সময় ১৬ অক্টোবর, ২০১৮; রংপুর জিলা স্কুল মাঠে চলছে ‘শেকড়ের সন্ধানে মেগা কনসার্ট’। কানায় কানায় পূর্ন মাঠের স্টেজ থেকে যখন ভেসে আসলো পরিচিত গানের গীটারের সুর, দর্শকদের উচ্ছ্বাস দেখে কে? সমস্বরে সবাই গেয়ে উঠলো ‘চলো বদলে যাই’ গান। কিন্তু কে জানতো গানের উন্মাদনায় বুঁদ করে রাখা আইয়ুব বাচ্চু তার ঠিক দুদিন পরেই (১৮ অক্টোবর) এক আকাশের তারা হয়ে যাবেন।
চলুন একটু ঘুরে আসি ক্যাসেট প্লেয়ারের যুগে। প্লাস্টিকের ছোট্ট এক চারকোনা
জাদুকরী বাক্স, যার ভেতর জড়িয়ে থাকা বাদামী রঙের ফিতা। সেই ফিতার পাকেই যেন বন্দি থাকত
আমাদের কৈশোর আর যৌবনের কত আনন্দ, বিরহ আর ভালোবাসা। প্রিয় ব্যান্ড বা শিল্পীর নতুন
অ্যালবাম আসার খবরে পাড়ার ক্যাসেটের দোকানে ভিড় করা এবং অপেক্ষা শেষে পকেটের জমানো
টাকা দিয়ে চকচকে মোড়কের নতুন একটা ক্যাসেট পাওয়ার আনন্দ ছিল আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার
মতো।
ক্যাসেটের প্লাস্টিক কভারটা খুলে ভেতরের ইনলে কার্ডে (Inlay card) গানের
লিরিক্স বা কথা পড়া, ফিতা জড়িয়ে গেলে পেন্সিল কিংবা বলপেন দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পরম যত্নে
ফিতা ঠিক করে নেওয়া, প্রিয় গানটি একটু পরপর রিওয়াইন্ড করে শোনা; সেটিও ছিল আনন্দের
অংশ। ৮০ ও ৯০ এর দশকে ক্যাসেটের ফিতায় বন্দি গান শোনার অভিজ্ঞতা কেবল বিনোদন ছিল না,
তা ছিল এক টুকরো বিশুদ্ধ আবেগ এবং পরম মায়া।
একদিন যে গিটার ছিল কেবল কিছু তরুণের হাতে থাকা নতুন এক বাদ্যযন্ত্র, সময়ের
সঙ্গে সেটিই হয়ে উঠেছে একটি প্রজন্মের কণ্ঠস্বর। সেই গিটারের সুরে, গানের কথায় আর মঞ্চ
কাঁপানো পরিবেশনায় নিজের আলাদা পরিচয় গড়েছিলেন বাংলাদেশের রকসংগীতের কিংবদন্তি আইয়ুব
বাচ্চু। তাঁর হাতের গিটার হয়ে উঠেছিল অসংখ্য তরুণের আবেগ, ভালোবাসা আর বিদ্রোহের ভাষা।
২০২৬ সালে মরণোত্তর একুশে পদকে সম্মানিত হন আইয়ুব বাচ্চু। বাংলাদেশের সংগীতজগতে
তাঁর দীর্ঘ অবদান ও অনন্য প্রভাবের প্রতি রাষ্ট্রের এই স্বীকৃতি যেন আরও একবার মনে
করিয়ে দেয়, একজন শিল্পীর প্রস্থান ঘটলেও তাঁর সৃষ্টির মৃত্যু হয় না। গিটারের তারে তারে
ছড়িয়ে দেওয়া সেই সুর আজও বেঁচে আছে শ্রোতাদের হৃদয়ে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
চট্রগ্রামে জন্ম নেয়া আইয়ুব বাচ্চু, যিনি রক ব্যান্ড এল আর বি’র গায়ক ও
গীটারবাদক হিসেবে পুরো বিশ্বে
জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন। তাকে বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংগীতের ধারায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী
ও গীটারবাদক বলা হয়। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেয়া তাঁর পক্ষে সংগীতকে পেশা
হিসেবে বেছে নেয়া এতটা সহজ ছিলোনা। গীটারের প্রতি ছিলো তাঁর অগাধ ভালোবাসা। এর প্রথম
পদক্ষেপ হিসেবে হাতেখড়ি হয় জেকব ডায়াজ নামের এক বার্মিজের কাছে।
চট্রগাম কলেজে পড়াকালীন সহপাঠীদের নিয়ে গড়ে তোলেন ব্যান্ডদল ‘গোল্ডেন বয়েজ’।
যা পরে নাম বদলে হয় ‘আগলি বয়েজ’। সেই ব্যান্ডের গায়ক ছিল কুমার বিশ্বজিৎ এবং আইয়ুব
বাচ্চু ছিলেন গিটারিস্ট। ১৯৭৭ সালে তিনি যোগ দেন ফিলিংস নামের একটি রক ব্যান্ডে, যেখানে
টানা ৩ বছর জেমসের সাথে কাজ করেছিলেন। আইয়ুব বাচ্চুর অসাধারন গীটার বাজানোর মুগ্ধতায়
সোলস ব্যান্ডের নকীব খান তাকে তাদের সাথে যুক্ত হওয়ার অফার দেন। পরবর্তী ১০ বছর তিনি
সোলস’এর মূল গীটার বাদক, গীতিকার এবং গায়ক(অনিয়মিত) হিসেবে কাজ করে। ১৯৯০ সালে অবশেষে
তাঁর নিজস্ব ব্যান্ড ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’ গঠন করেন, যা পরবর্তী সময়ে ‘লাভ রানস ব্লাইন্ড’
বা সংক্ষেপে ‘এল আর বি’ নামে জনপ্রিয়তা লাভ করে। নিজস্ব ব্যান্ড গঠনের পর তাদের প্রথম
কনসার্টটি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কনসার্টটি বামবা দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল।
১৯৯২ সালে তারা বাংলাদেশের প্রথম ডাবল অ্যালবামঃ এলআরবি ১ এবং এলআরবি ২
প্রকাশ করে। ব্যান্ডটির ৩য় স্টুডিও অ্যালবাম সুখ, যা বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ রক অ্যালবামগুলোর
মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। আর এতে ছিল সেই কালজয়ী গান ‘চলো বদলে যাই’। এরপর আর
পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অল্প কয়দিনের মধ্যেই দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রক ব্যান্ডের মধ্যে
একটি হয়ে উঠে এল আর বি। বাংলাদেশের বাইরে তাদের করা ১ম কনসার্ট ছিল ব্যাংগালোরে। নিউইয়র্কের
ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠান করা তারাই ছিল একমাত্র বাংলাদেশি ব্যান্ড।
শুধু যৌথভাবেই নয়, একক শিল্পী হিসেবেও তিনি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন।
সোলস’এ থাকাকালীন তাঁর ২টি অ্যালবাম বের হয়েছিল। ‘রক্ত গোলাপ’ ও ‘ময়না’ উভয় অ্যালবামেই
মূলত পপ রক গান ছিল। পুরো দেশে ময়না অ্যালবামটির ৬০,০০০ কপি বিক্রি হয়েছিল। ১৯৯৫ সালে
ব্যান্ডের ঘুমন্ত শহরে অ্যালবামের পর নিজের একক অ্যালবাম ‘কষ্ট’ রেকর্ড করেন। ‘কষ্ট
পেতে ভালোবাসি’, ‘ জেগে আছি একা’ র মত জনপ্রিয় গানের সম্মিলন ছিল এই অ্যালবামটিতে।
বরাবরের মত এই অ্যালবামটিও প্রচুর জনপ্রিয় হয়। কারো কারো মতে এটিই ছিল তাঁর সবচেয়ে
জনপ্রিয় অ্যালবাম। এক বছরের ভেতরেই এর ৩ লক্ষ কপি বিক্রিত হয়েছিল।
সংগীত জীবনে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি অনেক সম্মাননাও পেয়েছেন। ব্যান্ড এল আর
বি’র সাথে ৬টি মেরিল প্রথম আলো পুরষ্কার এবং ১ টি সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস
জিতেছেন। ২০০৪ সালে বাচসাস পুরষ্কার জিতেছিলেন সেরা পুরুষ ভোকাল বিভাগে। ২০১৭ সালে
টেলি সিনে আজীবন সম্মাননা পুরষ্কার জিতেছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি বেশ সুখী ছিলেন।
পছন্দের মানুষ ফেরদৌস চন্দনা কে বিয়ে করেছিলেন ১৯৯১ সালের দিকে।
২০১২ সালের দিকে ফুসফুসে পানি জমার কারনে কিছুদিন অসুস্থ ছিলেন। চিকিৎসা
গ্রহন শেষে পরবর্তিতে সুস্থ হোন। কিন্তু প্রকৃতির অমোঘ বিধি। ২০১৮ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত
হয়ে এই লিজেন্ড মৃত্যু বরন করেন। আইয়ুব বাচ্চুকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য চট্রগ্রামের
প্রবর্তক মোড়ে স্থাপন করা হয় ‘রুপালী গীটার’ ভাস্কর্য। তিনি হারিয়ে গেছেন ঠিকই কিন্তু
মানুষের মনে এক বিরাট অংশ জুড়েই রয়েছে তাঁর অস্তিত্ব।
ঢাকা/টিএ