কর্নেল ডা. নাজমুল হুদা খান (অব.)
চিকিৎসাবিজ্ঞানে
সার্জারি চিকিৎসার ইতিহাস ১০ হাজার বছরের হলেও এক সময় ইউরোপের অন্ধকার যুগে নাপিতগণ
কাটাছেঁড়া বা সার্জারির কাজ করত। আজ চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় সার্জারি এমন একটি
ক্ষেত্র, যেখানে প্রযুক্তির প্রতিটি নতুন সংযোজন রোগীর জন্য আরও নিরাপদ, কম আঘাতপ্রবণ
ও অধিক নিখুঁত চিকিৎসার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ওপেন সার্জারি থেকে ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি,
ল্যাপারোস্কোপি থেকে রোবোটিক-অ্যাসিস্টেড সার্জারি—এ বিবর্তনের সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি হলো রোবোটিক
সার্জারি।
বাংলাদেশও এখন এই
প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করেছে। গত আগস্ট মাসে মেডবট টুমাই এন্ডোস্কোপিক সার্জিক্যাল
রোবটের সহায়তায় দুটি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়—একটি রোবোটিক কোলেসিস্টেকটমি এবং অন্যটি রোবোটিক হিস্টেরেকটমি। অনেকে এটিকে
বাংলাদেশে নিয়মিত রোবোটিক সার্জারি সেবার সূচনা হিসেবে ঘোষণা করেছে।
রোবোটিক সার্জারির
ইতিহাস
রোবোটিক সার্জারির
ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। ১৯৮৫ সালে PUMA-৫৬০ নামের একটি রোবোটিক সিস্টেম ব্যবহার করে মস্তিষ্কের টিস্যু পরীক্ষা করা
হয়। এটিকে রোবোটিক-অ্যাসিস্টেড সার্জারির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক মাইলফলক হিসেবে
বিবেচনা করা হয়। পরবর্তী সময়ে PROBOT, ROBODOC, AESOP ও ZEUS-এর মতো বিভিন্ন সিস্টেমের উন্নয়ন ঘটে।
১৯৯০-এর দশকে নাসা প্রতিরক্ষা গবেষণা ও টেলিসার্জারির ধারণা রোবোটিক সার্জারি প্রযুক্তির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে দুর্গম স্থান, যুদ্ধক্ষেত্র কিংবা মহাকাশে অবস্থানরত রোগীর কাছে দূরবর্তী সার্জনের দক্ষতা পৌঁছে দেওয়ার ধারণা থেকে টেলিরোবোটিক সার্জারির গবেষণা এগিয়ে যায়। এরপর আসে দ্য ভিন্সি সার্জিক্যাল সিস্টেমের যুগ। ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ দ্য ভিন্সি সিস্টেমকে সাধারণ ল্যাপারোস্কোপি সার্জারির অনুমোদন দেয়। এরপর ইউরোলজি, গাইনোকোলজি, জেনারেল সার্জারি, থোরাসিক সার্জারি এবং বিভিন্ন ক্যানসার সার্জারিতে রোবোটিক প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বিস্তৃত হয়।
রোবোটিক সার্জারি
আসলে কী?
রোবোটিক সার্জারি
এমন একটি উন্নত মিনিমালি ইনভেসিভ বা স্বল্প-অস্ত্রোপচার পদ্ধতি, যেখানে সার্জন একটি
কনসোলে বসে বিশেষায়িত যন্ত্র ও ক্যামেরা-সমৃদ্ধ রোবোটিক বাহু নিয়ন্ত্রণ করে জটিল সার্জারির
কাজটি সহজে সম্পন্ন করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রোবট নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে রোগীর
অস্ত্রোপচার করে না। রোবোটিক সিস্টেম সার্জনের হাতের নড়াচড়াকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নিয়ন্ত্রিতভাবে
রোগীর শরীরের ভেতরের যন্ত্রে রূপান্তর করে। সাধারণত একটি রোবোটিক সার্জিক্যাল প্ল্যাটফর্মে
থাকে—
১. সার্জনের কনসোল;
২. রোগীর পাশে থাকে একাধিক রোবোটিক
আর্ম;
৩. উচ্চ-রেজল্যুশনের থ্রি-ডি ক্যামেরা;
৪. সূক্ষ্ম ও বিভিন্ন ধরনের সার্জিক্যাল
ইনস্ট্রুমেন্ট;
৫. সফটওয়্যার-নিয়ন্ত্রিত মুভমেন্ট
ও মুভমেন্ট স্কেলিং ব্যবস্থা।
৬. ফলে সার্জন শরীরের
গভীর ও সংকীর্ণ স্থানে ত্রিমাত্রিক ও বড় করে দেখা অপারেটিভ ফিল্ডে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে
কাজ করতে পারেন।
রোবোটিক সার্জারি কীভাবে কাজ করে?
প্রথমে রোগীর শরীরে
কয়েকটি ছোট ছিদ্র করা হয়। এসব ছিদ্রের মাধ্যমে ক্যামেরা ও বিশেষ সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট
প্রবেশ করানো হয়। রোবোটিক বাহুগুলো রোগীর শরীরের বাইরে অবস্থান করে এবং ভেতরের যন্ত্রগুলোকে
নিয়ন্ত্রণ করে। যন্ত্রের মাথা মানুষের কবজির মতো বিভিন্ন দিকে নড়াচড়ার সক্ষম। কিছু
সিস্টেমে ৩৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত মুভমেন্টের সুবিধা থাকে। একই সঙ্গে হাতের স্বাভাবিক বা
সূক্ষ্ম কাঁপুনি সফটওয়্যার-নিয়ন্ত্রিতভাবে কমিয়ে আনা যায়।
রোবোটিক সার্জারির
প্রধান সুবিধা:
১. নিখুঁত: রোবোটিক
সিস্টেম সার্জনের সূক্ষ্ম নড়াচড়াকে আরও সূক্ষ্মভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে। বিশেষ করে
শরীরের গভীর, সংকীর্ণ ও জটিল অঞ্চলে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২. থ্রি-ডি ও প্রশস্ত
অপারেশন এরিয়া: রোবোটিক সিস্টেমে সার্জন সাধারণত উচ্চ-রেজল্যুশনের ত্রিমাত্রিক ছবি
দেখতে পান। এতে টিস্যুর স্তর, রক্তনালি ও গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো শনাক্ত করা সহজ হয়।
৩. ছোট ছিদ্র: বড়
কাটাছেঁড়ার পরিবর্তে সাধারণত ছোট ছিদ্র দিয়ে অস্ত্রোপচার করা হয়। ফলে সার্জারি-পরবর্তী
ব্যথা হ্রাস পায়, সংক্রমণ কমে ও ঘা শুকাতে খুবই কম সময় লাগে।
৪. রক্তক্ষরণ হ্রাস:
অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাটাছেঁড়া করা সম্ভব হওয়ায় কিছু নির্বাচিত অস্ত্রোপচারে রক্তক্ষরণ
কম হয়।
৫. জটিল ও ক্যানসার
সার্জারিতে সম্ভাবনা: পেলভিস, প্রোস্টেট, জরায়ু, কোলন-রেকটাম, থোরাসিক সার্জারিসহ সকল
গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষেত্রে রোবোটিক প্ল্যাটফর্ম সার্জনকে অধিক অপারেশন
স্থান ও দেখার সুযোগ করে দেয়।
৬. দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরা: রোবোটিক সার্জারির বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রোগীগণ দ্রুত হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে দৈনন্দিন কাজে ফিরে আসতে পারে। তবে এটি রোগীর অবস্থা এবং অপারেশনের ধরনের ওপর নির্ভরশীল।
রোবোটিক সার্জারির
ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতা: রোবোটিক সার্জারি
অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর হলেও এটি সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়। এর প্রধান ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতাগুলো
হলো—
১. প্রচলিত অস্ত্রোপচারের
ঝুঁকি: রোবোটিক সার্জারিতেও
অন্যান্য অস্ত্রোপচারের মতো রক্তপাত, সংক্রমণ, অ্যানেসথেসিয়া-সংক্রান্ত জটিলতা এবং
পার্শ্ববর্তী অঙ্গ বা টিস্যুতে অনাকাঙ্ক্ষিত আঘাতের ঝুঁকি থাকে। কোনো জটিলতা দেখা দিলে
বা রোবোটিক পদ্ধতিতে নিরাপদে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা সম্ভব না হলে অপারেশন চলাকালীন
রোবোটিক পদ্ধতি থেকে ল্যাপারোস্কোপিক বা ওপেন সার্জারিতে রূপান্তর করতে হতে পারে।
২. যান্ত্রিক বা
প্রযুক্তিগত ত্রুটি: রোবোটিক প্ল্যাটফর্মে
যান্ত্রিক, বৈদ্যুতিক বা সফটওয়্যার-সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই জরুরি পরিস্থিতিতে
বিকল্প সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি ও ব্যাকআপ ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা অপরিহার্য।
৩. দক্ষ ও প্রশিক্ষিত
জনবলের প্রয়োজন: শুধু রোবোটিক সিস্টেম
স্থাপন করলেই নিরাপদ অস্ত্রোপচার নিশ্চিত হয় না। দক্ষ সার্জন, সহকারী সার্জন, অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট,
প্রশিক্ষিত নার্সিং টিম এবং বায়োমেডিক্যাল/টেকনিক্যাল সাপোর্ট টিম প্রয়োজন। রোবোটিক
সার্জারির জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ, সিমুলেশন, পর্যবেক্ষণাধীন অস্ত্রোপচার এবং পর্যাপ্ত
অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। নতুন প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জনে সময় লাগে এবং এর জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ
ও দক্ষতার মূল্যায়ন জরুরি।
৪. উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভরতা,
বিনিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণ: রোবোটিক সিস্টেম
অত্যন্ত জটিল ও প্রযুক্তিনির্ভর। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, সফটওয়্যার আপডেট, যন্ত্রাংশ
পরিবর্তন এবং দক্ষ টেকনিক্যাল সাপোর্টের প্রয়োজন হয়। এসবের কোনো ঘাটতি হলে সেবায় বিঘ্ন
ঘটতে পারে। রোবোটিক সার্জিক্যাল প্ল্যাটফর্ম, বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোর
জন্য বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়।
৫. রোগীর জন্য অতিরিক্ত
আর্থিক চাপ: বাংলাদেশের বর্তমান
বাস্তবতায় রোবোটিক সার্জারির ব্যয় প্রচলিত সার্জারির তুলনায় প্রায় ২–৩ গুণ হতে পারে বলে বিভিন্ন
ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয়ের কোনো প্রচলিত অস্ত্রোপচারের
ক্ষেত্রে রোবোটিক পদ্ধতিতে প্রায় সাড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। তবে
প্রকৃত খরচ অস্ত্রোপচারের ধরন, হাসপাতাল, ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, সার্জন ও অন্যান্য চিকিৎসাসেবার
ওপর নির্ভর করে।
রোবোটিক সার্জারির
বাস্তবতা: রোবোটিক সার্জারি
নিয়ে সাধারণের ভুল ধারণাটি হলো—এতে হয়তো ভবিষ্যতে সার্জনের প্রয়োজন থাকবে না। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা হলো, এটি
সার্জন প্রতিস্থাপন নয়, সার্জন-সহায়ক। সিদ্ধান্ত নেন সার্জন; রোগীর সমস্যা বোঝেন সার্জন;
কখন, কোথায়, কীভাবে অপারেশন করতে হবে এবং কোনো জটিলতা দেখা দিলে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল
দিতে হবে—এসবের জন্য সার্জনের প্রয়োজনীয়তা
অপরিহার্য। রোবট সার্জনের চোখকে আরও স্পষ্ট দেখতে, হাতকে আরও সূক্ষ্মভাবে কাজ করতে
এবং জটিল অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গভীরে আরও সঠিকভাবে পৌঁছাতে সহায়তা করে।
উপসংহার
বাংলাদেশে রোবোটিক
সার্জারির সূচনা নিঃসন্দেহে দেশের চিকিৎসাপ্রযুক্তির বিবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
এটি বাংলাদেশি সার্জনদের জন্য আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের
নতুন ক্ষেত্র উন্মুক্ত করবে। তবে প্রযুক্তির প্রতি আবেগের চেয়ে রোগীর নিরাপত্তা, দক্ষ
জনবল, সঠিক রোগনির্ণয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। রোবোটিক সার্জারির সাফল্য শুধু কতটি রোবট
বাংলাদেশে এসেছে, তার ওপর নির্ভর করবে না; বরং নির্ভর করবে কতটা নিরাপদ, দক্ষ ও রোগীবান্ধবভাবে
এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপর।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও পরিচালক, মেডিক্যাল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল
ঢাকা/টিএ