চীনের ফার্স্ট লেডি পেং লিইউয়ান কতটা ক্ষমতাধর?

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চীনের ফার্স্ট লেডি পেং লিইউয়ান। ছবি: সংগৃহীত
চীনের ফার্স্ট লেডি পেং লিইউয়ান। ছবি: সংগৃহীত

গান, সংস্কৃতি, মানবিক উদ্যোগ ও কূটনৈতিক উপস্থিতি—সব মিলিয়ে পেং লিইউয়ান চীনের সবচেয়ে পরিচিত নারী মুখগুলোর একজন। কিন্তু তিনি কি সত্যিই দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্রে আছেন? নাকি তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি অন্য জায়গায়—চীনের ভাবমূর্তি বদলে দেওয়ার ক্ষমতায়?


ওয়াশিংটনে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সাম্প্রতিক সফরে পেং লিইউয়ানের উপস্থিতি আবারও সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন, শিশুদের সঙ্গে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া, চীনা লোকগানে কণ্ঠ মেলানো এবং ঐতিহ্যবাহী পোশাকে উপস্থিতি—সব মিলিয়ে তাঁকে দেখা গেছে চীনের এক তুলনামূলক কোমল, সাংস্কৃতিক ও মানবিক মুখ হিসেবে।


এটি নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় একে বলা যায় সফট পাওয়ার বা জনকূটনীতি। আর এই জায়গাতেই পেং লিইউয়ানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক গুরুত্ব।


ক্ষমতার রাজনীতিতে নাকি ভাবমূর্তির রাজনীতিতে?


চীনের রাজনৈতিক কাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের মতো নয়। মার্কিন ফার্স্ট লেডির নিজস্ব রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম, নীতিনির্ধারণে দৃশ্যমান ভূমিকা বা রাজনৈতিক প্রচারণায় সক্রিয়তার ঐতিহ্য থাকলেও চীনে প্রেসিডেন্টের স্ত্রী হিসেবে পেং লিইউয়ানের কোনো সাংবিধানিক বা আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নেই। তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বরং প্রতিনিধিত্বমূলক।


ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার সেন্টার অন পাবলিক ডিপ্লোমেসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ফার্স্ট লেডিরা দীর্ঘদিন ধরেই একটি দেশের জনকূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পেংয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সি চিন পিং জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত হওয়ার বহু আগেই পেং ছিলেন চীনের ঘরে ঘরে পরিচিত একজন তারকা।


অর্থাৎ, তিনি এমন একজন ব্যক্তি যাঁর নিজস্ব জনপরিচিতি স্বামীর রাজনৈতিক পরিচিতির আগে তৈরি হয়েছিল। এই জায়গাটিই তাঁকে অন্য অনেক রাজনৈতিক নেতার স্ত্রীর চেয়ে আলাদা করে।


সি চিন পিংয়ের স্ত্রী হওয়ার আগেই ছিলেন তারকা


পেং লিইউয়ান মূলত একজন খ্যাতিমান লোকসংগীতশিল্পী। চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের জনপ্রিয় নববর্ষের অনুষ্ঠানে বছরের পর বছর তাঁর পরিবেশনা তাঁকে বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দেয়। ফলে তিনি শুধু ‘প্রেসিডেন্টের স্ত্রী’ নন; তাঁর নিজের একটি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ক্যারিয়ার ও জনসমর্থন রয়েছে।


এই জনপ্রিয়তাই পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়।


উইলসন সেন্টারের বিশ্লেষণে পেংকে সি চিন পিংয়ের ‘সফট পাওয়ার ক্যালকুলেশন’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক উপাদান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তাঁর শিল্পী পরিচয়, সামরিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ ক্যারিয়ার এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতি—সবকিছু মিলিয়ে তিনি চীনের রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি তুলে ধরার একটি কার্যকর মুখ হয়ে ওঠেন।


তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি: চীনের ‘মানবিক মুখ’


সি চিন পিংয়ের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি মূলত শক্তিশালী রাষ্ট্র, জাতীয় নিরাপত্তা, সামরিক সক্ষমতা, কঠোর দলীয় নিয়ন্ত্রণ ও চীনের বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে যুক্ত। পেংয়ের ভাবমূর্তি প্রায় তার বিপরীত। গান, শিশু, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ঐতিহ্য—এসব বিষয় তাঁকে তুলনামূলকভাবে মানবিক ও সহজবোধ্য করে তোলে।


ফলে বিদেশে চীনের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে তাঁর উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়: চীন শুধু সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি নয়; তার সংস্কৃতি, মানুষ ও মানবিক মূল্যবোধও আছে।


এ কারণেই পেংকে নিয়ে গবেষণায় তাঁর ‘সফট পাওয়ার’ ভূমিকা বারবার উঠে এসেছে। একটি একাডেমিক গবেষণায় বলা হয়েছে, পেংয়ের ইতিবাচক ভাবমূর্তি চীনের ভাবমূর্তি উন্নত করা এবং চীনা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি তুলে ধরার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।


আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর আরেক পরিচয়—স্বাস্থ্যকূটনীতিক


পেংয়ের প্রভাব শুধু সংস্কৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়। ২০০৬ সালে তিনি চীনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধবিষয়ক দূত হন। পরের বছর তাঁকে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের জাতীয় দূত করা হয়। ২০১১ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাঁকে যক্ষ্মা ও এইচআইভি/এইডসবিষয়ক Goodwill Ambassador নিয়োগ করে।


WHO-র তৎকালীন বক্তব্যে পেংয়ের সংগীতশিল্পী পরিচয় এবং মানুষের ওপর তাঁর প্রভাবকে স্বাস্থ্যসচেতনতা তৈরির কাজে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়েছিল। তিনি এইচআইভি আক্রান্ত মানুষ, শিশু ও যক্ষ্মারোগীদের নিয়ে কাজ করেছেন এবং রোগীদের প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন।


২০২৬ সালেও তাঁকে WHO-র যক্ষ্মা ও এইচআইভি/এইডসবিষয়ক Goodwill Ambassador হিসেবে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে। বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস উপলক্ষে চলতি বছরও তিনি WHO-র অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়েছেন।


এখানে পেংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়: তিনি এমন একটি বিষয়ে কাজ করছেন, যেখানে রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে মানবিক যোগাযোগ বেশি কার্যকর।


সামরিক বাহিনীতেও ছিল তাঁর অবস্থান


পেংকে শুধু গায়িকা হিসেবে দেখলে তাঁর ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। WHO-র তথ্য অনুযায়ী, তিনি পিপলস লিবারেশন আর্মির (PLA) General Political Department-এর Chinese Song and Dance Ensemble-এর প্রধান ছিলেন এবং সামরিক কাঠামোয় মেজর জেনারেল পদমর্যাদার সমতুল্য অবস্থান পেয়েছিলেন।


অর্থাৎ তাঁর ক্যারিয়ার ছিল একই সঙ্গে শিল্প, রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি ও সামরিক সাংস্কৃতিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। এটি তাঁকে চীনের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার ভেতরকার একজন দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখে পরিণত করেছে। তবে এখানেও একটি পার্থক্য জরুরি। সামরিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে থাকা মানেই যে তিনি সামরিক বা রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে সরাসরি ক্ষমতাবান ছিলেন—এমন প্রমাণ নেই।


তাহলে কি সি চিন পিংয়ের রাজনৈতিক উত্থানেও পেংয়ের ভূমিকা ছিল?


এটি সবচেয়ে বিতর্কিত প্রশ্নগুলোর একটি। কিছু চীন-বিশেষজ্ঞের মতে, পেংয়ের ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও সামাজিক নেটওয়ার্ক সি চিন পিংয়ের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে কোনো না কোনোভাবে সহায়ক ছিল। তবে এ বিষয়ে যে সব দাবি করা হয়েছে, সেগুলোর অনেকটাই বিশ্লেষক বা জীবনীকারের বক্তব্য; প্রতিষ্ঠিত সরকারি তথ্য হিসেবে এগুলোকে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।


তাই বলা যায়, পেংয়ের রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক থাকার সম্ভাবনা ও প্রভাব নিয়ে আলোচনা আছে, কিন্তু সি চিন পিংয়ের ক্ষমতার উত্থানে তাঁর নির্দিষ্ট ভূমিকার ব্যাপারে নিশ্চিত প্রমাণ সীমিত।


এখানে সতর্ক থাকা জরুরি।


চীনে ‘ফার্স্ট লেডি’ পদটিই আলাদা


চীনের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রেসিডেন্ট বা কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতার স্ত্রীকে ঐতিহ্যগতভাবে মার্কিন ফার্স্ট লেডিদের মতো নিয়মিত রাজনৈতিক ভূমিকায় দেখা যায়নি।


মাও সে তুংয়ের স্ত্রী চিয়াং ছিংয়ের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বড় ঐতিহাসিক উদাহরণ। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর পরিণতি পরবর্তী চীনা নেতৃত্বের কাছে রাজনৈতিক নেতার স্ত্রীর অতিরিক্ত প্রকাশ্য রাজনৈতিক ভূমিকার ব্যাপারে একটি সতর্কতাও তৈরি করে।


এই প্রেক্ষাপটে পেংয়ের মডেলটি আলাদা।


তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতা দাবি না করে সাংস্কৃতিক ও মানবিক প্রভাব ব্যবহার করছেন।


পেংয়ের ‘ক্ষমতা’ আসলে কোন ধরনের?


পেং লিইউয়ানকে ক্ষমতাবান বললে আগে ঠিক করতে হবে—‘ক্ষমতা’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে।


১. নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা — সীমিত


চীনের কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোয় পেংয়ের কোনো প্রকাশ্য সাংবিধানিক বা দলীয় শীর্ষ পদ নেই। ফলে তাঁকে সি চিন পিংয়ের মতো নীতিনির্ধারক বা দলের ক্ষমতার কেন্দ্রের অংশ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।


২. রাজনৈতিক প্রভাব — সম্ভাব্য, কিন্তু অস্বচ্ছ


তাঁর দীর্ঘ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সি চিন পিংয়ের নিকটতম বৃত্তের অংশ হিসেবে উপস্থিতি তাঁকে একটি বিশেষ অবস্থান দেয়। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রভাব কতটা—চীনের অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে তা বাইরে থেকে পরিমাপ করা কঠিন।


৩. জনকূটনীতির ক্ষমতা — অত্যন্ত শক্তিশালী


এখানেই পেং সবচেয়ে বেশি কার্যকর।


বিদেশি নেতার স্ত্রী, শিশু, শিল্পী, শিক্ষার্থী বা স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ এমন একটি বার্তা তৈরি করে, যা কোনো সরকারি বিবৃতি সহজে তৈরি করতে পারে না।


৪. সাংস্কৃতিক ক্ষমতা — অসাধারণ


পেংয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সম্পদ তাঁর নিজের জনপ্রিয়তা। তিনি সি চিন পিংয়ের স্ত্রী হওয়ার আগে থেকেই চীনের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের তারকা ছিলেন। এই ‘নিজস্ব ব্র্যান্ড’ তাঁকে অন্য অনেক রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যের চেয়ে শক্তিশালী জনকূটনৈতিক সম্পদে পরিণত করেছে।


ওয়াশিংটনে তাঁর সাম্প্রতিক উপস্থিতির গুরুত্ব কোথায়?


ওয়াশিংটনে মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গে পেংয়ের উপস্থিতি এই মডেলটিরই সাম্প্রতিক উদাহরণ।


সি ও ট্রাম্পের আলোচনায় বাণিজ্য, প্রযুক্তি, তাইওয়ান, নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির মতো কঠিন বিষয় প্রাধান্য পায়। সেই কঠিন কূটনীতির বাইরে দুই দেশের ফার্স্ট লেডির সাংস্কৃতিক ও মানবিক যোগাযোগ একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশ তৈরি করে।


সেখানে পেংয়ের ইংরেজিতে যোগাযোগ, শিশুদের সঙ্গে গান গাওয়া কিংবা চীনা সংস্কৃতিকে সামনে আনা—এসবকে তাই শুধু সৌজন্যসূচক ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি ধরা পড়ে না।


এগুলো চীনের রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি নির্মাণের নরম পদ্ধতি হিসেবেও কাজ করে।


‘সফট পাওয়ার’ মানেই কি রাজনৈতিক সাফল্য?


অবশ্যই নয়। পেং যতই জনপ্রিয় বা আকর্ষণীয় হোন, তাঁর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি চীনের বৃহত্তর রাজনৈতিক ভাবমূর্তি থেকে পুরোপুরি আলাদা নয়।


চীনের মানবাধিকার পরিস্থিতি, তাইওয়াননীতি, দক্ষিণ চীন সাগর, বাণিজ্যিক বিরোধ, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত দ্বন্দ্ব—এসব কঠিন ইস্যুতে পেংয়ের সাংস্কৃতিক কূটনীতি সীমিত প্রভাব ফেলতে পারে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের একটি বিশ্লেষণও সতর্ক করেছিল যে, পেংয়ের সফট ডিপ্লোমেসি ও জনপ্রিয়তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাঁর ভূমিকা অতিরঞ্জিত করা উচিত নয়।


অর্থাৎ, তিনি চীনের কঠিন ক্ষমতার বিকল্প নন; বরং তার পরিপূরক।

sidebar ad