নারীর অধিকার ও সমতায় অঙ্গীকারের বার্তা: নারী দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬

নারীর অধিকার ও সমতায় অঙ্গীকারের বার্তা: নারী দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য

ঢাকা, ৭ মার্চ ২০২৬ (বাসস) : আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে সামনে রেখে দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সরকার শিক্ষা, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য এবং রাজনীতিসহ সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীর সক্রিয় ও কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাঁর ভাষায়, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন নারী-পুরুষ উভয়েই সমান অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ পায়।


আগামীকাল ৮ মার্চ বিশ্বজুড়ে পালিত হবে International Women’s Day। এ উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের সকল নারীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে নারী ও পুরুষ সমান মর্যাদা নিয়ে পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজে অবদান রাখবে। উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন নারীর অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সিদ্ধান্তগ্রহণে অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।”


প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য—“আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার”—কে সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এই প্রতিপাদ্য কেবল একটি স্লোগান নয়; বরং এটি একটি অঙ্গীকার, যা সমাজকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, একটি উন্নত ও মানবিক সমাজ গড়তে হলে নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার নিশ্চিত করা অপরিহার্য।


বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী—এই বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারীদের রাষ্ট্র, সরকার ও রাজনীতির মূলধারার বাইরে রেখে কোনো দেশের উন্নয়ন কল্পনা করা যায় না। বিশেষ করে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত না হলে পরিবার ও সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বাংলাদেশেও জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী; তাই জাতীয় উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে নারীর ক্ষমতায়ন একটি অপরিহার্য শর্ত।


নারীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গে তিনি স্মরণ করেন স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ হিসেবে পরিচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অবদান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, শহীদ জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ে ‘নারী বিষয়ক দফতর’ প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা ছিল নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে গঠন করা হয় ‘মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়’, যা বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৯৪ সালে সম্প্রসারিত হয়ে ‘মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’-এ রূপ নেয়।


তিনি উল্লেখ করেন, নারীর আর্থসামাজিক ক্ষমতায়নে বেগম খালেদা জিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা চালু করা। এটি শুধু একটি শিক্ষা নীতি ছিল না; বরং ছিল একটি সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা। এর ফলে বাংলাদেশের অসংখ্য কন্যাশিশু শিক্ষার সুযোগ পেয়েছে এবং ধীরে ধীরে সমাজে নারীর অংশগ্রহণের পরিসরও বিস্তৃত হয়েছে।


প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার সেই ধারাবাহিকতাকে আরও এগিয়ে নিতে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালু করেছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে অনেক নারী পরিবারে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সিদ্ধান্তগ্রহণে নতুন ভূমিকা পাচ্ছেন। তাঁর মতে, নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়ন নয়; এটি পরিবার ও সমাজের সামগ্রিক অগ্রগতিরও পথ তৈরি করে।


ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরকার স্নাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা চালুর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো, মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে স্কুল ইউনিফর্ম, ডিজিটাল লার্নিং সুবিধা এবং আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, শিক্ষাই নারীর ক্ষমতায়নের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।


নারীর নিরাপত্তা প্রসঙ্গেও তিনি গুরুত্বারোপ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বিশেষ করে ডিজিটাল যুগে সাইবার বুলিং এবং অনলাইনে নারীর বিরুদ্ধে হয়রানি একটি নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইন ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে।


প্রধানমন্ত্রী তাঁর বার্তায় আরও বলেন, একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে হলে শুধু নীতি বা আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন। তিনি বলেন, “আমাদের বিদ্যমান সমাজে সমতা হোক অঙ্গীকার, মর্যাদা হোক বাস্তবতা এবং ক্ষমতায়ন হোক উন্নয়নের ভিত্তি।” তাঁর মতে, নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে কেবল নারীর উন্নয়ন নয়—এটি পুরো জাতির উন্নয়নের পথকে সুদৃঢ় করা।


আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে গৃহীত সকল কর্মসূচির সফলতা কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই দিনটি আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়—সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আমরা কতদূর এগিয়েছি এবং সামনে আমাদের কী কী দায়িত্ব রয়েছে।


নারীর অধিকার, সমতা এবং মর্যাদার প্রশ্নে এই অঙ্গীকার শুধু রাষ্ট্রের নীতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজের প্রতিটি স্তরে বাস্তবায়িত হোক—এটাই আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মূল বার্তা বলে তিনি উল্লেখ করেন।

sidebar ad