সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই অফিসের কথা মনে পড়ে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভার হয়ে আসে। অফিসে যাওয়ার সময় মনে হয়, ‘আজ আবার কী হবে?’ কম্পিউটার অন করার আগেই কয়েকটি মেইল, কয়েকটি মেসেজ, কয়েকটি অসমাপ্ত কাজ মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে। তার ওপর বসের একটি ফোন—‘এই কাজটা এখনো শেষ হয়নি কেন?’ কথাটা হয়তো মাত্র কয়েক সেকেন্ডের। কিন্তু ফোন কেটে দেওয়ার পরও তার রেশ থেকে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
কাজ করতে বসেছেন, কিন্তু মন বসছে না। একটু পরপর মনে হচ্ছে, কিছু একটা ভুল হয়ে যাচ্ছে। বস কখন ডাকবেন, কী বলবেন, কোনো কাজ নিয়ে অসন্তুষ্ট হবেন কি না—এসব ভাবতে ভাবতেই দিনের বড় একটা অংশ চলে যাচ্ছে। অফিস শেষে বাড়ি ফিরেও মাথা থেকে অফিসকে সরাতে পারছেন না।
শরীর ক্লান্ত নয় শুধু, মাথাটাও যেন ক্লান্ত
এই অবস্থাকে অনেকে বলেন ‘মেন্টালি এগজস্টেড’—অর্থাৎ মানসিকভাবে নিঃশেষ বা ভীষণ ক্লান্ত। আর কখনো কখনো এই ক্লান্তির পেছনে কাজের পরিমাণের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে একজন কর্মীর সরাসরি সুপারভাইজার বা বসের আচরণ।
বসের একটি ফোনেই যদি বুক ধড়ফড় করে
বসের ফোন আসা স্বাভাবিক অফিস-জীবনের অংশ। কিন্তু যদি ফোনের রিং শুনলেই অস্বস্তি শুরু হয়, ফোন ধরার আগে কয়েকবার গভীর শ্বাস নিতে হয়, অথবা মনে হয় ‘নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা হয়েছে’—তাহলে বিষয়টি একটু গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
কারণ কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ শুধু কাজের পরিমাণ থেকে তৈরি হয় না। কাজের ওপর নিয়ন্ত্রণের অভাব, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, সহায়তার অভাব, অতিরিক্ত চাপ এবং কর্মক্ষেত্রের সম্পর্কও স্ট্রেস ও বার্নআউটের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যবস্থাপনা না-করা চাপকে বার্নআউটের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
আপনার বস কী সবসময় ভুল ধরেন?
আপনি দশটি ভালো কাজ করলেন, কিন্তু বসের চোখে পড়ল শুধু একটি ভুল। মিটিংয়ে আপনার করা ভালো কাজের কোনো আলোচনা নেই, বরং সবাইয়ের সামনে বলা হলো—
‘এটাও ঠিকমতো করতে পারেননি?’
একদিন-দুদিন এমন ঘটনা ঘটতেই পারে। কিন্তু নিয়মিতভাবে যদি একজন কর্মীর কাজের মূল্যায়ন হয় শুধু ভুল খুঁজে বের করার মাধ্যমে, তাহলে আত্মবিশ্বাসে প্রভাব পড়তে পারে। এরপর কর্মী হয়তো প্রতিটি কাজ করার আগে ভয় পাবেন।
‘এটা ঠিক হলো তো?’ ‘ওটা নিয়ে আবার কিছু বলবেন না তো?’ ‘আমার কাজটা কি যথেষ্ট ভালো?’-- এই অতিরিক্ত আত্মসংশয়ও মানসিক ক্লান্তি বাড়াতে পারে।
সবসময় ‘আর্জেন্ট’—কিন্তু কোনোটাই আসলে জরুরি নয়
আরেক ধরনের বস আছেন, যাঁদের কাছে প্রতিটি কাজই ‘এখনই’ করতে হবে।
সকাল ১০টায় একটি কাজ দেওয়া হলো।
সাড়ে ১০টায়—‘হলো?’
১১টায়—‘কতদূর?’
দুপুরে নতুন আরেকটি কাজ।
বিকেলে আগের কাজের আপডেট।
অফিস শেষ হওয়ার একটু আগে আবার নতুন নির্দেশনা।
ফলে কর্মী সারাদিন শুধু কাজ করছেন না; একই সঙ্গে নিজের কাজের অগ্রাধিকার বদলাতে বদলাতে মানসিক শক্তিও খরচ করছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কাজের ওপর নিয়ন্ত্রণের অভাব, সময়ের চাপ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও সহায়তার অভাব কর্মক্ষেত্রের চাপ, ক্লান্তি ও বার্নআউটের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত।
‘বস কী ভাববেন?’—এই ভয়টাও ক্লান্ত করে
কাজের ভুল নিয়ে ভয় এক জিনিস। কিন্তু বস কী ভাববেন, কী বলবেন, কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন—এই অনিশ্চয়তা যদি প্রতিদিনের সঙ্গী হয়ে যায়, তাহলে কর্মক্ষেত্রের মানসিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
২০২১ সালের আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন বা এপিএর ‘ওয়ার্ক অ্যান্ড ওয়েল-বিইং সার্ভে’-তে ৪৪ শতাংশ কর্মী বলেছেন, সুপারভাইজারের সঙ্গে সমস্যা তাঁদের কর্মক্ষেত্রের স্ট্রেসকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে। একই জরিপে ৪৮ শতাংশ কর্মী সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে না পারাকেও স্ট্রেসের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
অর্থাৎ শুধু কাজের পরিমাণ নয়, কাজের পরিবেশ এবং কর্মীর কতটা নিয়ন্ত্রণ বা অংশগ্রহণ আছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বস কি আপনাকে কথা বলার সুযোগ দেন?
আপনি হয়তো কোনো সমস্যার কথা বলতে চান। কিন্তু বস কথা শেষ করার আগেই বলে দিলেন—
‘এসব অজুহাত শুনতে চাই না।’
অথবা মিটিংয়ে আপনার মতামত দেওয়ার সুযোগ নেই। সিদ্ধান্ত আগে থেকেই নেওয়া। আপনার কাজ শুধু সেটি পালন করা।
এমন পরিবেশে একজন কর্মী ধীরে ধীরে নিজের মতামত দেওয়া বন্ধ করে দিতে পারেন।
‘বলেই বা কী লাভ?’
এই ভাবনাটা খুব বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে কর্মজীবনের জন্য।
কারণ কর্মীর মতামত, অংশগ্রহণ ও কাজের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ থাকা কর্মক্ষেত্রের মানসিক সুস্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এপিএর তথ্যেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের অভাবকে উল্লেখযোগ্য কর্মক্ষেত্রের স্ট্রেসর হিসেবে পাওয়া গেছে।
অপমানকে যদি ‘মোটিভেশন’ বলা হয়
কেউ কেউ মনে করেন, কর্মীকে একটু কঠিনভাবে কথা না বললে কাজ আদায় করা যায় না। সবার সামনে অপমান করা, ব্যঙ্গ করা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, ভয় দেখানো কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণ—এসবকে কখনো কখনো ‘ডিসিপ্লিন’ বা ‘মোটিভেশন’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
কিন্তু অপমানজনক আচরণকে স্বাভাবিক কর্মপরিবেশের অংশ ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় সুপারভাইজারের অশোভন বা অসম্মানজনক আচরণ এবং কর্মীদের মানসিক ক্লান্তির মধ্যে সম্পর্ক পরীক্ষা করা হয়েছে। গবেষণাটিতে ১৫৪ জন কর্মীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হয়, সুপারভাইজারের এমন আচরণ কর্মীদের শারীরিক অভিযোগ ও আবেগগত ক্লান্তির সঙ্গে সম্পর্কিত কি না। গবেষণায় এমন সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অফিস ছুটির পরও যদি বস মাথার ভেতর থাকেন
বিকেল পাঁচটা। অফিস শেষ।
আপনি বাড়ি ফিরেছেন।
পরিবারের সঙ্গে বসেছেন। কিন্তু মাথায় ঘুরছে—
‘কাল সকালে রিপোর্টটা দিতে হবে।’
‘বস হয়তো আবার প্রশ্ন করবেন।’
‘আজকের মিটিংয়ে আমি ওই কথাটা কেন বললাম?’
‘কাল কীভাবে বিষয়টা সামলাব?’
শরীর অফিস থেকে বের হয়ে এসেছে, কিন্তু মন যেন এখনো অফিসেই আটকে আছে।
এটিকে বলা যায় কাজ নিয়ে ‘রুমিনেশন’—অর্থাৎ একই চিন্তা বারবার মাথায় ঘুরতে থাকা।
কর্মক্ষেত্রের চাপ যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তা বার্নআউটের দিকে যেতে পারে। ডব্লিউএইচওর সংজ্ঞা অনুযায়ী, বার্নআউটের তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো শক্তি বা উদ্যম নিঃশেষ হয়ে যাওয়া, কাজের প্রতি মানসিক দূরত্ব বা নেতিবাচকতা তৈরি হওয়া এবং নিজের কাজের সক্ষমতা কমে যাওয়ার অনুভূতি।
তবে মনে রাখা জরুরি—প্রতিদিন ক্লান্ত লাগলেই সেটিকে বার্নআউট বলা যায় না। বার্নআউট একটি নির্দিষ্ট কর্মক্ষেত্র-সম্পর্কিত ঘটনা; এটি নিজে কোনো মেডিকেল রোগ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ নয়।
তাহলে বুঝবেন কীভাবে যে আপনি মানসিকভাবে ক্লান্ত?
নিজের মধ্যে কয়েকটি পরিবর্তন খেয়াল করতে পারেন—
অফিসে যাওয়ার আগেই অস্বস্তি বা বিরক্তি তৈরি হওয়া।
ছোট বিষয়েও অস্বাভাবিকভাবে বিরক্ত হয়ে যাওয়া।
কাজ শুরু করতে ইচ্ছা না করা।
মনোযোগ ধরে রাখতে কষ্ট হওয়া।
আগে যে কাজ আনন্দ দিয়ে করতেন, সেটিও বিরক্তিকর মনে হওয়া।
বসের মেসেজ বা ফোন দেখলেই উদ্বেগ তৈরি হওয়া।
কাজ শেষ হওয়ার পরও অফিসের চিন্তা মাথা থেকে না নামা।
নিজের কাজ নিয়ে সবসময় সন্দেহে থাকা।
‘আমি আর পারছি না’—এমন অনুভূতি তৈরি হওয়া।
ছুটির দিনেও মানসিকভাবে বিশ্রাম না পাওয়া।
এগুলোর কয়েকটি দীর্ঘদিন ধরে থাকলে নিজের অবস্থাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তাহলে কী চাকরি ছেড়ে দেবেন?
সব সমস্যার সমাধান চাকরি ছেড়ে দেওয়া নয়। আবার সব পরিস্থিতিতে ‘আরও সহ্য করুন’ বলাও সমাধান নয়। প্রথমে বোঝার চেষ্টা করা দরকার—সমস্যাটি কোথায়। কাজের চাপ কী সাময়িক? নাকি প্রতিদিনের নিয়ম? বসের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি কি কোনো নির্দিষ্ট বিষয় থেকে তৈরি হয়েছে? নাকি নিয়মিত অপমান, অসম্মান, ভয় দেখানো বা অন্যায্য আচরণ হচ্ছে?
সরাসরি ‘আপনার কারণে আমি মানসিকভাবে শেষ’—এভাবে শুরু না করে নির্দিষ্ট সমস্যার কথা বলা যেতে পারে।
যেমন— ‘একসঙ্গে কয়েকটি জরুরি কাজ এলে অগ্রাধিকার ঠিক করতে আমার সমস্যা হয়। আমরা কি কাজগুলোর অগ্রাধিকার আগে ঠিক করে নিতে পারি?’
অথবা— ‘মিটিংয়ের সময় সবার সামনে ভুল নিয়ে আলোচনা হলে আমি চাপ অনুভব করি। কাজের বিষয়ে ফিডব্যাক যদি আলাদাভাবে দেওয়া হয়, তাহলে আমি হয়তো আরও ভালোভাবে সংশোধন করতে পারব।’
অর্থাৎ ব্যক্তিকে আক্রমণ না করে আচরণ, সমস্যা এবং তার প্রভাব নিয়ে কথা বলা।
নিজের সীমাটাও বুঝতে হবে
সবকিছু সহ্য করে যাওয়াকে পেশাদারিত্ব বলা যায় না।
আপনি কর্মী, মেশিন নন।
কাজের দায়িত্ব আপনার আছে, কিন্তু নিজের বিশ্রাম, ব্যক্তিগত সময় ও মানসিক সুস্থতারও মূল্য আছে।
সম্ভব হলে কাজের অগ্রাধিকার লিখে রাখুন। জরুরি কাজ ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ আলাদা করুন। দিনের শেষে অসমাপ্ত কাজের তালিকা তৈরি করে পরের দিনের জন্য রেখে দিন। অফিসের পর কিছুটা সময় এমন কোনো কাজে দিন, যা আপনাকে কাজের চিন্তা থেকে বের হতে সাহায্য করে।
আর যদি মানসিক চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে ঘুম, দৈনন্দিন জীবন, সম্পর্ক বা স্বাভাবিক কাজকর্মে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ছে, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সঙ্গে কথা বলা উপকারী হতে পারে।
একজন বসের একটি কঠিন কথা হয়তো আপনাকে একদিন খারাপ লাগাতে পারে। কিন্তু প্রতিদিনের ভয়, অসম্মান, অনিশ্চয়তা, অতিরিক্ত চাপ এবং নিজের কাজের ওপর নিয়ন্ত্রণের অভাব ধীরে ধীরে একজন কর্মীর মানসিক শক্তি ক্ষয় করতে পারে।
তাই প্রশ্নটি শুধু—
‘আমার বস কেমন?’
তা নয়।
প্রশ্ন হওয়া উচিত—
‘এই কর্মপরিবেশে আমি কি নিরাপদে কথা বলতে পারছি? নিজের কাজের ওপর কি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আছে? ভুল থেকে শেখার সুযোগ আছে? আমার পরিশ্রমের মূল্য আছে? আর অফিস থেকে বের হওয়ার পর আমি কি সত্যিই কাজ থেকে বের হতে পারছি?’
কারণ ভালো কর্মক্ষেত্র মানে শুধু ভালো বেতন নয়।
ভালো কর্মক্ষেত্র এমন একটি জায়গা, যেখানে মানুষ কাজ করবে, ভুল করবে, শিখবে, মতামত দেবে এবং দিন শেষে মনে হবে।
‘আজ অনেক কাজ করেছি, কিন্তু নিজেকে হারিয়ে ফেলিনি।’