একটি বিলাসবহুল জীবন, দামি গাড়ি, রাজকীয় বাড়ি কিংবা অবসর কাটানোর অঢেল সুযোগ—বিশাল সম্পদের মালিক হলে মানুষের জীবন এমনই বদলে যাবে, এটাই আমাদের প্রচলিত ধারণা। কিন্তু বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ স্বনির্মিত নারী বিলিয়নিয়ার লুয়ানা লোপেস লারার গল্প যেন সেই ধারণার বিপরীত। প্রায় ২.৬ বিলিয়ন ডলারের সম্পদের মালিক হয়েও তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার এখনো নিজের প্রতিষ্ঠান, আর প্রতিদিনের রুটিনে রয়েছে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ।
বিলিয়নিয়ার হয়েও বদলায়নি জীবনের অগ্রাধিকার
৩০ বছর বয়সী ব্রাজিলীয় উদ্যোক্তা লুয়ানা লোপেস লারা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রেডিকশন মার্কেট প্ল্যাটফর্ম কালশির সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও)। ২০২৬ সালের মে মাসে ফোর্বস-এর হিসাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন ২২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পর তাঁর আনুমানিক ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ২.৬ বিলিয়ন ডলারে।
কিন্তু এত বিশাল সম্পদের মালিক হওয়ার পরও তাঁর দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি বলে জানিয়েছেন তিনি। ফরচুন-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লারা বলেন, কালশি গড়ে তোলার কাজে তিনি সব সময়ই নিবিড়ভাবে মনোযোগী ছিলেন। ফলে বিলিয়নিয়ার হওয়ার পরও তাঁর কাজের রুটিন প্রায় আগের মতোই রয়েছে।
তিনি প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ করেন এবং খুব কমই ছুটি নেন। তাঁর কাছে ব্যক্তিগত সম্পদের অঙ্কের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মাঝেমধ্যে বন্ধুদের সঙ্গে ভালো কোনো রেস্তোরাঁয় খাওয়া কিংবা একটু দুপুরের খাবার উপভোগ করা—জীবনযাত্রায় পরিবর্তন বলতে এটুকুই। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভ্যাটিকানে বড়দিনের প্রার্থনায় অংশ নেওয়ার মতো বিশেষ অভিজ্ঞতাও তাঁর হয়েছে। তবে বিলাসিতার পেছনে ছুটে বেড়ানোর চেয়ে কালশিকে আরও বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করাই তাঁর মূল লক্ষ্য।
মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে বিলিয়নিয়ার হওয়ার যাত্রা
লুয়ানা লোপেস লারার বেড়ে ওঠা একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে। তাঁর মা গণিতের শিক্ষক এবং বাবা তড়িৎ প্রকৌশলী। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় তাঁর আগ্রহ ছিল। গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের অলিম্পিয়াডেও সাফল্য অর্জন করেছিলেন তিনি। তবে তাঁর জীবনের প্রথম বড় স্বপ্ন প্রযুক্তি কিংবা ব্যবসাকে ঘিরে ছিল না। বরং তিনি চেয়েছিলেন পেশাদার ব্যালেরিনা হতে।
ব্রাজিলের বলশয় ব্যালে স্কুলে তাঁর প্রশিক্ষণ ছিল অত্যন্ত কঠোর। দীর্ঘ সময় ধরে নাচের অনুশীলন, শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের মধ্য দিয়ে তাঁকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। স্কুলজীবনে একদিকে চলত নিয়মিত পড়াশোনা, অন্যদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যালে প্রশিক্ষণ।
উচ্চমাধ্যমিকের পর তিনি অস্ট্রিয়ায় পেশাদার ব্যালেরিনা হিসেবে প্রায় নয় মাস কাজও করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জীবনের গতিপথ বদলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ব্যালেরিনার পেশা ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) কম্পিউটার বিজ্ঞান পড়তে যান।
একটি শিল্পমাধ্যমে পেশাদার হওয়ার স্বপ্ন থেকে প্রযুক্তি ও ব্যবসার জগতে প্রবেশ—এই পরিবর্তনই তাঁর পরবর্তী সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করে।
কীভাবে তৈরি হলো কালশি?
এমআইটিতে পড়ার সময়ই লারার পরিচয় হয় তাঁর ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক অংশীদার তারেক মানসুরের সঙ্গে। দুজনেই কম্পিউটার বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন। পরে নিউইয়র্কে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ করার সময় ভবিষ্যতের বিভিন্ন ঘটনার সম্ভাবনা নিয়ে লেনদেনের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির ধারণা তাঁদের মাথায় আসে। এই ধারণা থেকেই ২০১৯ সালে তাঁরা কালশি প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রেডিকশন মার্কেট বা পূর্বাভাসভিত্তিক বাজার এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে ব্যবহারকারীরা নির্বাচন, খেলাধুলা, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত কিংবা অন্যান্য বাস্তব ঘটনার সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে নির্দিষ্ট চুক্তিতে লেনদেন করেন। এসব লেনদেনের মূল্য থেকে বাজারের অংশগ্রহণকারীদের সম্মিলিত প্রত্যাশা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
তবে এই ব্যবসা শুরু করা সহজ ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের বাজার পরিচালনার আইনি কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। প্রতিষ্ঠাতাদের দীর্ঘ সময় ধরে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ও আইনি স্বীকৃতির জন্য কাজ করতে হয়েছে।
২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কমোডিটি ফিউচারস ট্রেডিং কমিশনের অনুমোদন পাওয়ার পর কালশি নিয়ন্ত্রিত বাজার হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার পথ পায়। পরবর্তী সময়ে নির্বাচনী ফলাফলসংক্রান্ত চুক্তি নিয়েও প্রতিষ্ঠানটি আইনি লড়াইয়ে জড়ায়। প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যেই কালশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ অর্জন করে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠানটি ১১ বিলিয়ন ডলার মূল্যায়নে এক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সংগ্রহ করে। এরপর ২০২৬ সালের মে মাসে আরও এক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সংগ্রহের ঘোষণার সঙ্গে এর মূল্যায়ন বেড়ে ২২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
এই উত্থানের ফলেই লারা ও তাঁর সহপ্রতিষ্ঠাতা মানসুরের আনুমানিক সম্পদ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
বিশাল সম্পদের মালিক হওয়ার পরও লারা নিজের বিলিয়নিয়ার পরিচয়কে কিছুটা অবাস্তব বলে মনে করেন। তাঁর কাছে ব্যক্তিগত সম্পদ কিংবা কালশির বাজারমূল্য জীবনের চূড়ান্ত অর্জন নয়; বরং দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের একটি স্বীকৃতি।
এই দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে একটি বাস্তব বিষয়ও রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন বাড়লে তার প্রতিষ্ঠাতার আনুমানিক সম্পদও বাড়তে পারে, কিন্তু সেই সম্পদের সবটাই নগদ অর্থ নয়। প্রতিষ্ঠানে থাকা শেয়ারের মূল্য বাজারের পরিস্থিতি ও বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে।
অর্থাৎ, বিলিয়নিয়ার হওয়া মানেই ব্যাংক হিসাবে সমপরিমাণ অর্থ জমা থাকা নয়। লারার ক্ষেত্রে তাঁর আনুমানিক ২.৬ বিলিয়ন ডলারের সম্পদের বড় অংশই কালশিতে তাঁর মালিকানার মূল্য থেকে নির্ধারিত।
তবু এই সম্পদ তাঁকে যে আর্থিক স্বাধীনতা দিয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশেষ খাবার উপভোগ করা কিংবা পরিবারকে নিয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা অর্জন করার সুযোগ তাঁর রয়েছে। কিন্তু এসব সুযোগ তাঁর মূল লক্ষ্যকে সরিয়ে দেয়নি।
কঠোর পরিশ্রম, নাকি কাজের সঙ্গে অতিরিক্ত একাত্মতা?
লারার গল্পের সবচেয়ে আলোচিত দিক তাঁর দীর্ঘ কর্মঘণ্টা। প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ করা এবং খুব কম ছুটি নেওয়া নিঃসন্দেহে তাঁর কাজের প্রতি নিবেদনের পরিচয় দেয়। তবে এই জীবনযাপনকে সবার জন্য অনুসরণযোগ্য আদর্শ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
উদ্যোক্তা হিসেবে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রাথমিক পর্যায়ে দীর্ঘ সময় কাজ করার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সাফল্য ধরে রাখতে বিশ্রাম, মানসিক সুস্থতা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং কাজের ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ।
লারার জীবন থেকে তাই শুধু এই শিক্ষা নেওয়া যথেষ্ট নয় যে, সফল হতে হলে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় কাজ করতে হবে। বরং তাঁর গল্প দেখায়, একটি লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিকভাবে কাজ করা, প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন এবং দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার মানসিকতা উদ্যোক্তা জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, সাফল্যের পথ সবার জন্য এক নয়। কারও ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবসা সম্প্রসারণ অগ্রাধিকার পেতে পারে, আবার কারও কাছে পরিবার, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সুস্থ জীবনযাপন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বিলিয়নিয়ার পরিচয়ের বাইরে লুয়ানা
লুয়ানা লোপেস লারার গল্পকে শুধু একজন তরুণীর বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠার ঘটনা হিসেবে দেখলে এর গুরুত্বপূর্ণ অংশটি আড়ালে থেকে যায়। ব্যালে প্রশিক্ষণের কঠোরতা, এক পেশা ছেড়ে নতুন বিষয়ে পড়াশোনা, আর্থিক খাতের অভিজ্ঞতা, নতুন ব্যবসার ধারণা এবং দীর্ঘ নিয়ন্ত্রক বাধা পেরিয়ে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ইতিহাস—সব মিলিয়েই তাঁর সাফল্যের গল্প।
তিনি দেখিয়েছেন, জীবনের প্রথম স্বপ্ন পরিবর্তন করেও নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা সম্ভব। আবার বড় আর্থিক সাফল্য অর্জনের পরও নিজের কাজের প্রতি মনোযোগ ধরে রাখা যায়।
তবে তাঁর জীবনযাত্রার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো বিলাসিতা ত্যাগ করা কিংবা প্রতিদিন ১৪ ঘণ্টা কাজ করা নয়। বরং নিজের কাছে সাফল্যের অর্থ কী, সেটি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারা।
কারও কাছে সাফল্য মানে সম্পদ, কারও কাছে স্বাধীনতা, আবার কারও কাছে নিজের পছন্দের কাজ করে যাওয়া। লারার কাছে আপাতত সেই সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দু কালশি।
প্রায় ২.৬ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ তাঁকে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত তরুণ উদ্যোক্তাদের একজন করেছে। কিন্তু তাঁর নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিচিতির এই পরিবর্তনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই প্রতিষ্ঠানকে আরও এগিয়ে নেওয়া, যা গড়ে তুলতে তিনি বছরের পর বছর সময় ও শ্রম দিয়েছেন।
শেষ পর্যন্ত লুয়ানা লোপেস লারার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সম্পদ একজন মানুষের আর্থিক অবস্থান বদলে দিতে পারে, কিন্তু সে নিজের জীবনে কোন বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে, সেটি নির্ধারণ করে তার লক্ষ্য, মূল্যবোধ ও সিদ্ধান্ত।