বিশ্বজুড়ে লিঙ্গসমতার পথে গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও সেই অগ্রযাত্রা এখন ভঙ্গুর হয়ে উঠছে। কিছু ক্ষেত্রে অর্জিত অগ্রগতিও আবার পিছিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান গতিতে এগোলে বিশ্বে নারী-পুরুষের পূর্ণ সমতা অর্জনে আরও ১২০ বছর সময় লাগতে পারে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (WEF) Global Gender Gap Report 2026-এ উঠে এসেছে এমনই চিত্র।
২০০৬ সাল থেকে বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য পরিমাপ করে আসছে সংস্থাটি। প্রতিবেদনের ২০তম সংস্করণে ১৪৫টি দেশের অর্থনীতিকে চারটি ক্ষেত্রে মূল্যায়ন করা হয়েছে—অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ, শিক্ষাগত অর্জন, স্বাস্থ্য ও বেঁচে থাকা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন।
দুই দশকে অগ্রগতি, তবু পুরো সমতা অনেক দূর
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে লিঙ্গবৈষম্যের ৬৯.২ শতাংশ বন্ধ হয়েছে। গত এক বছরে এই হার বেড়েছে ০.৪ শতাংশ পয়েন্ট। ২০০৬ সাল থেকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকা ৯৭টি অর্থনীতির মধ্যে বৈষম্য কমেছে ৫.২ শতাংশ পয়েন্ট—যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
তবে অগ্রগতির এই চিত্রের পাশাপাশি বড় একটি বাস্তবতাও রয়েছে। অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগের ক্ষেত্রে সমতার হার মাত্র ৬১.৭ শতাংশ এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে ২২.১ শতাংশ। অর্থাৎ নারীরা শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে এগোলেও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার জায়গায় এখনও বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাদিয়া জাহিদি বলেন, গত ২০ বছরের তথ্য দেখায় যে লিঙ্গসমতা অর্জন সম্ভব। বিভিন্ন আয়স্তরের দেশই অগ্রগতি করেছে। তাঁর মতে, মূল চ্যালেঞ্জ সম্পদের অভাব নয়; বরং কার্যকর নীতিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা এবং নতুন অর্থনীতির জন্য নারীদের দক্ষতা ও সুযোগ তৈরি করা।
নেতৃত্বে নারীরা, কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রে কতটা?
নারীরা এখন ব্যবসা ও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে আগের তুলনায় বেশি জায়গা করে নিয়েছেন। ২০০৬ সালে যে ধরনের নেতৃত্বের পদে নারীদের উপস্থিতি ছিল বিরল, সেসব পদে এখন তাদের দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে—এমন পদগুলোতে নারীর উপস্থিতি এখনও তুলনামূলকভাবে কম।
করপোরেট নেতৃত্বের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। বর্তমানে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা CEO পদে নারীর অংশ মাত্র ১৯.১ শতাংশ। চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (CFO) এবং চিফ অপারেটিং অফিসার (COO)-এর মতো শীর্ষ পদেও নারীর উপস্থিতি প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
অন্যদিকে মানবসম্পদ ও কর্মী ব্যবস্থাপনার শীর্ষ পদে নারীর উপস্থিতি প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রযুক্তিনির্ভর নেতৃত্বের ক্ষেত্রে চিত্র একেবারেই ভিন্ন—চিফ ইনফরমেশন অফিসার পদে পাঁচজনেরও কমের একজন নারী এবং চিফ টেকনোলজি অফিসার পদে ১০ জনেরও কমের একজন নারী। অর্থাৎ কর্মক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি বাড়লেও ক্ষমতা, প্রযুক্তি ও বড় সিদ্ধান্তের কেন্দ্রীয় জায়গাগুলোতে সেই প্রতিনিধিত্ব এখনও সমান নয়।
রাজনীতিতেও অগ্রগতি থমকে যাচ্ছে
গত ২০ বছরে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নই লিঙ্গসমতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি করেছে। ২০০৬ সালে প্রতি আটজন পুরুষ মন্ত্রীর বিপরীতে নারী মন্ত্রী ছিলেন একজন। এখন প্রতি ৪ দশমিক ৩ জন পুরুষ মন্ত্রীর বিপরীতে একজন নারী মন্ত্রী রয়েছেন।সংসদেও নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। ২০০৬ সালে প্রতি ৫ দশমিক ৬ জন পুরুষ সংসদ সদস্যের বিপরীতে একজন নারী ছিলেন। বর্তমানে প্রায় প্রতি তিনজন পুরুষ সংসদ সদস্যের বিপরীতে একজন নারী। তবে এখানেই রয়েছে উদ্বেগের জায়গা। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের সূচকটি বর্তমানে ২০১৬ সালের তুলনায় নিচে নেমে গেছে। গত এক বছরেও এই সূচকে আরও ০.৪ শতাংশ পয়েন্ট পতন হয়েছে।
নারী রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ৯৭টি দেশের ধারাবাহিক নমুনায় ২০২২ সালে নারী রাষ্ট্রপ্রধান থাকা দেশের হার ২৭ শতাংশে পৌঁছেছিল—যা গত অর্ধশতকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপর সেই হার কমে আবার ২০১৬ সালের পর্যায়ে ফিরে গেছে।
কোন দেশগুলো এগিয়ে?
লিঙ্গসমতার সূচকে টানা ১৭তম বছর শীর্ষে রয়েছে আইসল্যান্ড। দেশটি তার লিঙ্গবৈষম্যের ৯৩ শতাংশ বন্ধ করেছে এবং ৯০ শতাংশের বেশি বৈষম্য বন্ধ করা একমাত্র দেশ হিসেবে রয়েছে। এর পরের অবস্থানে ফিনল্যান্ড, নরওয়ে ও নামিবিয়া। শীর্ষ ১০-এ রয়েছে যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ও আয়ারল্যান্ড। অস্ট্রেলিয়া এবার প্রথমবারের মতো শীর্ষ ১০-এ জায়গা করে নিয়েছে।
তবে অগ্রগতি শুধু উচ্চ আয়ের দেশেই সীমাবদ্ধ নয়। কেনিয়া, ঘানা, গুয়াতেমালা, অ্যাঙ্গোলা ও চেকিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশ এবারের সূচকে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। ২০০৬ সালের তুলনায় বলিভিয়া, চিলি, ইকুয়েডর, ফ্রান্স, গুয়াতেমালা, আইসল্যান্ড, মেক্সিকো, নামিবিয়া ও নেপাল—এই দেশগুলো লিঙ্গবৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে অন্তত ১২ শতাংশ পয়েন্ট অগ্রগতি করেছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় এখনও বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ
অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে ইউরোপ ৭৫.৭ শতাংশ লিঙ্গসমতা নিয়ে শীর্ষে। উত্তর আমেরিকা ৭৫.২ শতাংশ এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল ৭৪.৫ শতাংশ নিয়ে পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার স্কোর ৬৪.৫ শতাংশ। এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগের ক্ষেত্রে, যেখানে সমতার হার মাত্র ৪০.৯ শতাংশ।
তবে আশার জায়গাও রয়েছে। ২০০৬ সালের পর থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় শিক্ষাগত সমতায় সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হয়েছে। গত দুই দশকে এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে ১৫ শতাংশ পয়েন্ট। উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রেও এই অঞ্চলের প্রায় সব অর্থনীতি এখন সমতার কাছাকাছি পৌঁছেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নতুন বৈষম্য
প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের সময়ে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। LinkedIn-এর তথ্য অনুযায়ী, AI-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মীদের মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ একই ধরনের নন-AI প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কম। সাধারণ কর্মী পর্যায়ে AI প্রতিষ্ঠানে নারীর অংশগ্রহণ ৩৬.৬ শতাংশ, যেখানে নন-AI প্রতিষ্ঠানে তা ৪৪.৮ শতাংশ।
শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় AI প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারীর অংশগ্রহণ ২৫.৩ শতাংশ, যেখানে নন-AI প্রতিষ্ঠানে তা ২৭.৭ শতাংশ। AI-সংক্রান্ত পেশার মধ্যেও নারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি যুক্ত হচ্ছেন ডেটা অ্যানোটেশনের মতো অপেক্ষাকৃত কম বেতনের কাজে। কিন্তু AI ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে নারীর অংশ মাত্র ১৯.৩ শতাংশ।
তবে পরিবর্তনের কিছু লক্ষণও আছে। AI ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতাসম্পন্ন নারী প্রতিষ্ঠাতার হার ২০১৯ সালের ২.৩ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালের প্রথম দুই প্রান্তিকে বেড়ে ৮.৭ শতাংশ হয়েছে।
নেতৃত্বের পথে কোথায় আটকে যাচ্ছে নারীরা?
প্রতিবেদনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের পর থেকে ৬২টি অর্থনীতিতে শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় নারীর অংশগ্রহণ গড়ে ৩০ শতাংশের নিচে আটকে আছে।
শুধু তাই নয়, ১৬টি অর্থনীতিতে নতুন নিয়োগের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২২ সাল থেকে শীর্ষ ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে নতুন নিয়োগ পাওয়া নারীর হার প্রতি বছর কমেছে। ২০২২ সালে এই হার ছিল ৩৪.৮ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের প্রথম দুই প্রান্তিকে নেমে এসেছে ৩২.৩ শতাংশে।
এ থেকে বোঝা যায়, শুধু নারীদের নেতৃত্বের পদে পৌঁছে দেওয়া যথেষ্ট নয়। তাদের সেই পর্যায়ে পৌঁছানোর পথটিও টেকসই করতে হবে। শিক্ষা, দক্ষতা, নিয়োগ, পদোন্নতি এবং কর্মক্ষেত্রে সুযোগ—প্রতিটি ধাপেই সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
আইন বদলেছে, বদলাতে হবে বাস্তবতাও
নারীর অধিকার রক্ষায় গত কয়েক দশকে বিভিন্ন দেশ তাদের আইন ও নীতিমালা বিস্তৃত করেছে। বিশ্বব্যাংকের Women, Business and the Law প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ৯৬ শতাংশ আইনগত সংস্কার নারীর আইনি অধিকার সম্প্রসারণ করেছে।
তবে আইন পরিবর্তনের পাশাপাশি সেই অধিকার বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কাগজে সমান অধিকার থাকলেও কর্মক্ষেত্র, রাজনীতি, প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর প্রতিনিধিত্ব যদি পিছিয়ে থাকে, তাহলে পূর্ণ সমতা অর্জন সম্ভব নয়।
সামনে পথ দীর্ঘ, কিন্তু অসম্ভব নয়
Global Gender Gap Report 2026-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাগুলোর একটি হলো—অগ্রগতি সম্ভব, কিন্তু তা নিজে থেকে স্থায়ী হয় না। গত দুই দশকে বিশ্বে লিঙ্গবৈষম্য কমেছে। নারীরা শিক্ষা, রাজনীতি, ব্যবসা ও নেতৃত্বে আগের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান। কিন্তু একই সময়ে অর্থনৈতিক ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে বৈষম্য এখনও স্পষ্ট।
বিশেষ করে AI-নির্ভর নতুন অর্থনীতিতে এখন থেকেই নারীর দক্ষতা ও অংশগ্রহণ বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে নতুন ধরনের লিঙ্গবৈষম্য তৈরি হতে পারে।
আজকের মেয়েরা যেন আগামী দিনের নেতৃত্বে পৌঁছাতে পারে, সে জন্য শুধু দরজা খুলে দিলেই হবে না—তাদের সেই দরজা পর্যন্ত পৌঁছানোর পথটিও সমানভাবে তৈরি করতে হবে।
কারণ লিঙ্গসমতা কেবল নারীর অধিকার বা প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন নয়; এটি একটি দেশের অর্থনীতি, নেতৃত্ব, উদ্ভাবন ও ভবিষ্যৎ সক্ষমতার সঙ্গেও জড়িত। আর বর্তমান গতিতে পূর্ণ সমতা পেতে যদি সত্যিই ১২০ বছর অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে প্রশ্নটা শুধু ‘আমরা কতটা এগিয়েছি’ নয়—বরং ‘আর কত দ্রুত এগোতে পারি’।