কখনও হাতে দায়িত্বের ভার, কখনও অসুর দমনে দেবীর আবির্ভাব। পর্দায় কখনও তিনি ভয়ের কাছে নতিস্বীকার করা এক পুলিশ কর্মকর্তা, আবার কখনও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো দেবী। দক্ষিণী সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেত্রী নয়নতারা এবার হাজির হচ্ছেন এমনই দুই বিপরীতধর্মী চরিত্রে। তাঁর অভিনীত ‘মুকুথি আম্মান ২’ সিনেমার ট্রেলার প্রকাশের পর আলোচনায় উঠে এসেছে অভিনেত্রীর এই ব্যতিক্রমী উপস্থিতি।
দক্ষিণী চলচ্চিত্রের জগতে নয়নতারা শুধু জনপ্রিয়তার নাম নন, নারীপ্রধান চরিত্রকে পর্দার কেন্দ্রে নিয়ে আসার ক্ষেত্রেও তিনি পরিচিত মুখ। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন এই অভিনেত্রী। কখনও দৃঢ়চেতা নারী, কখনও প্রতিশোধপরায়ণ চরিত্র, আবার কখনও অতিপ্রাকৃত শক্তির অধিকারী দেবী—বিভিন্ন রূপেই দর্শকের সামনে হাজির হয়েছেন তিনি। এবার ‘মুকুথি আম্মান ২’-এ তাঁর চরিত্রের বৈচিত্র্য সেই পরিচয়কে আরও একবার সামনে নিয়ে এসেছে।
দেবীর শক্তি, পুলিশের ভয়
বুধবার প্রকাশিত ‘মুকুথি আম্মান ২’-এর ট্রেলারে দেখা যায়, নয়নতারা ফিরেছেন দেবী আম্মানের চরিত্রে। ২০২০ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটির প্রথম পর্বেও দেবীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন তিনি। এবারও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দেবীরূপে দেখা যাবে তাঁকে। তবে নতুন সিনেমায় তাঁর উপস্থিতির বিশেষত্ব শুধু দেবী চরিত্রে ফিরে আসা নয়; একই সঙ্গে একজন পুলিশ কর্মকর্তার ভূমিকাতেও অভিনয় করেছেন তিনি।
ট্রেলারে রেজিনা ক্যাসান্দ্রা ও দুনিয়া বিজয় অভিনীত দুই পৌরাণিক খলনায়ক পৃথিবীতে নেমে আসে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে এবং নিজেদের ক্ষমতা বাড়াতে। তাদের হুমকিতে বিপন্ন হয়ে পড়ে শিশু ও নিরীহ মানুষের জীবন। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে সামনে আসে নয়নতারার অভিনীত পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্র।
কিন্তু এই পুলিশ কর্মকর্তা প্রচলিত অর্থে সাহসী কিংবা নির্ভীক নন। সাধারণ বিষয়েও ভয় পান তিনি। এমনকি একা ঘুমাতেও তাঁর ভয় লাগে। ফলে দায়িত্বের পোশাক পরা এই চরিত্রের সঙ্গে দেবীর অসীম শক্তির এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে।
ভয়ের আড়ালেও কি থাকে সাহস?
নারীকেন্দ্রিক গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নারী চরিত্রকে কেবল সাহসী, আত্মবিশ্বাসী কিংবা সব পরিস্থিতিতে জয়ী হিসেবে উপস্থাপন না করে তাঁর দুর্বলতা ও দ্বিধাকেও জায়গা দেওয়া। ‘মুকুথি আম্মান ২’-এর ট্রেলারে নয়নতারার পুলিশ চরিত্রে সেই ভিন্নতার ইঙ্গিত রয়েছে।
একজন পুলিশ কর্মকর্তার কাছে সাহস প্রত্যাশিত। অথচ সেই মানুষটিই যখন সামান্য বিষয়েও ভীত হয়ে পড়েন, তখন চরিত্রটি হয়ে ওঠে প্রচলিত নায়িকাসুলভ ভাবমূর্তির বাইরে। এখানে ভয় তাঁর মানবিক দুর্বলতা, যা চরিত্রটিকে অন্য মাত্রা দিতে পারে। তবে এই ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালনের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিপদের মুখে দাঁড়াতে পারাটাই কি সাহস, নাকি ভয় পেয়েও নিজের দায়িত্ব থেকে সরে না যাওয়ার নামই সাহস?
সিনেমাটিতে এই প্রশ্নের উত্তর কীভাবে উঠে আসবে, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে মুক্তি পর্যন্ত। তবে ট্রেলারে চরিত্রটির উপস্থাপন দর্শকের কৌতূহল তৈরি করেছে।
দেবী মানেই কি শুধু অলৌকিক শক্তি?
অন্যদিকে দেবী আম্মানের চরিত্রে নয়নতারা হাজির হন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপে। সেখানে ভয় নয়, বরং শক্তি ও প্রতিরোধই মুখ্য। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই, বিপন্ন মানুষের সুরক্ষা এবং অন্যায়ের মোকাবিলা—দেবী চরিত্রটির মধ্য দিয়ে এমন ভাবনাই সামনে আসে।
নারীকেন্দ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই দুই চরিত্রের পাশাপাশি অবস্থান বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। একজন নারী ভয় পান, অন্যজন ভয়কে জয় করার প্রতীক। একজন সাধারণ মানুষের সীমাবদ্ধতার প্রতিনিধিত্ব করেন, অন্যজন অসাধারণ শক্তির অধিকারী। আর দুই চরিত্রেই রয়েছেন নয়নতারা।
এখানে নারীকে শক্তিশালী করে তোলার ধারণাটি শুধু শারীরিক ক্ষমতা কিংবা নির্ভীকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং দুর্বলতা ও শক্তি—দুটিই যে একই চরিত্রের মধ্যে সহাবস্থান করতে পারে, সেই সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
নয়নতারা: নারী চরিত্রের বহুমাত্রিক উপস্থিতি
দক্ষিণী চলচ্চিত্রে নয়নতারা দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম। তাঁর অভিনীত বিভিন্ন চরিত্রে নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং গল্পের কেন্দ্রে থাকার প্রবণতা দেখা গেছে। নতুন সিনেমায়ও তাঁর দুই বিপরীতধর্মী চরিত্র দর্শকের সামনে অভিনয়ের ভিন্ন সম্ভাবনা তুলে ধরতে পারে।
বিশেষ করে একই সিনেমায় ভীতু পুলিশ কর্মকর্তা ও শক্তিশালী দেবীর মতো দুই আলাদা চরিত্রে অভিনয় করার বিষয়টি অভিনেত্রী হিসেবে তাঁর বহুমুখিতা দেখানোর সুযোগ তৈরি করেছে। একটি চরিত্রে ভয় ও অনিশ্চয়তা, অন্যটিতে শক্তি ও আত্মবিশ্বাস—এই দুই মেরুর মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই হবে অভিনয়ের বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে নারী চরিত্রের বৈচিত্র্য শুধু তাদের শক্তিশালী করে দেখানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; চরিত্রগুলো কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তাদের সিদ্ধান্ত ও অভিজ্ঞতা গল্পকে কতটা এগিয়ে নেয়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিবেচনায় ‘মুকুথি আম্মান ২’ নয়নতারার অভিনয়জীবনে কতটা আলাদা মাত্রা যোগ করে, তা সিনেমাটি মুক্তির পরই স্পষ্ট হবে।
দুই রূপে এক নয়নতারা
‘মুকুথি আম্মান ২’-এর ট্রেলার আপাতত নয়নতারাকে ঘিরে দুটি ভিন্ন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। একদিকে দেবীরূপে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই, অন্যদিকে ভয়ে কাঁপতে থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তার মানবিক অভিজ্ঞতা। দুই চরিত্রের মধ্যে পার্থক্য যেমন স্পষ্ট, তেমনি তাদের মাধ্যমে নারী চরিত্রের ভিন্ন ভিন্ন দিক তুলে ধরার সম্ভাবনাও রয়েছে।
পর্দায় দেবী হয়ে অসুর দমন করা কিংবা ভীতু পুলিশ কর্মকর্তা হয়ে নিজের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হওয়া—দুই ক্ষেত্রেই নয়নতারার সামনে রয়েছে আলাদা অভিনয়চ্যালেঞ্জ। আর সেখানেই এই সিনেমার প্রতি আগ্রহের জায়গা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—ভয়কে জয় করে পুলিশ কর্মকর্তা কি হয়ে উঠবেন সত্যিকারের সাহসী, আর দেবীরূপে নয়নতারা কীভাবে রুখে দাঁড়াবেন অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে? দুই ভিন্ন রূপে তাঁর এই প্রত্যাবর্তনের উত্তর দেবে ‘মুকুথি আম্মান ২’।