প্রযুক্তি বিশ্বের সফল নারী উদ্যোক্তা জৌ কুনফেই, ৯০ হাজার শ্রমিক কাজ করেন তাঁর কারখানায়


জৌ কুনফেই। ছবি: সংগৃহীত
জৌ কুনফেই। ছবি: সংগৃহীত

মাধ্যমিকের আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া এবং ফ্যাক্টরি শ্রমিকের জীবন—এই ছিল জৌ কুনফেইয়ের শুরুর গল্প। দারিদ্র্যপীড়িত শৈশব, মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মাকে হারানোর পর সেই জায়গা থেকে উঠে এসে তিনি হয়েছেন বিশ্বের অন্যতম সফল নারী উদ্যোক্তা এবং প্রযুক্তি বিশ্বের প্রভাবশালী এক ব্যবসায়ী। তার প্রতিষ্ঠিত Lens Technology আজ বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী।


জৌ কুনফেইয়ের গল্প তাই শুধু একজন বিলিয়নিয়ারের গল্প নয়। এটি একজন নারীর গল্প, যিনি প্রতিকূলতাকে নিজের শক্তিতে পরিণত করেছেন; যিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতাকে শেখার অদম্য ইচ্ছা দিয়ে অতিক্রম করেছেন এবং প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনশীল বাজারে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন।


দারিদ্র্য থেকে স্বপ্নের শুরু


১৯৭০ সালে চীনের হুনান প্রদেশের শিয়াংজিয়াং অঞ্চলে এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম জৌ কুনফেইয়ের। তিন সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে ছোট। তার বাবা ছিলেন কারখানার শ্রমিক। কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনায় তিনি আংশিক দৃষ্টিশক্তি হারান। আর জৌ যখন মাত্র পাঁচ বছরের শিশু, তখন মারা যান তার মা। অভাবের সংসারে খুব অল্প বয়সেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় তাকে। পরিবারের কাজে সাহায্য করতে এবং সামান্য আয় করতে গবাদী পশু পালনের কাজও করেছেন তিনি।


কিন্তু সেই কঠিন শৈশব তার স্বপ্নকে থামিয়ে দিতে পারেনি। বরং বাবার সংগ্রাম ও মায়ের অকালমৃত্যু তাকে শিখিয়েছিল—পরিবারের জন্য কিছু করতে হলে তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে।


পড়াশোনা থেমেছিল, শেখা নয়


মাত্র ১৬ বছর বয়সে মাধ্যমিকের পড়াশোনা ছেড়ে দেন জৌ। এরপর অভিবাসী কর্মী হিসেবে চলে যান শেনজেনে। সেখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পাশাপাশি নিজের জ্ঞান বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যান। হিসাবরক্ষণ, কম্পিউটার পরিচালনা, কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং বাণিজ্যিক যানবাহন চালানোসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন।


তার স্বপ্ন ছিল ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার। কিন্তু ভাগ্য তাকে নিয়ে যায় প্রযুক্তি ও উৎপাদনশিল্পের দিকে। ঘড়ির যন্ত্রাংশ তৈরির একটি কারখানায় কাজ শুরু করেন তিনি। কারখানার পরিবেশ পছন্দ না হওয়ায় চাকরি ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার দক্ষতা ও সম্ভাবনা বুঝতে পেরে কারখানার প্রধান তাকে আরও দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ দেন। সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তার উদ্যোক্তা জীবনের ভিত্তি তৈরি করে।


মাত্র ২২ বছর বয়সে উদ্যোক্তা


১৯৯৩ সালে, মাত্র ২২ বছর বয়সে নিজের ব্যবসা শুরু করেন জৌ কুনফেই। তার প্রাথমিক বিনিয়োগ ছিল প্রায় ২০ হাজার হংকং ডলার—তৎকালীন হিসাবে প্রায় ৩ হাজার মার্কিন ডলার।


শুরুতে তার প্রতিষ্ঠান উচ্চমানের লেন্স তৈরি করত। ছোট ব্যবসা হলেও জৌ শুরু থেকেই একটি বিষয়ে ছিলেন আপসহীন—পণ্যের মান। এই মাননির্ভর ব্যবসায়িক দর্শন ধীরে ধীরে ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করে। ছোট প্রতিষ্ঠানটি বড় হতে থাকে। আর জৌ বুঝতে শুরু করেন, ভবিষ্যতের বড় সুযোগ লুকিয়ে আছে প্রযুক্তি শিল্পে।


যে সুযোগ বদলে দিল সবকিছু


২০০১ সালে তার প্রতিষ্ঠানের সামনে আসে বড় একটি সুযোগ। চীনা মোবাইল ফোন নির্মাতা TCL-এর ফোনের স্ক্রিন তৈরির কাজ পায় তার প্রতিষ্ঠান।


এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। জৌ বুঝতে পারেন, মোবাইল ফোন শিল্প দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতের প্রযুক্তি আরও বেশি স্ক্রিননির্ভর হবে। এই সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন Lens Technology।


এরপর HTC, Nokia ও Samsung-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজের সুযোগ আসে। প্রযুক্তি শিল্পে জৌয়ের প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে থাকে।


প্রযুক্তি বিশ্বের সফল নারী উদ্যোক্তা


Lens Technology-র উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে জৌ কুনফেইয়ের পরিচয়ও বদলে যায়। তিনি আর শুধু একজন সফল ব্যবসায়ী নন—তিনি হয়ে ওঠেন প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম সফল নারী উদ্যোক্তা। পুরুষপ্রধান প্রযুক্তি ও উৎপাদনশিল্পে একজন নারীর নেতৃত্বে একটি প্রতিষ্ঠানকে বৈশ্বিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া ছিল অসাধারণ অর্জন।


বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি করে Lens Technology কাচ, কভার গ্লাস ও অন্যান্য প্রযুক্তি উপাদান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে।


অ্যাপল, স্যামসাং ও হুয়াওয়ের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টদের সরবরাহকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির নাম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও পরিচিত হয়ে ওঠে।


এভাবেই ফ্যাক্টরির সাবেক শ্রমিক জৌ কুনফেই প্রবেশ করেন বিশ্বের প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের অভিজাত তালিকায়।


৯০ হাজার কর্মীর প্রতিষ্ঠান


২০১৫ সালে Lens Technology শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। সে সময় প্রতিষ্ঠানটির কর্মীসংখ্যা ছিল প্রায় ৯০ হাজার। ভাবুন, একসময় যে নারী নিজেই একজন ফ্যাক্টরি শ্রমিক ছিলেন, পরবর্তীতে তিনিই এমন একটি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়েছেন যেখানে কাজ করতেন হাজার হাজার মানুষ।


এটাই জৌ কুনফেইয়ের যাত্রার সবচেয়ে শক্তিশালী দিকগুলোর একটি। তার সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের গল্প নয়; এটি কর্মসংস্থান তৈরি, প্রযুক্তি শিল্পে নেতৃত্ব এবং একজন নারী উদ্যোক্তার বৈশ্বিক পর্যায়ে উঠে আসার গল্প।


কঠোর পরিশ্রমই তার শক্তি


জৌ কুনফেইয়ের সহকর্মীরা তাকে “ব্রাদার ফেই” নামে ডাকেন। তার কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং দৃঢ়তার কারণেই এই ডাক। তিনি বিশ্বাস করেন, ব্যবসায় বাধা আসবেই। ব্যর্থতা আসবে, কঠিন সময় আসবে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সেই সময়েও এগিয়ে যাওয়া।


একবার কোম্পানির ২০ জন নির্বাহীকে নিয়ে দল-গঠন প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে পাহাড়ে আরোহণে যান তিনি। অনেকেই মাঝপথে হাল ছেড়ে দিলেও জৌ থামেননি।


তার দর্শন ছিল স্পষ্ট—মাঝপথে থেমে গেলে আবার শুরু করার শক্তি অনেক সময় থাকে না। এই দর্শন শুধু পাহাড়ে ওঠার ক্ষেত্রে নয়, তার পুরো উদ্যোক্তা জীবনের প্রতিচ্ছবি।


ডিগ্রির চেয়ে শেখার ইচ্ছা বড়


জৌ কুনফেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জন করতে পারেননি। কিন্তু শেখার প্রতি তার আগ্রহ কখনও শেষ হয়নি। এটাই হয়তো তার উদ্যোক্তা জীবনের অন্যতম বড় শক্তি। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, নতুন দক্ষতা অর্জন করেছেন এবং নিজের ব্যবসার প্রতিটি দিক বোঝার চেষ্টা করেছেন।


তার জীবন দেখিয়েছে—প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হলেও শেখার ইচ্ছা, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং নিজেকে প্রতিনিয়ত উন্নত করার মানসিকতাও একজন উদ্যোক্তার জন্য বিশাল সম্পদ।


সাফল্যের পরেও বিনয়ী


বিলিয়ন ডলারের সম্পদের মালিক হওয়ার পরও জৌ কুনফেইকে একজন নম্র ও মিষ্টভাষী নেতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তার বিশ্বাস, সাফল্যের সময়ে অহংকারে ভেসে যাওয়া যেমন বিপজ্জনক, তেমনি খারাপ সময়ে হতাশ হয়ে পড়াও ভুল। এই মানসিকতার পেছনে তিনি তার বাবার কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষার কথা বলেন।


তার কাছে সাফল্য মানে শুধু অর্থ বা ক্ষমতা নয়; বরং কঠিন পরিস্থিতিতে নিজের চরিত্র ধরে রাখা।


লাখো নারীর অনুপ্রেরণা


জৌ কুনফেইয়ের গল্প বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ নারীদের জন্য। কারণ তিনি এমন একটি শিল্পে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন, যেখানে নেতৃত্বের জায়গাগুলো ঐতিহাসিকভাবে পুরুষপ্রধান। তিনি দেখিয়েছেন, একজন নারী শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজই করতে পারেন না—চাইলে সেই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়ে সেটিকে বৈশ্বিক পর্যায়েও নিয়ে যেতে পারেন।


আজ প্রযুক্তি বিশ্বের সফল নারী উদ্যোক্তাদের উদাহরণ দিতে গেলে জৌ কুনফেইয়ের নাম অনিবার্যভাবেই সামনে আসে।


তার গল্প তরুণীদের জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা দেয়— সুযোগের অপেক্ষায় বসে থাকার প্রয়োজন নেই। নিজের দক্ষতা, পরিশ্রম ও সাহস দিয়ে সুযোগ তৈরি করা যায়।


শূন্য থেকে বিলিয়নিয়ার—একটি অসম্ভবের গল্প


জৌ কুনফেইয়ের জীবন শুরু হয়েছিল দারিদ্র্যের মধ্যে। খুব অল্প বয়সে হারিয়েছেন মাকে। বাবাকে দেখেছেন দুর্ঘটনার পর সংগ্রাম করতে। নিজে ছিলেন ফ্যাক্টরি শ্রমিক। স্কুলের পড়াশোনাও শেষ করতে পারেননি।


কিন্তু এসবের কোনোটিই তার শেষ পরিচয় হয়ে থাকেনি। তিনি নিজেকে বারবার নতুন করে তৈরি করেছেন। একজন শ্রমিক থেকে উদ্যোক্তা, উদ্যোক্তা থেকে প্রযুক্তি শিল্পের নেতা, আর শেষ পর্যন্ত বিশ্বের অন্যতম সফল নারী বিলিয়নিয়ার—জৌ কুনফেইয়ের এই যাত্রা প্রমাণ করে, মানুষের শুরুটা তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না।

sidebar ad