বর্তমান সভ্যতা কেবলমাত্র একটি সমস্যায় ভুগছে, এমন নয়। নানাবিধ সমস্যা আজকের সভ্যতাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যা মায়া সভ্যতার মতো ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে মানুষের জীবন আরও কঠিন করে তুলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ান লেখক ও সাংবাদিক সারা উইলসন তাঁর নতুন বই I Eat the Stars-এ যুক্তি দিয়েছেন যে মানবসভ্যতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে কেবল জলবায়ু সংকট নয়, বরং সমগ্র সভ্যতাই নিজের জটিলতার ভারে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। তাঁর মতে, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, রাজনৈতিক মেরুকরণ, জন্মহার হ্রাস, সম্পদের সংকট এবং বিশ্বজুড়ে সংঘাত—এসব মিলিয়ে বর্তমান বিশ্ব প্রাচীন রোমান ও মায়া সভ্যতার মতো পতনের দিকে এগোচ্ছে।
উইলসন বলেন, তিনি বরাবরই এমন বিষয় নিয়ে লিখেছেন যা পরে মূলধারার আলোচনায় এসেছে—যেমন খাবার থেকে চিনি বাদ দেওয়া , উদ্বেগ (anxiety) এবং জলবায়ু সংকট। তাঁর দাবি, তিনি নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব দিচ্ছেন না; বরং জটিল বৈজ্ঞানিক তথ্যকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজভাবে তুলে ধরছেন।
তিনি জলবায়ু সংকট এবং ‘সভ্যতার পতন’-এর মধ্যে পার্থক্যও ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনকে অনেকেই একটি একক সমস্যা হিসেবে দেখেন যার একটি সমাধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এটি বৃহত্তর একটি সংকটের অংশ।
আধুনিক সভ্যতা সীমাহীন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা শেষ পর্যন্ত নিজস্ব জটিলতার কারণে অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে।
উইলসনের ভাষায়, আমরা এখন এক "লিমিনাল" বা সন্ধিক্ষণের সময়ে বাস করছি। বর্তমান ব্যবস্থা আর টিকে থাকবে না, কিন্তু তার পরিবর্তে কী আসবে, সেটিও স্পষ্ট নয়। তিনি মনে করেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সম্পদ, তেলের দাম এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মতো যে সূচকগুলো এতদিন ঊর্ধ্বমুখী ছিল, সেগুলো এখন নিম্নমুখী হওয়ার পথে।
তবে তিনি এটিকে শুধু ভয়াবহ সময় হিসেবে দেখেন না। ইতিহাসে এমন পরিবর্তনের সময় থেকেই নতুন দর্শন, ধর্ম, শিল্প এবং রাজনৈতিক ধারণার জন্ম হয়েছে। তাই এই সংকটের মধ্যেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
‘সভ্যতার পতন’ দেখতে কেমন হবে—এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না। কারণ এটি অত্যন্ত অনিশ্চিত একটি প্রক্রিয়া।
সারা উইলসন এর মতে, সুদান ও গাজার মতো অঞ্চলগুলো ইতোমধ্যেই সেই ধরনের বাস্তবতার অভিজ্ঞতা লাভ করছে। তিনি মনে করেন, ভবিষ্যতে মানুষের জীবন আরও কঠিন হবে এবং আগের মতো উন্নতির ধারায় ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
সারা উইলসন আশা ছাড়তে বলেন না। তাঁর মতে, ভেঙে পড়ছে মূলত শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী, ঔপনিবেশিক, সম্পদ-নির্ভর ও সীমাহীন প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। মানুষ যদি এই ব্যবস্থার সবচেয়ে ক্ষতিকর দিকগুলো থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারে, তাহলে নতুন ও আরও টেকসই সমাজ গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সবশেষে তিনি বলেন, এই সংকটের জন্য কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দোষারোপ করলে সমস্যার সমাধান হবে না। যদিও ক্ষমতাবান ও সুযোগসন্ধানী কিছু ব্যক্তি পরিস্থিতিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে, তবুও মূল সংকটটি একটি জটিল ব্যবস্থাগত (systemic) সমস্যা।
সারা উইলসন এর মতে, আধুনিক সভ্যতার বাস্তবতা বুঝতে পারলে মানুষ পরস্পরকে দোষারোপ করার বদলে বৃহত্তর সমাধানের দিকে মনোযোগ দিতে পারবে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, এল হান্ট, ২৯জুলাই, ২০২৬