হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে শুধু ব্যায়াম বা ওজন নিয়ন্ত্রণই যথেষ্ট নয়—প্রতিদিনের খাবারও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কী খাচ্ছি, কতটা খাচ্ছি এবং কোন খাবারের বদলে কোন খাবার বেছে নিচ্ছি, তার সঙ্গে হৃদ্স্বাস্থ্যের সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৬ সালের American Heart Association (AHA)-এর হালনাগাদ খাদ্যবিষয়ক নির্দেশনায় হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে শাকসবজি, ফল, পূর্ণশস্য ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত লবণ, যোগ করা চিনি, স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কেন শাকসবজি এত গুরুত্বপূর্ণ?
প্রতিদিনের খাবারে নানা ধরনের শাকসবজি রাখার পরামর্শ দিয়েছে AHA। শুধু একটি বা দুটি সবজি নয়, বিভিন্ন রঙ ও ধরনের সবজি খাওয়াই ভালো। সবুজ শাক, গাজর, টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রকলি, ঢেঁড়স, বেগুনসহ স্থানীয় ও মৌসুমি সবজি খাবারের বৈচিত্র্য বাড়াতে পারে।
শাকসবজি সাধারণত ভিটামিন, খনিজ ও খাদ্যআঁশের ভালো উৎস। হৃদ্স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাসে পর্যাপ্ত ফাইবার থাকা গুরুত্বপূর্ণ। AHA-র ২০২৬ সালের নির্দেশনায় প্রতিদিন প্রচুর শাকসবজি ও ফল খাওয়ার পাশাপাশি পরিশোধিত শস্যের বদলে পূর্ণশস্য বেছে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ, ভাত বা রুটির সঙ্গে শুধু মাংসের বড় একটি পদ রাখলেই সুষম খাবার হয় না। প্লেটে সবজির উপস্থিতিও জরুরি।
প্রোটিন মানেই শুধু মাংস নয়
প্রোটিনের কথা উঠলেই অনেকের মনে প্রথমে আসে গরু, খাসি বা মুরগির মাংস। কিন্তু হৃদ্স্বাস্থ্য বিবেচনায় প্রোটিনের উৎসে বৈচিত্র্য আনা গুরুত্বপূর্ণ।
AHA উদ্ভিদভিত্তিক প্রোটিন—যেমন ডাল, মটরশুঁটি, ছোলা, বিভিন্ন ধরনের বিনস, বাদাম ও বীজ—খাবারে রাখার ওপর জোর দিয়েছে। পাশাপাশি মাছ ও সামুদ্রিক খাবার নিয়মিত খাওয়া এবং প্রয়োজন হলে চর্বিহীন, অপরিশোধিত মাংস বেছে নেওয়ার পরামর্শ রয়েছে।
বাংলাদেশের খাবারের দিকে তাকালেও স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের অনেক সহজ উৎস পাওয়া যায়। যেমন—
মসুর, মুগ বা ছোলার ডাল
ছোলা ও বিভিন্ন ধরনের ডালজাতীয় খাবার
দেশি মাছ
ডিম
চামড়া ছাড়া মুরগি
পরিমিত পরিমাণে চর্বিহীন মাংস
চিনাবাদামসহ বিভিন্ন বাদাম ও বীজ
তাই প্রতিদিনের খাবারে প্রোটিন যোগ করতে গিয়ে শুধু মাংসের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই।
মাছ হতে পারে ভালো পছন্দ
মাছ বাংলাদেশের খাবারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হৃদ্স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাসেও মাছকে জায়গা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কিছু তৈলাক্ত মাছে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। AHA নিয়মিত মাছ ও সামুদ্রিক খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেয়।
তবে মাছ কীভাবে রান্না করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত তেলে ভাজা মাছের বদলে ঝোল, ভাপ, গ্রিল বা কম তেলে রান্না করা মাছ বেছে নেওয়া যেতে পারে।
মাংস খাবেন? বেছে নিন স্বাস্থ্যকরভাবে
মাংস পুরোপুরি বাদ দেওয়া যাবে না। বরং মাংস খেলে চর্বিহীন ও অপরিশোধিত মাংস বেছে নেওয়া এবং প্রক্রিয়াজাত মাংস কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সসেজ, সালামি, বেকন বা অন্যান্য প্রোসেসড মিট-এর বদলে চামড়া ছাড়া মুরগি কিংবা চর্বি কম এমন মাংস বেছে নেওয়া যেতে পারে। লাল মাংস খেলে পরিমাণের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
শাকসবজির সঙ্গে পূর্ণশস্য
শুধু শাকসবজি ও প্রোটিন যোগ করলেই হবে না; কার্বোহাইড্রেটের উৎসও গুরুত্বপূর্ণ। পরিশোধিত শস্যের বদলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে whole grain বা পূর্ণশস্য বেছে নেওয়া ভালো। সাদা ভাতের পাশাপাশি লাল চাল বা ব্রাউন রাইস, আটার রুটি, ওটস ও অন্যান্য পূর্ণশস্য খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে বাঙালির প্রিয় ভাত বাদ দিতে হবে; বরং পুরো খাবারের ভারসাম্য ও পরিমাণের দিকে নজর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
তেলও গুরুত্বপূর্ণ
সব ধরনের চর্বি এক রকম নয়। স্যাচুরেটেড ফ্যাটের বদলে অসম্পৃক্ত চর্বির উৎস বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। বাদাম, বীজ, অ্যাভোকাডো এবং নন-ট্রপিক্যাল উদ্ভিজ্জ তেল এর উদাহরণ। তাই রান্নায় তেলের পরিমাণের পাশাপাশি কোন তেল ব্যবহার করা হচ্ছে, সেদিকেও নজর দেওয়া দরকার।
কমাতে হবে লবণ, চিনি ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার
হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখার ক্ষেত্রে শুধু কী খাবেন তা নয়, কী কমাবেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত সোডিয়াম, যোগ করা চিনি এবং অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার কমানোর পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষ করে নিয়মিত অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার, মিষ্টি পানীয়, অতিরিক্ত মিষ্টি, ভাজাপোড়া ও উচ্চমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত খাবারের অভ্যাস কমানো যেতে পারে।
প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময় লেবেলে sodium, added sugar এবং saturated fat-এর পরিমাণ দেখে নেওয়ার অভ্যাসও করা ভালো।
একদিনের খাবারের প্লেট কেমন হতে পারে?
হৃদ্স্বাস্থ্যবান্ধব খাবার মানেই দামি বা বিদেশি কোনো বিশেষ ডায়েট নয়। ঘরের সাধারণ খাবার দিয়েই শুরু করা সম্ভব।
সকালে:
ওটস/আটার রুটি + সবজি + ডিম + চিনি ছাড়া চা
দুপুরে:
পরিমিত ভাত + ডাল + দুই ধরনের সবজি + মাছ + সালাদ
বিকেলে:
একটি ফল + অল্প পরিমাণ লবণহীন বাদাম
রাতে:
পরিমিত ভাত বা আটার রুটি + সবজি + মাছ/ডাল/চামড়া ছাড়া মুরগি
অবশ্য ব্যক্তির বয়স, শারীরিক পরিশ্রম, ওজন ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর খাবারের প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে।
হৃদযন্ত্রের যত্ন নিতে কোনো একটি ‘সুপারফুড’-এর ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। বরং প্রতিদিনের খাবারে বৈচিত্র্য, ভারসাম্য এবং পরিমিতি আনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন