পিতৃতান্ত্রিক সমাজে যুগের পর যুগ নারীদের এগিয়ে যেতে হয়েছে সীমিত অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিয়েই। সেই সামান্য ক্ষমতাটুকু কীভাবে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজে লাগাতে হয়, সেটিও যে শেখানো সম্ভব—জাম্বিয়ায় পরিচালিত একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা তারই চমকপ্রদ প্রমাণ দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের একদল নারী গবেষক এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তাঁদের গবেষণায় দেখা গেছে, অল্প বয়সী মেয়েদের ভালোভাবে আলোচনা ও দর-কষাকষি করতে শেখানো হলে তার দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে তাদের শিক্ষা, বিয়ে এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক জীবনে।
মাত্র ১২ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ
গবেষণার অংশ হিসেবে ১২ ও ১৩ বছর বয়সী একদল মেয়েকে তিন সপ্তাহে মোট ১২ ঘণ্টার দর-কষাকষির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ছয়টি দুই ঘণ্টার ক্লাসে পরিচালিত এই প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন স্থানীয় তরুণীরা, যারা নিজেরাও পড়াশোনা শেষ করেছিলেন এবং প্রশিক্ষণের পাঠ্যক্রম তৈরির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।
প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য ছিল মেয়েদের শুধু নিজেদের দাবি আদায় করতে শেখানো নয়; বরং যার সঙ্গে তারা কোনো বিষয়ে আলোচনা করছে, তার দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রয়োজনও বোঝার দক্ষতা তৈরি করা।
এক দশকেরও বেশি সময় পরের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, প্রশিক্ষণ নেওয়া মেয়েরা এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল এখনো পাচ্ছেন।
গবেষণায় একটি নিয়ন্ত্রণ দলের সঙ্গে তাঁদের তুলনা করা হয়। নিয়ন্ত্রণ দলের মেয়েরাও একই প্রশিক্ষকদের কাছ থেকে ‘ক্ষমতায়ন’ বিষয়ক ক্লাস পেয়েছিল, তবে সেখানে দর-কষাকষির কৌশল শেখানো হয়নি।
দেখা যায়, দর-কষাকষির প্রশিক্ষণ পাওয়া মেয়েরা তুলনামূলকভাবে—
বেশি সময় স্কুলে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে;
কলেজ থেকে স্নাতক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি ছিল;
এবং অনেক বেশি বয়সী পুরুষকে বিয়ে করার সম্ভাবনা কম ছিল।
সমস্যাটা কোথায় ছিল?
গবেষণাটির সঙ্গে শুরু থেকেই যুক্ত ছিলেন পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হোয়য়ার্টন স্কুলের অর্থনীতির অধ্যাপক কোরিন লো এবং তাঁর সহকর্মী নাভা আশরাফ।
গবেষণাটি শুরু হয়েছিল জাম্বিয়া সরকারের একটি প্রশ্ন থেকে—কী কারণে মেয়েরা মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে না?
গবেষকেরা প্রথমে ধারণা করেছিলেন, হয়তো মেয়েরা স্কুলকে বিরক্তিকর মনে করে। কিন্তু বিভিন্ন ফোকাস গ্রুপ আলোচনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্র উঠে আসে।
মেয়েরা জানায়, তারা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়। কিন্তু স্কুলের ফি দেওয়ার জন্য বাবা-মা কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যদের রাজি করাতে পারে না।
কারণ, পরিবারে ছেলে ও মেয়েকে ঘিরে প্রত্যাশার মধ্যেও ছিল বড় পার্থক্য। অধ্যাপক লোর ভাষায়, পরিবারের অনেকের ধারণা ছিল—‘আমার ছেলে ভবিষ্যতে আমাকে সাহায্য করবে’, কিংবা ‘পরিবারের দেখাশোনা করবে’। কিন্তু মেয়েকে নিয়ে ছিল অন্যরকম আশঙ্কা—সে হয়তো ছেলেদের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়বে বা সমস্যায় পড়বে।
গবেষকদের মনে হলো, এই মেয়েদের এমন কিছু দক্ষতা শেখানো দরকার, যা তাদের নিজেদের প্রয়োজন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবারের সঙ্গে কার্যকরভাবে আলোচনা করতে সাহায্য করবে।
শত্রু নয়, বুঝতে হবে অন্য পক্ষের অবস্থান
অধ্যাপক লো বলেন, এই প্রশিক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল—যার সঙ্গে আলোচনা করছেন, তাকে শত্রু হিসেবে না দেখে তার দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করা।
অর্থাৎ, ‘আমি কী চাই’—শুধু সেটি বললেই হবে না। বরং অন্য ব্যক্তি কেন একটি বিষয়ে রাজি হচ্ছেন না, তাঁর প্রয়োজন বা উদ্বেগ কী—সেটিও বুঝতে হবে। এরপর এমন একটি সমাধান খুঁজতে হবে, যেখানে উভয় পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় থাকে।
লো বলেন, মেয়েদের শুধু ‘তোমাকে স্কুলে থাকতেই হবে’ বললে কোনো পরিবর্তন আসবে না। বরং তাদের এমন কিছু বাস্তব দক্ষতা দিতে হবে, যা তাদের জীবনের ফলাফল বদলাতে পারে।
ক্ষমতায়ন মানেই কি প্রচলিত নিয়ম ভেঙে দেওয়া?
এই প্রশিক্ষণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি ছিল—এখানে মেয়েদের শুধু বিদ্যমান সামাজিক কাঠামোর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বলা হয়নি। বরং সেই কাঠামোকে বুঝে তার ভেতর থেকেই কীভাবে নিজের জায়গা তৈরি করা যায়, সেটিও শেখানো হয়েছে।
জাম্বিয়ার সমাজে প্রজন্মভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস ও পারিবারিক কর্তৃত্বের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাবা-মায়ের কাছে কোনো কিছু চাইতে গেলে কীভাবে সম্মান দেখাতে হয়, সেটিও প্রশিক্ষণের অংশ ছিল।
মেয়েরা নিজেরাই বলেছিল, বাবা-মায়ের সামনে তারা হাঁটু গেড়ে বসতে পারে, আনুষ্ঠানিকভাবে সম্বোধন করতে পারে কিংবা ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘চিটেঞ্জে’ পরতে পারে।
অধ্যাপক লো হাসতে হাসতে বলেন, একটি ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ কর্মসূচিতে মেয়েদের হাঁটু গেড়ে বসতে শেখানো—বিষয়টি কিছুটা অদ্ভুত শোনাতে পারে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই মেয়েদের পরিবারে তখনও তেমন ক্ষমতা ছিল না। তাই বাস্তব পরিস্থিতি অস্বীকার না করে, সেই পরিস্থিতির মধ্যেই কীভাবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা যায়, সেটিই শেখানো জরুরি ছিল।
বদলেছিল পারিবারিক সম্পর্কও
পরবর্তী সময়ে পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, শুধু মেয়েরাই নয়, তাঁদের বাবা-মায়েরাও এই প্রশিক্ষণের ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করেছিলেন।
অনেক অভিভাবক জানিয়েছেন, মেয়েরা তাঁদের সঙ্গে আরও ভালোভাবে সম্পর্ক তৈরি করতে পেরেছে। তারা বেশি শ্রদ্ধাশীল হয়েছে, ঘরের কাজে সহযোগিতা করেছে এবং বাবা-মায়ের অবস্থান ও সমস্যাগুলোও তুলনামূলকভাবে বেশি বুঝতে শিখেছে।
গবেষকেরা এখন ওই প্রথম দিকের অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে ১৫ বছর পরের একটি ফলো-আপ গবেষণার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সেই মেয়েরা এখন বিশের কোঠায়।
এরই মধ্যে জাম্বিয়ার শিক্ষাব্যবস্থায় এই পদ্ধতির কিছু অংশ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই ধরনের উদ্যোগ আরও কয়েকটি দেশেও চালু হয়েছে।
আফগানিস্তানেও কাজে লাগছে এই দক্ষতা
সবচেয়ে সাম্প্রতিক ও তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ পাওয়া যাচ্ছে আফগানিস্তানে। সেখানে ‘ফ্রি টু রান’ নামের একটি বেসরকারি সংস্থা এই প্রশিক্ষণের পরিবর্তিত সংস্করণ অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে মেয়েদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।
সাম্প্রতি প্রায় ১,২০০ মেয়ে এসব অনলাইন ক্লাসে অংশ নিয়েছে। আফগানিস্তানে তালেবান শাসনে মেয়েদের শিক্ষা, চলাফেরা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুযোগ ব্যাপকভাবে সীমিত। এমন পরিস্থিতিতে এই প্রশিক্ষণ তাঁদের অন্তত ছোট ছোট সিদ্ধান্তে নিজেদের কথা বলার এবং পরিস্থিতি সামলানোর কিছু কৌশল দিচ্ছে।
সংস্থাটির বৈশ্বিক কর্মসূচি ব্যবস্থাপক সানা মাহমুদ বলেন, পরিবারের ভেতরেও এই দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ। যেমন—বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার অনুমতি চাওয়া কিংবা কোনো ছোট সিদ্ধান্ত নিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে আলোচনা করার ক্ষেত্রেও দর-কষাকষির কৌশল কাজে লাগতে পারে।
কখনো কখনো মেয়েরা বাজারে যাওয়ার সময়ও তালেবান সদস্যদের প্রশ্নের মুখে পড়ে—‘তুমি এখানে কেন এসেছ?’ কিংবা ‘কোথায় যাচ্ছ?’
এমন পরিস্থিতিতেও শান্তভাবে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার জন্য আলোচনার দক্ষতা কাজে লাগতে পারে বলে মনে করেন মাহমুদ।
আফগান নারীদের পরিচালিত চারজন প্রশিক্ষক এই কোর্সটি পরিচালনা করছেন। অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
ছোট দক্ষতা, বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা
তবে শুধু একটি মেয়েকে ভালোভাবে দর-কষাকষি করতে শেখালেই বৃহত্তর সামাজিক বৈষম্য দূর হয়ে যাবে—এমন নয়। একটি নারীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে পরিবার, অর্থনীতি, শিক্ষা, আইন, সামাজিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক পরিবেশ—সবকিছুরই ভূমিকা রয়েছে।
পিতৃতান্ত্রিক সমাজে একজন নারীর ব্যক্তিগত দক্ষতা যতই বাড়ুক, তার সামনে থাকা কাঠামোগত বাধাগুলো থেকেই যায়।
তবু নিজের কথা স্পষ্টভাবে বলতে পারা, অন্যের অবস্থান বুঝতে পারা, নিজের প্রয়োজন নিয়ে আলোচনা করতে পারা এবং সংঘাতের বদলে সমাধানের পথ খুঁজে নেওয়ার দক্ষতা একজন মেয়েকে তার বাস্তব জীবনে কিছুটা বেশি সক্ষম করে তুলতে পারে।
জাম্বিয়ার এই দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা অন্তত সেই সম্ভাবনার কথাই বলছে।
নারীর ক্ষমতায়ন হয়তো সবসময় বড় কোনো বিপ্লব দিয়ে শুরু হয় না। কখনো কখনো সেটি শুরু হতে পারে খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন দিয়ে—‘আমি কী চাই, আর সেটা কীভাবে সম্মানের সঙ্গে চাইতে পারি?’
সেই প্রশ্ন করার সাহস এবং উত্তর খোঁজার দক্ষতাই হয়তো ভবিষ্যতের জন্য একটি মেয়ের হাতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান