নারী যতখানি এগিয়েছে সমাজ সেই তালে এগোয়নি : নূরজাহান বেগম

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬

নারী যতখানি এগিয়েছে সমাজ সেই তালে এগোয়নি : নূরজাহান বেগম
উপমহাদেশে বাঙালি মুসলিম নারীদের প্রথম পত্রিকা বেগম-এর সম্পাদক নূরজাহান বেগম। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে তিনি নারী-লেখকদের উদ্বুদ্ধ ও সংগঠিত করেছিলেন। রোদসীর সঙ্গে ঘরোয়া আড্ডায় নূরজাহান বেগম অকপটে প্রকাশ করলেন নিজের জীবনের অনেক কথা। জানালেন সমাজ নিয়ে তাঁর ভাবনা। তুলে ধরলেন নারী অগ্রগতির মন্ত্রণা। সদ্য ৯০-এ পা দিলেন তিনি। এখনও ভাবেন দেশ, জাতি ও নারী সমাজের উন্নতি নিয়ে। শরীর দুর্বল। নানা নিয়মকানুন মেনে প্রতিদিনের বাঁধা জীবন। তবু রোদসীর প্রথম আড্ডায় সর্বজন শ্রদ্ধেয় নূরজাহান বেগম কথা বললেন প্রাণ খুলে। আর রোদসী অকপটে স্বীকার করে, আজকের সে-ই বেগম-এর উত্তরসূরি। আজ রোদসী এসেছে সেই সুমহান ঐতিহ্যের পথ নয়। বেগম সম্পাদক নূরজাহান বেগম-এর মুখোমুখি হলেন রোদসী সম্পাদক সাবিনা ইয়াসমিন। অগ্রজ ও অনুজের কথামালা তাহলে হোক শুরু।


রোদসী : শুরু থেকেই শুরু করি। কীভাবে শুরু হলো আপনার সাংবাদিকতা জীবন? 

নূরজাহান বেগম : বাবার কাজ দেখে দেখেই তো বেডে উঠেছি। সেই ছোটবেলা থেকেই বাবাব পত্রিকায় টুকটাক সাহায্য করতাম। তোমরা তো জানো, আমার বাবা মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন ছিলেন সওগাত পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। বাবাও আমাকে অনুপ্রাণিত করতেন। একটু বড় হয়ে, ১৯৪০ সাল থেকে আমি সওগাত পত্রিকায় কাজ শুরু করি পুরোদমে। পরে বাবার উদ্যোগে নারীদের সাপ্তাহিক পত্রিকা বেগম প্রকাশিত হয়। সেই থেকে বেগম নিয়েই সারাটা জীবন আছি। তখন ছিলাম কলকাতায়। পরে ঢাকায় এসেও বেগম প্রকাশনার কাজ নিয়মিত করেছি।


রোদসী : আপনাদের সময়টা তো অনেক কঠিন ছিল, রক্ষণশীল ছিল। তা কাজ করতে গিয়ে কোনো প্রতিবন্ধকতা আসেনি সামনে?

নূরজাহান বেগম : সে তো অনেক কথা। আমি ঠিক প্রতিবন্ধকতা বলব না, যেকোনো কাজ করতে গেলে সমস্যা আসেই। সেটা স্বাভাবিক শুধু নারী কেন, পুরুষকেও সমস্যা মোকাবিলা করেই এগোতে হয়। বাবা সওগাত পত্রিকার নারীসংখ্যা প্রকাশ করতে শুরু করেছিলেন ১৯২৯ সাল থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত বছরে একটি করে নারীসংখ্যা করতেন সওগাত-এর। তখন সমাজ খুব রক্ষণশীল। ফলে লেখা এবং ছবি সংগ্রহ করতে হতো বাড়ি বাড়ি গিয়ে। এসব কাজে আমিও যুক্ত হলাম বাবার সঙ্গে।  ছিলেন কবি সুফিয়া কামালও। একসময় বাবা বললেন, এভাবে বছরে সওগাত-এর একটি নারীসংখ্যা প্রকাশ করে নারীদের উন্নতি হবে না। নারীদের জন্য আলাদা একটি নিয়মিত পত্রিকা দরকার।
বাবার উদ্যোগেই ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই কলকাতা থেকে প্রচ্ছদে নারীদের ছবিই প্রকাশ করা হবে। প্রথম সংখ্যায় বেগম রোকেয়ার ছবি ছাপা হয়েছিল। শুরুতে বেগম-এর প্রধান সম্পাদক ছিলেন সুফিয়া কামাল, আমি ছিলাম ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। তবে শুরু থেকেই সব কাজ আমি করতাম। কয়েক মাস পর আমি সম্পাদক হই। সেই সময় নারীদের লেখা ও ছবি সংগ্রহ করা অত সহজ কাজ ছিল না। নারী-লেখকের সংখ্যা ছিলও হাতে গোনা। এরই মধ্যে ১৯৪৮ সালে 'ঈদসংখ্যা বেগম' প্রকাশিত হয়। এটি নারীদের বাংলা পত্রিকার প্রথম একটি ঈদসংখ্যা। ১৯৫০ সালে আমরা ঢাকায় চলে আসি পাকাপাকিভাবে। এরপর ঢাকা থেকেই বেগম পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে। নারীদের সংগঠিত করার জন্য বেগম ক্লাব প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৯৫৪ সালে। এই ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হলেন বেগম শামসুন নাহার মাহমুদ আর আমি সেক্রেটারি। খুব সুন্দরভাবেই চলছিল কাবের কার্যক্রম। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ক্লাবের সদস্যদের যুদ্ধে রাজনৈতিক মতভেদের কারণে তিকতা শুরু হলে ক্লাবের কার্যক্রম বন্ধ করে দিই।


রোদসী : এসবই এখন ইতিহাস। অহংকার করার মতো উজ্জ্বল ইতিহাস। আচ্ছা, সেই সময়ের নারী ও এই সময়ের নারীদের জীবনে কতটা পরিবর্তন এসেছে বলে আপনার মনে হয়?

নূরজাহান বেগম : পরিবর্তন তো অনেক হয়েছেই। তবে শিক্ষায়, ধ্যান-ধারণায়, কাজে-কর্মে নারীরা যতখানি এগিয়েছে, সমাজ কিন্তু সেই তালে এগোয়নি। সামাজিক নানা বিপত্তির কারণে এখনো মেয়েদের অনেক প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এগোতে হচ্ছে।


রোদসী : এই এত বছর পরও ঘরের কাজ আর সন্তান লালন-পালনই নারীর একমাত্র কাজ হিসেবে দেখা হয়, একে কি আপনি নারীর অগ্রগতিতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা বলবেন?

নূরজাহান বেগম : এসব কথা বলে নারীদের আটকানো যাবে না। নারী-পুরুষ সমান তালে না এগোলে সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের যথাযথ উন্নয়ন হবে না। আগের যুগেও এসব বলে নারীদের দমন করতে পারেনি কেউ, এখন তো পারবেই না। প্রগতিশীলতার কথা বললেই কাউকে নাস্তিক বলা হবে, তা তো ঠিক নয়। একটি গোষ্ঠী নারীদের অন্যায়ভাবে দমন করতে চায়। তবে সবাই এখন অনেক সচেতন। এখন নারীর অগ্রগতির সঙ্গেই তাল মেলাতে হবে। প্রগতির পথেই চলতে হবে।


রোদসী : তার পরও নারীর অগ্রগতিতে এ সময় বড় বাধা কী বলে মনে করেন আপনি?

নূরজাহান বেগম : অজ্ঞতা সমাজ থেকে, পরিবার থেকে অজ্ঞতা দূর করতে হবে। নারীদেরও শিক্ষা-দীক্ষায়-যোগ্যতায় প্রস্তুত হতে হবে। তাহলে অন্যায়ভাবে নারীদের কেউ দমিয়ে রাখার সাহস পাবে না। এখন অনেক এগিয়েছে নারীরা। তবে এটাই যথেষ্ট নয়। এখনো চারদিকে অনেক সমস্যা। সেসব সমাধানে সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।


রোদসী : আপনার জীবন তো সংগ্রামের জীবন। অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতি ঠেলে এগোতে হয়েছে আপনাকে এবং আপনার সময়কার নারীদের। তো আপনার জীবনের একটি সুখের ঘটনা বলুন। 

নূরজাহান বেগম : আমার তো সবটাই সুখের। দুঃখের কিছু নেই। সারা জীবন কাজ করেছি, অর্জনও কম নয়। কোনো কিছু নিয়েই দুঃখ করি না আমি। এখন বয়স হয়েছে, আগের মতো কাজ করতে পারি না। আমার মেয়েরাই বেগম পত্রিকার হাল ধরেছে এখন। তারা যদি পারে, ভালোভাবে এগিয়ে নেবে একে। দুই মেয়ে, জামাতা, নাতি-নাতনি নিয়ে আমার সুখের সংসার। শুধু শরীরটা ভালো না। রোগব্যাধি বাসা বেঁধেছে। বয়স হয়েছে, আর কত? এখন তো ওপারের ডাকের অপেক্ষায় আছি। ডাক এলেই চলে যেতে হবে।


রোদসী : আপনার সুস্থ ও সুন্দর দীর্ঘ জীবন কামনা করি। আর আনন্দের সঙ্গে আপনাকে জানাতে চাই, আপনারা যেখানে শুরু করেছিলেন, সেই ঐতিহ্যের পথ ধরে আমাদের 'রোদসী' আসছে। আমাদের এ পথচলায় আপনার আশীর্বাদ চাই।

নূরজাহান বেগম : অনেক দোয়া রইল। আশা করি, প্রশংসনীয় কিছু কাজ করবে। কাজ করতে গেলে বাধা-বিপত্তি আসবে, তবে থামা যাবে না। এগিয়ে যেতে হবে। শক্ত হাতে হাল ধরতে হবে। মেয়েদের পাশে দাঁড়াও, তুলে ধরো তাদের কীর্তি আর সাফল্যগাথা। মনে রেখো, সামগ্রিকভাবে সব মেয়ের উন্নতি না হলে, এক-দুজনের উন্নতিতে কিছু হবে না। সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে। আমার আশীর্বাদ, এগিয়ে চলুক রোদসী।


সংক্ষিপ্ত জীবনী : বাঙালি নারী সাংবাদিকদের অগ্রপথিক নূরজাহান বেগম। জন্ম ১৯২৫ সালের ৪ জুন, চাঁদপুরের চালিতাতলী গ্রামে। মাসিক সওগাত পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, সর্বজন শ্রদ্ধেয় মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিনের সুযোগ্য কন্যা তিনি। মায়ের নাম ফাতেমা খাতুন। ১৯৪২ সালে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন নূরজাহান বেগম। ১৯৪৬ সালে লেডি ব্রেবোর্ন থেকে বিএ পাস করেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি কলেজে সব রকম সৃজনশীল কাজে অংশগ্রহণ করে কৃতিত্বের পরিচয় দেন। ১৯৫২ সালে রোকনুজ্জামান খানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন নাসরীন ইয়াসমি সালে তিনি শ্রে লাভ করেন। বাংলা একাডেমির ফেলো সম্মানে ভূষিত হন ২০০৫ সালে। এ ছাড়া পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার।


টিএ

sidebar ad