স‍্যোসাল মিডিয়ার গুজব কতটা ভয়ংকর হতে পারে!

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৬

স‍্যোসাল  মিডিয়ার গুজব কতটা ভয়ংকর হতে পারে!

একসময় খবর মানুষের কাছে পৌঁছাতো পত্রিকা, টেলিভিশন কিংবা রেডিওর মাধ্যমে। তথ্য প্রকাশের আগে তা যাচাই করার একটি প্রক্রিয়া ছিল। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে তথ্য ছড়ানোর মাধ্যম বদলে গেছে। এখন একজন সাধারণ মানুষও কয়েক সেকেন্ডে একটি পোস্ট, ছবি বা ভিডিও দিয়ে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।

 

এই সহজলভ্যতা যেমন একটি বড় সুবিধা, তেমনি এটি একটি বড় বিপদের কারণও হয়ে উঠছে। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো তথ্যের অনেকটাই যাচাই করা হয় না। আর যখন মানুষ যুক্তি দিয়ে চিন্তা না করে, যাচাই না করেই তথ্য বিশ্বাস করেতখন সেই ভুল তথ্য বা গুজব সমাজে ভয়ংকর প্রভাব ফেলতে পারে। আজকের বাস্তবতায় বলা যায়, গুজবের আগুন এখন খুব দ্রুত ছড়ায়, আর সেই আগুনকে জ্বালিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়া।

 

গুজব কেন এত দ্রুত ছড়ায়

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলোএখানে তথ্য খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একটি পোস্ট কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। সমস্যা হলো, এই পোস্টগুলোর অনেকগুলোই সত্য নয়। অনেক সময় পুরনো ছবি নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়, অন্য দেশের ঘটনা নিজের দেশের বলে প্রচার করা হয়, অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে হেয় করার জন্য মিথ্যা গল্প তৈরি করা হয়। কিন্তু যারা তথ্য যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তোলেননি, তারা এসব পোস্টকে সত্য মনে করে দ্রুত শেয়ার করতে থাকেন। ফলে একটি মিথ্যা তথ্য মুহূর্তের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যায়। গুজবের এই দ্রুত বিস্তারই সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

সাবিনা ইয়াসমীন

সম্পাদক, রোদসী

 

আবেগের সুযোগ নেয় মিথ্যা প্রপাগান্ডা

 

গুজব বা প্রপাগান্ডা ছড়ানোর পেছনে একটি বড় কৌশল থাকেমানুষের আবেগকে ব্যবহার করা।ধরা যাক, কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে একটি উত্তেজনাপূর্ণ পোস্ট তৈরি করা হলো। সেখানে এমন একটি ছবি ব্যবহার করা হলো, যা আসলে অন্য সময় বা অন্য জায়গার। কিন্তু পোস্টের ভাষা এমনভাবে লেখা হয়েছে যাতে মানুষ ক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় অনেক মানুষ আর যুক্তি দিয়ে ভাবেন না। তারা ভাবেন—“এটা যদি সত্য হয়, তাহলে তো খুব অন্যায় ঘটনা! এই আবেগ থেকেই তারা পোস্টটি শেয়ার করে দেন। আর এভাবেই একটি মিথ্যা খবর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।


লজিক্যাল চিন্তার অভাব: বড় সামাজিক সমস্যা

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই বিপদের মূল কারণ হলো লজিক্যাল চিন্তার অভাব। লজিক্যাল চিন্তা মানে হলোকোনো তথ্যকে অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে সেটিকে বিশ্লেষণ করা, প্রশ্ন করা এবং প্রমাণ খোঁজা। যেমন এই খবরটি কোথা থেকে এসেছে?এটি কি কোনো বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে?ছবিটি কি সত্যিই এই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত? অন্য কোনো সূত্র কি একই তথ্য দিচ্ছে? যারা এই প্রশ্নগুলো করেন না, তারা খুব সহজেই গুজবের শিকার হন।আর এই ব্যক্তিগত ভুল বিশ্বাস ধীরে ধীরে একটি বড় সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়।

 

গুজব থেকে সামাজিক অস্থিরতা




বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজব বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়েছে। কখনো ধর্মীয় উত্তেজনা, কখনো জাতিগত সংঘাত, আবার কখনো রাজনৈতিক সহিংসতাএসব ঘটনার পেছনে অনেক সময় মিথ্যা তথ্য বা বিকৃত খবর বড় ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশেও এর উদাহরণ কম নয়। কখনো একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে গ্রামে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, কখনো গুজব ছড়িয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। পরবর্তীতে দেখা গেছেঘটনাটি সত্য ছিল না। কিন্তু ততক্ষণে ক্ষতি হয়ে গেছে।

 

সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমও সমস্যার অংশ

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর অ্যালগরিদম। এই প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে মানুষ সেখানে যত বেশি সময় কাটায়। তাই যে পোস্টগুলো বেশি উত্তেজনাপূর্ণ, আবেগী বা বিতর্কিতসেগুলোই বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। অর্থাৎ, একটি শান্ত ও তথ্যভিত্তিক পোস্টের তুলনায় একটি উত্তেজনাপূর্ণ গুজব অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই কারণে মানুষ ধীরে ধীরে এমন একটি পরিবেশে আটকে যায়, যেখানে তারা শুধু সেই ধরনের তথ্যই দেখতে থাকে যা তাদের আবেগ বা বিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করে।

 

ডিজিটাল সচেতনতা কেন জরুরি

 

এই সমস্যার সমাধান শুধু প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন ডিজিটাল সচেতনতা। মানুষকে শিখতে হবে

 

কোন তথ্য সত্য, কোনটি গুজব

কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়

কেন শেয়ার করার আগে ভাবা জরুরি

 

বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যদি ডিজিটাল সচেতনতা নিয়ে আলোচনা করা হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অনেক বেশি দায়িত্বশীলভাবে এই মাধ্যম ব্যবহার করতে পারবে।

 

ব্যক্তিগত দায়িত্বও কম নয়

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সমস্যার জন্য শুধু প্ল্যাটফর্ম বা প্রযুক্তিকে দায়ী করলে চলবে না। এখানে প্রতিটি ব্যবহারকারীরও দায়িত্ব রয়েছে। কোনো পোস্ট দেখেই তা শেয়ার করার আগে কয়েকটি বিষয় ভাবা উচিত

 

এই তথ্যটি কি সত্য?

আমি কি এটি যাচাই করেছি?

 

এটি শেয়ার করলে কি কারো ক্ষতি

 

এই সামান্য সচেতনতা অনেক বড় সমস্যা প্রতিরোধ করতে পারে।

 

দায়িত্বশীল ব্যবহারই  একমাত্র পথ

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। ব্যবসা, শিক্ষা, যোগাযোগসব ক্ষেত্রেই এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি শক্তিশালী মাধ্যম, যা ভালো এবং খারাপদুই ধরনের কাজেই ব্যবহার করা যায়। যদি মানুষ লজিক্যাল চিন্তা না করে, যাচাই না করে তথ্য গ্রহণ করেতাহলে এই মাধ্যমই সমাজে বিভ্রান্তি, ঘৃণা এবং সংঘাত তৈরি করতে পারে।

 

শেষ কথা

 

আজকের পৃথিবীতে তথ্যের অভাব নেই। কিন্তু সঠিকভাবে চিন্তা করার ক্ষমতার অভাব একটি বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। যে সমাজে মানুষ প্রশ্ন করতে শেখে না, যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখে নাসেই সমাজ সহজেই গুজব এবং প্রপাগান্ডার শিকার হয়। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করার আগে আমাদের মনে রাখতে হবেএকটি মিথ্যা পোস্ট শুধু একটি ভুল তথ্য নয়, কখনো কখনো সেটি একটি সমাজকে অস্থির করে দেওয়ার শক্তিও বহন করে।

sidebar ad