সুখী পরিবারের প্রথম ধাপ, পরিকল্পিত মাতৃত্ব

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬

সুখী পরিবারের প্রথম ধাপ, পরিকল্পিত মাতৃত্ব

পরিবার হলো একটি ক্যানভাসের মতো। তাতে হরেক রঙের খেলা আর ভালোবাসার বুননে তৈরি হয় একটি সুখী সংসার। রং-তুলির আঁচড়ে একটি সুন্দর জীবন ফুটিয়ে তুলতে প্রয়োজন হয় সঠিক পরিকল্পনার। আর এই ক্যানভাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল রঙ হলো পরিকল্পিত মাতৃত্ব। একটি ক্যানভাসে যেমন হুট করে অনেক রঙ ঢেলে দিলে তাতে সুন্দর কোন শিল্পকর্ম তৈরি হয়না, তেমনি মাতৃত্বের মতো এতো বড় এক দায়িত্ব যদি পরিকল্পিত না হয় তবে তা জীবনের ক্যানভাসে শারীরিক ও মানসিক অশান্তির কারণও হয়ে দাঁড়াতে পারে। সন্তান নেয়ার সিদ্ধান্ত কোনো আবেগের তাড়নায় নয়, হতে হবে দায়বদ্ধ, সচেতন ও প্রস্তুতিময়। একটি শিশুর জন্য শুধু ভালোবাসা নয়, প্রয়োজন পরিকল্পনাও। 


“ নারায়ণগঞ্জে অভাবের তাড়নায় সদ্য জন্ম নেয়া তৃতীয় কন্যা শিশুকে নদীতে ফেলে হত্যার চেষ্টা করেছেন বাবা-মা’’, “স্বামী প্রবাসে, তিনটি শিশু সন্তান নিয়ে একা একা সাংসারিক কাজ এবং তাদের সামলানো নিয়ে হিমশিম খেয়ে সন্তান বিক্রি করে নিখোঁজের নাটক সাজান মা’’, “গাইবান্ধায় অভাবের কারনে দুই সন্তানকে বিক্রি’’- এমন হৃদয়বিদারক খবর মাঝেমধ্যেই সংবাদের শিরোনাম হয়ে আসে।


প্রতিটা ঘটনার পেছনের বাস্তবতা হয়তো আলাদা। কিন্তু যখন একটি পরিবার কোনরুপ প্রস্তুতি ছাড়া, আর্থিক বা মানসিক সক্ষমতা বিবেচনা না করেই একের পর এক সন্তানের দায়িত্ব নেয়, তখন কিছু ক্ষেত্রে চরম অসহায়ত্ব থেকে এই ধরনের হৃদয়বিদারক কাহিনীর জন্ম হয়। আর এইসব ঘটনা বুঝিয়ে দেয় একটি সঠিক পরিবার পরিকল্পনার গুরুত্ব কতটা জরুরী। 


“মা’’ শব্দটি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ও মধুর একটি ডাক। মা হওয়া শুধু একটি অনুভূতি নয়, এটি অনেক বড় এক দায়িত্বও বটে। তাই একটি নতুন প্রাণ পৃথিবীতে আনার সিদ্ধান্ত শুধু আবেগ দিয়ে বিবেচনা করলে হবেনা। এর জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত মাতৃত্বের। কী এই পরিকল্পিত মা্তৃত্ব? মাতৃত্বের পরিকল্পনা বা পূর্ব গর্ভধারণ পরিকল্পনা হলো দম্পতির পারস্পরিক সম্মতিতে সন্তান নেওয়া, সন্তানের সংখ্যা এবং তাদের বয়সের ব্যবধান নির্ধারণের একটি সচেতন ও পরিকল্পিত প্রক্রিয়া। নিরাপদ গর্ভাবস্থা এবং সুষ্ঠুভাবে অভিভাবকত্ব শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এতে স্বাস্থ্যগত, আর্থিক ও জীবনসংক্রান্ত প্রস্তুতি অন্তর্ভুক্ত থাকে। এর মধ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবার পরিকল্পনার পদ্মতি ব্যবহার, গর্ভধারনের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, দীর্ঘমেয়াদী রোগ নিয়ন্ত্রণ, প্রয়োজনীয় টিকা এবং চিকিৎসকের পরামর্শও অন্তর্ভুক্ত। 


কেন পরিকল্পিত মাতৃত্ব জরুরি?

- পরিবার পরিকল্পনা নারীদের গর্ভাবস্থার সময়কাল ও পূর্বে সন্তান থাকলে তাদের জন্মের মধ্যবর্তী বিরতি নির্ধারণের সুযোগ করে দিয়ে মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়তা করে। সন্তান নেওয়া বা না নেওয়ার বিষয়ে এই সিদ্ধান্ত গ্রহনের স্বাধীনতা গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মৃত্যুর আশংকা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে এবং পাশাপাশি দুটি গর্ভাবস্থার মধ্যবর্তী সময়ে স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও সুযোগ করে দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, একটি জীবিত সন্তান জন্মদানের পরবর্তী গর্ভধারণের আগে কমপক্ষে ২৪ মাস অপেক্ষা করা ভালো। 


- পরিবার পরিকল্পনা শিশুদের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য ও সুস্থতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, পর পর বা অনুপযুক্ত সময়ে বা কম বিরতিতে গর্ভধারণ ও সন্তান প্রসবের ফলে শিশু মৃত্যুর হার বেড়ে যায়। পরিকল্পিত মাতৃত্ব নারীদের নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর উপায়ে সন্তান জন্মদান এবং শিশুদের উন্নত পুষ্টিপ্রাপ্তি নিশ্চিত করে। 


- পরিবারের আর্থিক অবস্থার জন্য এটা অনেক ফলপ্রসূ। শুধু চাইলাম আর সন্তান নিলাম, ব্যাপারটা এতো সহজ না। সন্তানের বর্তমান আর ভবিষ্যতের বিভিন্ন প্রয়োজন যেমন গর্ভাবস্থা ও চিকিৎসা খরচ থেকে শুরু করে সন্তানের শিক্ষা, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান অর্থাৎ তার সকল মৌলিক চাহিদা পূরণে বাবা-মায়ের সক্ষমতার বিষয়টিও এখানে বিবেচ্য বিষয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী দম্পতিরা তাদের আয় ও জীবনযাত্রার উপর ভিত্তি করে সন্তানের সংখ্যা নির্ধারণে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। 


- একজন সুস্থ মা মানেই সুস্থ সন্তান। গর্ভধারনের আগে মায়ের স্বাস্থ্য যদি ভালো থাকে, তবে গর্ভকালীন জটিলতা, অপুষ্টি, রক্তশূন্যতা, বাচ্চার জন্মগত সমস্যার ঝুঁকি কমতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আগে থেকেই যদি ব্যবস্থা নেয়া যায়, তবে অনেক সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে। পরিকল্পিত মাতৃত্বের মাধ্যমে গর্ভধারনের আগে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন শারীরিক পরীক্ষা, টিকা, পুষ্টি, বিশ্রাম এবং প্রসব-পরবর্তী সম্ভাব্য জটিলতার ব্যাপারে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়ার সকল প্রস্তুতি নিয়ে জেনে রাখা যায়। এতে যে কোন পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত দেয়ার সক্ষমতা তৈরি হয়।    


- সর্বোপরি, পরিবার পরিকল্পনা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তোলে। পরিকল্পিত মাতৃত্ব মানে এই নয় যে শিশুকে ভালোবাসা হবে কম। বরঞ্চ সন্তান নেওয়ার সময় পরিকল্পনা থাকলে বাবা-মা প্রতিটি সন্তানকে এবং একে অপরকে পর্যাপ্ত সময় এবং মনোযোগ দিতে পারেন। শুধু তাই নয়, বাচ্চারা জন্ম থেকেই পায় স্থিতিশীল পরিবেশ। এতে তাদের মানসিক গঠন হয় শক্ত ও আত্মবিশ্বাসী।  


একটি সুখী পরিবারের ভিত্তি শুধু ভালোবাসার উপর নয়, সচেতনভাবে পদক্ষেপ নেয়া সকল সিদ্ধান্তের উপর দাঁড়িয়ে থকে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে খোলামেলা আলোচনা করে যৌথ সিদ্ধান্তে নেয়া এই পরিকল্পিত মাতৃত্ব শুধুমাত্র যে মা ও শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে তা কিন্তু নয়, বরং পুরো পরিবারের মানসিক, সামাজিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। 

স্বাস্থ্য বিষয়ে যেকোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সুস্থ পরিবার, সচেতন জীবন- এই বার্তাই রোদসীর অঙ্গীকার। 

 

লেখা- শায়লা জাহান

sidebar ad