“ভালোবাসার অসম সমীকরণ”

প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬

“ভালোবাসার অসম সমীকরণ”

মানব মনোজগতের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো—ভালোবাসা কখনোই সরলরেখায় চলে না। অনুভূতির ভেতরে থাকে বৈপরীত্য, টানাপোড়েন, অসমতা। একদিকে কেউ কাউকে গভীরভাবে, প্রায় নিঃশর্তভাবে ভালোবাসে; অন্যদিকে সেই ভালোবাসার প্রাপক একই তীব্রতায় সাড়া দিতে পারে না। আবার একই সময়, সেই প্রাপকের মন অন্য কারো প্রতি অস্থির হয়ে ওঠে—যেখানে অনিশ্চয়তা, অপেক্ষা, আকর্ষণ সব মিলেমিশে থাকে। এই জটিল অবস্থানটাই মানব সাইকোলজির এক বাস্তব এবং প্রায়শই দেখা যায় এমন রূপ।




মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, মানুষের ভালোবাসার ধরন একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম। কারো ভালোবাসা নিরাপদ (secure), কারোটা উদ্বিগ্ন (anxious), আবার কারোটা এড়িয়ে চলার প্রবণতাসম্পন্ন (avoidant)। যখন কেউ অত্যন্ত গভীরভাবে ভালোবাসে, তখন তার ভেতরে প্রায়ই একধরনের আবেগিক নির্ভরতা তৈরি হয়। সে তার প্রিয় মানুষটিকে কেন্দ্র করে নিজের অনুভূতি, প্রত্যাশা ও স্বপ্ন গড়ে তোলে। কিন্তু যার প্রতি এই ভালোবাসা নিবেদিত, সে যদি একই মাত্রায় অনুভব না করে, তখন তার মধ্যে অপরাধবোধ, দ্বিধা ও মানসিক চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।



এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক বিষয় কাজ করে—“emotional attraction” বা আবেগিক আকর্ষণ। মানুষ প্রায়ই সেই জিনিস বা মানুষের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়, যা পুরোপুরি সহজলভ্য নয় বা যার মধ্যে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকে। এই অনিশ্চয়তা মস্তিষ্কে ডোপামিনের সাড়া বাড়ায়, যা একধরনের উত্তেজনা ও প্রত্যাশা তৈরি করে। ফলে এমন একজনের প্রতি টান তৈরি হয়, যার একটি ছোট্ট বার্তা বা উপস্থিতিও গভীর প্রভাব ফেলে। এই অপেক্ষা, এই অস্থিরতা—এগুলোই আকর্ষণকে আরও তীব্র করে তোলে।




অন্যদিকে, যে ভালোবাসা খুব সহজলভ্য, স্থির এবং নিশ্চিন্ত—তা অনেক সময় একই রকম উত্তেজনা তৈরি করতে পারে না। এটি অবমূল্যায়ন নয়, বরং মানব মস্তিষ্কের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা। মানুষ নতুনত্ব, অনিশ্চয়তা এবং চ্যালেঞ্জের প্রতি সহজাতভাবে আকৃষ্ট হয়। তাই যে সম্পর্কটি নিরাপদ এবং নিশ্চিত, সেটি কখনো কখনো কম আকর্ষণীয় মনে হতে পারে, যদিও সেটিই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।





এই দ্বৈত অনুভূতির ভেতরে মানুষ প্রায়ই নিজেকে প্রশ্ন করে—কেন এমন হচ্ছে? কেন যে মানুষটি নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে, তাকে একইভাবে ভালোবাসা যায় না? আর কেন সেই মানুষটির জন্য মন অস্থির হয়ে থাকে, যার উপস্থিতি অনিশ্চিত? এর উত্তর একক নয়, বরং এটি অভিজ্ঞতা, মানসিক গঠন, অতীত সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত চাহিদার সম্মিলিত ফল।




মনোবিজ্ঞান বলে, এই ধরনের অনুভূতিকে দমন না করে বুঝতে শেখাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি মানুষের আবেগিক বাস্তবতারই একটি অংশ। এখানে “ঠিক” বা “ভুল” এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সচেতনতা—নিজের অনুভূতি সম্পর্কে সৎ থাকা এবং অন্যের অনুভূতির প্রতিও সংবেদনশীল থাকা।





শেষ পর্যন্ত, ভালোবাসা একটি জটিল মানবিক অভিজ্ঞতা, যেখানে সব অনুভূতি সমানভাবে মেলে না। কেউ বেশি দেয়, কেউ কম পায়; আবার কেউ অপেক্ষা করে, কেউ দূরে সরে যায়। এই অসমতাই মানব সম্পর্ককে যেমন চ্যালেঞ্জিং করে তোলে, তেমনি তা আমাদের নিজের মনকে বুঝতে শেখার একটি গভীর সুযোগও দেয়।



সাবিনা ইয়াসমীন

সম্পাদক-রােদসী

sidebar ad