সবসময় অন্যদের বুঝতে বুঝতে অনেক মানুষ একসময় নিজের অনুভূতি, কষ্ট আর প্রয়োজনগুলো চেপে রাখতে শিখে যায়। তারা ভাবে,বললে যদি ভুল বোঝে?অন্যরা বিরক্ত হবে না তো?আমার চাওয়াটাই হয়তো বেশি।অথচ না বলা প্রয়োজন ধীরে ধীরে জমে অভিমান হয়,দূরত্ব হয়, কখনো মানসিক ক্লান্তিতেও বদলে যায়।
নিজের প্রয়োজন প্রকাশ করা স্বার্থপরতা নয়, এটা আত্মসম্মান,মানসিক সুস্থতা আর সুস্থ সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।যে মানুষ নিজের মনের কথা সম্মান দিয়ে বলতে শেখে, সে সম্পর্কেও বেশি শান্তি খুঁজে পায়,নিজেকেও কম হারিয়ে ফেলে।
নিজের প্রয়োজন বলতে আসলে কি বুঝায়:
নিজের প্রয়োজন বলতে বুঝায়,মানসিক,আবেগিক, শারীরিক বা ব্যক্তিগত সেই চাহিদাগুলো,যেগুলো পূরণ হলে একজন মানুষ স্বস্তি, সম্মান,নিরাপত্তা ও শান্তি অনুভব করে।
এটা শুধু টাকা-পয়সা বা বস্তুগত কিছু নয়।অনেক সময় নিজের প্রয়োজন হতে পারে,একটু গুরুত্ব পাওয়া।সম্মান দিয়ে কথা শোনা।মানসিক শান্তি
একা কিছু সময় কাটানো
ভালোবাসা ও যত্ন
নিরাপত্তা অনুভব করা।
ক্লান্ত হলে সাহায্য চাওয়া।
নিজের মতামত প্রকাশ করার সুযোগ পাওয়া।
অনেক মানুষ ছোটবেলা, সম্পর্ক বা সমাজের চাপে নিজের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে ভুলে যায়।তারা শুধু অন্যদের খুশি রাখতে ব্যস্ত থাকে।
কিন্তু সত্য হলো, নিজের প্রয়োজন অস্বীকার করতে করতে মানুষ ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
নিজের প্রয়োজন বোঝা মানে নিজেকে বোঝা।আর সেটা প্রকাশ করতে শেখা মানে নিজের অস্তিত্ব ও অনুভূতিকে সম্মান করা।
অনিমা সবসময় সবার কথা ভাবত।পরিবার,বন্ধু, সম্পর্ক,সবাইকে খুশি রাখতেই যেন তার জীবন। কেউ কিছু চাইলে না বলতে পারত না।নিজের ক্লান্তি,মন খারাপ বা প্রয়োজনের কথা সে কখনো স্পষ্ট করে বলত না।তার মনে হতো,আমার জন্য কাউকে বিরক্ত কেন করবো?
একদিন অফিস থেকে খুব ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরেও অনিমা রান্না,সবার খেয়াল রাখা,সব দায়িত্ব একাই সামলাতে লাগলো।ভেতরে ভেতরে সে চাইছিল একটু সাহায্য,একটু যত্ন,শুধু কেউ এসে বলুক,তুমি বসো, আজ আমি করি।কিন্তু সে কিছুই বলল না।
ধীরে ধীরে অনিমা খিটখিটে হয়ে যেতে লাগলো।ছোট ছোট বিষয়ে কষ্ট পেত, অভিমান জমতো
আশেপাশের মানুষ ভাবতো, ও হঠাৎ এত বদলে গেল কেন?অথচ কেউ বুঝতেই পারছিল না,অনিমা কখনো তার প্রয়োজনগুলো ভাষায় প্রকাশই করেনি।
একদিন তার এক বন্ধু তাকে বলেছিল,মানুষ তোমার মন পড়তে পারবে না অনিমা।তুমি না বললে কেউ বুঝবে কীভাবে তোমারও ক্লান্তি হয়, তোমারও যত্ন দরকার?
সেদিন অনিমা প্রথমবার বুঝেছিল,নিজের প্রয়োজন প্রকাশ করা দুর্বলতা নয়।
সবসময় চুপ থেকে নিজেকে কষ্ট দেওয়ার নামও ভালোবাসা নয়। মাঝে মাঝে নিজের মনের কথাটাও সাহস করে বলতে হয়।
কিভাবে প্রকাশ করা যায়:
নিজের প্রয়োজন প্রকাশ করা আসলে খুব জটিল কিছু না, কিন্তু আমাদের অনেকের জন্য এটা কঠিন লাগে,কারণ আমরা ভয় পাই,লজ্জা পাই বা অভ্যাস নেই।ধীরে ধীরে একটু সচেতনভাবে চেষ্টা করলেই এটা শেখা যায়।
প্রথমেই, দরকার নিজের প্রয়োজনটা পরিষ্কারভাবে বোঝা।তুমি আসলে কী চাইছো,সময়,সাহায্য, সম্মান,না মানসিক সাপোর্ট?যখন নিজের ভেতরে স্পষ্টতা আসে, তখন বলা সহজ হয়।
তারপর,সেটা সরাসরি কিন্তু শান্তভাবে বলা শেখা জরুরি।ঘুরিয়ে না বলে সহজভাবে বলা যায়,আমি একটু ক্লান্ত,আমাকে একটু সাহায্য করলে ভালো লাগবে। বা আমি চাই তুমি আমার কথাটা একটু মন দিয়ে শোনো।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সঠিক সময় বেছে নেওয়া।রাগের মুহূর্তে না বলে শান্ত সময়ে বললে মানুষও বেশি বুঝতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, “আমি” দিয়ে কথা বলা। যেমন,তুমি কিছুই করো না। না বলে বলা।
আমি একটু একা অনুভব করছি,তাই তোমার সাহায্য দরকার।শুরুতে অস্বস্তি লাগতে পারে,কিন্তু ধীরে ধীরে এটা অভ্যাসে পরিণত হয়। আর একবার নিজের প্রয়োজন প্রকাশ করতে শিখলে,সম্পর্কও অনেক বেশি স্বচ্ছ আর শান্ত হয়ে ওঠে।
শেষে একটা কথা মনে রাখা খুব জরুরি,সবাইকে খুশি করতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলা,কোনোভাবেই জীবনের সঠিক পথ না। মানুষের কথা,আচরণ বা প্রভাব সবসময় নিয়ন্ত্রণ করা যায় না,কিন্তু নিজের মানসিক শান্তি আর আত্মসম্মান রক্ষা করা আমাদের নিজের দায়িত্ব।
যে মানুষ তোমাকে ছোট করে,তোমার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেয় না বা সবসময় তোমাকে ভেতর থেকে দুর্বল করে ফেলে।তাদের থেকে একটু দূরত্ব নেওয়াও অনেক সময় আত্মরক্ষার অংশ।নিজের মূল্য বোঝো, নিজের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দাও,আর মনে রেখো,তুমি যেমন অনুভব করো, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।জীবন তখনই একটু সহজ হয়, যখন তুমি নিজেকে প্রাধান্য দিতে শেখো, কিন্তু অন্যকে অসম্মান না করেই।
লেখাঃ ইশরাত জাহান ইনা