নার্সিসিজমঃ আয়নায় বন্দী এক আমি!

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬

নার্সিসিজমঃ আয়নায় বন্দী এক আমি!

নার্সিসিজম যাকে আমরা মোটা দাগে আত্মপ্রেম বলে থাকি, কমবেশি সকলেরই এই ব্যাপারে হালকা ধারণা আছে। যদিও এই শব্দটির মিনিং কিছুটা নেগেটিভ অর্থেই ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আসলেই নার্সিসিজম ভাব থাকা কি খারাপ লক্ষণ? নার্সিসিস্ট ব্যক্তি কি আসলেই স্বার্থপরতার দেয়ালে আবদ্ধ? এইসব ব্যাপারেই আজ জানবো আমরা। 


নিজের প্রশংসা শুনতে কে না ভালোবাসে। মানুষ সর্বক্ষেত্রেই নিজের গুনগান শুনতে পছন্দ করে। আত্মপ্রেম বা নার্সিসিজম হলো একটি স্ব-কেন্দ্রিক ব্যক্তিত্ত্বের শৈলী যা মূলত আত্মমগ্নতা, নিজের গুণ সম্পর্কে অতিরঞ্জিত ধারণা পোষণ করা, নিজের প্রতি নিজেই অতিরিক্ত মুগ্ধ থাকা এবং সর্বোপরি, নিজের জীবনে অন্য কাউকে অতটা গুরুত্ব না দেয়াকে বুঝায়। সীমিত পরিসরে এটি সাধারণ জীবনের একটি অংশ। এর নামের পেছনে অনেক চমকপ্রদ কাহিনী লুকিয়ে আছে। নার্সিসিজম শব্দটি এসেছে রোমান কবি ওভিডের মেটামরফোসেস থেকে। পৌরাণিক গল্পে বলে, নার্সিসাস নামে এক সুদর্শন যুবক যে কিনা অনেকের প্রেমের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতো। ইকো নামের এক দেবীর প্রেম নিবেদন যখন সে প্রত্যাখ্যান করে, তখন ইকো তাকে অভিশাপ দেয় যে একসময় সে তার নিজের রুপের দেমাগে নিজেই কাবু হবে। ব্যাপারটিও সত্যি ফলে গেলো। একদিন সে পানি খেতে যেয়ে পুকুরে নিজের ছায়া দেখে নিজেই মুগ্ধ হয়ে যায়। এভাবেই তাকিয়ে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা, দিনের পর দিন। আর এভাবেই সে মারা যায়। অত্যধিক স্বার্থপরতার ধারণাটি ইতহাস জুড়ে স্বীকৃত। ১৮০০ এর দশকের শেষের দিকে নার্সিসিজমকে মনস্তাত্ত্বিক পরিভাষায় সংজ্ঞায়িত করা শুরু হয়। সেই সময় থেকে মূলত, নার্সিসিজম শব্দটি মনোবিজ্ঞানের অর্থে একটি উল্লেখযোগ্য ভিন্নতা নিয়ে এসেছে। 


নার্সিসিস্টিক আচরণের আওতায় দুটি ভিন্ন ধরনের নার্সিসিজম দেখতে পাওয়া যায়। এই ধরনের আচরণের বৈশিষ্ট্য সাধারণত শৈশব অভিজ্ঞতা থেকে নিজের মাঝে ধারন করা হয়। প্রথমটিকে বলা হয়, গ্র্যান্ডিওজ নার্সিসিজম। শৈশবকালে এই আচরণের লোকদের সাথে সম্ভবত এমন আচরণ করা হয়েছিলো যেন তারা আপার ক্লাসের এবং অন্য সবার থেকে উপরে। পরবর্তীতে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সাথে সাথে এই প্রত্যাশাগুলো তাদের অনুসরণ করতে পারে। গ্র্যান্ডিওজ নার্সিসিজম যাদের আছে তারা কিছুটা আক্রমণাত্মক, প্রভাবশালী এবং তাদের গুরুত্বকে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করে। 

আরেক ধরনের আছে যারা দূর্বল নার্সিসিজমের আওতায় পড়ে। এই আচরণ সাধারণত শৈশব অবহেলা বা অপব্যবহারের ফলাফল। এরা অন্তর্মুখী ও লাজুক প্রকৃতির হয়ে থাকে। সরাসরি অহংকার দেখানোর চাইতে নিজেদের ভিকটিম হিসেবে উপস্থাপন করে সহানুভূতি পেতে চান। এরা খুবই সংবেদনশীল হন এবং কোন ধরনের সমালোচনা সহজে মেনে নিতে চান না। 


নার্সিসিজমের লক্ষণ

আত্মপ্রেম একটি সহজাত প্রবৃত্তি। প্রত্যেকেরই ভেতর সময়ে সময়ে নার্সিসিস্টিক প্রবণতা থাকে। এর স্বাস্থ্যকর মাত্রা বিদ্যমান থাকলেও, নার্সিসিজমের আরও চরম মাত্রা রয়েছে, বিশেষ করে যারা আত্মমগ্ন ব্যক্তিদের মধ্যে দেখা যায় অথবা যাদের নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারের মতো প্যাথলজিকাল মানসিক রোগ রয়েছে। এই প্রবণতাগুলো তখনই ব্যক্তিত্ত্বের ব্যাধিতে পরিণত হয় যখন এটি ব্যক্তির কাজ করার এবং অন্যদের সাথে জড়িত হওয়ার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। নার্সিসিস্টিক আচরণের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা দেখে শনাক্ত করা যাবে-

- নার্সিসিস্টের জগৎ ঘিরে থাকে ভাল-খারাপ, উচ্চতর-নিকৃষ্ট এবং সঠিক-ভুল সম্পর্কে। একটি সুনির্দিষ্ট শ্রেনীবিন্যাস আছে, যেখানে নার্সিসিস্ট শীর্ষে থাকে এবং সেখানেই সে নিরাপদ বোধ করে। তাদের হতে হবে সেরা, সবচেয়ে সঠিক এবং সবচেয়ে যোগ্য। 

- এই বৈশিষ্ট্যের অধিকারীদের যতই প্রশংসা করা হোক না কেন কিংবা তাদের ভালোবাসেন তা বলা হোক না কেন, তারা কখনোই এটি যথেষ্ট বলে মনে করেনা। কারণ গভীরভাবে তারা বিশ্বাস করতে চায়না যে কেউ তাদের ভালোবাসতে পারে। তাদের সমস্ত আত্মমগ্নতা, বড় বড়াই করা সত্ত্বেও, নার্সিসিস্টরা আসলে নিজেদের খুব অনিরাপদ মনে করে। 

- কোন কাজ পরিকল্পনা অনুসারে বা নিখুঁত না হয়ে থাকে এবং সেখানে যদি সমালোচিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে সেক্ষেত্রে তারা কখনোই ফলাফলের জন্য দায় ভার নিতে চায়না। সমস্ত দোষ এবং দায়িত্ব অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়। প্রায়শই নার্সিসিস্ট এমন ব্যক্তিকে দোষারোপ করে থাকে যে তার জীবনে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। 

- এদের অন্যদের প্রতি সহানুভূতি দেখানোর ক্ষমতা কম। তারা কিছুটা স্বার্থপর এবং অন্যরা আসলে কি অনুভব করছে তা বুঝতে অক্ষম। সহানুভূতির এই অভাব সত্যিকারের সম্পর্ক এবং নার্সিসিস্টদের সাথে মানসিক সংযোগকে কঠিন বা অসম্ভব করে তোলে। 

- তাদের সমগ্র জীবন ভয় দ্বারা ঘিরে থাকে। তারা ক্রমাগত উপহাস, প্রত্যাখ্যান বা ভূল হওয়ার ভয় পায়। 


এখন মনে প্রশ্ন আসতে পারে হেলদি নার্সিসিস্ট আদৌ আছে কি? নার্সিসিজম শব্দটা এমন যা প্রায়শই খারাপ কিছুর সাথে দেখা হয়। এর পাশে হেলদি বা পজেটিভ নার্সিসিজম? কিছুটা ভুল নাম বলে মনে হচ্ছে? আত্মকেন্দ্রীক, সহানুভূতির অভাবের মতো বৈশিষ্ট্যের অধিকারী নার্সিসিজমের এমন কোন পজেটিভ দিক সত্যিই থাকতে পারে? নার্সিসিজম হলো আপনি অন্যদের সাথে নিজেকে কীভাবে দেখেন। পজেটিভ নার্সিসিজম তখনই সম্ভব যখন আপনার ব্যক্তিত্ত্বের বৈশিষ্ট্যগুলো ইতিবাচক পর্যায়ে থাকে এবং তা প্রকাশে কোন সীমা অতিক্রম না করে। সুস্থ নার্সিসিজমের ধারণাটি প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলে আসছে, যদিও গবেষকরা এখনো এটি সম্পর্কে একমত হতে পারেনি। সিগমুন্ড ফ্রয়েড সর্বপ্রথম এটিকে মানুষের মানসিকতার একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখিয়েছিলেন যদিনা একে চরম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়। 


সামনে চলার জন্য অনুপ্রেরণা পেতে, কাজে প্রশান্তি পেতে আত্মপ্রেম থাকা ভালো। তবে তা হতে হবে পজেটিভ ওয়েতে। যদি নিজের আচরণগুলো পজেটিভ না নেগেটিভ তা ব্যাপারে নিশ্চিত না হন তবে কোন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া যেতে পারে। এতে নিজেকে আরও ভালোভাবে জানতে এবং নিঃস্বার্থ আচরণের একটি সুস্থ ভারসাম্য গড়ে তুলতে সাহায্য হতে পারে।


লেখা: শায়লা জাহান

sidebar ad