উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—একটি ‘উইনিং টিম’ তৈরি করা

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

একজন উদ্যোক্তার স্বপ্ন সাধারণত শুরু হয় একা। মাথায় থাকে একটি আইডিয়া, চোখে থাকে ভবিষ্যতের ছবি, আর মনে থাকে নিজের কিছু করে দেখানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু ব্যবসা যখন একটু একটু করে বড় হতে থাকে, তখন উদ্যোক্তা বুঝতে পারেন—একটি ভালো আইডিয়া দিয়ে প্রতিষ্ঠান শুরু করা যায়, কিন্তু সেটিকে বড় ও টেকসই করতে প্রয়োজন একটি ভালো দল।


সেখানেই আসে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—‘উইনিং টিম’ বা সফল দল তৈরি করা।


একটি প্রতিষ্ঠানে অনেক দক্ষ মানুষ থাকলেই যে দলটি সফল হবে, এমন নয়। গুগলের ‘প্রজেক্ট অ্যারিস্টটল’ গবেষণায় ১৮০টির বেশি দলের কার্যপ্রণালি বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছিল, কার্যকর দলের ক্ষেত্রে শুধু সদস্যদের ব্যক্তিগত দক্ষতা নয়, বরং তারা কীভাবে একসঙ্গে কাজ করেন—সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় পাঁচটি বিষয় বিশেষভাবে উঠে আসে: মানসিক নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা, কাজ ও দায়িত্বের স্পষ্টতা, কাজের অর্থবোধ এবং কাজের প্রভাব।


শুধু ভালো মানুষ নয়, দরকার সঠিক মানুষ


উদ্যোক্তাদের একটি সাধারণ ভুল হলো—নিজের পরিচিত, পছন্দের কিংবা নিজের মতো চিন্তা করেন এমন মানুষকে দলে নেওয়া। কিন্তু একটি শক্তিশালী দল তৈরি করতে প্রত্যেক সদস্যের চিন্তাধারা একই হওয়া জরুরি নয়।


বরং প্রয়োজন দক্ষতার বৈচিত্র্য


কেউ হয়তো অসাধারণ পরিকল্পনা করতে পারেন, কেউ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগে দক্ষ, কেউ সংখ্যার হিসাব ভালো বোঝেন, আবার কেউ সমস্যার মধ্যে থেকেও নতুন সমাধান খুঁজে বের করতে পারেন। তাই কর্মী নিয়োগের সময় শুধু প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়—‘এই মানুষটি কতটা দক্ষ?’


আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে—


‘এই মানুষটি আমাদের দলের কোন ঘাটতি পূরণ করবেন?’


একজন উদ্যোক্তা যদি নিজের মতো আরও দশজন মানুষ নিয়োগ করেন, তাহলে হয়তো একটি আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি হবে; কিন্তু নতুন চিন্তা, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও সমস্যার বিকল্প সমাধান কমে যেতে পারে।


হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউতে নিয়োগ নিয়ে আলোচনায় ‘কালচার ফিট’ বা প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতির সঙ্গে মিলকে একমাত্র মানদণ্ড না করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।


‘বস’ নয়, হতে হবে টিম লিডার


একজন উদ্যোক্তা যখন নিজের প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই সব সিদ্ধান্ত নিজের হাতে রাখতে চান। কিন্তু প্রতিষ্ঠান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অভ্যাসই কখনো কখনো দলের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিটি সিদ্ধান্ত যদি উদ্যোক্তাকেই নিতে হয়, তাহলে কর্মীরা ধীরে ধীরে শুধু নির্দেশের অপেক্ষায় থাকা মানুষে পরিণত হতে পারেন।


একজন কার্যকর নেতা বরং বলেন—


‘তুমি কী ভাবছ?’


‘তোমার সমাধান কী?’


‘এই কাজটি আরও ভালোভাবে কীভাবে করা যায়?’


এই প্রশ্নগুলো কর্মীর মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি করে। তারা বুঝতে পারেন, প্রতিষ্ঠানে তাদের মতামতের মূল্য আছে।


গুগলের গবেষণাতেও দেখা গেছে, কার্যকর দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ‘সাইকোলজিক্যাল সেফটি’—অর্থাৎ এমন পরিবেশ, যেখানে কর্মীরা ভুল স্বীকার করতে, প্রশ্ন করতে, ভিন্নমত জানাতে কিংবা নতুন ধারণা দিতে ভয় পান না।


ভুল করলে শাস্তি নয়, শেখার সুযোগ


একটি প্রতিষ্ঠানে ভুল হবেই। কিন্তু ভুলের পর নেতৃত্ব কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, সেটিই দলের সংস্কৃতি নির্ধারণ করে। কর্মী যদি মনে করেন, ‘ভুল করলে আমাকে অপমান করা হবে’, তাহলে পরবর্তী সময়ে তিনি হয়তো নিজের ভুল লুকাবেন। কোনো সমস্যা দেখলেও মুখ খুলবেন না। নতুন কোনো আইডিয়া থাকলেও বলবেন না। ফলে প্রতিষ্ঠান বাইরে থেকে শান্ত দেখালেও ভেতরে ভেতরে থেমে যেতে পারে।


অন্যদিকে, নেতা যদি বলেন—


‘কোথায় ভুল হয়েছে দেখি। কীভাবে একই ভুল আরেকবার না হয়, সেটা ঠিক করি।’ তাহলে ভুলটি হয়ে উঠতে পারে শেখার সুযোগ।


গুগলের গবেষণায় ‘সাইকোলজিক্যাল সেফটি’কে কার্যকর দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি উপাদানের মধ্যে প্রথমে রাখা হয়েছে। গবেষণাটি বলছে, এমন পরিবেশে মানুষ নতুন ধারণা দিতে এবং আন্তঃব্যক্তিক ঝুঁকি নিতে তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।


দায়িত্ব পরিষ্কার না থাকলে দল ভেঙে যায়


‘সবাই সব কাজ করবে’—শুনতে ভালো লাগলেও বাস্তবে এটি অনেক সময় বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। কার দায়িত্ব কী, কে কোন সিদ্ধান্ত নেবেন, কোন কাজের জন্য কে জবাবদিহি করবেন—এসব পরিষ্কার না হলে একই কাজ একাধিক ব্যক্তি করতে পারেন, আবার গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ সবার চোখ এড়িয়ে যেতে পারে।


তাই একটি ‘উইনিং টিম’-এ প্রত্যেক সদস্যের ভূমিকা পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন।


গুগলের গবেষণায় এটিকে বলা হয়েছে ‘স্ট্রাকচার অ্যান্ড ক্ল্যারিটি’—অর্থাৎ কাঠামো ও স্পষ্টতা। দলের প্রত্যেক সদস্যকে জানতে হবে তাঁর দায়িত্ব কী, প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য কী এবং সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর পরিকল্পনা কী।


শুধু বেতন নয়, কাজের অর্থও গুরুত্বপূর্ণ


একজন কর্মী মাস শেষে বেতন পাবেন—এটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শুধু বেতন একজন মানুষকে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আবেগগতভাবে যুক্ত রাখে না।


মানুষ জানতে চান—


‘আমি যে কাজ করছি, সেটির গুরুত্ব কী?’


একজন বিপণনকর্মী হয়তো শুধু পণ্য বিক্রি করছেন না; তিনি প্রতিষ্ঠানের নতুন মানুষের কাছে পৌঁছানোর পথ তৈরি করছেন।


একজন কনটেন্ট রাইটার শুধু লেখা তৈরি করছেন না; তিনি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ও পাঠকের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করছেন।


একজন হিসাবরক্ষক শুধু হিসাব করছেন না; তিনি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক শৃঙ্খলা ধরে রাখছেন।


অর্থাৎ প্রত্যেক কর্মীর কাজকে প্রতিষ্ঠানের বড় উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করে দেখাতে পারলে কাজের প্রতি দায়িত্ববোধ বাড়তে পারে।


গুগলের গবেষণায় ‘মিনিং’ বা কাজের অর্থবোধকেও কার্যকর দলের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।


‘আমি’ থেকে ‘আমরা’


একজন উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয় তখন, যখন তিনি ভাবতে শুরু করেন—


‘আমি কীভাবে সফল হব?’


থেকে


‘আমরা কীভাবে সফল হব?’


এই পরিবর্তনটিই আসলে নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।


কারণ একটি ব্যবসা উদ্যোক্তার একার নয়। একজন কর্মী যখন প্রতিষ্ঠানের সাফল্যকে নিজের সাফল্য মনে করতে শুরু করেন, তখনই দল শক্তিশালী হতে থাকে।


এর জন্য প্রয়োজন কৃতিত্ব ভাগ করে নেওয়া। কোনো কর্মী ভালো কাজ করলে প্রকাশ্যে প্রশংসা করা, দলের সামনে তাঁর অবদান স্বীকার করা এবং প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো—এসব ছোট বিষয় হলেও কর্মীর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক গভীর করতে পারে।


মতবিরোধকে ভয় পাওয়া যাবে না


‘উইনিং টিম’ মানেই সবাই সব বিষয়ে একমত—এমন ধারণাও ভুল।


বরং শক্তিশালী দলে মতবিরোধ থাকতে পারে। একজন বলবেন, ‘এভাবে করলে ভালো হবে।’ অন্যজন বলবেন, ‘আমার মনে হয় অন্যভাবে করা উচিত।’


সমস্যা মতবিরোধে নয়; সমস্যা হয় যখন মতবিরোধ ব্যক্তিগত আক্রমণে পরিণত হয়।


একজন ভালো নেতা তাই নিশ্চিত করবেন—মানুষের সঙ্গে নয়, সমস্যার সঙ্গে তর্ক হবে।


ভিন্নমতকে জায়গা দেওয়া হলে অনেক সময় এমন একটি সমাধান বেরিয়ে আসে, যা একা উদ্যোক্তার পক্ষে ভাবা সম্ভব ছিল না।


দায়িত্ব দিন, শুধু কাজ নয়


কর্মীকে যদি শুধু বলা হয়, ‘এই কাজটা করে দাও’, তাহলে তিনি কাজটি সম্পন্ন করার চেষ্টা করবেন।


কিন্তু যদি বলা হয়—


‘এই প্রকল্পটির দায়িত্ব তোমার। কীভাবে করবে, সেটার পরিকল্পনা তুমি তৈরি করো।’


তাহলে কর্মীর মধ্যে মালিকানাবোধ তৈরি হতে পারে।


এই ‘ওনারশিপ’ বা মালিকানাবোধ একটি দলের শক্তি বাড়ায়। উদ্যোক্তা তখন সব কাজ নিজের হাতে আটকে না রেখে দলের সদস্যদের সক্ষম করে তুলতে পারেন।


নিয়মিত কথা বলা জরুরি


অনেক উদ্যোক্তা মনে করেন, কর্মীর সঙ্গে বছরে একবার মূল্যায়ন করলেই যথেষ্ট। কিন্তু ভালো দল তৈরি হয় নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে।


ছোট ছোট আলোচনায় জানা যেতে পারে—


কাজ করতে গিয়ে কোথায় সমস্যা হচ্ছে?


কোন কাজটি সহজ করা দরকার?


দলের মধ্যে কোথায় সমন্বয়ের অভাব আছে?


কর্মী কী নতুন কিছু শিখতে চান?


প্রতিষ্ঠানের কোন বিষয়টি তাঁকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করছে?


কোন সিদ্ধান্তে তাঁর মতামত দেওয়া প্রয়োজন?


এ ধরনের আলোচনায় শুধু সমস্যা নয়, সুযোগও বেরিয়ে আসে।


উদ্যোক্তার আচরণই দলের সংস্কৃতি তৈরি করে


একজন উদ্যোক্তা কর্মীদের কাছে যা আশা করেন, নিজের আচরণেও তার প্রতিফলন থাকা দরকার। তিনি যদি সময়নিষ্ঠতা চান, নিজেকেও সময়নিষ্ঠ হতে হবে। তিনি যদি সম্মানজনক আচরণ চান, নিজেকেও কর্মীদের সম্মান করতে হবে। তিনি যদি নতুন আইডিয়া চান, নিজের ভুল স্বীকার করার সাহসও তাঁকে দেখাতে হবে। কারণ প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি শুধু দেয়ালে লেখা মূল্যবোধ দিয়ে তৈরি হয় না। নেতৃত্বের প্রতিদিনের আচরণ থেকেই সংস্কৃতি তৈরি হয়।


একটি ব্যবসা শুরু করার জন্য হয়তো একজন উদ্যোক্তাই যথেষ্ট। কিন্তু সেটিকে বড় করার জন্য প্রয়োজন একটি দল। আর সেই দল তৈরির কাজ শুধু নিয়োগ দিয়ে শেষ হয় না।


সঠিক মানুষ নির্বাচন, দায়িত্বের স্পষ্টতা, পারস্পরিক আস্থা, ভিন্নমতের জায়গা, ভুল থেকে শেখার সংস্কৃতি, কাজের অর্থ বোঝানো এবং প্রত্যেক সদস্যকে প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের অংশীদার করে তোলা—সব মিলিয়েই তৈরি হয় একটি ‘উইনিং টিম’ বা সফল দল।


শেষ পর্যন্ত একজন উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়তো তাঁর অফিস, যন্ত্রপাতি কিংবা পুঁজি নয়। সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো এমন একটি দল, যারা উদ্যোক্তার অনুপস্থিতিতেও প্রতিষ্ঠানের স্বপ্নটিকে নিজেদের স্বপ্ন মনে করে এগিয়ে নিতে পারে।


সূত্র: গুগল রি:ওয়ার্ক

sidebar ad