আফগানিস্তানে মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বন্ধ থাকার বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন ইসলামি বক্তা ড. জাকির নায়েক। তাঁর দাবি, মেয়েদের শিক্ষা পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি; ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। এরপরের শিক্ষা আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও নারী শিক্ষকের ঘাটতির কারণে। তাঁর এই বক্তব্য নিয়ে ইতিমধ্যে সমালোচনা শুরু হয়েছে।
একটি মেয়ের শিক্ষাজীবন শুধু তার নিজের ভবিষ্যৎ বদলায় না, বদলে দিতে পারে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎও। শিক্ষিত একজন নারী নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, নিজের আয় ও পেশা নিয়ে ভাবতে পারেন, সন্তানকে শিক্ষিত করে তুলতে পারেন এবং সমাজে নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারেন। তাই কোনো দেশে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ সীমিত হলে তার প্রভাব শুধু শিক্ষা ব্যবস্থায় পড়ে না; পরিবার ও সমাজের ভবিষ্যতের ওপরও পড়ে।
আফগানিস্তানে মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক উদ্বেগ রয়েছে। এর মধ্যেই সম্প্রতি ইসলামি বক্তা ড. জাকির নায়েকের একটি বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে জাকির নায়েক বলেন, আফগানিস্তানে মেয়েদের শিক্ষা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়নি। তাঁর দাবি, মেয়েরা ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পারে। এরপর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং নারী শিক্ষকের ঘাটতির কারণে শিক্ষা স্থগিত রাখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আফগানিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সব তথ্য সঠিক নয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তালেবানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তিনি এ বিষয়ে কথা বলেছেন।
মেয়েদের উচ্চশিক্ষা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হয়নি; নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হওয়া এবং প্রয়োজনীয় নারী শিক্ষক পাওয়া গেলে শিক্ষার সুযোগ আবার চালু হতে পারে।
‘নারী শিক্ষক নেই’—কেন এই যুক্তি আলোচনায়?
মেয়েদের শিক্ষা চালু রাখতে নারী শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন জাকির নায়েক। কিন্তু তাঁর এই যুক্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকেরা। প্রশ্নটি খুব সরল—মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় যাওয়ার সুযোগ না থাকলে ভবিষ্যতের নারী শিক্ষক তৈরি হবে কীভাবে?
আফগানিস্তানে যেসব মেয়েকে এখন ষষ্ঠ শ্রেণির পর আর আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় যেতে দেওয়া হচ্ছে না, তাদেরই একটি অংশ ভবিষ্যতে শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা গবেষক হতে পারত। শিক্ষার পথ বন্ধ থাকলে সেই সম্ভাবনাগুলোও সংকুচিত হয়।
জাকির নায়েকের বক্তব্যের সমালোচনা করে আফগানিস্তানের পার্লামেন্ট ইন এক্সাইলের সদস্য মারিয়াম সোলাইমানখিলও প্রশ্ন তুলেছেন—মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ সীমিত রেখে নারী শিক্ষক সংকট কীভাবে দূর হবে?
জাতিসংঘের তথ্য কী বলছে?
জাকির নায়েকের বক্তব্যের সঙ্গে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে আফগানিস্তানে ২৬ লাখের বেশি মেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বন্ধ রয়েছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগও বন্ধ করা হয়।
ইউনিসেফের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আফগানিস্তানই বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে মেয়েদের ও নারীদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা কার্যত বন্ধ।
অর্থাৎ, জাকির নায়েক এটিকে ‘স্থগিত’ হিসেবে বর্ণনা করলেও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো আফগান মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টিকেই তুলে ধরছে।
মেয়েদের শিক্ষা বন্ধ হলে ক্ষতি কার?
একজন মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার প্রভাব শুধু সেই মেয়েটির জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকে না। একজন শিক্ষিত নারী ভবিষ্যতে নিজের পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখতে পারেন। সন্তানদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও শিক্ষা নিয়ে সচেতন হতে পারেন। কর্মজীবনে যুক্ত হয়ে পরিবারের আয় বাড়াতে পারেন। আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হলে কঠিন পরিস্থিতিতে নিজের ও সন্তানের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতাও বাড়ে।
অন্যদিকে, মেয়েদের শিক্ষার পথ বন্ধ হয়ে গেলে বাল্যবিবাহ, অল্প বয়সে সন্তান নেওয়া, কর্মক্ষেত্র থেকে নারীর দূরে থাকা এবং অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার মতো সমস্যাগুলো আরও গভীর হতে পারে।
তাই মেয়েদের শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও উন্নয়নের অংশ।
নারী শিক্ষক সংকটের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক
আফগানিস্তানে নারী শিক্ষক সংকটের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখানে একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্নও রয়েছে—আজ যে মেয়েটি স্কুলে যেতে পারছে না, সে আগামীকাল কীভাবে শিক্ষক হবে?
ইউনিসেফের একটি বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে, মেয়েদের শিক্ষা ও নারীদের কর্মসংস্থানের ওপর বিধিনিষেধ অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে আফগানিস্তান প্রায় ২০ হাজার নারী শিক্ষক এবং ৫ হাজার ৪০০ নারী স্বাস্থ্যকর্মী হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
অর্থাৎ, নারী শিক্ষকের ঘাটতি যদি সত্যিই একটি সমস্যা হয়, তাহলে মেয়েদের শিক্ষার পথ বন্ধ রাখা সেই সমস্যার সমাধান নয়; বরং ভবিষ্যতে সংকট আরও বাড়াতে পারে—এমন প্রশ্নই উঠছে।
একজন মেয়ের ভবিষ্যৎ কি অপেক্ষা করতে পারে?
জাকির নায়েকের বক্তব্যে শিক্ষার সুযোগকে নিরাপত্তা ও শিক্ষক সংকটের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু একটি মেয়ের শিক্ষাজীবনে সময়ের গুরুত্ব অনেক বেশি।
একটি শিশু ছয় বছর বয়সে স্কুলে যায়। কৈশোর পেরিয়ে তার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার সময় আসে। এই সময়টুকু পেরিয়ে গেলে পরে আবার একই জায়গা থেকে শুরু করা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে যায়।
একজন ছেলে বা মেয়ের জীবনে কয়েকটি বছর হয়তো ক্যালেন্ডারে খুব বেশি সময় নয়। কিন্তু শিক্ষাজীবনে এই কয়েক বছরই হতে পারে তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়।
তাই মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে আলোচনা শুধু ‘স্কুল খোলা হবে কি না’—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকার সুযোগ নেই। প্রশ্ন হওয়া উচিত, কীভাবে মেয়েদের নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং ধারাবাহিকভাবে পড়াশোনা করার সুযোগ দেওয়া যায়।
একজন মেয়েকে শিক্ষিত করার অর্থ শুধু তাকে একটি সনদ দেওয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তার আত্মবিশ্বাস, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
একজন মা শিক্ষিত হলে তাঁর সন্তানদের শিক্ষাজীবনেও তার প্রভাব পড়ে। একজন নারী নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হলে পুরো পরিবার উপকৃত হয়। একজন নারী আয় করতে পারলে পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ে।