ইসমাত জাহান একজন গবেষক। কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড পলিমার সায়েন্সে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো স্টেট ইউনিভার্সিটি-তে পিএইচডি গবেষক হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র পলিমার কম্পোজিটস, সেমিকন্ডাক্টর ম্যাটেরিয়ালস, ডেনসিটি ফাংশনাল থিওরি (ডিএফটি), ইলেকট্রনিক স্ট্রাকচার, ডাইইলেকট্রিক প্রপার্টিজ এবং অ্যাডভান্সড ম্যাটেরিয়ালস ডিজাইন। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, তিনি এমন নতুন উপকরণ ও প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন, যা ভবিষ্যতের ইলেকট্রনিক্স, জ্বালানি ও আধুনিক শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইতোমধ্যেই তাঁর একাধিক গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। আরও কয়েকটি গবেষণা প্রকাশের অপেক্ষায়। গবেষণায় কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ইসমাত জাহান অর্জন করেছেন স্প্রিং ২০২৬ গ্র্যাজুয়েট এক্সেলেন্স অ্যাওয়ার্ড, যা আউটস্ট্যান্ডিং একাডেমিক পারফরম্যান্সের জন্য প্রদান করা হয়। পাশাপাশি নিউ মেক্সিকো স্টেট ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত অ্যাডভান্সড ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ সিম্পোজিয়াম-এ এক্সেলেন্ট প্রেজেন্টেশনের জন্য প্রথম পুরস্কার অর্জন করেছেন। তাঁর কাছে সাফল্যের সংজ্ঞা ভিন্ন। ইসমাত জাহান বিশ্বাস করেন, জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো ট্রফি, পদক বা সনদ নয়; বরং প্রতিকূলতার মুখেও স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার সাহস। তাঁর জীবনের দর্শন এক বাক্যেই ধরা পড়ে—‘নেভার গিভ আপ’। রোদসীর সঙ্গে একান্ত আলাপে উঠে এসেছে ইসমাত জাহানের জীবনের গল্প। সাক্ষাৎকার গ্রহণে স্বরলিপি।
রোদসী: যতটুকু জানি, আপনি একজন সিঙ্গেল মাদার। আপনার সন্তান মাইল্ড অটিজমে আক্রান্ত। সন্তানকে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছেন। আপনার অতীতের গল্প রোদসীর পাঠকদের উদ্দেশে একটু বলবেন?
ইসমাত জাহান: আমার বিয়ে হয়েছিল যখন আমার বয়স ২৬ বছর। এটি ছিল পরিবারের পছন্দে হওয়া একটি অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ। অনেক স্বপ্ন নিয়ে নতুন জীবন শুরু করেছিলাম। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝতে পারি, সম্পর্কটি সুস্থ ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে ফিজিক্যাল ও ইমোশনাল অ্যাবিউজ এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে আমাকে।
তারপরও আমি সম্পর্কটিকে বাঁচিয়ে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। এই কঠিন সময়ের মধ্যেই আমি মা হই। আমার ছেলের জন্মের পর আমার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে তার ভবিষ্যৎ। পরে জানতে পারি, আমার সাবেক স্বামী গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। এরপর তিনি আমাকে একটি ডিভোর্স নোটিশ পাঠান। অনেকেই জানতে চান, বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত প্রথমে কে নিয়েছিল।
সত্যি বলতে, আমি কখনো সংসার ভাঙতে চাইনি। শেষ পর্যন্ত সম্পর্কটিকে সম্মান, ধৈর্য ও আন্তরিকতার সঙ্গে ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু একটি সম্পর্কে যখন রেসপেক্ট, ট্রাস্ট, অনেস্টি এবং সেফটি—অর্থাৎ পারস্পরিক সম্মান, বিশ্বাস, সততা ও নিরাপত্তা—থাকে না, তখন সেই সম্পর্ককে জোর করে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না।
আজ আমি অতীত নিয়ে কোনো ক্ষোভ পোষণ করি না। কারণ আমি বিশ্বাস করি, ‘পেইন চেঞ্জেস পিপল, বাট ফেইথ ট্রান্সফর্মস দেম’—অর্থাৎ কষ্ট মানুষকে বদলে দেয়, কিন্তু বিশ্বাস মানুষকে নতুনভাবে গড়ে তোলে।
আমার অতীত আমাকে ভেঙে দেয়নি; বরং আরও শক্তিশালী করেছে। তাই আমি সবার উদ্দেশে শুধু একটি কথাই বলতে চাই—কোনো মানুষ, কোনো সম্পর্ক কিংবা কোনো ব্যর্থতা আপনার জীবনের শেষ পরিচয় হতে পারে না। নিজের শিক্ষা, দক্ষতা ও আত্মসম্মানকে কখনো হারিয়ে ফেলবেন না। আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখুন, কঠোর পরিশ্রম করুন এবং কখনো নিজের স্বপ্ন ছেড়ে দেবেন না।
জীবন থেকেই শিখেছি, ‘ইওর পাস্ট ইজ আ চ্যাপ্টার, নট দ্য টাইটেল অব ইওর লাইফ’—আপনার অতীত জীবনের একটি অধ্যায়, পুরো জীবনের শিরোনাম নয়।
আর আমার সবচেয়ে প্রিয় লাইন হলো, ‘সাকসেস ইজ দ্য বেস্ট রেসপন্স টু এভরি হার্ডশিপ’—প্রতিটি কঠিন সময়ের সবচেয়ে সুন্দর জবাব হলো সাফল্য।
রোদসী: সংসার ভাঙার পরে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছেন কীভাবে?
ইসমাত জাহান: নিজেকে গুছিয়ে নেওয়া কোনো একদিনের কাজ ছিল না। প্রতিদিন নিজেকে একটু একটু করে পরিবর্তন করেছি। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আমার অতীত আমার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না। আমি পড়াশোনায় মন দিয়েছি, গবেষণায় নিজেকে ব্যস্ত রেখেছি, নতুন দক্ষতা অর্জন করেছি এবং সবচেয়ে বড় কথা, নিজের আত্মবিশ্বাসকে আবার গড়ে তুলেছি।
প্রতিদিন নিজের কাছে একটি প্রশ্ন করতাম—“হোয়াট ক্যান আই ডু টুডে টু বিকাম আ বেটার ভার্সন অব মাইসেলফ?” অর্থাৎ, ‘আজ আমি নিজেকে আরও ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে কী করতে পারি?’
আমার ছেলে ছিল আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। আমি জানতাম, আমি যদি হেরে যাই, তাহলে সেও হেরে যাবে। তাই আমি কখনো হার মানিনি।
রোদসী: জীবন আপনার কাছে কী?
ইসমাত জাহান: আমার কাছে জীবন মানে শুধু সফল হওয়া নয়। জীবন মানে গ্রোথ, রেজিলিয়েন্স, পেশেন্স অ্যান্ড পারপাস—অর্থাৎ বিকাশ, প্রতিকূলতা মোকাবিলার শক্তি, ধৈর্য এবং জীবনের লক্ষ্য।
জীবন আমাদের বারবার পরীক্ষা নেয়। প্রশ্ন হলো—আপনি ভেঙে পড়বেন, নাকি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবেন? আমি দ্বিতীয়টিকেই বেছে নিয়েছি।
আমি বিশ্বাস করি, “এভরি সেটব্যাক ইজ আ সেটআপ ফর আ গ্রেটার কামব্যাক”—অর্থাৎ প্রতিটি ব্যর্থতা বা বাধাই আরও বড় সাফল্যের জন্য নতুন প্রস্তুতি।
রোদসী: ভবিষ্যতে কী করতে চান?
ইসমাত জাহান: আমার স্বপ্ন শুধু একজন সফল গবেষক হওয়া নয়। আমি এমন গবেষণা করতে চাই, যা বাস্তব জীবনে মানুষের উপকারে আসে। আমি একাডেমিয়ায় শিক্ষকতা করতে চাই, আন্তর্জাতিক গবেষণায় নেতৃত্ব দিতে চাই এবং নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানী তৈরি করতে চাই।
বিশেষ করে আমি নারী গবেষক, সিঙ্গেল মাদার এবং সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করতে চাই। আমি চাই, তারা বুঝুক—“ইওর কনডিশনস ডু নট ডিফাইন ইওর ডেস্টিনেশন”—অর্থাৎ আপনার পরিস্থিতি আপনার গন্তব্য নির্ধারণ করে না।
রোদসী: আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কী? প্রত্যাশা কী?
ইসমাত জাহান: আমার ছেলে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। সে মাইল্ড অটিজম-এর মধ্যে রয়েছে। অনেকে অটিজমকে সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখেন, কিন্তু আমি কখনো সেভাবে দেখিনি। আমি দেখেছি তার অসাধারণ মেধা ও সম্ভাবনা।
বিশেষ করে কোডিং এবং টেকনোলজি-র প্রতি তার আগ্রহ আমাকে সবসময় মুগ্ধ করে। বিবাহবিচ্ছেদের পর একজন সিঙ্গেল মাদার হিসেবে তার চিকিৎসা, শিক্ষা, মানসিক বিকাশ এবং নিজের গবেষণা—সবকিছু একসঙ্গে সামলানো সহজ ছিল না।
অনেক রাত কেঁদেছি। আবার পরের দিন হাসিমুখে ল্যাবে গিয়েছি। কারণ আমি জানতাম—“হি ইজ ওয়াচিং মি”—সে আমাকে দেখছে। আমি যদি হেরে যাই, তাহলে সেও একদিন হার মানতে শিখবে।
আলহামদুলিল্লাহ, গত মাসে সে নিউ মেক্সিকো ইন্টার-স্কুল কোডিং কম্পিটিশন-এ (New Mexico Inter-School Coding Competition) ফার্স্ট প্লেস অর্জন করেছে। সেদিন আমার মনে হয়েছে, আমার সব কষ্ট সার্থক হয়েছে।
আমার একটি স্বপ্ন আছে। আমি চাই না মানুষ আমাকে শুধু আমার পরিচয়ে চিনুক। আমি চাই, একদিন মানুষ বলুক—“শি ইজ দ্য মাদার অব দ্যাট ব্রিলিয়ান্ট ইয়াং ম্যান”—তিনি সেই মেধাবী তরুণের মা। আমার সবচেয়ে বড় পরিচয় হবে আমার সন্তানের চরিত্র, মানবিকতা এবং সাফল্য।