শায়লা জাহান:
এক ভোরে, আধো-অন্ধকারে, চারদিকে ফজরের আজান হচ্ছিল, জেলগেট দিয়ে বাকের ভাইয়ের লাশ বের করে দেওয়া হয়। সৎকারের পর শোকে স্তব্ধ একাকী মুনা ভোরের আলো-অন্ধকারে ছায়া হয়ে একা প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকে—কোথাও কেউ নেই। নাটকের শেষ দৃশ্য দেখে কারও চোখ পানিতে ভাসেনি, এমন পাওয়া দুষ্কর। বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত এই ধারাবাহিকটি এতটাই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল যে, বাকের ভাইয়ের সম্ভাব্য ফাঁসি ঠেকাতে প্রতিবাদমুখর দর্শকের রাস্তায় ঢল নেমেছিল। কালের সাক্ষী হয়ে থাকা এই সময়গুলো নির্মাণের কারিগর ছিলেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। তাঁকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য সাহিত্যের কোনো শাখার বাঁধনে বাঁধা যাবে না। তাঁর বিচরণ ঘটেছিল উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, নাটক ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনীতে। কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির দর্শকের জন্য নয়, সব শ্রেণির, সব বয়সের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন সমান জনপ্রিয়।
শুরুটা করেছিলেন উপন্যাস লেখার মধ্য দিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় ‘নন্দিত নরকে’ নামে প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য উপন্যাস রচনা করেন। সীমিত পরিসরেই উপন্যাসের আবহ তৈরি করতে পেরেছিলেন তিনি। এরপর একে একে প্রকাশিত হয় ‘শঙ্খনীল কারাগার’ এবং বিজ্ঞান কল্পকাহিনি ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’।
নাটক নির্মাণের ক্ষেত্রেও দেখিয়েছিলেন সুনিপুণ দক্ষতা। বাংলা নাটকের ব্যাকরণই পাল্টে দিয়েছিলেন তিনি। ‘এইসব দিনরাত্রি’ ছিল প্রথম ধারাবাহিক নাটক। এটি এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে, প্রচারের সময় ঢাকার ব্যস্ত রাস্তাগুলো ফাঁকা থাকত। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সুখ-দুঃখ, ভালোবাসা, টানাপোড়েন ও মৃত্যু নিয়ে কাহিনিটি আবর্তিত হয়েছিল। ১৯৮৮-৮৯ সালের দিকে প্রচারিত হয় নাটক ‘বহুব্রীহি’। এটি ছিল মূলত একটি হাস্যরসাত্মক নাটক। এই নাটকের মাধ্যমে তিনি সে সময় মুক্তিযুদ্ধকে নতুনভাবে জাগিয়ে তুলেছিলেন। ‘তুই রাজাকার’—এই একটি সংলাপেই স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ পেয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি বহু একপর্বের নাটক নির্মাণ করেন। ‘খেলা’, ‘অচিন বৃক্ষ’ ও ‘খাদক’ উল্লেখযোগ্য।
১৯৯৪ সালে ‘আগুনের পরশমণি’ চলচ্চিত্র দিয়ে পরিচালনায় অভিষেক ঘটে তাঁর। সাহিত্য যার রক্তে মিশে আছে, তাঁকে কি ধরাবাঁধা নিয়মে বাঁধা যায়? তাই তো চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাওয়া শিক্ষকতার চাকরি থেকে অব্যাহতি দেন তিনি। স্বাধীনতাযুদ্ধভিত্তিক এই ছবিতে ছিল অসাধারণ গল্প ও দুর্দান্ত নির্মাণশৈলীর মিশেল। পরবর্তী সময়ে নিজস্ব উপন্যাস অবলম্বনে মোট আটটি ছবি নির্মাণ করেন। ‘আগুনের পরশমণি’, ‘দারুচিনি দ্বীপ’ ও ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ ছবির জন্য বিভিন্ন বিভাগে মোট ছয়টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জিত হয়েছে।
লিখেছিলেন প্রায় তিন শতাধিক গ্রন্থ। একুশে বইমেলায় ১৯৯০ ও ২০০০ সালে তাঁর বই ছিল বেস্টসেলার। তাঁর জাদুকরী লেখায় কিছু কিছু চরিত্র হয়ে উঠত জীবন্ত। রহস্যময় এক চরিত্র ছিল মিসির আলি, যার প্রথম উপস্থিতি ঘটে ‘দেবী’ উপন্যাসে। মিসির আলির কাহিনিগুলো ক্রাইম ফিকশনের মতো নয়; বরং তা মনস্তাত্ত্বিক ও যুক্তিনির্ভর কাহিনির বুনটে ঠাসা। আবার হিমু চরিত্র ছিল মিসির আলির পুরো বিপরীত। স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের অধিকারী হিমু চলত যুক্তির তাড়নায়। উদাসীন হিমু একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের তরুণদের ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। অনেকেই তখন হিমুর মতো করে হলুদ পাঞ্জাবি পরে জ্যোৎস্নাশোভিত রাতে খালি পায়ে হাঁটার কল্পনা করত।
এত গুণী ও বড় মাপের মানুষ ছিলেন, কিন্তু তাঁর মধ্যে সারাক্ষণই এক উচ্ছ্বল শিশু বাস করত। সময় পেলেই নুহাশ পল্লীতে বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে আড্ডায় মেতে উঠতেন। কখনো বসত গানের আসর। তিনি ছিলেন প্রচণ্ড গানের অনুরাগী। নাটক ও চলচ্চিত্রের প্রয়োজনে গানও রচনা করেছিলেন। ভালোবাসতেন বৃষ্টির শব্দ ও জোছনার বাঁধভাঙা হাসি, যা তাঁর রচিত গানেও প্রকাশ পায়—
যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো
চলে এসো এক বরষায়
অথবা
ও কারিগর, দয়ার সাগর
ওগো দয়াময়
চান্নি পসর রাইতে যেন আমার মরণ হয়
সব মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে, নয় মাস চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০১২ সালের আজকের দিনে (১৯ জুলাই) হুমায়ূন আহমেদ মারা যান। আবেগ আর ভালোবাসায় ভাসিয়ে যে তরুণদের এত দিন দিকনির্দেশনা দিয়ে এসেছেন, সেই কোটি তরুণের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন নুহাশ পল্লীতে।
ঢাকা/শায়লা/লিপি