লিঙ্গসমতার পথে বড় একটি বাধা এখনো বেতন বৈষম্য। সমান বা সমমূল্যের কাজ করেও অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় কম আয় করেন নারীরা। বাংলাদেশেও নারীরা আয় এবং তুলনামূলক ভালো বেতনের কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছেন। এই বৈষম্যের মাত্রা কতটা এবং এর পেছনে কী কী কারণ কাজ করছে—তা বোঝা কার্যকর নীতি প্রণয়ন এবং সমমূল্যের কাজের জন্য সমান পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর উদ্যোগে প্রকাশিত ‘Gender Pay Gap in Bangladesh: Trends, Causes and Policy Options’ শীর্ষক গবেষণায় বাংলাদেশে নারী ও পুরুষের বেতন বৈষম্যের চিত্র, কারণ এবং সম্ভাব্য নীতিগত পদক্ষেপ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটিতে বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপের (Labour Force Survey) পরিমাণগত তথ্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মতামত এবং বিভিন্ন নীতির বিশ্লেষণ ব্যবহার করা হয়েছে।
কতটা কম আয় করেন নারীরা?
গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—বাংলাদেশে নারীদের মাসিক আয় পুরুষদের তুলনায় প্রায় ২২ থেকে ২৫ শতাংশ কম। প্রায় সব খাত ও পেশাতেই কোনো না কোনো মাত্রায় এই বেতন ব্যবধান দেখা যায়।
গবেষণায় শুধু নারী ও পুরুষের আয়ের পার্থক্য তুলে ধরা হয়নি; বরং এই ব্যবধানের কোন অংশ বিভিন্ন পরিমাপযোগ্য কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় এবং কোন অংশের ব্যাখ্যা সহজে পাওয়া যায় না—সেটিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিভিন্ন খাত, পেশা এবং শ্রমিকদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বেতন বৈষম্য কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তা-ও গবেষণায় দেখা হয়েছে।
বৈষম্যের পেছনে যেসব কারণ
গবেষণায় দেখা যায়, নারীদের বেতন বৈষম্যের পেছনে কিছু কাঠামোগত কারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মধ্যে অন্যতম হলো নারীদের তুলনামূলক কম বেতনের কাজ ও পেশায় বেশি কেন্দ্রীভূত থাকা। একই সঙ্গে পরিবারের যত্ন, সন্তান লালন-পালন ও গৃহস্থালির দায়িত্বও নারীদের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়ে। এসব দায়িত্ব নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ, কাজের ধরন নির্বাচন, কর্মঘণ্টা এবং ভালো বেতনের চাকরিতে টিকে থাকার সুযোগকে প্রভাবিত করতে পারে।
অর্থাৎ, শুধু কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বেতনের পার্থক্য দেখলেই পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না। নারীরা কোন ধরনের কাজে প্রবেশ করছেন, তাঁদের ওপর পারিবারিক দায়িত্ব কতটা, এবং ভালো বেতনের কাজের সুযোগ তাঁরা কতটা পাচ্ছেন—এসব বিষয়ও বেতন বৈষম্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
আইন ও নীতির পর্যালোচনা
গবেষণায় বাংলাদেশে লিঙ্গসমতা ও সমমূল্যের কাজের জন্য সমান পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিগত কাঠামোও পর্যালোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
গবেষণার তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে একটি Research Advisory Group (RAG) সহযোগিতা করেছে। এতে সরকারের প্রতিনিধি, শ্রমিক ও মালিকপক্ষের সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অংশীজন ছিলেন। বিভিন্ন পর্যায়ের পরামর্শ ও ত্রিপক্ষীয় যাচাইয়ের মাধ্যমে গবেষণার ফলাফল ও সুপারিশগুলোতে বাংলাদেশের সামাজিক অংশীদারদের দৃষ্টিভঙ্গি অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন?
বেতন বৈষম্য কমাতে গবেষণায় সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
সমমূল্যের কাজের জন্য সমান পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার আইন ও নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন;
বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করা;
শ্রম আইন ও মজুরি-সংক্রান্ত নিয়মকানুনের বাস্তবায়ন ও নজরদারি জোরদার করা;
সন্তান লালন-পালন ও পরিবারের যত্নের দায়িত্ব সামলাতে নারীদের সহায়তা বাড়ানো;
নারীদের কর্মসংস্থানে প্রবেশের পথে থাকা বিভিন্ন বাধা কমানো;
নারী-পুরুষের বেতন বৈষম্য নিয়ে সরকার, মালিক ও শ্রমিকপক্ষের মধ্যে আরও কার্যকর সামাজিক সংলাপ তৈরি করা।
গবেষণাটির লক্ষ্য হলো বাংলাদেশে তথ্য ও প্রমাণভিত্তিক, জেন্ডার-সংবেদনশীল মজুরি নীতি প্রণয়নে সহায়তা করা। একই সঙ্গে এমন একটি শ্রমবাজার গড়ে তোলার পথ দেখানো, যেখানে নারী ও পুরুষের জন্য কর্মসংস্থান ও পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি হয়।
নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা শুধু একটি ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই বেতন বৈষম্যের কারণগুলো চিহ্নিত করে তা কমানোর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া নারীর কর্মজীবন ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: আইএলও