ত্রয়োদশের প্রাক্কালে: নারী নেতৃত্বের দীর্ঘ অধ্যায়ের ইতি

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ত্রয়োদশের প্রাক্কালে: নারী নেতৃত্বের দীর্ঘ অধ্যায়ের ইতি

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে ১৯৯১ থেকে ২০২৪, এই দীর্ঘ সময়টুকু এক অনন্য অধ্যায়। প্রায় টানা তিন দশক ধরে দেশের সর্বোচ্চ দুই রাজনৈতিক আসনে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা, দুটিতেই ছিলেন নারী। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি কেবল ব্যতিক্রম নয়, এক শক্তিশালী প্রতীকও।


কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন এক বাস্তবতা দৃশ্যমান, এবার সংসদে থাকবেন না কোনো নারী সংসদনেত্রী বা বিরোধীদলীয় নেতা। ১৯৯১–২০২৪-এর ধারাবাহিকতা ভেঙে  ইতিহাসের এই সম্ভাব্য মোড় আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।



১৯৯১: এক নতুন সূচনা


১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে প্রথম নির্বাচন। সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পেল তার প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে। একই সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন শেখ হাসিনা। এই মুহূর্তটি কেবল ক্ষমতার পালাবদল ছিল না; এটি ছিল নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্বের এক নতুন যুগের সূচনা।


১৯৯৬: দ্বৈত নির্বাচন, দ্বৈত বাস্তবতা


১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন প্রধান বিরোধী দলগুলো বর্জন করায় সংসদ কার্যত একদলীয় হয়ে পড়ে। সেখানে বিরোধীদলীয় নেতা ছিল না। তবে একই বছরের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে, প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা এবং বিরোধীদলীয় নেতা হন খালেদা জিয়া। এই সময় থেকেই নারী নেতৃত্বের পালাবদল এক স্বাভাবিক রাজনৈতিক চিত্রে পরিণত হয়।


২০০১: পালাবদলের ধারাবাহিকতা


অষ্টম সংসদ নির্বাচনে আবার প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া, আর বিরোধীদলীয় নেতা হন শেখ হাসিনা। এই পালাবদল ছিল গণতান্ত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতিফলন, কিন্তু তার চেয়েও বড় বিষয় ছিল, দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির শীর্ষে ছিলেন নারী।


২০০৮ থেকে ২০২৪: দীর্ঘতম অধ্যায়


২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। এরপর ২০১৪ (দশম), ২০১৮ (একাদশ) এবং ২০২৪ (দ্বাদশ) সংসদেও তিনি প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।


এই সময় বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্বে ছিলেন কখনো খালেদা জিয়া, কখনো জাতীয় পার্টির নেতা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, রওশন এরশাদ এবং পরবর্তীতে জি এম কাদের।


তবে একটি বিষয় স্থির ছিল, রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে নারীর উপস্থিতি।


ইতিহাসের বিস্তৃত প্রেক্ষাপট


১৯৮৬ সালের তৃতীয় জাতীয় সংসদেও শেখ হাসিনা বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন। অর্থাৎ প্রথম, দ্বিতীয় ও চতুর্থ সংসদ ছাড়া প্রায় সব সংসদেই বাংলাদেশ পেয়েছে নারী প্রধানমন্ত্রী বা বিরোধীদলীয় নেতা। এই ধারাবাহিকতা বিশ্ব রাজনীতিতেও বিরল। বহু উন্নত দেশেও যেখানে নারী নেতৃত্ব এখনও ব্যতিক্রম, সেখানে বাংলাদেশ প্রায় তিন দশক ধরে নারী নেতৃত্বকে স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত করেছিল।



তাহলে ত্রয়োদশ কী বলছে?


ত্রয়োদশ সংসদে  কোনো নারী প্রধানমন্ত্রী বা বিরোধীদলীয় নেতা না থাকায় সেটি হবে দীর্ঘ এক অধ্যায়ের ইতি। কিন্তু প্রশ্ন হলো এটি কি স্থায়ী পরিবর্তন, নাকি সাময়িক বিরতি? 


রাজনীতির মঞ্চে প্রজন্ম বদলায়, নেতৃত্ব বদলায়। তবে এই তিন দশক বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে একটি বার্তা দিয়ে গেছে, নারী নেতৃত্ব এখানে অস্বাভাবিক নয়, গ্রহণযোগ্য।


সমাজের একজন সচেতন মানুষ হিসেবে এই অধ্যায়কে কেবল দলীয় রাজনীতির দৃষ্টিতে দেখলে ভুল হবে। এটি ছিল হাজারো মেয়ের চোখে স্বপ্নের প্রতিফলন। গ্রামবাংলার স্কুলছাত্রী থেকে শহুরে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া, তারা দেখেছে, দেশের সর্বোচ্চ পদেও একজন নারী থাকতে পারেন। এখন হয়তো সেই দৃশ্য কিছু সময়ের জন্য অনুপস্থিত থাকবে। কিন্তু ইতিহাস জানায়, বাংলাদেশ নারী নেতৃত্বকে একবার নয়, বারবার বেছে নিয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদ হয়তো একটি নতুন বাস্তবতা নিয়ে আসবে। তবে ১৯৯১ থেকে ২০২৪ এই সময়কাল ইতিহাসে থাকবে এক বিশেষ স্বাক্ষর হিসেবে। 



বাংলাদেশ এক দেশ, যেখানে নারী নেতৃত্ব ছিল দীর্ঘদিনের স্বাভাবিক চিত্র। ত্রয়োদশ নির্বাচনের মাধ‍্যমে তার অবসান । সময়ের প্রশ্ন শুধু একটাই বাংলাদেশ নারী নেতৃত্বে আবার কবে?


-সাবিনা ইয়াসমীন

sidebar ad