নারী দিবস ও মধ্যপ্রাচ্যের নারীদের মানবিক বিপর্যয়

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬

নারী দিবস ও মধ্যপ্রাচ্যের নারীদের মানবিক বিপর্যয়

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের দিনটিতে বিশ্বজুড়ে যখন নারীর অগ্রগতি, অধিকার এবং সমতার কথা বলা হয়, তখন পৃথিবীর আরেক প্রান্তে অসংখ্য নারী দাঁড়িয়ে আছেন বেঁচে থাকার মৌলিক লড়াইয়ের সামনে। উন্নয়ন, নেতৃত্ব কিংবা ক্ষমতায়নের ভাষা সেখানে অনেকটাই দূরের কথা; সেখানে প্রতিদিনের প্রার্থনা একটাই—আগামীকাল যেন সন্তানটি বেঁচে থাকে।

৮ মার্চ পালিত International Women’s Day সাধারণত নারীর অর্জনকে স্মরণ করার দিন। কিন্তু ২০২৬ সালের এই দিনটি আমাদের সামনে এক কঠিন বাস্তবতাও তুলে ধরে—মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নারীরা আজ ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ইরান থেকে ফিলিস্তিন, লেবানন থেকে ইয়েমেন—যুদ্ধ ও সংঘাতের দীর্ঘ ছায়া নারীদের জীবনকে করে তুলেছে অনিশ্চয়তা ও শোকের প্রতিদিনের ইতিহাস।

নারী দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য—“আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার”—আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অধিকার প্রতিষ্ঠার আলোচনার পাশাপাশি পৃথিবীর এমন সব জায়গার দিকে তাকানোও জরুরি, যেখানে এখনো মানুষের সবচেয়ে মৌলিক অধিকার—বেঁচে থাকার অধিকার—ঝুঁকির মুখে।

যুদ্ধের ছায়ায় নারীজীবনের ভাঙনঃ মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের যুদ্ধাবস্থা এই অঞ্চলের সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোকে ভেঙে দিচ্ছে দ্রুতগতিতে। সেই ভাঙনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নারী।

২০২৬ সালের শুরু থেকেই ইরান ভয়াবহ সামরিক উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে অনিশ্চয়তার পরিবেশ মানুষের জীবনযাত্রাকে আমূল বদলে দিয়েছে। দক্ষিণ ইরানের মিনাবে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৬০ জনের বেশি ছাত্রীর মৃত্যু কেবল একটি যুদ্ধঘটনা নয়; এটি একটি সভ্যতার জন্য লজ্জাজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে।





যুদ্ধের এই বাস্তবতায় ইরানের নারীরা যেন দ্বিমুখী সংকটে পড়ে গেছেন। একদিকে তারা দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতার দাবিতে সংগ্রাম করছেন, অন্যদিকে এখন তাদের লড়াই করতে হচ্ছে নিজের এবং পরিবারের জীবন রক্ষার জন্য। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় অনেক নারী একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। হাসপাতালের অভাব, ওষুধের সংকট এবং নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে গর্ভবতী নারীরা অনেক সময় বাঙ্কার বা ধ্বংসস্তূপের মাঝেই সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য হচ্ছেন।


যারা একসময় তেহরানের রাস্তায় ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতেন, আজ তারা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে এক শহর থেকে আরেক শহরে ছুটছেন।


গাজা ও লেবাননের নিঃশব্দ দুর্ভিক্ষঃ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সবচেয়ে মর্মান্তিক চিত্র দেখা যায় ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা এবং লেবাননের বিভিন্ন অঞ্চলে। এখানে নারীরা শুধু যুদ্ধের শিকার নন; তারা এক দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভিক্ষের শিকার।




২০২৬ সালের নারী দিবসে এখানকার বহু নারীর কাছে ‘অধিকার’ শব্দটির চেয়ে ‘রুটি’ এবং ‘পানি’ শব্দ দুটি অনেক বেশি বাস্তব। খাদ্য সংকট এতটাই প্রকট যে অনেক মা নিজেরা না খেয়ে শিশুদের জন্য সামান্য খাবার জোগাড় করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তা সম্ভব হচ্ছে না।


দুগ্ধদানকারী মায়েরা নিজেরা পর্যাপ্ত পুষ্টি না পাওয়ায় শিশুদের বুকের দুধ দিতে পারছেন না। যুদ্ধের কারণে চিকিৎসা ও স্যানিটারি সামগ্রীর তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। হাজার হাজার নারী ‘ডিগনিটি কিট’-এর অভাবে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জীবনযাপন করছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের প্রজনন স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

উদ্বাস্তু জীবনের অনিরাপত্তা


সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে কয়েক মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এই বিপুল উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশি নারী ও শিশু। শরণার্থী শিবিরগুলোতে জীবনযাপন করা নারীদের জন্য প্রতিদিনই নতুন আশঙ্কা নিয়ে আসে।


অন্ধকার তাবু, পর্যাপ্ত শৌচাগারের অভাব, নিরাপত্তাহীন পরিবেশ—সব মিলিয়ে নারীরা সেখানে সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। যৌন সহিংসতা ও মানবপাচারের আশঙ্কা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়ায়।




অনেক নারী যুদ্ধে স্বামী বা পরিবারের অন্য সদস্যদের হারিয়েছেন। ফলে তারাই এখন পরিবারের একমাত্র অভিভাবক। এই ‘নারী-প্রধান’ পরিবারগুলো সম্পূর্ণভাবে ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।



আশার প্রদীপ: নারীদের নেতৃত্ব, তবু এই অন্ধকারের মাঝেও আশার আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন অনেক নারী। স্থানীয় নারী নেত্রীরা নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে গড়ে তুলেছেন ছোট ছোট সহায়তা নেটওয়ার্ক। অনেক জায়গায় সরকারি সাহায্য পৌঁছানোর আগেই তারা গর্ভবতী নারীদের কাছে ওষুধ ও প্রয়োজনীয় ভিটামিন পৌঁছে দিচ্ছেন।


স্কুল ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় নারী শিক্ষকরা ছোট ছোট তাবু কিংবা ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে শিশুদের পড়াচ্ছেন। যুদ্ধের ট্রমা থেকে শিশুদের মনকে কিছুটা দূরে রাখতে এই উদ্যোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


আন্তর্জাতিক পর্যায়েও কিছু নারী নেত্রী যুদ্ধের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় নারীদের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তুলেছেন। তাদের মতে, যুদ্ধের সবচেয়ে গভীর ক্ষত নারীরাই অনুভব করেন; তাই শান্তি প্রতিষ্ঠার আলোচনাতেও তাদের উপস্থিতি অপরিহার্য।


আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়ঃ মানবিক সহায়তা নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর অবস্থাও সহজ নয়। UNICEF এবং UN Women জানিয়েছে, তারা সাধ্যমতো চেষ্টা করলেও তহবিলের ঘাটতি ও রাজনৈতিক জটিলতার কারণে সব জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।


বিশ্ব যখন প্রযুক্তিগত অগ্রগতির গল্প বলে, তখন ২০২৬ সালেও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক মা বিনা চিকিৎসায় সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য হচ্ছেন—এটি পুরো মানবজাতির জন্যই একটি কঠিন প্রশ্ন।




নারী দিবসের প্রকৃত অর্থঃ নারী দিবস কেবল সেমিনার বা শোভাযাত্রার দিন নয়; এটি আমাদের বিবেককে জাগ্রত করার দিনও। এবারের নারী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ হলো তাদের জীবনকে নিরাপদ করা।

আজ যখন আমরা সমতার কথা বলি, তখন সেই কথার ভেতরেই থাকতে হবে যুদ্ধবিধ্বস্ত নারীদের নিরাপত্তা, খাদ্য ও চিকিৎসার নিশ্চয়তার দাবি।


সম্ভবত এ বছরের নারী দিবসের সবচেয়ে জরুরি স্লোগান হতে পারে— “যুদ্ধ বন্ধ করো, জীবন বাঁচাও।


ইতিহাস একদিন সাক্ষী দেবে—এই সংকটের সময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কতটা মানবিক দায়িত্ব পালন করেছিল। পৃথিবীর মানুষ চায় না ২০২৬ সালের নারী দিবসটি কেবল শোকের দিন হয়ে থাকুক; তারা চায় এটি হোক মানবিক সংহতি ও দায়িত্ববোধের নতুন সূচনা।




লেখকঃ সাবিনা ইয়াসমীন।
            সম্পাদক, রোদসী

 

sidebar ad