স্বামী, সন্তান আর ঘর হারানো সামিরার গল্প

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

যুদ্ধে অনেক মানুষ বেঁচে থাকার শেষ  সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। ২০০৩ সালে প্রথমবার নিজ গ্রামে যুদ্ধের আগুন পৌঁছানোর পর থেকে এখন পর্যন্ত সাতবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন সামিরা।


যে নারী একসময় বিচারক হয়ে মানুষের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত তার কাছ থেকেই কেড়ে নিয়েছে স্বামী, দুই সন্তান, একটি হাত, একটি চোখের দৃষ্টি এবং সবচেয়ে বড় কথা—নিজের ঘরে ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা।


পথে পথে তাকে সইতে হয়েছে ভয়াবহ ক্ষতি, নির্যাতন ও শারীরিক আঘাত। হারিয়েছেন স্বামী ও দুই মেয়েকেও। সুদানের চাদ সীমান্তের কাছে টাইনের উপকণ্ঠে একটি গ্রামে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন তিনি। এখন তার জায়গা হয়েছে  সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের কোরসি শরণার্থী শিবিরে। সেখানে শিবিরের বাজারে একটি অ্যালুমিনিয়ামের ট্রেতে ছোট ছোট স্তূপ করে চাল ও মসলা সাজিয়ে বসেন ৩৩ বছর বয়সী সামিরা। এর কিছু আসে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি থেকে পাওয়া মাসিক খাদ্য সহায়তা থেকে। সেই সামান্য খাবারের কিছু অংশ আবার বিক্রি করে দেন তিনি। কখনো সামর্থ্য হলে নিজের টাকায় কিছু পণ্য কিনে সামান্য লাভে বিক্রি করেন।


বাজারের এক কোণে নীরবে বসে ক্রেতাদের স্বাগতহ জানান সামিরা। লাল রঙের ঢিলেঢালা ‘তুব’ কাপড়টি তার রোগা মুখের চারপাশে জড়িয়ে থাকে। কাপড়ের একাংশ ঢেকে রাখে তার আহত ডান চোখ। মাঝেমধ্যে তিনি কাপড়টি একটু সরিয়ে আবার ঠিক করে নেন—যাতে ডান হাতের খালি অংশটিও ঢাকা থাকে। যুদ্ধের পর থেকেই এই অভ্যাস তার।


তবে শরীরের এই ক্ষতই সামিরার জীবনে যুদ্ধের একমাত্র ক্ষত নয়। তার জীবনের গল্পজুড়েই ছড়িয়ে আছে বাস্তুচ্যুতি, প্রিয়জন হারানো আর ঘর হারানোর বেদনা।


২০০৩ সালে যুদ্ধ প্রথম তার গ্রামে পৌঁছানোর সময় সামিরার বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। এরপর একের পর এক সংঘাতের কারণে তাকে দারফুরের বিভিন্ন এলাকা পেরিয়ে পালাতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মিনিবাস, মোটরসাইকেল, ট্যাক্সি ও কখনো পায়ে হেঁটে তিনি সীমান্ত পেরিয়ে পৌঁছান সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে। এখন সেখানে হাজারো সুদানি শরণার্থীর সঙ্গে কোরসি শিবিরে বসবাস করছেন তিনি। তারা সবাই ২০২৩ সালে শুরু হওয়া সুদানের সর্বশেষ গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে এসেছেন।


কোরসি শিবিরের চারদিকে সারি সারি ছোট ছোট খড়ের ঘর। ধুলোমাখা পথের দুই পাশে কাঠের টেবিল কিংবা মাটিতে বিছানো প্লাস্টিকের ওপর টমেটো, শুকনো মাছ, পেঁয়াজ, সাবান ও পুরোনো কাপড় সাজিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। শিশুরা ভিড়ের মধ্যে ছোটাছুটি করে। কেউ পানি বহনের পাত্র নিয়ে যাচ্ছে, কেউ কয়লার বস্তা। রঙিন তুব পরা নারীরা দরদাম করছেন মসলা ও সবজি নিয়ে।


কাঠ, খড় ও প্লাস্টিক দিয়েই গড়ে উঠেছে শিবিরের অধিকাংশ ঘর। গাছের ডাল ও খড় দিয়ে তৈরি সেই ঘরগুলোর ওপর জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের দেওয়া সাদা ত্রিপল টানানো। দূর থেকে উত্তর-পূর্ব সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের বিশাল আকাশের নিচে ঘরগুলোকে অত্যন্ত ভঙ্গুর মনে হয়।

বর্ষাকালও ঘনিয়ে এসেছে। আকাশে জমতে শুরু করেছে কালো মেঘ। শিগগিরই ভারী বৃষ্টির শব্দে কেঁপে উঠবে এসব আশ্রয়। অথচ এগুলো কোনো স্থায়ী ঘর নয়—শুধু বেঁচে থাকার জন্য তৈরি করা অস্থায়ী আশ্রয়।


যে মেয়েটি বিচারক হতে চেয়েছিলেন

একসময় সামিরার জীবন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সুদানের চাদ সীমান্তের কাছে বর্ষাকালে কৃষিকাজ করতেন তারা। শুষ্ক মৌসুমে পশু নিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতেন। কৃষি ও পশুপালনের সমন্বয়ে চলত তাদের জীবন।

গ্রামে একটি স্কুলও ছিল। পড়াশোনা করতে ভীষণ ভালোবাসতেন সামিরা। স্বপ্ন দেখতেন একদিন খার্তুমে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়বেন। এরপর বিচারক হয়ে মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন।

সামিরা বলেন, “আমি চেয়েছিলাম মানুষকে ন্যায়বিচার পেতে সাহায্য করতে।”

কিন্তু ২০০৩ সালে সেই স্বপ্নে আঘাত হানে যুদ্ধ।

দারফুরের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের অভিযোগে সুদান সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়। এর জবাবে খার্তুম সরকার ভয়াবহ দমন অভিযান শুরু করে। সেনাবাহিনীর পাশাপাশি সরকার-সমর্থিত আরব মিলিশিয়াদেরও অস্ত্র দেওয়া হয়। এসব মিলিশিয়া পরবর্তীতে ‘জানজাওয়িদ’ নামে কুখ্যাত হয়ে ওঠে।

সামিরার গ্রামের মতো অসংখ্য গ্রামের জন্য এর পরিণতি ছিল ভয়াবহ। আকাশে যুদ্ধবিমানের শব্দ শোনার পরপরই শুরু হতো হামলা। বোমা হামলা, আগুন, লুটপাট—সবকিছুই যেন একসঙ্গে নেমে আসত গ্রামগুলোর ওপর। মানুষ যা পারত সঙ্গে নিয়ে পালিয়ে যেত। কেউ আর কখনো ফিরে আসতে পারেনি, কেউ নিখোঁজ হয়ে যায়। সেই যুদ্ধ সামিরার পরিবারকে ঘরছাড়া করে। একই সঙ্গে ভেঙে দেয় তার ভবিষ্যতের স্বপ্ন।


দারফুরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে জীবন কাটানোর পর একসময় নিজের জাঘাওয়া সম্প্রদায়ের এক পুরুষকে বিয়ে করেন সামিরা। পরে তারা পশ্চিম দারফুরের রাজধানী এল জেনেইনায় বসতি গড়েন। দীর্ঘদিন পর সেখানেই প্রথমবারের মতো জীবনকে কিছুটা স্থির মনে হয়েছিল তার।


তার স্বামী সুদান ও চাদের মধ্যে পণ্য পরিবহনের ব্যবসা করতেন। সীমান্তের দুই পাশে বসবাসকারী জাঘাওয়া সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। ব্যবসাও ভালো চলছিল। তারা গাড়ি কিনেছিলেন, ব্যবসা বড় করেছিলেন এবং পাঁচ সন্তানকে নিয়ে সংসার গড়ে তুলেছিলেন। সামিরার কাছে এল জেনেইনা হয়ে উঠেছিল নিজের বাড়ি। অতীতের যুদ্ধ, পালিয়ে বেড়ানো আর হারানোর স্মৃতি ছিল, কিন্তু সেগুলো আর প্রতিদিনের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করত না।


আবারও যুদ্ধ, এবার সব হারালেন সামিরা

কিন্তু ২০২৩ সালের এপ্রিলে সুদানে আবার যুদ্ধ শুরু হলো। সামরিক সরকারের দুই ক্ষমতাধর জেনারেলের দ্বন্দ্ব রূপ নেয় সশস্ত্র সংঘাতে। মোহাম্মদ হামদান দাগালো—যিনি ‘হেমেদতি’ নামে পরিচিত—নেতৃত্ব দেন র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের। অন্যদিকে সুদানের সরকারি সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান। পরে আরও কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী এই সংঘাতে যুক্ত হয়। পশ্চিম দারফুর আবারও পরিণত হয় যুদ্ধক্ষেত্রে। বহুদিন ধরে জমে থাকা জাতিগত উত্তেজনা এবার প্রকাশ্য সহিংসতায় রূপ নেয়। জুন নাগাদ এল জেনেইনা শহর কার্যত বিশৃঙ্খলার মধ্যে ডুবে যায়। পশ্চিম দারফুরের গভর্নর খামিস আবাকার অপহৃত ও নিহত হওয়ার দিনই সশস্ত্র লোকজন সামিরার বাড়িতে আসে।


তাদের লক্ষ্য ছিল সামিরার স্বামীর গাড়ি, অর্থ ও সম্পদ। সামিরার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ দুই দশকের পরিশ্রমে গড়ে তোলা সম্পদ হস্তান্তর করতে তার স্বামী অস্বীকৃতি জানান। এরপর সামিরার চোখের সামনে তাকে হত্যা করা হয়।


“তারা আমার স্বামীকে আমার সামনেই হত্যা করে, একই দিনে তারা তাকে এবং আমার দুই মেয়েকেও হত্যা করে।”— বলছিলেন সামিরা।


সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান


sidebar ad