কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন মানে কি?
এর মানে হলো,দুই বা তার বেশি মানুষের মধ্যে যে ঝগড়া,মতবিরোধ বা সমস্যা হয়,সেটাকে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা।সহজভাবে বললে:
ঝগড়া মিটিয়ে সমাধান বের করা।
উদাহরণ:
দুই বন্ধুর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে,তারা কথা বলে বিষয়টা ঠিক করে নেয়।অফিসে সহকর্মীদের মধ্যে মতভেদ,আলোচনা করে একটা মাঝামাঝি সিদ্ধান্ত নেয়।এগুলোই কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন এর উদাহরণ।
কীভাবে করা হয়?
কথা বলে সমস্যাটা বোঝা
অন্যের দিকটা শোনা
সমাধানের পথ খোঁজা
কখনো সমঝোতা করা।
কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন এর সহজ কৌশল:
#আগে শান্ত হন রাগের মাথায় কথা বললে সমস্যা বাড়ে।একটু সময় নিয়ে শান্ত হয়ে কথা বলুন।
#অন্যের কথা মন দিয়ে শুনুন।শুধু উত্তর দেওয়ার জন্য নয়,বোঝার জন্য শুনুন।
#দোষারোপ না করে অনুভূতি বলুন তুমি সবসময় ভুল।না বলে।
তোমার কথায় আমি কষ্ট পেয়েছি বলুন।
#সমস্যার মূল কারণ খুঁজুন
অনেক সময় ঝগড়ার পেছনে থাকে ভুল বোঝাবুঝি,চাপ বা অবহেলা।
#জেতার নয়,সমাধানের চেষ্টা করুন।
সম্পর্কে আমি জিতলাম ভাবনা কমিয়ে আমরা কিভাবে ঠিক হবো ভাবুন।
#সমঝোতা করতে শিখুন
সবসময় নিজের কথাই ঠিক হবে না।মাঝামাঝি পথ অনেক সময় সবচেয়ে ভালো সমাধান।
#প্রয়োজনে একটু বিরতি নিন।কথা খুব উত্তপ্ত হলে কিছু সময় চুপ থাকা ভালো।
#ক্ষমা চাইতে ও ক্ষমা করতে শিখুন।একটা আন্তরিক সরি অনেক সম্পর্ক বাঁচিয়ে দেয়।
কনফ্লিক্ট হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু সেটাকে কিভাবে সামলানো হচ্ছে সেটাই সম্পর্কের আসল পরীক্ষা।
স্বামী স্ত্রী মধ্যে যখন কনফ্লিক্ট হয়:
স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন সবচেয়ে বেশি কাজ করে তখনই, যখন দুজনই কে ঠিক এটা প্রমাণ না করে সম্পর্কটা কিভাবে ভালো রাখা যায় সেটা ভাবেন।
কিভাবে মেটাবেন
#রাগের সময় সিদ্ধান্ত নয়
খুব রেগে থাকলে কথা থামান। তখন বলা অনেক কথা পরে আফসোসের কারণ হয়।
#একে অপরকে শেষ পর্যন্ত শুনুন,মাঝখানে থামাবেন না।অনেক ঝগড়া হয় কারণ মানুষ নিজেকে শোনা হয়নি মনে করে।
#পুরনো ভুল টেনে আনবেন না।বর্তমান সমস্যার সাথে ৫ বছর আগের ঘটনা জুড়ে দিলে সমাধান দূরে সরে যায়।
#তুমি এমন না বলে আমি কষ্ট পাই বলুন।অভিযোগ কম,অনুভূতি বেশি প্রকাশ করুন।তুমি আমাকে গুরুত্ব দাও না এর বদলে
তুমি ব্যস্ত থাকলে আমি একা অনুভব করি।
#জেদ কমিয়ে সমাধান খুঁজুন।সব কথায় জিততে গেলে সম্পর্ক হারে।
#ছোট ছোট যত্ন ফিরিয়ে আনুন।একসাথে খাওয়া, খোঁজ নেওয়া,ধন্যবাদ বলা।এসব ছোট বিষয়ই দূরত্ব কমায়।
#সন্তান বা পরিবারের সামনে ঝগড়া কম করুন
এতে সম্পর্কের চাপ পুরো পরিবারে ছড়িয়ে পড়ে।
#প্রয়োজন হলে তৃতীয় কারো সাহায্য নিন
বিশ্বস্ত বড় কেউ, কাউন্সেলর বা পারিবারিক পরামর্শ অনেক সময় সম্পর্ক বাঁচাতে সাহায্য করে।
স্বামী–স্ত্রীর সম্পর্কে মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু সম্মান, ধৈর্য আর যোগাযোগ থাকলে অনেক ভাঙা সম্পর্কও আবার ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যায়।
ভাইবোন এর মধ্যে কনফ্লিক্ট হলে:
ভাইবোনের মধ্যে কনফ্লিক্ট হলে কিভাবে মিটমাট করবেন?
ভাইবোনের সম্পর্ক খুব গভীর হয়,তাই অভিমানও বেশি হয়।ছোট ভুল বোঝাবুঝি জমতে জমতে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
*আগে শান্ত হয়ে কথা বলুন।রাগের সময় তর্ক না বাড়িয়ে একটু সময় নিন। পরে শান্তভাবে কথা বললে সমাধান সহজ হয়।
*তুলনা করা বন্ধ করুন।ও ভালো,তুমি খারাপ। এমন কথা সম্পর্ক নষ্ট করে। প্রত্যেকের জীবন আলাদা।
*পুরনো ঝগড়া বারবার তুলবেন না।একই পুরনো কষ্ট বারবার মনে করালে নতুন করে আঘাত লাগে।
*একে অপরের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করুন
অনেক সময় আচরণের পেছনে চাপ,কষ্ট বা ভুল বোঝাবুঝি থাকে।
*সম্মান রেখে কথা বলুন
ভাইবোন হলেও অপমানজনক কথা মনে দাগ ফেলে দেয়।
*প্রয়োজন হলে আগে নিজেই এগিয়ে যান
সবসময় ও আগে আসুক ভাবলে দূরত্ব বাড়ে।একটা ছোট মেসেজ বা খোঁজ নেওয়াও সম্পর্ক জোড়া লাগাতে পারে।
*পরিবারকে যুদ্ধক্ষেত্র বানাবেন না।
বাবা–মাকে মাঝখানে ফেলে পক্ষ নেওয়ানো পরিস্থিতি আরও খারাপ করে।
*একসাথে সময় কাটান
পুরনো স্মৃতি,গল্প, একসাথে খাওয়া বা কোথাও ঘুরতে যাওয়া সম্পর্ক নরম করে দেয়।
বন্ধু হারালে নতুন বন্ধু পাওয়া যায়, কিন্তু ভাইবোনের সম্পর্ক জীবনে একটাই।তাই অহংকারের চেয়ে সম্পর্কটাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া অনেক সময় সবচেয়ে বড় জিত।
দুই বন্ধুর মধ্যে:
দুই বন্ধুর মধ্যে কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন কিভাবে করবেন,
বন্ধুত্বে ভুল বোঝাবুঝি, অভিমান বা মতের অমিল হওয়া স্বাভাবিক।কিন্তু সঠিকভাবে সামলাতে পারলে সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে।
*সরাসরি কথা বলুন
তৃতীয় কারো মাধ্যমে নয়। নিজের অনুভূতি নিজেই শান্তভাবে বলুন।
*আগে শুনুন, পরে উত্তর দিন।বন্ধু কেন কষ্ট পেয়েছে সেটা বোঝার চেষ্টা করুন।
*ইগো কমান।সবসময় কে ঠিক সেটা প্রমাণ করতে গেলে বন্ধুত্ব দূরে সরে যায়।
*ভুল হলে স্বীকার করুন
একটা আন্তরিক সরি,অনেক দূরত্ব কমিয়ে দেয়।
*ছোট বিষয় বড় করবেন না।সব কথায় সম্পর্ক ভাঙার সিদ্ধান্ত নিলে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব টেকে না।
*সীমা ও সম্মান বজায় রাখুন।মজা করতে গিয়ে এমন কিছু বলবেন না যা অপমান লাগে।
*সময় দিন।কখনো কখনো মানুষকে একটু স্পেস দিলেও সম্পর্ক ঠিক হয়ে যায়।
*ভালো স্মৃতিগুলো মনে করুন।একটা ঝগড়ার জন্য পুরো বন্ধুত্বকে বিচার না করে ভালো। সময়গুলোকেও মূল্য দিন।
সত্যিকারের বন্ধু সবসময় নিখুঁত হয় না।কিন্তু ভুল বোঝাবুঝির পরও যারা একে অপরকে বুঝতে চায়, তাদের বন্ধুত্বই সবচেয়ে বেশি টিকে থাকে।
রাহাত আর সায়েম ছোটবেলার দুই বন্ধু। একসাথে স্কুল, মাঠ, ক্রিকেট সবকিছুতেই তারা ছিল জুটি।সবাই বলতো, এই দুইজনকে আলাদা করা যাবে না।
কিন্তু একদিন একটা ছোট ঘটনা বড় হয়ে গেল। পরীক্ষায় রাহাত একটু বেশি নম্বর পেয়েছিল,আর সায়েমের মনে হলো—রাহাত নাকি তাকে সাহায্য করেনি,ইচ্ছা করেই দূরে সরে গেছে। রাগে সায়েম আর রাহাতের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিল।
রাহাত প্রথমে কিছু বুঝতেই পারেনি।পরে যখন বুঝলো, সেও জেদ ধরে বলল, আমি তো কিছু ভুল করিনি।এভাবেই দুজনের মধ্যে নীরবতা বাড়তে লাগলো।মাঠে দেখা হলেও কেউ আর আগের মতো কথা বলে না।দিনগুলো বদলাতে লাগলো। হাসি কমে গেল,গল্প কমে গেল, আর বন্ধুত্বটা ধীরে ধীরে অচেনা হয়ে গেল।একদিন স্কুলে খেলার সময় সায়েম পড়ে গিয়ে আঘাত পেল। সবাই যখন দৌড়ে গেল, রাহাতও থেমে থাকতে পারল না,সেও ছুটে গিয়ে সাহায্য করল।সায়েম তখন চুপচাপ রাহাতের দিকে তাকিয়ে রইল।অনেকদিনের জমে থাকা অভিমান ভেঙে গলায় আটকে থাকা কথাটা বের হয়ে এলো—
আমি তোকে ভুল বুঝেছিলাম।
রাহাত একটু হাসল,বলল,
আর আমি তোকে বোঝানোর সুযোগ দিইনি।
সেদিন তারা শুধু ঝগড়া মেটায়নি,তারা আবার বন্ধুত্বটাকেও খুঁজে পেয়েছিল।
অনেক সম্পর্ক ভাঙে না বড় সমস্যায়,ভাঙে ছোট ভুল বোঝাবুঝি আর কথা না বলায়।একটু কথা, একটু বোঝাপড়া,অনেক দূরত্ব সহজেই কমিয়ে দিতে পারে।
সমাধান (কনফ্লিক্ট মেটানোর সহজ উপায়)
যে গল্পটা হলো রাহাত আর সায়েমের,তার আসল সমাধানটা ছিল খুব সাধারণ কয়েকটা জিনিসে,
*ভুল বোঝাবুঝি পরিষ্কার করা।
*সায়েম যদি প্রথমেই রাহাতকে জিজ্ঞেস করত, তুই কি আমাকে ইচ্ছা করে বাদ দিয়েছিস?তাহলে সমস্যা বড় হতো না।
*কথা বলা বন্ধ না করা
নীরবতা সম্পর্ককে ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে দেয়। কথা বললেই অনেক সমস্যা ছোট হয়ে যায়।
*ইগো না ধরা
আমি ঠিক,ও ভুল —
এই চিন্তা দুজনেই ধরেছিল বলেই দূরত্ব বেড়েছিল।
*সরাসরি অনুভূতি বলা
আমি কষ্ট পেয়েছি —
এই একটা বাক্য অনেক ঝগড়া শেষ করতে পারে।
*ছোট ভুল মাফ করা
সব ভুল ইচ্ছাকৃত না—
এটা বুঝতে পারলেই সম্পর্ক সহজ হয়।
*আবার একসাথে সময় দেওয়া।
*পুরনো বন্ধন ফিরিয়ে আনতে একসাথে সময় কাটানো খুব জরুরি।
শেষ কথা
সমাধান কোনো জটিল বিষয় না,
# একটু কথা
#একটু বোঝা
#আর একটু ইগো কমানো
এই তিনটা থাকলে ভাঙা সম্পর্কও অনেক সময় আবার জোড়া লাগে।
লেখাঃ ইশরাত জাহান ইনা