন্য। আশালতা সিংহের রচিত উপন্যাসগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, অমিতার প্রেম, দুই নারী (১৯৩৪), অন্তর্যামী (১৯৩৫), বিয়ের পরে (১৯৩৬), কলেজের মেয়ে (১৯৩৮), একাকী (১৯৪০) ইত্যাদি। আশালতা সিংহের প্রথম উপন্যাস অমিতার প্রেম সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘কোনো পুরুষ যদি এই গল্প লিখত, তাহলে আমি চোখ বুজে বলতুম, যে স্ত্রী চরিত্র জানে না।’ (অনিন্দিতা দেবী ১৯৯৭ : ৫৯)।  তবে লেখার এই ধারা তিনি বজায় রাখতে পারেননি। তাঁর ব্যক্তিজীবন সাহিত্যকেও প্রভাবিত করেছে । শেষ জীবনে তিনি সন্ন্যাসিনীর জীবন বেছে নিয়েছিলেন। পুরুষতন্ত্রকেও তিনি জপ করেছেন এবং তাঁর লেখাতে তিনি ক্রমশ সেই ছকের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন। এমনকি তাঁর কলেজের মেয়ে উপন্যাসে শিক্ষা সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাবও প্রকাশিত হয়েছে।

আশাপূর্ণা দেবী (১৯০৯-১৯৯৫) তাঁর তিয়াত্তর বছরের দীর্ঘ সাহিত্যিক জীবনে তিনি ১৭৬টি উপন্যাস, ৩০টি গল্প সংকলন, ৪৭টি ছোটদের বই লিখেছেন। (সৈয়দা নাজনীন আখতার ২০০৬ : ১৯৬)। আশাপূর্ণা দেবীর সর্বাধিক জনপ্রিয় ও আলোচিত ত্রয়ী উপন্যাস, প্রথম প্রতিশ্রুতি (১৯৬৫), সুবর্ণলতা (১৯৬৬) ও বকুলকথা (১৯৮৭)। অগ্নিপরীক্ষা উপন্যাসে আশাপূর্ণা দেবী পিতৃতান্ত্রিকতার ছক অনুসরণ করে সাত পাকে বাঁধা বৈবাহিক বন্ধন ও হিন্দু-সংস্কারের জয়ধ্বজা উড়িয়েছেন। তবে তাঁর ত্রয়ী উপন্যাসেই মূলত তিনি নিজ ধারায় ফিরে এসেছেন। তিনি নিজেও এ সম্পর্কে বলেছেন, ‘তিন যুগের প্রেক্ষাপটে আঁকা এই তিন কন্যার ছবিই আমার এই সাহিত্য জীবনের প্রধান ফসল।’ (আশাপূর্ণা দেবী ১৩৮২ : ২১)। আশাপূর্ণা দেবী নারীর যথার্থ সামাজিক ছবিটি তাঁর উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। একজন নারীর এগিয়ে যাবার পথের প্রতিবন্ধকতাগুলো তিনি তাঁর সৃষ্ট নারীচরিত্রের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন। এছাড়া নারীর লেখক হবার পিছনে সামাজিক যে বাঁধাগুলো কাজ করে তার স্ব”ছ চিত্র আশাপূর্ণা দেবী তাঁর সুবর্ণলতা ও বকুলকথা উপন্যাসে তুলে ধরেছেন যা এই প্রবন্ধের প্রথমে আলোচিত হয়েছে।

নীলিমা ইব্রাহিমের (১৯২১-২০০২) উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে বিশ শতকের মেয়ে (১৯৫৮), এক পথ দুই বাঁক (১৯৫৮), পথশ্রান্ত (১৯৫৮), কেয়াবন সঞ্চারিনী (১৯৬২), বহ্নি বলয় (১৯৮৫), জ্যোতির্ময় (১৯৯১) ইত্যাদি। বিশ শতকের মেয়ে উপন্যাসে নীলিমা ইব্রাহিম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া কয়েকটি নারীচরিত্রের মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন সর্বো”চ বিদ্যাপীঠে অধ্যয়ন করেও এদের অনেকে সংকীর্ণ মানসিকতার অধিকারী। নারী-পুরুষ বন্ধুত্বে এদের অনেকেরই আস্থা নেই। তবে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই উপন্যাসের নারীরা পুরুষকে তাদের জীবনে অপরিহার্য মনে করেনি। এক পথ দুই বাঁক উপন্যাসে নারীর মাতৃত্বকেই মহিমান্বিত করা হয়েছে। তাই আত্মপরায়ণ পলি চরিত্রটি নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপিত হয়েছে। বিপরীতে লিলি সৎমা হয়েও পলির সন্তান শাহেদকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকার শক্তি সঞ্চয় করেছে। পথশ্রান্ত উপন্যাসে ঔপন্যাসিক নারীর অর্থলিপ্সু রূপটিকে ডলি চরিত্রের মাধ্যমে রূপায়ণ করেছেন। নারীর কোমল, গৃহরক্ষয়িত্রী, সেবাপরায়ণতার রূপটি প্রাধান্য পেয়েছে রাশেদা, রমি ইত্যাদি চরিত্রের মধ্য দিয়ে। নীলিমা ইব্রাহিমের উপন্যাসগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তাঁর উপন্যাসে সমাজে নারীদের প্রকৃত অবস্থানটি চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে তিনিও অনেক ক্ষেত্রে সমাজনির্মিত ভালো ও খারাপ নারীর বিভাজনকে অনুসরণ করেছেন।

রাবেয়া খাতুন (১৯৩৫) তাঁর প্রথম উপন্যাস মধুমতি প্রকাশিত হয় ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে। প্রায় চল্লিশটির মত উপন্যাস লিখেছেন তিনি। উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে, মধুমতি (১৯৬৩), মন এক শ্বেত কপোতী (১৯৬৫), অনন্ত অন্বেষা (১৯৬৭), রাজাবাগ শালিমারবাগ (১৯৬৭), সাহেব বাজার (১৯৬৭), ফেরারী সূর্য (১৯৭৫), বায়ান্ন গলির এক গলি (১৯৮৪) ইত্যাদি। ১৯৪০ পরবর্তী সময়ের ঢাকা শহরের একটি অঞ্চল সাহেব বাজারের সংস্কৃতি, ব্যক্তি মানুষের সুখ-দুঃখময় জীবন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাপ, রায়ট ও মানুষের জীবনের রদবদলের এক নিবিড় আখ্যান রাবেয়া খাতুনের সাহেব বাজার উপন্যাসটি। এ উপন্যাসের বিশিষ্টতা এখানে যে, এ উপন্যাসের নারীচরিত্রগুলো গৃহস্থালী প্রত্যয়টির কেন্দ্রে অবস্থান করছে। গোলসানুর মা চরিত্রটি তার স্বামী পঙ্গু হবার পর পিঠা বিক্রি করে সংসারের খরচ চালিয়েছে। কুলসুম বিবির স্বামী উপার্জনে অক্ষম। দুটি কন্যা সন্তানের অন্নসংস্থানের ব্যবস্থার ভার তাকেই কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে। হাওয়ার মা নিঃসন্তান তাই স্বামী তাকে পরিত্যাগ করেছে। মেসের ‘ঝি’-এর কাজ করে সে জীবন-নির্বাহ করেছে। খোদেজা স্বামীর মৃত্যুর পর মোয়া বিক্রি করে, দোকান পরিচালনা করে, মহল্লার মেয়েদের আরবি পড়িয়ে সন্তানের পড়াশুনার খরচ বহন করেছে। এছাড়া, সাহেব বাজারের মেয়েরা স্বাধীন জীবীকার জন্য বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করেছে। কমলার মা ফেরি করে চুড়ি বিক্রি করে, ফুলজান ঘুগনী বিক্রি করে। সাহেব বাজারের নারীরা বেঁচে থাকার প্রয়োজনে চুরি করে, ঝগড়া করে আবার কারো বিপদে একত্রিত হতেও দ্বিধাবোধ করে না। পুরুষদের কাছে এই নারীর কদর গৃহের সৌন্দর্যবর্ধণ আর বংশের উত্তরাধিকারী জন্মদানের জন্য। আয়রা ও পায়রা, জোবেদা, মনাক্কা এই নারীচরিত্ররা পুরুষ নারীকে কত নির্মমভাবে নির্যাতন করতে পারে তার উদাহরণ। জোবেদা চরিত্রটি নিজের অত্যাচারিত নারীজীবনের পরিসমাপ্তি টেনেছে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে। কিš‘ আয়রা স্বামীর নির্যাতনের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং স্বামীহন্তারক হয়েছে। যে নারী খবরের কাগজ পড়তে পারে না, যে নারী খবরের কাগজে ছবি হয়ে আসে, সেও যে খবর সৃষ্টি করতে পারে আয়রা চরিত্রটি তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একজন নারীর সাহসী আচরণের ধারাবাহিকতায় একুশ বছর পর সাহেব বাজারে দেখা যায় নারী স্কুলের একটি বড় বাস। নারীর অবস্থার পরিবর্তনের জন্য ঔপন্যাসিক শিক্ষাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছেন। 

সুদূর অতীতে জঙ্গলাকীর্ণ রাজাবাগ অঞ্চলটি কীভাবে নারীর ছোঁয়ায় বসবাস উপযোগী হয়ে উঠেছে তারই ভাষ্য রচিত হয়েছে রাজাবাগ শালিমারবাগ উপন্যাসের ‘রাজাবাগ’ আখ্যানটিতে। রাবেয়া খাতুন এই উপন্যাসে রুহির সমস্যা সমাধানের জন্য তার নিজস্ব উপার্জনের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। রুহি মেয়েদের স্কুলে শিক্ষকতা করে সংসারে আর্থিক স্বা”ছন্দ্য আনার চিন্তা করেছে। আর্থিক দিক থেকে সাবলম্বী হবার সঙ্গে সঙ্গে পত্রিকাতে নিজের লেখা প্রকাশ হওয়ায় সে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। ‘শালিমারবাগ’ আখ্যানটিতে নারীর জীবনযুদ্ধের অন্য একটি রূপ চিত্রিত হয়েছে। শরমিনের বাবার মৃত্যুর পর শরমিনের মা ও তার খালার প্রচেষ্টায় পুরুষবিহীন সংসারটি সচল থেকেছে। রাবেয়া খাতুন এই নারীচরিত্রদুটিকে বলেছেন, স্বাবলম্বী নারীর যুগ প্রতীক। পুরুষের মত এই নারীরা শুধু উপার্জন করাকেই তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য ভাবেনি বরং তারা ঘর ও বাহির অভ্যস্ত হাতে সামলিয়েছে।

রাজিয়া খান (১৯৩৬-২০১১) একাধারে ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও কবি। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তাঁর উপন্যাস অনুকল্প প্রকাশিত হয়। আঠারো বছর বয়সে তিনি রচনা করেন বটতলার উপন্যাস (১৯৫৮)। তাঁর রচিত অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে, প্রতিচিত্র (১৯৭৫), চিত্রকাব্য (১৯৮০), হে মহাজীবন (১৯৮৩), দ্রৌপদী (১৯৯২), পদাতিক (১৯৯৬) ইত্যাদি। প্রাকরণিক দক্ষতা, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, বিষয়ব¯‘র বৈচিত্র্য ইত্যাদি কারণে বাংলা সাহিত্যে রাজিয়া খান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঔপন্যাসিক। প্রথম উপন্যাস দুটিতেই তাঁর স্বাতন্ত্র্য নিশ্চিত হয়ে যায়। মানুষের অন্তর্গত জৈব চাহিদার মত একটি স্পর্শকাতর বা নিষিদ্ধ বিষয়কে তিনি উপন্যাসের বিষয়বস্তু করেছিলেন। নারীলেখকদের জন্য নির্ধারিত লক্ষণরেখা অতিক্রম করে ভার্জিনিয়া উলফ তাঁর সময়ে বেশ কষ্ট করেই নিজস্ব লিখনশৈলী গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর সমসাময়িক পুরুষ লেখক বিশেষ করে ডি.এইচ. লরেন্স (১৮৮৫-১৯৩০) যৌনতা ও নারীশরীর নিয়ে যেভাবে লিখেছেন নারী-লেখকরা একই সময়ে সেসব নিয়ে কথা বলেছেন চুপিসারে। (অংশুমান কর ২০০৮ : ৬০১-৬০২)। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে পুরুষের প্রতি নারীর রূপতৃষ্ণা ও অজাচার সম্পর্কিত ট্যাবুকে প্রথম রাজিয়া খান ভেঙ্গে দিয়েছেন। রাজিয়া খান নারী ঔপন্যাসিকদের মধ্যে উপন্যাসের প্রকরণগত বিষয়ে যেমন দক্ষতা দেখিয়েছেন, তেমনি জটিল মনোজগতের রহস্য উন্মোচন করতেও তিনি ব্রতী হয়েছেন। এক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ উভয়ের বিচিত্র মনোবৃত্তিই তিনি অনুসন্ধান করেছেন। লক্ষযোগ্য, নারীর প্রকৃত আকাক্সক্ষার স্বরূপটি কেমন তা প্রথম বাংলাদেশের সাহিত্যে সুস্পষ্টরূপে দেখিয়েছেন রাজিয়া খান। পুরুষ ঔপন্যাসিক নারীর যে স্টেরিওটাইপ নির্মাণ করেছিলেন সাহিত্যে সেই প্রথাগত ছকের একেবারে বিপরীত চরিত্র সুমিতা ও রেনু। 

দিলারা হাশেম (১৯৩৬) গল্পসমগ্র, কাব্যসংকলন ও উপন্যাস মিলিয়ে দিলারা হাশেমের গ্রস্থ সংখ্যা প্রায় ত্রিশটি। ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে দিলারা হাশেমের প্রথম উপন্যাস ঘর মন জানালা প্রকাশিত হয়। নাজমা, আসমা ও সালমা তিনজন নারীকে কেন্দ্র করে ঘর মন জানালা উপন্যাসের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে। অসুস্থ পিতার কারণে অল্প বয়সেই পড়াশুনা বাদ দিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে হয়েছে নাজমাকে। এই উপন্যাসের সব নারী চরিত্রই জীবনের টানাপড়েনে ক্ষয়িত, বঞ্চিত ও হতাশাগ্রস্থ। নাজমা নারী বলেই কর্মক্ষেত্রে নানা প্রলোভন এড়িয়ে তাকে কাজ করতে হয়, আবার তার অর্থের উপর নির্ভরশীল বলে তার বাবা-মা আত্মগ্লানিতে ভোগে । ছেলে সন্তান ও মেয়ে সন্তানের প্রভেদ এভাবেই ঔপন্যাসিক চিহ্নিত করেছেন। ‘মাতৃত্ব’ এই উপন্যাসে দু’জন নারীকে কঠিন সমস্যার মুখোমুখি করেছে। আসমা আখতারের সন্তানকে গর্ভে ধারণ করে বাধ্য হয়ে মালেককে জীবনসঙ্গী করেছে। নাজমা বোনের সম্মান রক্ষা করার জন্য নিজের প্রেমকে বিসর্জন দিয়েছে। আলোচ্য উপন্যাসেও রাজিয়া খানের বটতলার উপন্যাস ও অনুকল্পের মত কেন্দ্রীয় চরিত্র নাজমা পরিবারের জন্য নিজের ই”ছার বিরুদ্ধে অন্যের মন জুগিয়ে চলতে গিয়ে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। একজন নারী সামাজিকভাবেই নিজেকে বঞ্চিত করার শিক্ষা নিয়ে বেড়ে ওঠে। এর ফলেই নারীকে বাধ্য হয়ে জীবনের করুণ পরিণতি মেনে নিতে হয়। নাজমা কিংবা আসমা দুটি নারীচরিত্রই পুরুষতন্ত্রের যাঁতাকলে পিষ্ট।

বাংলাদেশের নারী ঔপন্যাসিকদের লেখাতে তিনটি স্তর পাওয়া সম্ভব। প্রথম স্তরে নারী-লেখকরা পুরুষ লেখকদের লেখার অক্ষম অনুকরণ করেছেন। পুরুষের তৈরি সামাজিক নিয়ম ও নিষেধের বেড়াজালে আবদ্ধ এই সময়ের সাহিত্যিকদের নারীচরিত্রগুলো। দ্বিতীয় পর্যায়ের নারী-লেখকরা প্রতিবাদী হয়ে উঠেছেন। তৃতীয় পর্যায় নারীলেখকদের পূর্ণতা প্রাপ্তির সময়। এই সময়ের লেখকরা নারীত্বের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচনে সচেষ্ট হয়ে উঠেছেন। বিষয়বস্তর সঙ্গে সঙ্গে এই সময়ের নারী ঔপন্যাসিকেরা প্রকরণগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নারীত্বের নতুন সংজ্ঞার্থ নির্ণয়ে উৎসাহী হয়েছেন। বাংলার নারীলেখকদের উপন্যাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একদল নারী ঔপন্যাসিক পুরুষ লেখকদের প্রতিষ্ঠিত ছক থেকে বের হয়ে আসতে পারেননি, অন্যদল নিজের ভিতরে প্রতিরোধ শক্তি গড়ে তুলেছে। প্রথম দলটি নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের চাইতে পুরুষতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধকে আঁকড়ে ধরেছেন। অনেকের মধ্যে দ্বৈত কণ্ঠস্বরও পাওয়া সম্ভব। তাই কোনো সময়ের ধারাবাহিকতা দিয়ে বাংলার নারীলেখকদের লেখার গতি-প্রকৃতি নির্ণয় করা সম্ভব নয়। স্বর্ণকুমারী দেবী ও রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সৃষ্ট নারীচরিত্ররা সময়ের চাইতে প্রাগ্রসর। রোকেয়ার পরে উপন্যাস রচনা করেও অনুরূপা দেবী, নিরুপমা দেবী, গিরিবালা দেবী পুরুষতন্ত্রের ছকের বাইরে বের হতে পারেননি। বিপরীতে, শৈলবালা ঘোষজায়া, আমোদিনী ঘোষ, আশাপূর্ণা দেবী এমন নারীচরিত্রকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যারা প্রচলিত সমাজরীতিকে অগ্রাহ্য করেছে, মাথা উঁচু করে বাঁচতে চেয়েছে, সমাজের সঙ্গে দ্বন্দ্বে একা যুদ্ধ করেছে অথবা প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। ১৯৪৭-১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত নারীর জীবনের সমস্যার চারিত্র্য শুধু দাম্পত্য বা প্রণয়কেন্দ্রিক থাকেনি। নারীর উপন্যাসেও রাষ্ট্রীয় অভিঘাত ছাপ ফেলেছে, একই সঙ্গে তাঁরা ঘর ও বাইরের দ্বন্দ্বকে উপজীব্য করেছে। বাংলাদেশের নারী ঔপন্যাসিকরা কর্মজীবী নারীদের সংগ্রাম ও সমাজের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের চিত্র এঁকেছেন তাঁদের উপন্যাসে। এই নারীচরিত্ররা সামাজিক নিয়মের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে কখনো কখনো মানসিক বৈকল্যের শিকার হয়েছে, কখনো পরিবার থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে নিজেকে। বিষয় ও প্রকরণ উভয় দিক থেকেই এই সময়ের নারীলেখকরা তাঁদের উপন্যাসে একটি স্বতন্ত্র রূপ তৈরিতে সমর্থ হয়েছেন। 

 

তথ্যসূত্র: 

অনিন্দিতা দেবী (১৯৯৭), ‘নারী-প্রতিভা’, অনিন্দিতা দেবীর রচনা সংকলন, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা


আশফাক উল আলম, সেলিনা হোসেন ও অন্যান্য (সম্পাদিত), বাংলা একাডেমী লেখক অভিধান, বাংলা একাডেমী, ঢাকা


আশাপূর্ণা দেবী (১৩৮২ বঙ্গাব্দ), খেলা থেকে লেখা, দেশ, সম্পাদকের নামবিহীন, সাহিত্য সংখ্যা 


আব্দুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান (১৩৮১ বঙ্গাব্দ), বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, বইঘর, চট্টগ্রাম 


কাজী দীন মুহম্মদ (১৯৬৮), বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (৩য় খণ্ড), স্টুডেন্ট ওয়েজ, ঢাকা

চিত্রা দেবী (১৩৯০ বঙ্গাব্দ), ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা 

সুকুমার সেন (১৯৯৯), বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস (পঞ্চম খণ্ড-: ১৮৯১-১৯৪১), আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা 


সুতপা ভট্টাচার্য (২০০০), মেয়েলী পাঠ, পুস্তক বিপণি, কলকাতা


সুমনা দাস সুর (২০০৮), ‘অবরোধবাসিনী থেকে সবলা: নারী ঔপন্যাসিকের চোখে নারীর আত্মপরিচয়ের সন্ধান, নারীবিশ্ব, (সম্পাদক: পুলক চন্দ), কলকাতা সুদক্ষিণা ঘোষ (২০০৮), মেয়েদের উপন্যাসে মেয়েদের কথা, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা


সৈয়দা নাজনীন আখতার (২০০৬), ‘অনুরূপা দেবী’, ‘গিরিবালা দেবী’ জেন্ডার বিশ্বকোষ [অ-ন], (সম্পাদক : সেলিনা হোসেন, বিশ্বজিৎ ঘোষ ও মাসুদুজ্জামান), ফারিয়া লারা ফাউন্ডেশন ও মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা


(২০০৬), ‘শান্তা দেবী’, জেন্ডার বিশ্বকোষ [প-হ], (সম্পাদক : সেলিনা হোসেন, বিশ্বজিৎ ঘোষ ও মাসুদুজ্জামান), ফারিয়া লারা ফাউন্ডেশন ও মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা


হুমায়ুন আজাদ (১৯৯৩), ‘উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্য’, বাংলাদেশের ইতিহাস (৩য় খণ্ড), এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা ১৯৯৩ (১৯৯৯), নারী, আগামী, ঢাকা।

 

sidebar ad